মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

ময়ূরের পেখম উপড়ানোর রহস্য

মসনবি শরিফের পা-ুলিপি, ওয়াল্টার আর্ট মিউজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র, ১৬০০ শতক

হে ময়ূর! তোমার পালক পেখম ছিঁড় না, উপড়াবে না। বরং তোমার সুন্দর পেখম থেকে তোমার মনটাই উপড়ে ফেল, বিচ্ছিন্ন করে নাও। বাইরের যুদ্ধ যেমন সামনে শত্রু ছাড়া অর্থহীন, তেমনি আত্মিক জিহাদও নফস না থাকলে অনর্থক। সুফিরা দারিদ্র্যের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার অর্থও এটিই। অর্থাৎ সম্পদ অমুখাপেক্ষিতা ত্যাগ করার মানে ফকিরি ও দারিদ্র্য বরণ নয়, বরং সম্পদ আর মুখাপেক্ষিতার প্রতি আগ্রহ না থাকার মানেই হলো ফকিরি

সমতলভূমিতে এক ময়ূর তার সুন্দর পেখমগুলো উপড়াচ্ছিল নিজের ঠোঁটে। এক প-িত লোক যাচ্ছিলেন সে পথ দিয়ে। ময়ূরের সঙ্গে তিনি কথা বললেন দর্শনের যুক্তি সাজিয়ে। ময়ূর! তুমি কি জান না তোমার পেখম পুচ্ছের কদর কত? নিজের পেখম নিজে ছিঁড়লে তুমি বিবসনা বিশ্রী হয়ে যাবে। পেখম তো তোমার গায়ের জামা, রূপের সাজ, গর্বের ধন। কাদামাটিতে এভাবে ছুড়ে ফেলছ, তুমি কি আহম্মক? জান না, মক্তবের শিশুরা তোমার পেখম দিয়ে কোরআন শরিফে নিশান বানায়? আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কীভাবে অকৃতজ্ঞতা দেখাচ্ছ? সুন্দর, হৃদয়কাড়া, দৃষ্টিনন্দন পালক, পেখম তোমায় আল্লাহই দিয়েছেন। তুমি এত অভিমান দেখাও কার সঙ্গে? অত অমুখাপেক্ষী বেনেয়াজ মনে করো না নিজেকে।
আই বসা’ নাযা’ কে গর্দদ আ’ন গুনাহ
আফগনদ মর বন্দা রা’ আয চশমে শা’হ
অনেক অভিমানী, ঠমকে এমন গোনাহ করে
বান্দাকে ত্যাজ্য বানায় স্বয়ং বাদশাহর নজরে।
কোনো কোনো অভিমান, অমুখাপেক্ষী আচরণ এমন গোনাহের কারণ হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বান্দাকে মহান আল্লাহর দরবারে বঞ্চিত করতে পারে। কাজেই আল্লাহর সমীপে, এ জগতে কখনও নিজেকে বেনেয়াজ, অমুখাপেক্ষী ভাবতে নেই। কারণ এমন মনোভাব তোমার মধ্যে অহংকার, অবাধ্যতা সৃষ্টি করবে। মওলানা আরও বলেন, অভিমান দেখানো মিষ্টান্ন খাওয়ার মতো বেশ মজা। কিন্তু মিষ্টান্ন তো তোমার শরীর স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ। অভিমান দেখাচ্ছ আর নিজেকে ভাবছ, বেশ ফুরফুরে? কিন্তু যার সঙ্গে অভিমান, তিনি যদি তোমার দিকে ফিরে না তাকান, মুখ ফিরিয়ে নেন, তোমার অবস্থা কী হবে? কাজেই আল্লাহর সঙ্গে মান-অভিমান দেখাতে নেই। সবসময় নিজেকে আল্লাহর কাছে ছোট, মুখাপেক্ষী করে রাখাই নিরাপদ। যদি তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে থাক, মনে হবে তুমি দুর্বল, মাটির সঙ্গে মিশে আছ; কিন্তু এ অনুভূতি তোমার বুকটা চাঁদের মতো আলোকিত করবে।
তুমি যদি শীতকাল হয়ে যাও, যদি তোমার অস্তিত্ব থেকে আমিত্বের পত্রপল্লব ঝেড়ে ফেলে দাও, নিজেকে আমিত্বশূন্য নাঙ্গা গাছে পরিণত কর, তাহলে তিনি তোমার ভেতর থেকে এমন আধ্যাত্মিক বসন্তের উজ্জীবন ঘটাবেন, যা তোমার অস্তিত্বের গাছটিকে হকিকত ও মারেফতের ফলে-ফুলে ভরে দেবে। নৈতিক সৌন্দর্যের সমারোহে জীবন মহিমান্বিত হবে। 
হ্যাঁ, যদি তুমি নিজেকে রাতের মতো করে ফেল, নফসে আম্মারার উৎপাত ঠেকাতে পার, যদি কামনা-বাসনা, খ্যাতির লোভ সংবরণ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পার, তাতে নিজেকে রাতের আঁধারে আচ্ছাদিত মনে হলেও শিগগিরই তোমার অন্তর্জগৎ থেকে আল্লাহ প্রভাতের দেদীপ্যমান সূর্য উদিত করবেন। 
কাজেই হে ময়ূররূপী মানুষ তোমার চেহারাকে কুফরি নাফরমানির নখ দিয়ে আঁচড়াবে না, ক্ষতবিক্ষত করবে না। কামনা-বাসনার আধিক্যের কারণে তুমি নিজের আধ্যাত্মিক চেহারা দেখতে পাচ্ছ না। মন্দচিন্তা, মন্দচরিত্র বর্জন কর, তোমার সুন্দর চেহারা তোমার সামনে তখনই উদ্ভাসিত হবে। তোমার ভেতরে আসল যে চেহারা তার পরিচয় ‘নফসে মুতমাইন্না’ প্রশান্ত আত্মা। 
রূয়ে নফসে মুতমাইন্না দর জসদ
যখমে নাখোনহা’য়ে ফিকরত মী কশদ
তোমার ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রশান্ত আত্মা যা
তোমার মন্দচিন্তার নখ নিয়ত বিক্ষত করছে তা।
কোরআন মাজিদে নফসে মুতমাইন্নার পরিচয় ব্যক্ত হয়েছে এভাবেÑ ‘হে প্রশান্ত চিত্ত! তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।’ (সূরা ফজর : ২৭, ২৮)।
এটিই মানবসত্তার আসল পরিচয়। নফসে মুতমাইন্না বুকের ভেতরে আয়নাস্বরূপ। তোমার খারাপ চিন্তা, অসৎ কাজ এ আয়নার ওপর কালো দাগের আঁচড় বসিয়ে দেয়। 
ফিকরতে বদ নাখোনে পুর যাহর দা’ন
মী খরা’শদ দর তাআম্মুক রূয়ে জা’ন
যত মন্দ চিন্তা জান বিষাক্ত নখ শুধু খামচায়
ক্ষতবিক্ষত দাগ পড়ে গভীরে রুহের চেহারায়। 
বুঝলাম, তুমি চিন্তাবিদ, যুক্তিবুদ্ধির সারথি, কাল্পনিক প্রশ্নের জট খুলতে ঘুম নাই অহর্নিশ অথচ তোমার রুহের কী প্রয়োজন, আত্মায় কোথায় জট লেগে আছে, সে চিন্তা নাই। তার পরিবর্তে আজেবাজে চিন্তা দিয়ে রুহের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছ। তোমার এ কাজ স্বর্ণের তৈরি কোদাল নিয়ে মল খসানোর মতোই বেমানান। তুমি থিসিস, এন্টি থিসিস, সেনথিসিসের মারপ্যাঁচে সমস্যার জট চষে জীবন-যৌবন শেষ করে দিয়েছ। আমার প্রশ্ন, তুমি কি নিজের ভেতরে খননকার্য চালিয়েছ? তুমি কি জানতে পেরেছ, তুমি ভাগ্যবান, নাকি হতভাগা? তোমার শেষ জীবন কি সৌভাগ্যময় হবে, নাকি চরম হতাশা তোমার অপেক্ষায় রয়েছে? এককথায় তুমি কি তোমার পরিচয় পেয়েছ। কাজেই আগে নিজের সমস্যার সমাধান কর। জায়েজ-নাজায়েজ, হারাম-হালাল নিয়ে তর্কে জড়ানোর আগে চিন্তা কর, তুমি নিজে হালাল কি না। ভেবে দেখ, তোমার ভেতরটা পবিত্র কি না, নাকি অপবিত্র চিন্তা-চেতনায় হাবুডুবু খাও। 
বর মকন পর রা’ ওয়াদিল বরকন আযূ
যাঁকে শর্তে ইন জিহা’দ আমদ আদূ
পেখম ছিঁড় না, বরং অন্তর চ্ছিন্ন কর, তা থেকে
কারণ জিহাদের শর্তই হলো শত্রু থাকতে হবে। 
তুমি আধ্যাত্মিক সাধনার নামে তোমার পালক পেখম ছিঁড়ে ফেলবে, তা সঠিক পথ নয়। নির্জন নিরালায় বৈরাগ্য সাধনা ইসলামের পথ নয়। কৃচ্ছ্রসাধনা মানে তো নিজের মনের সঙ্গে, প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। যুদ্ধের জন্য পূর্বশর্ত সামনে শত্রু থাকা। তার মানে, তোমার নফস থাকতে হবে। নফসকে মেরে ফেলা যাবে না। তাহলে যুদ্ধটা কার সঙ্গে হবে?
মওলানা রুমির আধ্যাত্মিক দর্শনে সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করে, কাজকারবার ছেড়ে দিয়ে চিল্লায় পড়ে থাকা বা বৈরাগ্য সাধনার কোনো স্থান নেই। মওলানার ছেলে সুলতান ওয়ালাদ যেমন বলেন, চিল্লা নবী-রাসুলদের পথ ছিল না, তা বেদাত। হ্যাঁ, নির্জনতা অবলম্বন ভালো; যদি বন্ধুরা খারাপ হয়। কিন্তু ভালো বন্ধুদের ছেড়ে নির্জনতা মূর্খতা। কেননা হাদিসে আছে, আল জামাআতু রাহমাতুন ‘সংঘবদ্ধতার মধ্যেই রহমত’। (মাআরেফে সুলতান ওয়ালাদ, পৃ. ২৯৬)।
মওলানা অন্যত্র বলেছেন, নির্জনতা চাই পরজনের কাছ থেকে, আপনজনের কাছ থেকে নয়। কম্বল-কাঁথা শীতের জন্য এসেছে, বসন্তের জন্য নয়। 
কাজেই উপরের বয়েতের ব্যাখ্যা হলো, হে ময়ূর! তোমার পালক পেখম ছিঁড় না, উপড়াবে না। বরং তোমার সুন্দর পেখম থেকে তোমার মনটাই উপড়ে ফেল, বিচ্ছিন্ন করে নাও। বাইরের যুদ্ধ যেমন সামনে শত্রু ছাড়া অর্থহীন, তেমনি আত্মিক জিহাদও নফস না থাকলে অনর্থক। সুফিরা দারিদ্র্যের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার অর্থও এটিই। অর্থাৎ সম্পদ অমুখাপেক্ষিতা ত্যাগ করার মানে ফকিরি ও দারিদ্র্য বরণ নয়, বরং সম্পদ আর মুখাপেক্ষিতার প্রতি আগ্রহ না থাকার মানেই হলো ফকিরি। 
মওলানা বলেন, তোমার মধ্যে যদি যৌন কামনা না থাকে, তাহলে আল্লাহর হুকুমে নিজেকে সংবরণের তাৎপর্য কী হবে। কোনো দিকে মনের ঝোঁক না থাকলে ধৈর্য ধরার মানে তো হবে অর্থহীন। কাজেই 
হীন মকুন খোদ রা’ খসী রোহবান মশো
যাঁকে ইফফত হাস্ত শাহওয়াত রা’ গেরু
সাবধান! খাসি করো না নিজেকে, হইও না বৈরাগী
কারণ পবিত্রতা তো শাহওয়াত কামনার কাছেই জিম্মি। 
কামনাই যেখানে নাই, সেখানে কামনা থেকে পরহেজ করার মানে কী? যে লোক মরে গেছে তার সঙ্গে কি যুদ্ধ চলে? 
আনফিকূ গোফতে আস্ত পস কাসবী বকুন
যাঙ্কে নবুয়াদ খরজ বী দখলে কহুন
দান কর নির্দেশ আছে; তাই কর উপার্জন
কারণ যথেষ্ট উপার্জন ছাড়া কি দান সম্ভব?
কোরআন মাজিদে নির্দেশ আছেÑ তোমরা আল্লাহর রাস্তায় দান করো। দান করতে হলে তো অর্থ প্রয়োজন। অর্থের জন্য চাই উপার্জন। কোরআন মজিদের নির্দেশ হলো, ‘আনফিকু’ তোমরা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো। তুমি আয়াতটি এভাবে পড় ‘একসিবু সুম্মা আনফিকু’ তোমরা উপার্জন করো, তারপর আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করো। অনুরূপ মহামহিম আল্লাহ যে বলেছেন, তোমরা ধৈর্যধারণ করো। তার মানে তোমার ভেতরে নফসানি কামনা-বাসনা থাকতে হবে। তারপরই সেদিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিতে হবে। 
আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেনÑ ‘কুলু’ তোমরা খাও। মানুষের মধ্যে জৈবিক কামনা আসার জন্যই এই নির্দেশ, তারপর যে বলেছেন, অপচয় করো না। অর্থাৎ পবিত্রতার চেতনাকে তোমার স্বভাবে পরিণত করো। পানাহার যখন মানুষের মনে কামনা-বাসনার আগুন জ্বালায়, তখন অপব্যয় থেকে বাঁচার চেষ্টা আস্তে আস্তে পবিত্রতার চেতনা ও পরহেজগারির স্বভাব জাগায়। কাজেই আল্লাহর এ নির্দেশের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করো। 
‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর (বিধি মোতাবেক) পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করবে, আহার করবে, পান করবে; কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা আরাফ : ৩১)।

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৫খ. বয়েত ৫৩৬-৫৮৫)


ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি উদযাপনে সুদানিরা
  দ্বীপাঞ্চলের আবদুল কাইয়ুম রাজধানী খার্তুমে সেনা কর্তৃপক্ষ ও বিরোধী জোটের
বিস্তারিত
শ্রীলঙ্কায় ইস্টার হামলার পর কেমন
  মাত্র কয়েক মাস আগেও পশ্চিম শ্রীলঙ্কায় মোহাম্মদ ইলিয়াসের ব্যবসা রমরমা
বিস্তারিত
মালয়েশিয়ায় জাকির নায়েককে নিয়ে বিতর্ক
  ডা. জাকির নায়েক ইস্যুতে মালয়েশিয়ান রাজনীতি বেশ টালমাটাল। নানা কথা
বিস্তারিত
নরেন্দ্র মোদি ও কাশ্মীর ইস্যু
  ১৫ আগস্ট লন্ডনভিত্তিক  আরবি-ইংরেজি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউ অ্যারাবে প্রকাশিত ইমাদ
বিস্তারিত
কাশ্মীরকে দমাতে দিল্লির ৪ দফা নীলনকশা
কড়া নিরাপত্তা বলয়ে ভারত অধিকৃত গোটা জম্মু-কাশ্মীর। কারফিউয়ের সঙ্গে পরিস্থিতি
বিস্তারিত
নারী শিক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে পড়াশোনা করতে, জ্ঞানার্জনে ব্রতী হয়ে আল্লাহর
বিস্তারিত