বাংলা শকুনের গল্প

বাংলা শকুনের এ ছবি দুইটি তুলেছেন পাখিবিদ ইনাম আল হক

শুধু বাংলা শকুন নয়, এক সময় বাংলাদেশে সাত প্রজাতির শকুন দেখা যেত। এর মধ্যে ইউরেশীয় গৃধিনী, হিমালয়ী-গৃধিনী, ধলা শকুন ও কালা শকুন ছিল অনিয়মিত আগন্তুক। আর বাকি তিন প্রজাতির শকুন স্থায়ীভাবে এদেশে বসবাস করত। এর মধ্যে রাজশকুন ও সরুঠুঁটি শকুন চার-পাঁচ দশক আগেই বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন এদেশে শকুন বলতে শুধু বাংলা শকুনকেই বোঝানো হয় এবং এটিও আমরা হারাতে বসেছি

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তোমাদের শকুন পাখির গল্প শোনাব। এর নামের আগেও ‘বাংলা’ আছে। অর্থাৎ এর নাম ‘বাংলা শকুন’। এ পাখিটি 
কয়েক বছর আগেও আমাদের দেশের আকাশে প্রায় উড়তে দেখা যেত। দেখা যেত নদীর তীরে বা ভাগাড়েও। সে দৃশ্য এখন নেই বললেই চলে। অথচ এটি আমাদের অনেক উপকারী পাখি। মৃত প্রাণী বা বিভিন্ন পচাগলা খেয়ে এরা আমাদের পরিচ্ছন্নকর্মীর কাজ করে। আবার শকুনের এসব মৃত প্রাণী বা পচাগলা খাওয়ার ফলে আমাদের জন্য ক্ষতিকর রোগজীবাণুও ছড়ায় না। অন্যদিকে এসব ময়লা-আবর্জনা খেয়ে শকুনের কোনো ক্ষতিও হয় না। কারণ এর হজমশক্তি অনেক বেশি। তারপরও উপকারী এ পাখিটি আমাদের দেশ থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
শুধু বাংলা শকুন নয়, এক সময় বাংলাদেশে সাত প্রজাতির শকুন দেখা যেত। এর মধ্যে ইউরেশীয় গৃধিনী, হিমালয়ী-গৃধিনী, ধলা শকুন ও কালা শকুন ছিল অনিয়মিত আগন্তুক। আর বাকি তিন প্রজাতির শকুন স্থায়ীভাবে এদেশে বসবাস করত। এর মধ্যে রাজশকুন ও সরুঠুঁটি শকুন চার-পাঁচ দশক আগেই বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন এদেশে শকুন বলতে শুধু বাংলা শকুনকেই বোঝানো হয় এবং এটিও আমরা হারাতে বসেছি।
এটি আমাদের ‘আবাসিক’ পাখি। তোমরা এখন প্রশ্ন করতে পারোÑ পাখিরা কি স্কুলে যায়, যে আবাসিক/অনাবাসিক শাখা আছে। তাহলে চলো আগে বাংলাদেশের পাখি নিয়ে একটু ধারণা নিই। 
বাংলাদেশে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির পাখির বসবাস। এর মধ্যে ৩৫০ প্রজাতি আবাসিক ও ৩০০ প্রজাতি পরিযায়ী। যে পাখি বারো মাস দেশে থাকে তারা আবাসিক। যারা বছরের কিছু সময় অন্য দেশে থাকে তারা পরিযায়ী। অর্থাৎ পরিযায়ী পাখিরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। অবশ্য অনেকে পরিযায়ী পাখিদের ভুল করে অতিথি পাখি বলে। তবে এরা মোটেই অতিথি নয়, এরা এদেশেরই পাখি। শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে পারিযায়ী পাখিদের প্রায় আশি শতাংশ গ্রীষ্ম মৌসুমে হিমালয়ের কাছাকাছি অঞ্চলের দেশ ও বিশ শতাংশ সুদূর সাইবেরিয়াসহ মধ্য ও উত্তর এশিয়ায় চলে যায়। আবার শীতের সময় এদেশে ফিরে আসে। তবে সব পরিযায়ী শীতের সময় আসে না। ৩০০ প্রজাতির ২৯০টি শীত মৌসুমে ও ১০টি গ্রীষ্ম মৌসুমে এদেশে দেখা যায়। এছাড়াও দুই/তিনটি পাখি বছরের বিভিন্ন সময় বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরতে ঘুরতে এদেশে আসে খানিক সময়ের জন্য। তাদের বলা হয় পান্থ-পরিযায়ী। এছাড়া যে পাখি বেশি দেখা যায়, তাদের নামের আগে সুলভ, যে পাখি কম দেখা যায় বা দেখা যায় না তাদের নামের আগে দুর্লভ, বিরল, বিপন্ন বা মহাবিপন্ন শব্দ বসানো হয়। অবশ্য এখন আর ৬৫০ প্রজাতির পাখি এদেশে দেখা যায় না। কারণ পরিবেশ ক্ষতির জন্য এরই মধ্যে এদেশ থেকে ৩০/৩২টি পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে মাঝেমধ্যে নতুন পাখির সন্ধানও এদেশের পাখিবিদরা করেন।
এবার চলো এদের শরীর ও জীবনযাপন সম্পর্কে জানি। এদের শরীর লম্বায় ৯০ সেন্টিমিটার, ওজন ৪.৩ কেজি, ডানা ৫৫ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৭.৬ সেন্টিমিটার, পা ১১.৬ সেন্টিমিটার ও লেজ ২২.৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের খাবারের তালিকায় আছেÑ মৃত প্রাণী ও পচা মাংস। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাসে এরা ডিম পাড়ে মাত্র একটি করে। ডিমের মাপ ৮.৬ী৬.৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ৪৫ দিনের মাথায় এদের ডিম ফোটে। উঁচু গাছ বা দালানে ডালপালা দিয়ে মাচার মতো করে বাসা বানায় এরা। আর এক বাসাতেই থাকে বছরের পর বছর। এর দেহ বিশাল ও প্রশস্ত ডানা। দেহের রঙ কালচে। মাথা ও ঘাড় পালকহীন। ঠোঁট সরু ও লম্বা। লেজের পালক সংখ্যা ১২ থেকে ১৪টি।
এদের উপকারিতা ও জীবন সম্পর্কে জানলে। এবার চলো কেন এরা হারিয়ে যাচ্ছে সেই গল্প শুনি।
বিশ্বের মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় থাকা শকুন হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ ‘ডাইক্লোফেন’ ও ‘কিটোপ্রোফেন’ নামক ওষুধ। এটি গবাদিপশুর ব্যথানাশক চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। আর এ ওষুধের কারণেই ৯৯ শতাংশ শকুন মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, পাকিস্তানেও এ ওষুধ ব্যবহার করা হতো। ফলে সেখানেও শকুন মারা যাচ্ছে। সেজন্য ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানে ২০০৬ সালে পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেন ব্যবহার নিষেধ করেছে। বাংলাদেশ সরকারও ২০১০ সাল থেকে গবাদিপশুর চিকিৎসায়  ডাইক্লোফেন ব্যবহার নিষেধ করেছে। কিন্তু এখনও এ ওষুধ লুকিয়ে লুকিয়ে বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে।
ডাইক্লোফেন আছে এমন গবাদিপশুর মৃতদেহ খেয়ে শকুনের কিডনি নষ্ট হয় এবং সে মারা যায়। কারণ, সব হজম করতে পারলেও শকুন এ ওষুধ হজম করতে পারে না। অন্যদিকে অ্যানথ্রাক্স রোগ ছড়ানোর কারণও এ ওষুধ।
অবশ্য এখন বাজারে ‘মেলোক্সিক্যাম’ নামের একটি ওষুধ আছে। এটি ডাইক্লোফেন ও কিটোপ্রোফেনের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে আবার এটি বিষাক্তও নয়। আর এ ‘মেলোক্সিক্যাম’ পশু চিকিৎসায় ব্যবহার করলে গরু-শকুন দুটোই বাঁচবে বলে পাখি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি পাখিবিদ ইনাম আল হকের মতে, মরতে মরতে এখন এ দেশে বাংলা শকুন আছে মাত্র তিনশয়ের মতো। আর এ শকুনগুলোর অধিকাংশ বসবাস করছে সিলেট ও খুলনা বিভাগে। তাই শকুন বাঁচিয়ে রাখতে অবশ্যই গবাদিপশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেন ও কিটোপ্রোফেন ওষুধ ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এর বিকল্প নিরাপদ হিসেবে  মেলোক্সিক্যাম ওষুধের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এসবের পাশাপাশি শকুনের উপকারিতা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ে যারা পশু চিকিৎসায় নিয়োজিত বা যারা নিজেরাই নিজেদের গবাদিপশুর চিকিৎসা করেন, তাদের বোঝাতে হবে ডাইক্লোফেন ও কিটোপ্রোফেন ওষুধের ভয়াবহতা সম্পর্কে। 
তোমাদের জন্য সুখবর হলোÑ বর্তমানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বন বিভাগ, আইইউসিএন বাংলাদেশ শকুন রক্ষার জন্য কাজ করছে। ইনাম আল হক শকুন নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেছেন। শকুন নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বিশেষ ডাকটিকিট, স্যুভেনিরশিট ও খাম প্রকাশ করেছে। ইনাম আল হক নিজের তোলা আলোকচিত্র দিয়ে এসব ডাকটিকিট, স্যুভেনিরশিট ও খামের নকশা করেছেন।
শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের অন্যন্য দেশেও শকুন পরিবেশের জন্য অনেক উপকারী প্রাণী। সেজন্যই শকুনকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবছর ৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালন করা হয়।
শকুনের ইংরেজি নাম : ডযরঃব-ৎঁসঢ়বফ ঠঁষঃঁৎব. এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থÑ বাংলা শকুন। চাইলে তোমরাও শকুন পাখি রক্ষার জন্য বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজ করতে পার। এতে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতিরই উপকার হবে। আর তার অংশীদার হবে তোমারও। 


ব্যাঙের বুদ্ধি
চিবিদ বনে বাস করত বিরাট এক অজগর। সে বেশ লোভী,
বিস্তারিত
বোরহান মাসুদ
  গুটিবেঁধে মেঘ এলো যেই ডানপিটের হৈচৈ কাদামাটির মাঠখান আজ করছে
বিস্তারিত
রূপকথার রাজ্য ও কম্পিউটার
পরের সকালে ঙ এসে রাজ্যের সবাইকে জানাল কম্পিউটার আপাতত একটা
বিস্তারিত
তোমাদের আঁকা ছবি
ছবিটি এঁকেছে নারায়ণগঞ্জের চাইল্ড  কেয়ার স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী  গাজী
বিস্তারিত
কাশফুল দুল যেন
কাশফুল দুল যেন প্রকৃতি মাঝে, নদীকূলে ঝুলে থাকে অপরূপা সাজে। সাদা
বিস্তারিত
শরৎ রানী বাংলা মাকে
আমার গাঁয়ে শরৎ আসে শিউলি ও কাশ মুচকি হাসে আমার
বিস্তারিত