পৃথিবীর প্রথম মানবী হাওয়া (আ.)

কাইরুয়ান মসজিদ তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান নগরের বেশ পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী একটি মসজিদ। এটি উকবা মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটি ৬৭০ সালে আরব সেনানায়ক উকবা ইবনে নাফি কর্তৃক কাইরুয়ান নগরীতে প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদের বিস্তৃৃতি প্রায় ৯,০০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে এবং এই মসজিদট

আরবি ‘হাইয়ুন’ মূল ধাতু থেকে ‘হাওয়া’ শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ জীবিত। একজন জীবিত মানুষ থেকে আরেকজন জীবিত মানুষের জন্ম বিধায় নামকরণ হয়েছে ‘হাওয়া’। আদম (আ.) এর বাঁ পাঁজরের হাড় থেকে হাওয়া (আ.) এর সৃষ্টি। তিনি মানবজাতির আদি মাতা। পৃথিবীর প্রথম নারী। মহামহিম স্রষ্টা ইচ্ছা করলে মা হাওয়াকেও আদম (আ.) এর মতো কোনো মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি মাটি থেকে সৃষ্টি করতে পারতেন। কিংবা হাওয়া (আ.) এর বদন থেকে আদম (আ.) এর শরীর বের করতে পারতেন। তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি যা চান, যেভাবে চান, সেভাবেই হয়। তিনি মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন আদমকে দিয়ে। তারপর তারই দেহ থেকে বিবি হাওয়ার উৎপত্তি ঘটালেন। নিশ্চয়ই এতে প্রজ্ঞাময় স্রষ্টার অপার হেকমত নিহিত আছে। 

কেন হাওয়া (আ.) এর সৃষ্টি?
আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে তাকে থাকতে দিয়েছেন অফুরন্ত নেয়ামতে পূর্ণ, চির শান্তি-সুখের প্রাণকেন্দ্র জান্নাতে। সেখানে মানব চাহিদা পূরণের সমূহ আয়োজন আছে। নয়নাভিরাম দৃশ্য আছে। ছলছল বয়ে চলা নদী, প্রবাহিত ঝরনা, স্বচ্ছ পানিতে মাছদের ছোটাছুটি, পাখিদের ওড়াওড়ি, নানা কিসিমের ফলমূল ও চোখ ধাঁধানো অট্টালিকা। বর্ণনাতীত এ বিচিত্র সুখভুবনে থেকেও বাবা আদম যেন অসুখী। তার ভেতরজুড়ে হাহাকার করছে মহাঝড়। কিন্তু কেন? তা তিনিও জানেন না। জানেন শুধু সেই সত্তা, যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন, সবুজের ঢেউ তোলা নান্দনিক দৃশ্য কিংবা কলকল ধ্বনি তুলে বয়ে চলা নদী বা বিচিত্র ফলমূলে সজ্জিত বাগান নয়, আদমের অগ্নিদগ্ধ হাহাকার পরম প্রাপ্তিতে রূপায়িত করতে পারে শুধু নারী। কারণ মানসিক প্রশান্তি ও আরাম-আয়েশের পূর্ণতা আসে সমগোত্রীয়ের সঙ্গ থেকে। 
তাই আল্লাহ তায়ালা ঘুমন্ত আদম থেকে সৃষ্টি করেন মা হাওয়া (আ.) কে। জাগ্রত হয়ে পাশে বসা অপরূপ সুন্দরী দেখে আদম (আ.) মুগ্ধ হলেন। কিন্তু আরশ থেকে আওয়াজ এলো, সাবধান! বিয়ের আগে স্পর্শ করা হারাম। বিয়েবহির্ভূত নারী-পুরুষ সম্পর্ক হারাম হওয়ার বিধান তো সেখান থেকেই। আদম (আ.) বিবি হাওয়াকে বিয়ে করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে আল্লাহ নিজে তা সম্পাদন করে দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে মানব-মানবীর বিয়ের ঘটনা এটিই প্রথম। জান্নাতের সেই বিয়ের পবিত্র ধারা চালু রেখেছেন দুনিয়াতেও। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেনÑ ‘তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জীবনসঙ্গিনী, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও এবং সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়ামায়া। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা রোম : ২১)। 

জান্নাত ছেড়ে দুনিয়ার মাটিতে
আল্লাহ তায়ালা আদম ও হাওয়া (আ.) কে জান্নাতে অবাধে বিচরণ ও ফল ভক্ষণ করার অনুমতি দিলেন। কিন্তু একটি গাছের ফল খেতে নিষেধ করেন। একদিন হাওয়া (সা.) একা একা জান্নাতে ঘোরাঘুরি করছিলেন। এমন সময় একটি কান্নার আওয়াজ শুনে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। তিনি এই ভেবে বিস্মিত হলেন যে, জান্নাত তো দুঃখ-কষ্টের স্থান নয়, তাহলে এখানে কান্না কেন? তিনি এগিয়ে গেলেন। শয়তান হাওয়া (আ.) কে দেখে বলল, আপনার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে; তাই কাঁদছি। এখান থেকে আপনাদের বেরিয়ে যেতে হবে, তাই। হাওয়া (আ.) কারণ জানতে চাইলে সে একটি গাছের দিকে ইশারা করে বলল, এ গাছের ফল যে ভক্ষণ করবে, সে কখনও জান্নাত থেকে বের হবে না। আমরণ এখানে থাকতে পারবে। শয়তান নানা কৌশলে মিথ্যা কথা বলে হাওয়া (আ.) কে প্ররোচনা দিতে লাগল। কিন্তু হাওয়া (আ.) বললেন, আমি আমার প্রভুর নির্দেশ কিছুতেই অমান্য করতে পারব না। শয়তান কসম খেয়ে নিষিদ্ধ ফলের মিথ্যা গুণাগুণ বলতে লাগল। এক পর্যায়ে হাওয়া (আ.) ও আদম (আ.) উভয়ে শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে গেলেন। তারা নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করে ফেললেন। 
পবিত্র কোরআনে এ ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছেÑ ‘অতঃপর শয়তান তাদের উভয়কে প্ররোচিত করল, যাতে তাদের অঙ্গ, যা তাদের কাছে গোপন ছিল, তাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়। সে বলল, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করেছেন, তা শুধু এজন্য যে, তোমরা যাতে ফেরেশতা হয়ে যাও কিংবা অনন্ত জীবন লাভ করো। সে নানারকম শপথ করে বলল, আমি তোমাদের হিতাকাক্সক্ষী হয়ে ভালো উপদেশ দিচ্ছি। অতঃপর সে প্রতারণাপূর্বক তাদের সম্মত করে ফেলল। অনন্তর যখন তারা নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়ে নিল, তখন তাদের গুপ্তাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে পড়ল। তারা লজ্জিত হয়ে জান্নাতের পাতা দিয়ে তাদের লজ্জাস্থান ঢাকতে লাগলেন। তাদের প্রতিপালক তাদের ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদের এই বৃক্ষ থেকে বারণ করিনি? আর আমি কি বলিনি যে, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সূরা আরাফ : ২০-২১)।
নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণের ফলে আল্লাহ তায়ালা আদম ও হাওয়া (আ.) কে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন। এ সময় (প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী) হাওয়া (আ.) আরবের জেদ্দা এবং আদম (আ.) শ্রীলঙ্কার সন্দ্বীপে অবতরণ করেন। এরপর দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর আরাফার ময়দানে তাদের সাক্ষাৎ ঘটে। আল্লাহ তায়ালা তাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানব জন্মের সূচনা করেন। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন। এরপর তাদের দুজন থেকে বিস্তার করেছেন অগণিত পুরুষ ও নারী।’ (সূরা নিসা : ১)। 
হাওয়া (আ.) এর গর্ভে ২৩৯ মতান্তরে ৩৬১ সন্তান জন্মগ্রহণ করে। আদম (আ.) এর মৃত্যুর এক বছর পর মা হাওয়া (আ.) ইন্তেকাল করেন। সে হিসাবে তার বয়স হয়েছিল ৯৬১ বছর। তবে সঠিক বয়সের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া উসমানিয়া দারুল উলুম সাতাইশ, টঙ্গী


স্বামী বিদেশে থাকলে ইসলামের দৃষ্টিতে
স্বামী বিদেশে থাকলে তার দ্বীন ও দুনিয়া বিষয়ক সকল কিছুর
বিস্তারিত
কোন মুসলিম দেশে কবে ঈদ
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সেন্টার (আইএসি) বেশির ভাগ ইসলামি রাষ্ট্রগুলোতে ঈদুল ফিতরের
বিস্তারিত
রমজানে পাপ মুক্তির অবারিত সুযোগ
আজ ১৬ রমজান বুধবার । মাগফেরাতের দশক শেষ হতে আর
বিস্তারিত
সৌদিতে রমজানে প্রীতিময় পরিবেশ
রমজানের আবহ শুরু হওয়ার আগে থেকেই সৌদি আরবের মানুষ মহিমান্বিত
বিস্তারিত
আজকের তারাবি ১৭
আজ ১৭তম তারাবিতে সূরা নামলের ৬০-৯৩, সূরা কাসাস এবং সূরা
বিস্তারিত
রাতে ঘুমানোর সময় নবীজি যা
আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী।’ (আন-নাবা ৯)। নিদ্রা
বিস্তারিত