ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে মোগল পান্ডুলিপিতে মহানবীর মেরাজ

ধারণা করা হয়, মেরাজে রজনীতে এই গম্বুজটির স্থানেই নবীজি (সা.) পূর্ববর্তী নবী ও ফেরেশতাদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজের ইমামতি করেন

ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে ‘মেরাজনামা’ নামে একটি পা-ুলিপি সংরক্ষিত আছে। এটি একটি ইসলামী পা-ুলিপি, যা পনেরো শতকে সুলতান শাহরুখ বিন তৈমুর লংয়ের আদেশে তৎকালীন খুরাসানের (বর্তমান আফগানিস্তান) অন্তর্গত হেরাত অঞ্চলে আলোর মুখ দেখেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, ৮৪০ হিজরি সনে তুর্কি-উইঘুর ভাষায় এর মূল টেক্সট লিপিবদ্ধ হয়।
ইরানি মিনিয়েচারে (ক্ষুদ্র চিত্র) মহানবী (সা.) এর মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস ও সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশ সফরের ঘটনাকে চিত্রিত করার অনেকগুলো প্রচেষ্টার মধ্য থেকে এটি একটি। এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নবীজির ইসরা ও মেরাজ এবং জান্নাত পরিভ্রমণ। 
পূর্ব তুর্কিস্তানের কবি মীর হায়দার মূল রচনাটি প্রণয়ন করেন এবং হেরাতের লিপিকার মালেক বখশি উইঘুর লিপিতে একে লিপিবদ্ধ করেন। উইঘুর লিপি হলো আরবি বর্ণমালায় তুর্কি ভাষা। পা-ুলিপিতে ৬১টি মিনিয়েচার রয়েছে।
ক্ষমতায় স্থির হওয়ার পর সুলতান শাহরুখ তার সময়ে বিকাশ লাভ করা শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন এবং কিংবদন্তি সিল্করুটসহ এশিয়া এবং ইউরোপের মাঝে প্রধান বাণিজ্যিক রুট স্থাপন করেন। ফলে হেরাত তৈমুর সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এবং শাহরুখ হয়ে ওঠেন তার সংস্কৃতি ও কূটনীতির জন্য প্রসিদ্ধ সুলতান। তিনি এমন কিছু নেতিবাচক বিষয়ের সংস্কার সাধন করেন যেগুলোর কারণ ছিলেন তার বাবা তৈমুর লং। 
ইসলামী শিল্পে ঊর্ধ্বারোহণকে চিত্রিত করে অঙ্কিত অন্য ছবিগুলোর চেয়ে ‘কিতাবুস সুঊদ’ অধিক পরিপূর্ণ। নবীজি (সা.) এর ঊর্ধ্বারোহণের এত বেশি পরিপূর্ণ ও শক্তিশালী সচিত্র ভ্রমণ হিসেবে পরিচিত ইসলামী পা-ুলিপি আর নেই। সুসজ্জিত ও বাঁধাইকৃত এ পা-ুলিপিতে সংরক্ষিত তৈমুরীয় মিনিয়েচার থেকে বেশি আসমান, ফেরেশতা, জাহান্নাম এর প্রতিকৃতি রয়েছে। 
ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত পা-ুলিপি তৈমুরীয় রাজবংশের শাসনামলে (১৩০৭-১৫০৭) মধ্য এশিয়া ও ইরানে বিকশিত ইসলামী চিত্রকলার ঐতিহ্যগত শৈলীর সাক্ষী প্রদান করে। যে রাজবংশ ইসলামী বিশ্ব ও পূর্ব-বিশ্বের মাঝে নিবিড় যোগাযোগের সাক্ষী হয়। যদিও এ মিনিয়েচারগুলো একটি মৌলিক ইসলামী ঘটনাকে চিত্রিত করে, তবু এর আইকনগুলো চীন ও মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধদের প্রভাবের কথা জানিয়ে দেয়। 

নবীজির ভ্রমণ ও নামাজের প্রমাণ
চৌদ্দ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। পৃথিবীর ইতিহাসে নবীজির রাতের সফর ও সশরীরে ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ এশীয় ইসলামি শিল্পে চিত্রাকারে অন্তর্ভুক্তিকরণ সম্পন্ন হয়েছে। এবং খানিদ শাসনামল থেকে কাজার যুগ (১৭৯৪-১৯২৫) পর্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সচিত্র ও স্বতন্ত্রভাবে ‘মেরাজনামা’ প্রকাশ করাও সম্পন্ন হয়েছে। যেমনিভাবে অন্যান্য প্রমাণাদি একথার ইঙ্গিত করে যে, এই শিল্পসম্মত কাজগুলো পারস্যের ধর্ম ও মতাদর্শগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্বের যুগে শাসক শ্রেণির মাঝে ইসলামের ধারণা ও সুন্নি মতাদর্শের সমর্থনে ব্যবহৃত হয়।
এ সত্ত্বেও অলঙ্করণে বৌদ্ধিক উপাদান রয়েছে। তন্মধ্য থেকে কয়েকটি ইরান, চীন ও মধ্য এশিয়ার বৈচিত্র্যময় এশিয়ান উত্তরাধিকার থেকে নেওয়া।
মেরাজনামা একইভাবে নামাজকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। কিছু মিনিয়েচারে হাতের অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শিত হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় এগুলো অধিকাংশ ফার্সি ভাষাভাষির জন্য সুন্নিদের নামাজের সচিত্র দলিলের মতো ব্যবহৃত হয়েছে। এবং সম্ভবত তা শাসকের তত্ত্বাবধানে, যা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই সচিত্র পা-ুলিপি শুধুই শিল্পের প্রেরণা থেকে নয়, বরং এর পেছনে ধর্মীয় প্রণোদনাও ক্রিয়াশীল ছিল।
শোড়ষ শতাব্দীর শেষভাগে তৈমুরীয় পা-ুলিপি মেরাজনামা ইস্তানবুল পৌঁছে এবং ১৬৭২ সাল পর্যন্ত তোপকাপি প্রাসাদের গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত হয়। মেরাজনামার এই সংস্করণ এবং অপর সংস্করণ যা খানিদ শাসকদের মধ্য থেকে ইলখানিদের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত, উভয়টিই পরে আরও অনেক চিত্রকলার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছে। ১৫৯৫ সালে উসমানী সুলতান তৃতীয় মুরাদের জন্য প্রস্তুতকৃত নবীজি (সা.) এর জীবনযাত্রার ওপর বাঁধাইকৃত একাধিক সচিত্র পা-ুলিপি পাওয়া যায়।   
নবীজি (সা.) এর বিশেষ ধরনের ঊর্ধ্বারোহণ যদিও অনেক দীর্ঘ, তবু তা পাঁচটি মিনিয়েচারে চিত্রিত করা হয়েছে। যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জিবরাইল (আ.) এর মক্কায় পৌঁছা, মসজিদুল আকসা অভিমুখে নবীজির সফর, নবীদের নিয়ে নামাজের ইমামতি, মুসলমানদের ওপর নামাজ ফরজ হওয়া এবং মক্কায় নবীজির প্রত্যাবর্তন।

মেরাজনামার চিত্রগুলো কী বলে?
প্রাচ্য শিল্পের ভিত্তি অনুসারে একজন শিল্পী তার শিল্পকর্মে আল্লাহর সারাংশ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। তার শিল্প-উপাদান ও আকৃতি ঐশ্বরিক আলো ফুটিয়ে তোলার একটি চেষ্টা।  
নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃতির অনুসরণ করা শিল্পীর জন্য আবশ্যক নয়। বরং সে আধ্যাত্মিক ঘটনাগুলো উপস্থাপনের জন্য বাস্তবতার প্রতীক ব্যবহার করবে। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী শিল্পে বিশেষজ্ঞ সুমাইয়া রমজানজাহি ও হাসান বুলখারির মতে, মেরাজনামায় ইরানি মিনিয়েচারে অঙ্কিত আগুন কোনো প্রাকৃতিক আগুন বা জাহান্নামের চিত্র নয়। বরং তা আল্লাহর পবিত্র নুরের প্রতিকৃতি।
ইসলামী প্রাচ্যশিল্পে প্রতীক গভীর অর্থ ধারণ করে। ইসলামী চিন্তার আলঙ্কারিক বোধ এবং অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য উপভোগের সক্ষমতা যার মর্মোদ্ধার করতে সহায়ক হবে। সুফি ধারণায় আলো এবং আগুন এই প্রতীকী পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে।   
মেরাজনামার পা-ুলিপি একই সঙ্গে বস্তু জগৎ, সপ্ত আকাশ, জান্নাত ও জাহান্নামের চিত্র একত্রিত করেছে, যা থেকে অনুমান করা যায় যে, শিল্পী বিভিন্ন ধরনের আলো ও আগুন সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। যদিও এই দাবি করা যায় না যে, তিনি এই পার্থক্যের অস্পষ্ট অর্থ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন।  

 হসূত্র : আলজাজিরা আরবি


স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে ঘোষিত সব হালাল খাদ্য স্বাস্থ্য উপযোগী এবং সব হারাম
বিস্তারিত
আলোর পরশ
কোরআনের বাণী ‘কীভাবে তোমরা সত্য প্রত্যাখ্যান করবে, যখন আল্লাহর আয়াতগুলো তোমাদের
বিস্তারিত
জমজম : মাটির পৃথিবীতে অলৌকিক
জমজম কূপের পানি তার আসল রূপেই হজ পালনকারীদের প্রদান করা
বিস্তারিত
সিরাতুল মুস্তাকিমের আকুতি
সূরা ফাতিহায় আল্লাহ প্রথমে দোয়ার আদব শিখিয়েছেন। তারপর চাওয়ার বিষয়টি।
বিস্তারিত
জেনে নিন রমজানের ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো
দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র মাহে রমজান। রমজান মাস ইবাদতের বসন্তকাল।
বিস্তারিত
সুদান ও আলজেরিয়ায় আরব বিপ্লবের নতুন
ফ্রান্সের দৈনিক পত্রিকা লেমন্ড বলছে, সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বাশির এবং
বিস্তারিত