মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

নামাজের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করুন

আল্লাহ তায়ালা মানবের সম্মুখে ইসলামের অনন্য বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তাদের সামনে শরিয়তের বিধানগুলো সুস্পষ্ট করেছেন। বান্দার ওপর দিনে-রাতে রীতিসিদ্ধ ও ধার্যকৃত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে যতœবান হওয়া এবং এতে নিরবচ্ছিন্নতা অবলম্বনকে ফরজ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘সব নামাজের প্রতি তোমরা যতœবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাজের ব্যাপারে। আর আল্লাহর সামনে একান্ত আদবের সঙ্গে দাঁড়াও।’ (সূরা বাকারা : ২৩৮)। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকারপূর্বক তা আদায়, পালন ও কায়েমকে ছেড়ে দেয়, ইসলামে তার কোনো অংশ নেই। 
জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.) থেকে শুনেছি, তিনি এরশাদ করেন, ‘ব্যক্তি ও কুফর শিরকের মাঝে পার্থক্য হলো নামাজ পরিত্যাগ করা।’ (মুসলিম)। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আমার বন্ধু রাসুল (সা.) এ মর্মে অসিয়ত করেন, ‘তুমি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না, যদিও তোমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় কিংবা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কিছুতেই ফরজ নামাজ ইচ্ছাকৃত ছেড়ে দিও না; যে তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়, সে যেন (আল্লাহ কর্তৃক) দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলো। আর মদ পান করো না; কারণ তা সব মন্দের চাবিকাঠি।’ (ইবনে মাজাহ)। 
ওলামায়ে কেরাম একমত যে, সীমিত ও সর্বজ্ঞাত সময় দ্বারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় সুনির্ধারিত ও সুবিদিত। নামাজের সময়ের শুরু ও শেষ রয়েছে। সময়ের আগে নামাজ আদায় করা যেমন কোনো মুসলমানের জন্য জায়েজ নয়, তেমনি (যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়া) সময়ের পরও কারও জন্য তা আদায় বৈধ নয়। আল্লাহ বলেনÑ ‘নিশ্চয়ই নামাজ মোমিনের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ।’ (সূরা নিসা : ১০৩)। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই হজের মতো নামাজেরও একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে।’ যেভাবে হজের সুনির্দিষ্ট মাসগুলোর বাইরে হজ করলে তা আদায় হয় না, তদ্রƒপ সময় শেষ হওয়ার পর আরাফায় অবস্থান বৈধ নয়। যেভাবে জুমার নামাজ শনিবার দিন অনুমোদিত নয়, তেমনি ফরজ নামাজের সময় নিয়ে শিথিলতাও বৈধ নয়। যারা ফরজ নামাজ শরিয়ত কর্তৃক নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে আদায় করে, এ অবস্থায় যে তারা তা সময়ের পর পড়ে নেয়; সেসব নামাজিকে আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করেন। আল্লাহ বলেনÑ ‘অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজির, যারা নিজেদের নামাজ সম্পর্কে বেখবর।’ (সূরা মাউন : ৪, ৫)। 
মূলত এসব মোনাফেক ও ফাসেকের অবস্থা, যারা দিনের নামাজ রাতে, আর রাতের নামাজ দিনে আদায় করে। নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী আদায় করে, তাদের ইবাদত সহিহ হওয়ার শর্তানুযায়ী আদায় করে না। তারা মূলত এসব করে অবজ্ঞা, অন্যায় ও তামাশাস্বরূপ। নওফেল বিন মুআবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দিল, তার পরিবার ও সম্পদ যেন লুণ্ঠন করে নেওয়া হলো।’ (ইবনে হিব্বান)। লুণ্ঠিত বলতে তাকে বোঝায়, যার কাউকে হত্যা করা হলো অথবা তার সম্পদ হরণ করা হলো। না সে তার হক বুঝল, আর না সে এর প্রতিশোধ নিল। উপরোক্ত হাদিসের সঙ্গে এর সাদৃশ্যের দিকটি হলো, যার নামাজ ছুটে গেছে; তো তার মাঝে গোনাহের চিন্তা ও সওয়াব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার চিন্তাÑ দুটোই একত্রিত হলো। যেভাবে হরণকৃত ব্যক্তি থেকে লুণ্ঠনের চিন্তা ও তা ফিরে পাওয়ার অস্থিরতাÑ দুটোই একীভূত হয়েছে। ‘নামাজ ছুটে যাওয়া’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, কোনো ওজর ব্যতিরেকে তা সময়ের পর বিলম্বে আদায় করা। 
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) কে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, যে এক ওয়াক্ত নামাজ এ নিয়তে ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয় যে, সে তা সময়ের পর কাজা আদায় করে নেবে, তাহলে তার এ গর্হিত কাজ কবিরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত হবে কি? উত্তরে তিনি বললেন, ‘আবশ্যকীয়ভাবে আদায়যোগ্য নামাজকে ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ের পর আদায় করা কবিরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত নামাজ ছেড়ে দেয়; সে ভয়াবহ কবিরা গোনাহে লিপ্ত হলো। অতএব সে যেন যথাসম্ভব তওবা ও নেক আমলের মাধ্যমে তার ঘাটতি পূরণ করে নেয়। যদিও সে কাজা আদায় করে তারপরও সে যা করেছে আলেমদের ঐকমত্য অনুযায়ী তা তার পাপ মোচনের জন্য যথেষ্ট হবে না।’ 
যে ব্যক্তি ভুলে কিংবা ঘুমে থাকার দরুন নামাজ ছেড়ে দেয়; তো অবশ্যই তার ছুটে যাওয়া নামাজ কাজা আদায় করা ওয়াজিব। অতএব ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হওয়ার পর আর ভুলে যাওয়া ব্যক্তির নামাজের কথা স্মরণ হওয়ার পর আদায় করবে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজের কথা ভুলে গেছে কিংবা ঘুমন্ত ছিল, তাহলে এর কাফফারা হলো যখন তার স্মরণ হবে, তখন আদায় করে নেবে। এছাড়া তার ওপর আর কোনো কাফফারা নেই।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 
তেমনি সূর্য হলুদবর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিনা ওজরে আসরের নামাজ পরে আদায় করবে না। যদি কেউ এরূপ করে, তাহলে সে বক্তব্য অনুযায়ী গোনাহগার সাব্যস্ত হবে। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘সূর্য হলুদ বর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত আসরের সময়।’ (মুসলিম)। তদ্রƒপ আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, সেটিই মোনাফেকের নামাজ, সেটিই মোনাফেকের নামাজ, সেটিই মোনাফেকের নামাজ। তোমাদের কেউ এমনি বসে থাকে, যখন সূর্য হলুদ রং ধারণ করে এ অবস্থায় তা শয়তানের দুই শিং বা এক শিংয়ের মাঝখানে থাকে। তারপর সে নামাজে দাঁড়িয়ে চারটি ঠোকর মারে। তাতে সে খুব কমই আল্লাহর স্মরণ করে।’ (মুসলিম)। যদি সূর্য হলুদ বর্ণ হওয়া পর্যন্ত নামাজ বিলম্ব করা বৈধ হতো, তাহলে কখনোই রাসুল (সা.) বিলম্বের নিন্দা করতেন না এবং তাকে মোনাফেকির আলামত হিসেবে গণ্য করতেন না। 
অনুরূপ মধ্যরাত অবধি এশার নামাজকে বিলম্ব করবে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আর এশার নামাজের (শেষ) সময় মধ্যরাত পর্যন্ত।’ (মুসলিম)। সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত ফজর নামাজ বিলম্ব করবে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ফজরের নামাজের সময় ভোর থেকে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত।’ (মুসলিম)। যে ব্যক্তি রুকু-সিজদাসহ যথাসময়ে পূর্ণ এক রাকাত নামাজ পেল, সে যেন পূর্ণ এক রাকাত পেল। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নামাজের রুকু পেল, সে নামাজ পেল।’ (বোখারি ও মুসলিম)। যে ব্যক্তি সূর্য উদিত হওয়ার পর জাগ্রত হওয়ার জন্য সতর্কীকরণ অ্যালার্ম দিয়ে রাখে এবং সে ফজরের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, আর সে জাগ্রত হওয়ার কোনো উপায় অবলম্বন করল না, আর ঘুম থেকে প্রত্যুষে জাগ্রত না হয়, এমনকি কাউকে জাগ্রত করে দেওয়ার জন্য না বলে, তাহলে সে বাড়াবাড়ির গোনাহে পতিত হলো। এমনকি সে ইচ্ছাকৃত বর্জনকারীর হুকুমে গণ্য হবে। 
ফরজ নামাজের জন্য ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। সময় সংকীর্ণ হলে তাকে জানিয়ে দেওয়া আবশ্যক; কেননা এটি কল্যাণ ও খোদাভীতির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার অংশ। কারণ ঘুমন্ত ব্যক্তি গাফেলের মতো। আর গাফেলকে সতর্ক করা ওয়াজিব। ব্যক্তি নিজ ঘরের অধীনদের সঙ্গে নামাজের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হবে। ফরজ নামাজ আদায়ে সে তাদের আদেশ দেবে। আর তাদের ফজর নামাজের জন্য জাগ্রত করে দেবে, যাতে তারা পূর্ণ পবিত্রতা অবলম্বনপূর্বক সূর্য উদিত হওয়ার আগেই পরিপূর্ণরূপে নামাজ আদায় করতে সক্ষম হয়। 
ওয়াজিব না হওয়া সত্ত্বেও শিশুকে নামাজের আদেশ দেওয়া, যাতে সে এতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের আদেশ দাও। আর ১০ বছর বয়সে এর পরিত্যাগে তাদের শাসন কর। আর তাদের বিছানা আলাদা করে দাও।’ (আবু দাউদ)। যেসব শিশু-কিশোর ও যুবক রাস্তাঘাটে, মাঠে-ময়দানে কিংবা মসজিদের পাশে খেলাধুলা বা অহেতুক কাজে লিপ্ত থাকে, আর তারা জামাতে নামাজ আদায়ে শরিক হয় না, আজান কিংবা আহ্বানে আগ্রহ না দেখায়, ইসলামের মৌলিক নিদর্শনের প্রতি তারা কোনো সম্মান প্রদর্শন না করেÑ এরূপ অবস্থায় তাদের অভিভাবকদের করণীয় হলো, তাদের এসব বিষয়ে তদারকি করা। অন্যরা যখন এমন বালকদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে, তাদেরও কর্তব্য এদের নসিহত করা। 
ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘যে চায় যে কাল কেয়ামতে মুসলমান অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, সে যেন এসব নামাজের প্রতি পূর্ণ যতœবান হয়। এমনকি এসবের নাম ধরে তাকে কেয়ামত দিবসে ডাকা হবে।’ 
আচ্ছা! বলুন তো, আজানের চেয়ে কোন আহ্বান এত সুমিষ্ট ও সুমধুর? হে ভাই ও বোনেরা! যে আজান শুনেও উত্তর দাও না। হে ওই ব্যক্তি, যে নামাজের ব্যাপারে ঢিলেমি, শৈথিল্য ও অবহেলা কর। যে অলসতায় মগ্ন ও ব্যস্ততায় লিপ্ত এবং লাগামহীন কাজে যুক্ত। তুমি মন্দ ও ধোঁকার সরোবরে বিচরণ করছ। যে ব্যক্তি মসজিদের দিকে রওনা হলো। সে তো সাক্ষাৎকারী মেহমান সদৃশ্য। সে কার সাক্ষাৎ লাভ করবে? কার দিকে সে রওনা হলো? সে কার মেহমান? সে তো একমাত্র মহান আল্লাহর মেহমানতার দয়া মেহেরবানি ও অনুগ্রহে রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যা মসজিদে গমন করে; যতবার সে মসজিদে গমন করে ততবার আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে তার জন্য মেহমানদারির ব্যবস্থা করবেন।’ (বোখারি ও মুসলিম)। 

৮ রজব ১৪৪০ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 
অনুবাদ নাজমুল হুদা


দাজ্জালের ফেতনা থেকে সাবধান
নবী (সা.) তাঁর উম্মতকে ফেতনা থেকে কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন। এ
বিস্তারিত
সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নেই
শ্রীলঙ্কায় নিরাপরাধ মানুষের ওপর নির্বিচার সন্ত্রাসী হামলায় সারাবিশ্বের বিবেকবান মানুষের
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই,
বিস্তারিত
দ্বিতীয় কাতার কোথা থেকে শুরু
প্রশ্ন : নামাজের প্রথম কাতার পূর্ণ হয়ে গেলে দ্বিতীয় কাতার
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বইয়ের নাম : রামাদান উদযাপন রচয়িতা : ড. মাওলানা আবু সালেহ
বিস্তারিত
জীবন পাথেয়
আপনি বিপদে পড়ে সর্বশেষ কবে আল্লাহর কাছে ধরনা দিয়েছেন? আল্লাহর
বিস্তারিত