কবি শেখ সাদি ও তার গুলিস্তান

মুহাম্মদ এরফানুল করীম

মহাকবি শেখ সাদির অনন্য গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’ লিখিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৭০০ বছর আগে। পদ্য ও গদ্যের সংমিশ্রণে লিখিত ‘গুলিস্তান’-এ বিধৃত সৌন্দর্যসুষমা, নৈতিকতা, অলংকার উপমা আভরণ যেভাবে শৈল্পিক বিন্যাসে শোভিত ও আয়ুষ্মান, তা সত্যিই বিস্ময়কর। শেখ সাদি গুলিস্তানের ভূমিকায় বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রশংসায় যে পঙ্ক্তিমালা রচনা করেছেন, তার অনুরণন, শিহরণ বিশ্ব মানবের প্রিয়তা ও ভালোবাসা অর্জন করেছে। গুলিস্তানের ভূমিকায় তিনি লিখেছেনÑ
বালাগাল উলা বিকামা লিহি
কাশাফাদ দুজা বি’জামালিহি
হাসনাত জামিয়ু খিসালি’হি
সাল্লু আলাইহি ওয়া আ’লিহি
বিশিষ্ট গবেষক ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী বলেছেন, ‘গুলিস্তান’-এর ভূমিকায় বিধৃত এ পঙ্ক্তিমালা শত শত বছর ধরে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় মাহফিলগুলোতে আশেকে রাসুলরা ভক্তি ও শ্রদ্ধায় অবনত কণ্ঠে সমস্বরে পাঠ করে অনাবিল তৃপ্তি ও নির্মল আনন্দ পান। এ অনুপম পঙ্ক্তিমালার যথার্থ অনুবাদের অনেক চেষ্টা বাংলা ভাষায়ও হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ দাবি করতে পারেননি এর সঠিক ও যথার্থ অনুবাদ হয়েছে বলে। মোটামুটি এভাবে তার অনুবাদ করা যায়Ñ
সুউচ্চ শিখরে সমাসীন তিনি নিজ মহিমায়
তিমির তমসা কাটিল তাঁর রূপের প্রভায়,
সুন্দর আর সুন্দর তাঁর স্বভাব চরিত্র তামাম
পড়ো তাঁর ও তাঁর বংশের পরে দরুদ সালাম। কবি শেখ সাদি জন্মগ্রহণ করেন ইরানের প্রসিদ্ধ সিরাজ নগরে। তিনি ইন্তেকাল করেন ১২৯১ অথবা ১২৯২ সালে। কবির পুরো নাম শেখ মুশাররফ উদ্দীন ইবনে মুসলেহ উদ্দীন সাদি। সাদি মূলত তার কলমি নাম। তার বাবার নাম সৈয়দ আবদুল্লাহ। মায়ের নাম মাইমুনা খাতুন। শৈশবেই তার পিতৃবিয়োগ হয়। শৈশবকাল থেকেই তার দিন কাটে অতি দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্র্যপীড়িত অবস্থায়। অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম করে তিনি ক্রমে বেড়ে ওঠেন। আর্থিক সংকটের কারণে তিনি স্কুলে পর্যন্ত ভর্তি হতে পারেননি। ছাত্র হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন মেধাবী, তেমনি কঠোর অধ্যবসায়ী। জ্ঞান অন্বেষণের গভীর তৃষ্ণা তার শৈশবকাল থেকেই পরিলক্ষিত হয়। সৌভাগ্যক্রমে এক ধনী ব্যক্তির বদান্যতায় তার শিক্ষালাভের সুযোগ ঘটে। শিক্ষানুরাগীর বাবার কাছেই তার শৈশবের পড়ালেখার হাতেখড়ি হয়। 
শেখ সাদির বেড়ে ওঠা ইরাকের বাগদাদ নগরীতে। যখন তার বয়স ২১ বছর, তখন নিজামিয়া মাদ্রাসার একজন শিক্ষককে স্বরচিত একটি কবিতা পড়তে দেন। শিক্ষক তার সৃজনশীল কাব্যিক প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন এবং তার জন্য মাসোহারা পাওয়ার বন্দোবস্ত করেন। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ নগরের বিখ্যাত নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব বিষয়ে অধ্যয়ন করেন, তার মধ্যে ছিল ইসলামি বিজ্ঞান, আইন, শাসন, ইতিহাস এবং আরবি সাহিত্য। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি গভীর মেধার স্বাক্ষর রাখেন, যার ফলে তিনি একাধিক বৃত্তি লাভ করেন। ভ্রমণের প্রতি তার ছিল বিশেষ আগ্রহ। সে সময়কার পারস্য ছাড়াও তিনি ভ্রমণ করেছেন অনেক ঐতিহাসিক দেশ ও শহরে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভারতের পশ্চিমাঞ্চল, তুরস্ক, সিরিয়া, জেরুজালেম, তুর্কিস্তান, আর্মেনিয়া, মিসর, আরব, আবিসিনিয়া ইত্যাদি।
তিনি হেঁটেও বহু জায়গায় ভ্রমণ করেছেন। গুলিস্তানে তিনি লিখেছেনÑ আমি কখনও কালের কঠোরতা ও আকাশের নির্মমতার ব্যাপারে অভিযোগ করিনি। তবে একবার নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। কারণ পায়ে তখন জুতা তো ছিলই না, এমনকি জুতা কেনার মতো অর্থও ছিল না। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে গিয়ে উঠলাম ইরাকের মসজিদ আল কুফায়। সেখানে একটি লোককে শুয়ে থাকতে দেখলাম। লোকটির একটি পা-ই নেই। তখন আল্লাহর দরবারে শোকর গুজার করে আমার নিজের পা খালি থাকা নিয়েও সন্তুষ্ট হলাম।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন তেহরান সফরে গিয়ে বলেছিলেন, জাতিসংঘ সদর দপ্তরের প্রবেশপথে রয়েছে জমকালো দৃষ্টিনন্দন একটি কার্পেট। আমার মনে হয়, জাতিসংঘে যত কার্পেট আছে, তার মধ্যে এটিই হচ্ছে সবচেয়ে বড়। এটি জাতিসংঘের দেওয়ালকে সুশোভিত করে রেখেছে। এ কার্পেটটি ইরানের জনগণের দেওয়া প্রীতি ভালোবাসার উপহার। ওই কার্পেটের ওপরই উৎকীর্ণ রয়েছে ফারসি সাহিত্যের মহান কবি শেখ সাদির চমৎকার নান্দনিক একটি কবিতার বর্ণোজ্জ্বল পঙ্ক্তিগুলো।
সব মানুষ একটি শরীরের অঙ্গের মতো। যেহেতু সৃষ্টির মূলে সবার শরীরের উপাদান একই রকম। যখন একটি অঙ্গ ব্যথায় কাতর হয়, তখন বাকি অঙ্গগুলোও স্থির থাকতে পারে না।
মহাকবি শেখ সাদির শ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে বুস্তান ও গুলিস্তান। কবি শেখ সাদি বুস্তান লেখা সমাপ্ত করেন ১২৫৭ সালে, অতঃপর গুলিস্তান রচনা শেষ করেন ১২৫৮ সালে অর্থাৎ বুস্তান রচনার পরের বছরেই গুলিস্তান রচনা শেষ করেন।
পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার প্রশান্তি দিয়ে শুরু হয়েছে শেখ সাদি রচিত সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’। বেহেশতের সংখ্যা আটটি, সে অনুসারে মোট আটটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হয়েছে গুলিস্তানকে। ভূমিকায় রয়েছে মহান আল্লাহপাকের প্রতি ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি তারিফ।
প্রথম অধ্যায়ের বিষয় রাজা-বাদশাহদের জীবন চরিত। তৎকালে কাব্য ও সাহিত্যচর্চা মানেই ছিল সম্রাট নৃপতিদের চাটুকারিতা। বিরুদ্ধে বলা মানে নিজের অনিবার্য মৃত্যু ডেকে আনা। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে দরবেশদের আখলাক। তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে অল্পেতুষ্টির ফজিলত। চতুর্থ অধ্যায়ে নীরবতার সুফল আলোচিত হয়েছে। আর পঞ্চম অধ্যায়ে প্রেম ও যৌবন প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে রয়েছে দুর্বলতা ও বার্ধক্যের কথা। সপ্তম অধ্যায়ের আলোচনার বিষয় হলো শিক্ষাদীক্ষার প্রভাব। গবেষকদের ভাষ্যমতে, এ গ্রন্থের সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী অংশ হলো অষ্টম অধ্যায়, যার বিষয় হলো সহচর্যের আদব ও শিষ্টাচার। শেখ সাদির রচনা বাংলায় আরও বেশি মাত্রায় অনুবাদ হওয়া দরকার। মহান এ কবির জীবন দর্শন সম্যকভাবে জানা প্রয়োজন। গবেষক ও ফার্সি ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী ‘ফুলের সুবাসে চির অমøান শেখ সাদির গুলিস্তান’ প্রবন্ধে বলেছেন, গুলিস্তানের বাচনভঙ্গি অপূর্ব, প্রাঞ্জল, গতিময়, প্রাণচঞ্চল। গদ্যে পদ্যে শব্দে শব্দে ঝংকার, ভাবের তরঙ্গ, আনন্দের উচ্ছলতা, তত্ত্বের সমাহার। মনে হবে, দুনিয়ার কোনো কাব্য বা পদ্য সাদির সমকক্ষতায় আসতে পারবে না। কিন্তু যখন গদ্যের মাঝে শ্লোক, খ-কবিতা প্রভৃতি পদ্যের সুন্দর সংযোজন দেখবেন, মনে হবে গদ্য-পদ্যের সব সীমা চুরমার করে দিয়েছে ‘গুলিস্তান’। প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি শ্লোক মুখস্থ রাখার মতো। তাই ইরানিদের মুখে মুখে চর্চারিত ‘গুলিস্তান’-এর এসব বাক্য। কথায় কথায় উদ্ধৃতি টানে সাদির উক্তির। অফুরন্ত জ্ঞান, তত্ত্ব ও উপদেশ উপচে পড়ে ‘গুলিস্তান’-এর প্রতিটি বাক্যবিন্যাসে।

লেখক : শিক্ষক, বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া আদর্শ মাদ্রাসা, উত্তর রামপুর, সাতকানিয়া চট্টগ্রাম


স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে ঘোষিত সব হালাল খাদ্য স্বাস্থ্য উপযোগী এবং সব হারাম
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী ‘কীভাবে তোমরা সত্য প্রত্যাখ্যান করবে, যখন আল্লাহর আয়াতগুলো তোমাদের
বিস্তারিত
জমজম : মাটির পৃথিবীতে অলৌকিক
জমজম কূপের পানি তার আসল রূপেই হজ পালনকারীদের প্রদান করা
বিস্তারিত
সিরাতুল মুস্তাকিমের আকুতি
সূরা ফাতিহায় আল্লাহ প্রথমে দোয়ার আদব শিখিয়েছেন। তারপর চাওয়ার বিষয়টি।
বিস্তারিত
জেনে নিন রমজানের ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো
দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র মাহে রমজান। রমজান মাস ইবাদতের বসন্তকাল।
বিস্তারিত
সুদান ও আলজেরিয়ায় আরব বিপ্লবের নতুন
ফ্রান্সের দৈনিক পত্রিকা লেমন্ড বলছে, সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বাশির এবং
বিস্তারিত