মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

সুখী জীবন লাভের রহস্য

মোমিনের চালচলন বাস্তব জীবন দেখলেই বোঝা যাবে, এসব গুণ তার চরিত্র ও স্বভাবে উদ্ভাসিত। কারণ সে বিশ্বাস করে তকদিরে যা যা লেখা আছে, অবশ্যই তা ঘটবে। মহামহিম শাসকের নিয়ন্ত্রণে সে বিশ্বাসী; তাই তার চরিত্র পূতঃপবিত্র। আল্লাহর ওপর গভীর আস্থায়, তার কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার আশায় সে নিজের সম্পদ বিলায়

 

কথায় বলে স্বভাবের দোষ। কারণ দোষগুলো লুকিয়ে থাকে মানব স্বভাবের গহিনে। সন্তর্পণে সামনে আসে, মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি, মনুষ্যত্ববোধের পায়ে জিঞ্জির-বেড়ি পরিয়ে দেয়। আত্মিক ও নৈতিক উন্নতির পথ রুখে দাঁড়ায় নাছোড়বান্দা হয়ে। চারটি স্বভাব তো খুবই মারাত্মক। লোভ, যৌন কামনা, প্রতিপত্তির মোহ ও বিলাসী কল্পনা। মানব স্বভাবের এসব দোষ চিহ্নিত করেছেন চরিত্র বিজ্ঞানীরা নানাভাবে। মসনবি শরিফে মওলানা রুমিও বিশ্লেষণ করেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। হজরত ইবরাহিম (আ.) এর জীবনের একটি ঘটনাকে উপজীব্য করেছেন তিনি কোরআন মজিদ থেকে চয়ন করে। 
ইবরাহিম (আ.) একবার কোথাও যাচ্ছিলেন, পথের ধারে দেখলেন একটি মরা লাশ পচেগলে পড়ে আছে পানির গর্তে। হিংস্র প্রাণী আর শকুন লাশটি নিয়ে টানাটানি করছে। ইবরাহিম (আ.) এর চিন্তায় এলো, মরা লাশাটি তো খ- খ- হয়ে বিভিন্ন প্রাণীর পেটে চলে যাচ্ছে, কীভাবে সে অখ- দেহ নিয়ে হাশরের দিন পুনর্জীবন লাভ করবে? যতই চিন্তা করেন মন প্রবোধ পায় মতো জবাব খুঁজে পান না। অবশেষে ফরিয়াদ জানান আল্লাহর দরবারে, ‘স্মরণ কর, যখন ইবরাহিম বলল, হে আমার প্রতিপালক! কীভাবে তুমি মৃতকে জীবিত করবে আমাকে দেখাও। আল্লাহ বললেন, তবে কি তুমি বিশ্বাস কর না? ইবরাহিম বলল, অবশ্যই বিশ্বাস করি; তবে (দেখতে চাইছি) আমার মনে যেন সান্ত¡না লাভ করতে পারি। আল্লাহ বললেন, তাহলে তুমি চারটি পাখি ধর, তারপর এগুলোকে তোমার পোষ্য বানিয়ে নাও। তারপর সেগুলো (জবাইয়ের পর) একেক অংশ একেক পাহাড়ের ওপর রেখে এসো। অতঃপর সেগুলোকে ডাক দাও, (দেখবে যে) ওরা দ্রুত দৌড়ে তোমার কাছে চলে আসবে। আর জেনে রেখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশালী, অতিশয় প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা বাকারা : ২৬০)।
ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ পালন করলেন। বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে তিনি বুঝে নিলেন, মৃত্যুর পর হাশরের দিন পুনরুজ্জীবন লাভের ব্যাপারটিও এভাবেই ঘটবে। 
সেই চার পাখি কোন কোন জাতের ছিল এবং মানব চরিত্রের কোন কোন স্বভাবের সঙ্গে ওদের মিল ছিল, তা নিয়ে মুফাসসির ও তত্ত্বজ্ঞানীরা নানা বিশ্লেষণ করেছেন। কারও মতে, এ চারটি পাখি ছিল কাক, ময়ূর, শকুন ও মোরগ। মুজাহিদ (রহ.) বলেন, এ চারটি পাখি ছিল কাক, মোরগ, ময়ূর আর কবুতর। তত্ত্বজ্ঞানীরা বলেছেন, কাক হলো লোভের প্রতীক। মোরগ যৌনকামনার প্রতীক, শকুন দীর্ঘায়ুর বাসনার আর ময়ূর আত্মপূজার পরিচয়বাহক। তারা বলেছেন, সফল, সুন্দর, চিরন্তন জীবন লাভ করতে হলে মানুষকে মনের লোভ, যৌনতা, দীর্ঘায়ুর বাসনা ও বিলাসী কল্পনা দমন করতে হবে। মওলানা রুমি বিষয়টিকে মনোজ্ঞ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন, যা যে কোনো চিন্তাশীল মানুষের মন ও জীবন ছুঁয়ে যায়। মওলানার ভাষায়Ñ
এ চারটি পাখির প্রত্যেকটি কাকের মতো জ্ঞানী লোকদের জ্ঞানবুদ্ধি, বিবেচনাবোধের চোখ তুলে নেয়। কাক কোনো লাশের ওপর বসে প্রথমে লাশের চোখটা খুলে নেয়। মানব স্বভাবের এ চারটি দোষও মানুষকে অন্ধ করে জীবনের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। 
যারা মানুষের হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করেন তাদের উদ্দেশ্যে মওলানা বলেন, ইবরাহিম (আ.) এর পাখি জবাইর মতো মানব চরিত্রের এ চারটি স্বভাবকে বধ কর; তবেই মানুষের প্রকৃত মুক্তির পথ উন্মোচিত হবে। কারণ এসব স্বভাব মানুষের দ্বীন, ঈমান হরণ করে, মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে। এই বধ করার অর্থ সম্পূর্ণ ধ্বংস করা নয়; বরং একান্ত বাধ্যগত, নিয়ন্ত্রিত ও বশীভূত করা। কারণ জীবন চলার পথে এগুলোরও প্রয়োজন আছে বাহনরূপে। তাই কৃচ্ছ্রতার কশাঘাতে দলন-দমন চালানোর পর এগুলোকে কাজে লাগাতে হবে নতুনভাবে। 
বা’যশা’ন যিন্দা কুন আয নূয়ী দিগার
কে নবা’শদ বাদ আয আ’ন যীশা’ন যরর 
তারপর এগুলো জিন্দা কর, পুনরায় নতুনরূপে
এরপর যেন কদাচ তোমার ক্ষতি না করতে পারে। 
তোমার স্বভাবের সুন্দর বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটিয়ে তোল। এসব বৈশিষ্ট্যের সৌন্দর্য ও হাসানাত দিয়ে যত দোষ সাইয়েআত আছে, সেগুলোকে চরিত্র সুষমায় রূপান্তরিত কর। ধনসম্পদের যে লোভ তোমার মনে, তা জ্ঞানার্জনের লোভে বদলে দাও। দুনিয়াকে ভোগ করার কামনার স্থলে আধ্যাত্মিক উন্নতি আকাক্সক্ষায় মনকে তৈরি কর। যৌনতার গলায় লাগাম পরিয়ে বৈধ সম্পর্কের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত কর। মওলানা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, চারটি আত্মিক পাখি মানুষের অন্তরের সামনে ডাকাত সেজে রয়েছে। এগুলোকে প্রতিহত কর, দেখবে চিরন্তন জীবন উপভোগ করার পথ তোমার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। 
বাত হেরাচ আস্তো খুরূস আন শাহওয়াত আস্ত
জা’হ চোন তাউস ও যা’গ উমনিয়্যত আস্ত
হাঁস তো লোভের প্রতীক, মোরগ যৌনতার কামনা
খ্যাতি-ক্ষমতার লিপ্সা ময়ূর, কাক বিলাসী কল্পনা। 
লোভের কাছে বন্দি কাকের জীবন। পাক-নাপাক চায় না, যা পায় কুড়িয়ে খায়। হাঁসের অবস্থাও তাই। ঠোঁটখানা উঁচিয়ে শুধু চষে বেড়ায়। পানিতে বা ডাঙায় শুধুই খাবার খোঁজে। এক মুহূর্তও বিরাম নেই তার কণ্ঠনালির। আল্লাহর হুকুম, ‘তোমরা খাও আর পান কর’ সেটিই বুঝি সে বুঝে। লোভী ব্যক্তির অবস্থাও তাই। সে চোরের মতো গৃহস্থের বাড়িতে ঢুকে এদিক-সেদিক হাতড়ায়, যা কিছু পায় কুড়িয়ে পালায়। বাছবিচার করার এতটুকু সময় তার নেই, কখন গৃহস্থ জেগে ওঠে, অন্য চোর এসে ভাগ না বসায়, সেই আতঙ্ক তাড়া করে। শহরে একজন শাসক আছেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করেন, জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করেন, সে আস্থা তার নেই। এমন চিন্তায় যারা লালিত তারা যেভাবে পায়, যত পায়, ততই কুড়ায়, হারাম-হালালের বালাই নেই। দুনিয়াকে ভোগ করা, সম্পদের পেছনে জীবন উজাড় করা তাদের জীবনের সাধনা। 
লে কে মু’মিন যে’তেমা’দে অ’ন হায়া’ত
মী কুনদ গা’রত বে মাহল ও বা’ আনা’ত
তবে যারা মোমিন পরজীবনে আস্থা রাখে
তারাও ভোগ করে; তবে শান্তি ও সম্ভ্রমে। 
কাক স্বভাবের লোভী ও কামুকের মোকাবিলায় মোমিন বান্দার অবস্থা হলো, সে পরকালীন জীবনের প্রতি আস্থাশীল। এ আস্থা ও বিশ্বাস তার জীবনে দিয়েছে পরম শান্তি ও সম্ভ্রমের উপহার। দুনিয়ার চাওয়া-পাওয়া নিয়ে তার মনে অস্থিরতা নেই। দুনিয়ার সহায়-সম্পদ সে-ও ভোগ করে; তবে তার চলনে-বলনে সম্ভ্রম, ভদ্রতা, ব্যক্তিত্বের ছাপ থাকে। সে বিশ্বাস করে, আমার ভাগ্যে যা লেখা আছে, তা আমার হাতে আসবেই। তার ভাগ্য কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবেÑ সেই ভয় তার নেই। কেননা মহামহিম শাসকের মতো বিচারের প্রতি তার পূর্ণ আস্থা। ফলে তার জীবন পরম শান্তির, তার ব্যক্তিত্বে উদ্ভাসিত আস্থা ও সম্ভ্রমের দীপ্তি। তকদিরের নির্ধারিত হিসসা সে পাবেইÑ এ বিশ্বাস আছে বলেই কোনো কিছু হারানোর পরও হাহুতাশ করে না, হতাশায় ভোগে না। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হলোÑ 
বস তাআন্নি দা’রদ ও সবরো শাকীব
চশম সীর ও মুআসসার আস্তো পাক জীব
ধীরস্থির, শান্ত-স্বভাব, ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা সহনশীল
নিলোর্ভ, কারও মুখাপেক্ষী নয়, পূতঃচরিত্র দানশীল। 
মোমিনের চালচলন বাস্তব জীবন দেখলেই বোঝা যাবে, এসব গুণ তার চরিত্র ও স্বভাবে উদ্ভাসিত। কারণ সে বিশ্বাস করে তকদিরে যা যা লেখা আছে, অবশ্যই তা ঘটবে। মহামহিম শাসকের নিয়ন্ত্রণে সে বিশ্বাসী; তাই তার চরিত্র পূতঃপবিত্র। আল্লাহর ওপর গভীর আস্থায়, তার কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার আশায় সে নিজের সম্পদ বিলায়। নিজের প্রয়োজনের ওপর অন্যের প্রয়োজনকে অধিক গুরুত্ব দেয়। 
মওলানা রুমি আরও বলেন, মানব চরিত্রের ধীরস্থিরতা শান্ত স্বভাব ও সম্ভ্রম মূলত দয়াময় আল্লাহর রহমতের ঝলক। আরশ থেকে সেই ঝলক মোমিনের কলবে পতিত হয়। পক্ষান্তরে তাড়াহুড়া, জীবনে সব হারালাম, হায় হায় কী হবে আমার, এমন চিন্তার পেরেশানি শয়তানের প্রক্ষেপ; তাতে বেঈমান প্ররোচিত হয়, ছটফট করে অস্থিরতায়।
যাঁকে শয়তা’নশ বেতরসা’নদ যে ফকর
বা’দগীরে সবর রা’ বুকশাদ বে আকর
শয়তান তাকে ভয় দেখায় দারিদ্র্যের
ধৈর্যের বাহন বধ করে, হয়ে পড়ে অস্থির। 
শয়তান দারিদ্র্যের ভয় দেখায়। বলে, যত পার, যেভাবে পার তড়িঘড়ি কর, নগদ যা পাও হাত পেতে নাও। ভালো-মন্দ বাছবিচারের দরকার নেই। কোরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে, ‘শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদের তাঁর ক্ষমা এবং অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা : ২৬৮)। 
যার অন্তর ঈমানের আলোয় আলোকিত নয়, তার জীবন চালিত হয় শয়তানের প্ররোচনায়। তাই তার জীবনে চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। যত পায় আরও চাই, শুধুই খাই খাই। হাদিসে এ কথাই বলা হয়েছেÑ 
লা’ জরম কা’ফের খোরদ দর হাফ্ত বতন
দীন ও দিল বা’রীক ও লা’গর যফতে বতন
অগত্যা কাফের খায় সাত আঁতে উদর পুরে
অন্তর মরা, ধর্ম দুর্বল; তবে পেট উপচে পড়ে। 


(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৫ খ. বয়েত ৩৪৩১-৩৫৪৩)


ইন্দোনেশিয়ায় হাফেজদের বিনা পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি মানেই পরীক্ষা নামক চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হওয়া। তারপরও
বিস্তারিত
বিশ্বের ১৩ হাজার বিশিষ্ট ব্যক্তিকে
সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ চলতি ১৪৪০ হিজরি
বিস্তারিত
রাশিয়ার এস-৪০০ আনল তুরস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, রাশিয়ার তৈরি এ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের এফ-৩৫
বিস্তারিত
হজের তালবিয়া
হজের সেøাগান ও প্রধান মৌখিক আমল হলো তালবিয়া। তালবিয়া হজের
বিস্তারিত
‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি যেভাবে পরিণত
সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছিলেন, হামলাকারীরা তার কাপড়-চোপড় এবং দাড়ি নিয়ে বিদ্রƒপ
বিস্তারিত
আঙুর বাগান
সৌদি আরবে যখন গ্রীষ্মের লু হাওয়ার প্রকোপ বাড়তে থাকে, তখন
বিস্তারিত