প্রচলিত বীমাপদ্ধতির শরয়ি বিধান

 

বাংলায় ব্যবহৃত বীমা শব্দটি মূলত উর্দু। এর আভিধানিক অর্থ হলো গ্যারান্টি, নিরাপত্তা বা নিশ্চয়তা প্রদান। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ ওহংঁৎধহপব এবং আরবি সমার্থক শব্দ ‘তামিন’। আর পরিভাষায় কিস্তিতে কিস্তিতে প্রদেয় প্রিমিয়ামের বিনিময়ে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হলে বা মৃত্যুবরণ করলে কিংবা দুর্ঘটনা ঘটলে নির্ধারিত মেয়াদের আগেই জীবনসম্পত্তি বা মূল্যবান দ্রব্যের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার যে চুক্তি করা হয় তাকে বীমা (ওহংঁৎধহপব) বলা হয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহু ধরনের বীমা প্রচলিত রয়েছে। তবে বহুল প্রচলিত বীমা তিন প্রকার : ১. জীবনবীমা, ২. উপকরণবীমা, ৩. দায়বীমা। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমরা উল্লিখিত বীমাগুলোর বাস্তবতা ও শরয়ি বিধান পেশ করব ইনশাআল্লাহ।

জীবনবীমা (খরভব ওহংঁৎধহপব)
জীবনবীমার বাস্তবতা হলো, যখন কোনো ব্যক্তি নিজের জীবনের বীমা করাতে চায়, তখন সে বীমা কোম্পানির শরণাপন্ন হয়। বীমা কোম্পানি তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় যে, আপনি আমাদের ১০ বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে (উদাহরণস্বরূপ) এক হাজার টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে যাবেন। যদি ১০ বছরের মধ্যে আপনার মৃত্যু হয়ে যায়, তা হলে আমরা আপনার নিযুক্ত নমিনীকে পাঁচ লাখ টাকা প্রদান করব। আর যদি এ সময়ে আপনার মৃত্যু না হয়, তা হলে আমরা আপনার সঞ্চিত টাকার সঙ্গে সুদ মিলিয়ে ফিরিয়ে দেব। আবার কোনো কোনো কোম্পানি নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর কোনো টাকা ফেরত দেয় না। ফলে মূলধনও গায়েব হয়ে যায়! এ বীমাকে জীবনবীমা (খরভব ওহংঁৎধহপব) বলা হয়। আপনি এখানে লক্ষ করেছেন, এক পক্ষের টাকা পরিশোধ করার বিষয়টি সুনিশ্চিত; কিন্তু অপর পক্ষের টাকা পরিশোধ করা অনিশ্চিত। কেননা যে ব্যক্তি কোম্পানির সঙ্গে জীবনবীমার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে তার জন্য প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিয়াম পরিশোধ করা জরুরি। অপরদিকে বীমা কোম্পানির পক্ষ থেকে উত্তরাধিকারদের পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করার বিষয়টি সম্ভাব্য। কেননা এ সময়ের মধ্যে যদি বীমাকারীর মৃত্যু হয়, তা হলে তার মনোনীত ব্যক্তিরা টাকা পায়। আর নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে যদি বীমাগ্রহীতার মৃত্যু না হয়, তা হলে চুক্তি অনুযায়ী কোনো কোনো কোম্পানি সুদসহ টাকা ফেরত দেয়। আবার কোনো কোনো কোম্পানি টাকা একেবারেই ফেরত দেয় না। যেহেতু জীবনবীমায় জীবনের মূল্য নির্ধারণ করা হয় এবং তাতে সুদ, জুয়া ও প্রতারণা পাওয়া যায়; তাই এ লেনদেন সর্বসম্মতিক্রমেই জায়েজ নেই।
এক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যক্তি প্রশ্ন উত্থাপন করে, জীবনবীমায় বীমা প্রতিষ্ঠানকে প্রদানকৃত টাকা ফেরত পাওয়া সুনিশ্চিত; সম্ভাব্য নয়। কেননা কোম্পানির পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি বীমাকারী ব্যক্তির মৃত্যু হয়ে যায়, তা হলে এ অবস্থায় সে পাঁচ লাখ টাকা পাবে। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি তার মৃত্যু না হয়, তা হলে সে প্রদত্ত টাকা ফেরত পাবে। যেহেতু তার টাকা ফেরত পাওয়া সুনিশ্চিত, তা হলে তাকে প্রতারণা বা জুয়া কীভাবে বলা যেতে পারে? আর এটা নাজায়েজ হওয়ারই বা কী কারণ থাকতে পারে? 
আলোচ্য প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, এখানে টাকা ফেরত পাওয়া যদিও সুনিশ্চিত; কিন্তু এটা জানা নেই, কত টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। হতে পারে যত টাকা জমা করা হয়েছিল, তত টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। আবার এটাও হতে পারে যে, পাঁচ লাখ টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। অতএব এখানেও প্রতারণা পাওয়া গেল। কেননা দুই বিনিময়ের মধ্য থেকে কোনো একটির পরিমাণও যদি অজ্ঞাত থাকে, তা হলে তাতে প্রতারণা সাব্যস্ত হয়ে যায়। তা ছাড়া যে অবস্থায় মূলধন ফেরত পাওয়া যাবে সেক্ষেত্রে মূলধনের সঙ্গে সুদও পাওয়া যাবে। এজন্য এটা হারাম। আর কোনো কোনো কোম্পানি জীবনবীমায় নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করলে মূলধনও ফেরত দেয় না। এ অবস্থায় জীবনবীমার চুক্তি জুয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা নিষিদ্ধ।

উপকরণবীমা (এড়ড়ফং ওহংঁৎধহপব)
উপকরণবীমায় চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পদ্ধতি হলো, যখন কেউ নিজের বাড়ি, দোকান বা গাড়ির বীমা করাতে চায়, তখন সে বীমা কোম্পানির কাছে গিয়ে বলে, আমি অমুক বস্তুর বীমা করাতে চাই। তখন বীমা কোম্পানি তাকে বলে, আপনি আমাদের প্রতি মাসে এত টাকা প্রিমিয়াম আদায় করবেন। যদি আপনার বাড়ি, দোকান বা গাড়ির কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তা হলে আমরা এর ক্ষতিপূরণ দেব। যেমন : কেউ বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চাচ্ছে। তখন ভূমিকম্প বা অন্যকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় সে বীমা প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হয়। এক্ষেত্রে বীমা কোম্পানি তাকে বলে : আপনি প্রতি মাসে এত টাকা প্রিমিয়াম আদায় করবেন। এরপর যদি আপনার ভবনের কোনো ক্ষতি হয়, তা হলে আমরা এর ক্ষতিপূরণ দেব। যদি ভবনের কোনো ক্ষতি না হয়, তা হলে বীমাগ্রহীতা ব্যক্তির প্রদত্ত টাকা ফেরত দেওয়া হয় না। যেহেতু এসব অবস্থায় বীমাকারীর পক্ষ থেকে প্রিমিয়াম আদায় করার বিষয়টি সুনিশ্চিত; কিন্তু বীমা কোম্পানির পক্ষ থেকে আদায় করাটা দুর্ঘটনার ওপর নির্ভরশীল। এজন্য এক পক্ষ থেকে আদায় করাটা সুনিশ্চিত এবং অন্য পক্ষ থেকে আদায় করাটা অনিশ্চিত। অতএব এ লেনদেনেও জুয়া ও প্রতারণা পাওয়া যাচ্ছে। তাই এ লেনদেনটিও নাজায়েজ এবং হারাম।

দায়বীমা (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু ওহংঁৎধহপব)
বীমার আরেকটি প্রকার হলো দায়বীমা। একে আজকাল ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু ওহংঁৎধহপব বা তৃতীয় পক্ষ বীমা বলেও অভিহিত করা হয়। দায়বীমায় চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পদ্ধতি হলো, যে ব্যক্তি বীমা করাতে চায়, সে কোম্পানির কাছে গিয়ে বলে : কোনো সময় আমার দ্বারা এমন কোনো দুর্ঘটনা সংঘটিত হতে পারে, যার ফলে আমি তৃতীয়পক্ষের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে যাব। অতএব যদি কখনও এমন হয়, তা হলে আপনারা তৃতীয় পক্ষকে সেই দায় পরিশোধ করবেন। তখন বীমা কোম্পানি তার আবেদন মঞ্জুর করে নেয় এবং ওই ব্যক্তির ওপর প্রতি মাসে নির্ধারিত পরিমাণ প্রিমিয়াম আদায় করা অপরিহার্য করে দেয়। উদাহরণস্বরূপ : আজকাল গাড়ি চালানোর জন্য আইনগতভাবে দায়বীমা করানো জরুরি। কোনো ব্যক্তি নিজের গাড়ি ততক্ষণ পর্যন্ত রাস্তায় চালাতে পারে না, যতক্ষণ না সে দায়বীমা করে। এক্ষেত্রে গাড়ির মালিক বীমা কোম্পানির কাছে গিয়ে বলে : যদি গাড়ি চালানোর সময় কোনো দুর্ঘটনা বা অ্যাক্সিডেন্ট সংঘটিত হয় এবং সেই দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তির জান বা মাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, ফলে সে আমার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করে, তা হলে এ অবস্থায় আপনারা তৃতীয় পক্ষকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করবেন। এক্ষেত্রে বীমাকারী ব্যক্তির ওপর যে দায় আসে, সে সেই দায় বীমা কোম্পানির ওপর ন্যস্ত করে দেওয়া হয়। এজন্য একে দায়বীমা বলে অভিহিত করা হয়। এ পদ্ধতিতে বীমাগ্রহীতার পক্ষ থেকে টাকা পরিশোধ করার বিষয়টি সুনিশ্চিত; কিন্তু বীমা কোম্পানির পক্ষ থেকে তৃতীয় পক্ষকে টাকা আদায় করার বিষয়টি সম্ভাবনাপূর্ণ। কেননা যদি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে ক্ষতি হয়, তা হলে কোম্পানি ক্ষতিপূরণ দেবে, অন্যথায় দেবে না। এজন্য এতে জুয়া ও প্রতারণা বিদ্যমান রয়েছে। আর জুয়া ও প্রতারণা জায়েজ নেই। তাই দায়বীমায় চুক্তিবদ্ধ হওয়াও জায়েজ নেই।
আমি উপরে বলেছি, কতক সময় আইনগতভাবে দায়বীমা করানো জরুরি হয়ে থাকে। যেমন : রাস্তায় গাড়ি চালানোর জন্য গাড়ির মালিকের ওপর আইনগতভাবে থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স করানো জরুরি। যেহেতু গাড়ি চালানো প্রতিটি ব্যক্তির অধিকার; তাই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এ বীমা করানোর অবকাশ রয়েছে। কিন্তু যদি এমন কোনো অ্যাক্সিডেন্ট বা দুর্ঘটনা ঘটে, যার ফলে কারও ক্ষতি হয়ে যায়, তা হলে এ সময় বীমা কোম্পানির কাছ থেকে শুধু তত পরিমাণ টাকা উসুল করা জায়েজ হবে, যত পরিমাণ টাকা সে প্রিমিয়াম হিসেবে প্রদান করেছিল। এর চেয়ে অতিরিক্ত গ্রহণ করা বীমাকারীর জন্য জায়েজ হবে না।

সহযোগিতামূলক বীমাপদ্ধতি (গঁঃঁধষ ওহংঁৎধহপব)
অবশ্য বীমা শুধু সে সময় নাজায়েজ, যখন তা বিনিময় চুক্তির আকৃতি ধারণ করে নেয়। কিন্তু বীমার এমন একটি পদ্ধতিও প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে বিনিময় চুক্তির ধরন অবলম্বন করা হয় না, বরং পারস্পরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি সম্পাদন করা হয়। যেমন : দশজন ব্যক্তি কাপড়ের ব্যবসা করছে। তারা নিজেদের মধ্যে একটি ফান্ড প্রতিষ্ঠা করে নেয়। তারা সম্মিলিতভাবে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, আমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেকে প্রতি মাসে এ ফান্ডে এত টাকা জমা দেবে। যদি বছরের কোনো সময় আমাদের মধ্য থেকে কেউ ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা হলে এ ফান্ড থেকে আমরা তাকে সহযোগিতা করব। এরপর বছরান্তে হিসাব করব, ফান্ড থেকে কোন ব্যক্তিকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে এবং কত টাকা তার কাছ থেকে উসুল করা হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তিকে তার প্রদানকৃত টাকার চেয়ে কম দেওয়া হয়, তা হলে বছর শেষে তার জমাকৃত বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হবে। আর যদি ফান্ডের পক্ষ থেকে প্রদত্ত টাকা তার জমাকৃত চাঁদার টাকার চেয়ে বেশি হয়, তা হলে অতিরিক্ত টাকা তার কাছ থেকে উসুল করা হবে। এটা মূলত পারস্পরিক সহযোগিতার একটি পদ্ধতি। একে ইংরেজিতে গঁঃঁধষ ওহংঁৎধহপব বলা হয়। যেহেতু এটা কোনো ব্যবসা বা বিনিময়চুক্তি নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতার একটি পদ্ধতি; তাই তাতে নাজায়েজ হওয়ার কোনো দিক নেই। এজন্য শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে গঁঃঁধষ ওহংঁৎধহপব বা পারস্পরিক সহযোগিতামূলক বীমা পদ্ধতি জায়েজ।
তথ্যসূত্র : ইসলাম আওর জাদীদ মাঈশত ও তিজারত, বীমা-তাকাফুল, দরসে তিরমিজি এবং অন্যান্য।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআ দারুল উলুম নুরিয়া, মধ্যবাড্ডা, গুলশান, ঢাকা-১২১২


স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে ঘোষিত সব হালাল খাদ্য স্বাস্থ্য উপযোগী এবং সব হারাম
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী ‘কীভাবে তোমরা সত্য প্রত্যাখ্যান করবে, যখন আল্লাহর আয়াতগুলো তোমাদের
বিস্তারিত
জমজম : মাটির পৃথিবীতে অলৌকিক
জমজম কূপের পানি তার আসল রূপেই হজ পালনকারীদের প্রদান করা
বিস্তারিত
সিরাতুল মুস্তাকিমের আকুতি
সূরা ফাতিহায় আল্লাহ প্রথমে দোয়ার আদব শিখিয়েছেন। তারপর চাওয়ার বিষয়টি।
বিস্তারিত
জেনে নিন রমজানের ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো
দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র মাহে রমজান। রমজান মাস ইবাদতের বসন্তকাল।
বিস্তারিত
সুদান ও আলজেরিয়ায় আরব বিপ্লবের নতুন
ফ্রান্সের দৈনিক পত্রিকা লেমন্ড বলছে, সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বাশির এবং
বিস্তারিত