মানব কল্যাণে জ্ঞানার্জন

আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিসর

জ্ঞানের সুবাদেই মানুষের মর্যাদা নিষ্পাপ ফেরেশতাদের চেয়েও বেশি। আমাদের চিন্তাকে উন্মুক্ত করলে এ মর্যাদার গভীরতা উপলব্ধি করা সহজ হবে। যেমন জ্ঞান অর্জনের পর কেউ যদি মানবকল্যাণের জন্য বই লেখে, অপরকে শিক্ষা দেয় বা অন্য কোনোভাবে এর প্রচার ও প্রসারে কাজ করে তবে তা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কাজ করবে। যেমনÑ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মানুষ মারা যায় তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ব্যতীত। ১. সদকায়ে জারিয়া, ২. এমন ইলম বা জ্ঞান যা দ্বারা মানব জাতি উপকৃত হয়, ৩. এমন সুসন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। (মুসলিম)। 
মহান আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সূরা মায়েদা : ৩)। মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের  জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা কোরআন মজিদ থেকে লাভ করতে হলে জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। যেমনÑ পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘আসমান ও জমিনের মধ্যে এমন কোনো বিষয় নেই যে বিষয়ে এই স্পষ্ট কিতাবে বর্ণনা করা হয়নি।’ (সূরা নামল : ৭৫)। অন্য আয়াতে আল্লাহপাক আরও বলেন, ‘আমি এই কিতাবে কোনো বিষয়ই (লিপিবদ্ধ করতে) বাদ দেইনি।’ (সূরা আনআম : ৩৮)। সুতরাং ধর্মের মৌলিক অনুসরণসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনার জন্য কোরআন-হাদিস থেকে জ্ঞানার্জন তথা ইসলাম শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইসলাম শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ও মৌলিক প্রয়োজনীয়তাগুলো হলো: 
১. ধর্মীয় অনুশাসনের ক্ষেত্রে : মহান আল্লাহ মানুষকে কেবল তার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহপাক বলেন, ‘আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা জারিয়াত : ৫৬)। এখানে মানুষের জন্য অবশ্যই জানা উচিত যে, ইবাদত কাকে বলে? বা ইবাদতের প্রকৃত সংজ্ঞা কী? ইবাদত কি কেবল মৌলিক ফরজ তথা নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এসবের উত্তরসহ ইবাদত করার প্রকৃত নিয়ম-কানুন বা পদ্ধতি সম্বন্ধে জানার জন্য ইসলাম শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। 
২. ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়োজনীয়তা : মানুষকে কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তিগত জীবন অতিবাহিত করতেই হয়। ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি কর্মই পাপের খাতায় নয়তো পুণ্যের খাতায় লিপিবদ্ধ হয়। এ পর্যায়ে কোনো মানুষকে ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলো পালনের সঙ্গে সঙ্গে উত্তম চরিত্র গঠন তথা সত্যবাদিতা, কর্তব্যপরায়ণতা, শোকর, ধৈর্য, ইহসান, অন্যের অধিকার আদায়, তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল ইত্যাদির ভিত্তিতে বাস্তব জীবন গঠন করতে হবে। আর এজন্যই ইসলাম শিক্ষা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। 
৩. পারিবারিক জীবনে প্রয়োজনীতা : স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, সন্তানসন্ততি, ভাই, বোন এদের সবাইকে নিয়ে গঠিত হয় একটি পরিবার। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা ও হক আদায় ইবাদতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এরপর সন্তানের প্রতি দায়িত্ব হিসেবে সন্তানের নামকরণ, আকিকা প্রদান, শিষ্টাচার শিক্ষাদান, ইলম শিক্ষাদানসহ লালনপালনে যাবতীয় কথা, কাজ ও অর্থ ব্যয়ও ইবাদত। এসব কাজ বা অর্থ ব্যয়ে পিতা-মাতা বা অভিভাবকের জন্য অসংখ্য সওয়াবও রয়েছে। আবার এর বিপরীতে দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি অবহেলা করলে সে জন্য জবাবদিহিও করতে হবে। একইভাবে পিতামাতার দেখাশোনা করা তথা তাদের হক আদায় করা সন্তানের প্রতি ফরজ দায়িত্ব এবং এতে সন্তানের জন্য জান্নাতের সুসংবাদও রয়েছে। এভাবে ভাইয়ের প্রতি বোনের এবং বোনের প্রতি ভাইয়ের মমতা, ভালোবাসা, দায়িত্ব ও হক ইত্যাদি সম্বন্ধে যদি জ্ঞান থাকে তবে পরিবার যেমন সুন্দর ও সুখী হয় তেমনি প্রত্যেকেই অসংখ্য সওয়াবের অধিকারী হয়। আর এ জ্ঞান অর্জিত হয়ে থাকে ইসলাম শিক্ষার মাধ্যমে। তাই পারিবারিক জীবনে এ শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
৪. সামাজিক জীবনে প্রয়োজনীয়তা : মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করাই মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি, স্নেহবোধ, শ্রদ্ধাবোধ, পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা, হক আদায় ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য জরুরি কর্তব্য এবং এগুলোতে অসংখ্য সওয়াব অর্জিত হয়। আবার এগুলোর বিপরীতে হিংসা-বিদ্বেষ, ঝগড়াঝাটি, বৈষম্য, মারামারি, হানাহানি ও অবিচার করা নিষিদ্ধ। এগুলো করলে অসংখ্য পাপ হয়।
এরপরও যদি ঝগড়াঝাটি লাগে তবে কত দিন কথা না বলে থাকা যাবে বা যাবে না অথবা কিভাবে মীমাংসা করতে হবে এসব বিষয়ে জানা না থাকলে অযথাই পাপ হতে থাকবে। তাই আদর্শ গুণগুলো গ্রহণ করত খারাপ গুণগুলো পরিহার করে আদর্শ সমাজ গঠন সবারই কাম্য। এসব বিষয়ে বিস্তারিত জ্ঞান ও দিকনির্দেশনার জন্য ইসলাম শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। 
৫. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা : মানুষ কিভাবে অর্থ আয়, ভোগ, সংরক্ষণ ও ব্যয় করবে এবং কীভাবে সমাজ থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস পাবে এ সবের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা ইসলামে রয়েছে। ইসলামের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ ব্যবস্থা পরিচালনা করলে সে অর্থ ব্যবস্থাপনা ইবাদত হিসেবে পরিগণিত হবে। কিন্তু ইসলামি নির্দেশনার বাইরে গিয়ে অর্থ ব্যবস্থা পরিচালনা করলে ওই অর্থ ব্যবস্থাপনাই জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে। যেমনÑ অর্থ উপার্জনের জন্য পৃথিবীতে হালাল ও হারাম মিলে বহু পেশা বা কর্ম রয়েছে। কিন্তু ইসলাম কেবল হালাল পেশাতেই (সেটা ছোট হোক বা বড় হোক) যুক্ত হওয়াকে সমর্থন করে।
কিন্তু পেশা হালাল হওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে যদি অনৈতিক কর্মের মাধ্যমে উপার্জন করা হয় তবে ওই নির্দিষ্ট অংশ হারাম হয়ে যায়। অপরপক্ষে পেশা যদি হারাম হয় তবে সেখানে যত শ্রমই দেওয়া হোক না কেন বা তাতে যত ন্যায়নিষ্ঠভাবেই কাজ করা হোক না কেন তা হালাল হবে না। সুতরাং বৈধ পন্থা নির্বাচনে, ঘুষ ও অন্যান্য দুর্নীতি সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকলে রিজিক হারাম হয়ে যেতে পারে। আর রিজিক হারাম হলে তার নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতসহ অন্য যে কোনো ভালো কাজ কবুল হবে না। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘হারাম উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলে তার ইবাদত কবুল হয় না।’ (বায়হাকি)। পরিশেষে এমন জীবিকা নির্বাহীদের জন্য পরকালীন আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। যেমন রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হারাম খাদ্যে পরিপুষ্ট যে দেহ, নরকাগ্নিই তার জন্য উপযুক্ত স্থান।’ (আহমাদ, দারিমি, বায়হাকি)।
৬. রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা : রাজনীতি করা হয় মানুষের কল্যাণের জন্য। আর মানবকল্যাণী রাজনীতি ইসলাম সমর্থন করে। কারণ মানুষকে মহান আল্লাহপাক পরস্পরের কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানুষের কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান : ১১০)। কিন্তু রাজনীতির আদলে ক্ষমতার লোভে বা জন্য দুর্নীতি, মারামারি, হানাহানি, জুলম, নির্যাতন, জ্বালাও-পোড়াও, যে কোনো সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকা- ইসলামে হারাম। সুতরাং রাজনীতির ব্যাপারে সুস্থ ও স্বচ্ছ জ্ঞানার্জনের জন্য ইসলাম শিক্ষা জরুরি।     
৭. সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা : ইসলাম শান্তি, সুন্দর ও সুরুচির ধর্ম। রুচিশীল ও তাকওয়াপূর্ণ শিল্প-সাহিত্য, স্থাপত্য বা অন্য কোনো বিনোদনে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে না। ইসলামে যেমন উগ্রতা ও গোড়ামির স্থান নেই তেমনি অশ্লীলতারও কোনো স্থান নেই। এসব জানার জন্য ইসলাম শিক্ষার প্রয়োজন আছে।


দাজ্জালের ফেতনা থেকে সাবধান
নবী (সা.) তাঁর উম্মতকে ফেতনা থেকে কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন। এ
বিস্তারিত
সন্ত্রাসবাদের কোনো ধর্ম নেই
শ্রীলঙ্কায় নিরাপরাধ মানুষের ওপর নির্বিচার সন্ত্রাসী হামলায় সারাবিশ্বের বিবেকবান মানুষের
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই,
বিস্তারিত
দ্বিতীয় কাতার কোথা থেকে শুরু
প্রশ্ন : নামাজের প্রথম কাতার পূর্ণ হয়ে গেলে দ্বিতীয় কাতার
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বইয়ের নাম : রামাদান উদযাপন রচয়িতা : ড. মাওলানা আবু সালেহ
বিস্তারিত
জীবন পাথেয়
আপনি বিপদে পড়ে সর্বশেষ কবে আল্লাহর কাছে ধরনা দিয়েছেন? আল্লাহর
বিস্তারিত