সুদান ও আলজেরিয়ায় আরব বিপ্লবের নতুন ঢেউ

আলজেরিয়া ও সুদানের জনগণের জন্য আন্দোলনের রাজপথ থেকে ফিরে আসতে কয়েকটি আরব বিপ্লবের বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি যথেষ্ট ছিল না

ফ্রান্সের দৈনিক পত্রিকা লেমন্ড বলছে, সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বাশির এবং আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদুল আজিজ বুতেফ্লিকার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন স্পষ্ট করেছে যে, ২০১১-তে শুরু হওয়া আরব বসন্তের নানা ধরনের সমাপ্তি ও পরিণতি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় পরিবর্তনের বাসনাকে শেষ করে দেয়নি। সাংবাদিক বিনইয়ামিন বার্ট সংবাদপত্রের এক প্রবন্ধে বলেন, সেই সব মিশরীয়, যাদের ২০১১ সালের বিপ্লবের মূলকেন্দ্র তাহরির স্কয়ারের স্মৃতি তাড়িয়ে ফেরে, তাদের অনেকেই শেষ কিছুদিন নির্ঘুম রাতযাপন করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত থেকে তাদের প্রতিবেশী সুদানিদের প্রতি লক্ষ রাখছে এবং প্রতি মিনিটে মিনিটে তাদের পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। 
মরচে পড়া বসন্ত
বার্ট আরও বলেন, এসব পরামর্শ খাওয়ানো হচ্ছে এমন দুঃখজনক অভিজ্ঞতা থেকে, যার স্বাদ মিশরীয়রা ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের সময় সেনাবাহিনীর ওপর অন্ধ বিশ্বাসের ফলে আস্বাদন করেছিল। তখন আন্দোলনকারীরা তাহরির স্কয়ার ছেড়ে দিয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা মিশরের জেনারেল আব্দেল ফাত্তাহ আল-সিসির ভেতর দিয়ে আড়াই বছর পর সেই পুরোনো শাসনই আবার ফিরে আসার পথ মসৃণ করে দেয়, যিনি বর্তমানে লোহার শাসনদ-ে মিশরে দমন-নিপীড়নের হুকুমত করছেন। 
কায়রোর সাবেক বিপ্লবী ও খারতুমের বর্তমান বিক্ষোভকারীদের মাঝে সময় ও স্থান ব্যক্ত করে এ সংলাপ সুদানের আন্দোলন, আলজেরিয়ার আন্দোলন এবং ২০১১ সাল থেকে চলমান বিদ্রোহগুলোর মাঝে পারস্পরিক সূত্র তুলে ধরে। 
গুরুত্বের সঙ্গে লেখক আরও বলেন, বুতেফ্লিকাবিরোধী আন্দোলন ও বাশিরবিরোধী আন্দোলনের আকৃতি ধারণ করা আরব বসন্তের এ দ্বিতীয় ঢেউ আবারও প্রমাণ করে যে, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাকে ২০১১ সাল থেকে শুরু হওয়া আরব অভ্যুত্থানগুলোর বিনাশকারী নানা কৌশল ও অধিকাংশ দুঃখজনক পরিণতি মিসমার করে দেয়নি। 
স্বৈরাচার প্রত্যাখ্যান 
আমেরিকার বৈরুত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ইসাম ফারেস ইনস্টিটিউটের পরিচালক তারিক মিত্র বলেন, ‘এটা দেখিয়ে দেয় যে, স্বৈরাচারী শাসনের প্রত্যাখ্যানও কিছু দেশের জন্য কতটা হতাশাজনক। স্বৈরাচারিতা এখনও গভীরভাবে রয়েছে, যেমন সবসময় ছিল। তাই বিভ্রম থেকে বেরিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আরবদের বিপ্লব যখন ব্যর্থ হবে তারা আবার আগের ব্যবস্থার দিকেই ফিরে যাবে।’
তিউনিশিয়া ছাড়াও যা তুলনামূলকভাবে একটি ব্যাপক রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে, যে দেশগুলোকে আট বছর আগে বিদ্রোহ-আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল, তা শেষ হয়ে গেছে। এরপর তা হয়তো গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নিয়েছে, যেমন সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়া অথবা একনায়কতন্ত্রের দিকে ফিরে গেছে, যেমন মিশর ও বাহরাইন। স্পষ্ট যে, এসব ঘটনা আলজেরীয় ও সুদানিদের জন্য নিজেদের নিয়তির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় রাজপথে বেরিয়ে আসা থেকে নিবৃত করতে যথেষ্ট ছিল না। 
বৈরুতের কার্নেগি ফাউন্ডেশনের পরিচালক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহা ইয়াহইয়া বলেন, আরব বিশ্ব ঐতিহাসিক সংকটের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। কেননা বিগত ষাট বছর ধরে চলমান পুরোনো শাসনব্যবস্থা ২০১১ সালের সংকটের কারণগুলো সমাধান না করেই প্রতিযোগিতার চূড়ান্তে পৌঁছেছে। তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রতিবাদ সামনে আরও অগ্রসর হওয়ার এটাই কারণ। 
দুটি আরব বসন্তের তুলনা করে লেখক বলেন, বুতেফ্লিকার পঞ্চমবারের মতো নির্বাচনে মনোনয়ন নেওয়ার গুরুতর ভুলকে আলজেরিয়ার জনগণের প্রত্যাখ্যান ছিল মিশরীয়দের হোসনি মোবারককে প্রত্যাখ্যানের প্রতিচ্ছবি। হোসনি মোবারক তার প্রেসিডেন্টের পদকে নিজ পুত্র জামালের উত্তরাধিকার করে দেশকে প্রজাতন্ত্রের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। এমনিভাবে সুদানিদের একটি রুটির মূল্য বেড়ে তিনগুণ হওয়ার ক্ষোভ এবং স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও শান্তির দাবিতে আন্দোলন পুরোপুরিভাবে তিউনিশিয়ার জনগণের ক্ষোভ ও তাদের আন্দোলনের অনুরূপ। 
তিউনিশিয়ার এক ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা ছিলেন মুহাম্মাদ আল-বু-আজিজি। পুলিশ তাকে দেশব্যাপী চলমান রাষ্ট্রযন্ত্রের জোর-জুলুমের ধারাবাহিকতায় অন্যায্য খাজনার দাবিতে লাঞ্ছিত করে এবং তার শেষ সম্বলটুকু ছিনিয়ে নেয়। বিচারহীনতার সেই দেশে সে নিজের গায়ে আগুন জ্বালিয়ে আত্মাহুতির মাধ্যমে এর প্রতিবাদ করে। এখান থেকেই তিউনিশিয়ার জনগণের মাঝে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে এবং আরব বসন্তের সূচনা হয়। 
রাজনৈতিক বন্ধ্যত্ব¡ 
শেষ দুই বছরে ঘটে যাওয়া বেশ অনেকগুলো ক্রোধের বিস্ফোরণ ইঙ্গিত করে, ২০১১ সালের আগুন এখনও ছাইয়ের নিচে প্রজ্বল্যমান আছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে যেমনটা ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক এলাকা মরক্কোর গ্রামাঞ্চলে একটি শক্তির মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে। যেমনটা ঘটেছে দক্ষিণ ইরাকের বসরায়। এটি অবহেলিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত একটি এলাকা, যারা স্বায়ত্তশাসনের প্রতি আগ্রহী। 
বৈরুতভিত্তিক সিনাবিস বিশ্লেষণ কেন্দ্রের পরিচালক পিটার হার্লিং বলেছেন, ‘আরব বিশ্ব ২০ বছর ধরে তাদের মুখোমুখি হওয়া ব্যাপক রাজনৈতিক বন্ধ্যত্বের কারণে বিপ্লবের ঝড়ো হাওয়াতেই দিনাতিপাত করছে।’ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্বারোপকারী এ গবেষক উল্লেখ করেন, ২০০৫ সালে বৈরুতের বসন্ত এবং ফিলিস্তিনি আইন পরিষদে হামাসের হঠাৎ বিজয় ছিল ২০১১ সালে সংঘটিত আরব বসন্তের প্রাদুর্ভাবের লক্ষণ ও সতর্কবার্তা।
উন্নতি করার মতো কিছু নেই শাসনব্যবস্থাগুলোর 
হারলিং আরও বলেন, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ এবং ২০০৬ সালে লেবাননে দ্বিতীয় যুদ্ধের মতো ভূরাজনৈতিক আঘাতগুলো সেই সময় মনোযোগ সরিয়ে দেয়। কিন্তু ২০১০ সালে যখন এ চাপটি কমে আসে, তখন শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত সমস্যাগুলো বহাল তবিয়তেই থাকে। তবে যাই হোক, এ বিপ্লব ও অভ্যুত্থান আবারও ফিরে আসবে, যতদিন না রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা নিজেকে উন্নত করার মতো কোনোকিছু ধারণ করছে। বিপ্লবীরা, এমনকি শয়তানও অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করে দেখতে পারে। 
উপসংহারে লেখক বলেন, যে কোনো জায়গায় স্বৈরশাসনের দিকে প্রত্যাবর্তন কখনোই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে না। আর সমৃদ্ধ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ছাড়া গৃহযুদ্ধে খ-বিখ- ইয়েমেন ও সিরিয়ায় এমন কোনো সুরক্ষাকারী নেই যে, অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদ্রোহের জ্বরকে প্রতিহত করবে। লেখক এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন, লিবিয়ায় অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল হাফতারের সাফল্য মানে তিউনিশিয়ায় যা ঘটেছিল তার অনুরূপ অভিজ্ঞতা থেকে সে দেশের বঞ্চিত হওয়া।

 আলজাজিরা আরবি অবলম্বনে


হজের প্রধান লক্ষ্য ও শিক্ষা
হজের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ও প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর জিকির প্রতিষ্ঠা
বিস্তারিত
ফিকহ অব সোশ্যাল মিডিয়া
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : শায়খ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার
বিস্তারিত
ধর্ষণ প্রতিরোধের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম কুপ্রবৃত্তি
দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ ধর্ষণ। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ এটাকে
বিস্তারিত
রোগীকে হেলা করবেন না
আমাদের আশপাশেই হয়তো এমন অনেক আল্লাহর বান্দা-বান্দি আছেন, যাদের হয়তো
বিস্তারিত
হজ-পরবর্তী জীবন হোক পাপমুক্ত
হজ ইসলামি শরিয়তের অন্যতম ভিত্তিমূল। তবে ব্যতিক্রমী ব্যাপার হলো, হজ
বিস্তারিত
খুবাইব (রা.) শহীদ হওয়ার মর্মস্পর্শী
আমর ইবনু আবু সুফিয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর
বিস্তারিত