মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

দাজ্জালের ফেতনা থেকে সাবধান

নবী (সা.) তাঁর উম্মতকে ফেতনা থেকে কঠিনভাবে সতর্ক করেছেন। এ ব্যাপারে তাদের প্রদান করেছেন মহানতর উপদেশ। বলে দিয়েছেন তাদের এসব ফেতনার ব্যাপারে করণীয়। দেখিয়ে দিয়েছেন এসবের হুমকি থেকে আত্মরক্ষার পথ-পন্থা। যাতে মুসলিমরা এসব থেকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকে এবং অবলম্বন ও আশ্রয় গ্রহণ করে। ফেতনাবিষয়ক এসব হাদিস নবী (সা.) এর সত্যতা ও নবুয়তের নিদর্শন এবং উম্মতকে বাঁচাতে তাঁর আগ্রহের প্রমাণ। 
সতর্ককৃত সেই ফেতনাগুলোর মধ্যে রয়েছে অন্ধ ফেতনা, ঘোর বিপদ, জটিল পরীক্ষা ও কঠিন পরিস্থিতিÑ যেগুলো সন্দেহাতীতভাবে পৃথিবীতে অনুষ্ঠিত হবেই। মানুষকে ছেয়ে ফেলবে ঘনঘোর দিন। এটি গায়েব তথা অদৃশ্যের প্রতি ঈমানের কঠিনতম বিষয়। কেয়ামতের বৃহত্তর আলামত। বান্দাদের জন্য আল্লাহর পরীক্ষা। সেটি ব্যাপকতর ফেতনাÑ যা ওই সময় বিদ্যমান সব সৃষ্টিকে পরিব্যাপ্ত করবে। তাদের ওপর পতিত হবে এবং তার বোঝা চাপিয়ে দেবে। 
আল্লাহর বান্দারা, সেটি মসিহ দাজ্জালের ফেতনা। কে আপনাদের জানাবে মসিহ দাজ্জালের ফেতনা কী? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দাজ্জালের চেয়ে বড় ফেতনা কখনও ছিল না, কেয়ামত পর্যন্ত কখনও হবেও না। এমন কোনো নবী নেই, যিনি নিজ জাতিকে দাজ্জাল থেকে সতর্ক করেননি।’ দাজ্জালের বহিঃপ্রকাশ সম্পর্কে নবী (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেই যদি দাজ্জাল আগমন করে, তাহলে তোমাদের ছাড়া আমি একাই তার বিরুদ্ধে লড়ব। আর আমি চলে যাওয়ার পর যদি সে আগমন করে, তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজেকে হেফাজত করবে। আর আমি চলে গেলে আল্লাহই প্রতিটি মুসলিমকে হেফাজতকারী হিসেবে যথেষ্ট।’
মসিহ দাজ্জাল হলো কুফরি ও গোমরাহির উৎস। ধোঁকা ও ঝুঁকির ঝরনা। নবীরা নিজ নিজ জাতিকে তার ব্যাপারে সতর্ক ও সাবধান করেছেন। তার পরিষ্কার বিবরণ দিয়েছেন। দ্ব্যর্থহীনভাবে তার বর্ণনা তুলে ধরেছেন। নবী (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদের তার ফেতনা থেকে সাবধান করছি। সব নবীই তাদের উম্মতকে দাজ্জাল থেকে সতর্ক করেছেন। নুহ (আ.) নিজ জাতিকে তার ব্যাপারে সাবধান করেছেন।’ তিনি আরও এরশাদ করেন, ‘আদম সৃষ্টি ও কেয়ামত সংগঠনের মধ্যকার সময়ে দাজ্জালের চেয়ে বড় সৃষ্টি আর নেই।’ সাফারিনি (রহ.) বলেন, ‘প্রত্যেক আলেমের উচিত নারী-শিশু ও পুরুষদের মাঝে দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদিসগুলো প্রচার করা। বিশেষ করে আমাদের যুগে, যখন ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বিপদ ক্রমে বেড়ে চলেছে। সুন্নতের নিদর্শনগুলো মুছে যাচ্ছে। সুন্নত হয়ে যাচ্ছে বেদাতের মতো। বেদাত হয়ে যাচ্ছে শরিয়ত, যা অনুসরণ করা হচ্ছে। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ।’ 
নাজাতপ্রত্যাশী এবং এ বিনাশী ফেতনা ও সর্বনাশা আপদে শঙ্কিত প্রতিটি মোমিনের কর্তব্য দাজ্জালের বাস্তবতা ও পরিণতি সম্পর্কে অবগত হওয়া। তার সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে, যার মাধ্যমে অন্যদের থেকে তাকে আলাদা করা যাবে। রয়েছে পরিষ্কার নিদর্শন, যা দিয়ে তাকে চেনা যাবে। যখন সে আবির্ভূত হবে, মানুষ তার সম্পর্কে সচেতন থাকবে। তার প্রতারণায় তারা বিভ্রান্ত হবে না। তার ফেতনায় পড়বে না। এখানে আমরা দাজ্জাল সম্পর্কে সহিহ হাদিসগুলো যা বিবরণ দিয়েছে তার সারাংশ তুলে ধরছি : 
দাজ্জাল হবে এক যুবক আদম সন্তান। শরীরের রং হবে লাল, বেঁটে, হাঁটলে দুই পায়ের মাঝে দূরত্ব হবে, মাথার চুল হবে কোঁকড়া, কপাল হবে উঁচু, বক্ষ হবে প্রশস্ত, ডান চোখ হবে টেরা এবং আঙুর ফলের মতো উঁচু। তার বাম চোখ থাকবে পুরু সাদা চামড়ায় ঢাকা। তার দুই চোখের মাঝে লেখা থাকবে ‘কাফের’। স্বাক্ষর-নিরক্ষর সব মুসলিম সে লেখা পড়তে পারবে। সে হবে নির্বংশ। তার কোনো সন্তান থাকবে না। সে বের হবে খোরাসানের পুবদিক থেকে। ইস্পাহানের সত্তর হাজার ইহুদি তার অনুসরণ করবে। তাদের মাথায় থাকবে মুকুট। মানুষ তার কাছ থেকে পাহাড়ে পলায়ন করবে। সে পৃথিবীময় দাপিয়ে বেড়াবে। এমন কোনো শহর নেই যেখানে যাবে না। শুধু মক্কা ও মদিনা ছাড়া। আল্লাহ তার জন্য এ দুই শহরে প্রবেশ হারাম করেছেন। ফেরেশতারা মক্কা-মদিনা পাহারা দেবেন। 
মানুষের জন্য আল্লাহর আরেকটি পরীক্ষা হলো, দাজ্জালকে দিয়ে তিনি অলৌকিক ঘটনা ঘটাবেন, যা বোধকে নাড়িয়ে দেবে এবং বুদ্ধিমানকে লা জবাব করে দেবে। সে প্রথমে নবী দাবি করবে, তারপর দাবি করবে ইলাহ হওয়ার। হাদিসে আরও এসেছেÑ তার সঙ্গে থাকবে জান্নাত ও জাহান্নাম। তার জান্নাত আসলে জাহান্নাম এবং জাহান্নাম আসলে জান্নাত। তার সঙ্গে আরও থাকবে পানির নদী ও রুটির পাহাড়। সে আসমানকে বৃষ্টি নামাতে বলবে আর অমনি শুরু হবে বৃষ্টি। ভূমিকে বলবে ফসল ফলাতে আর অমনি ফসল উদ্গত হবে। জগতের ভা-ারগুলো তার পিছু ছুটবে। পৃথিবী পরিভ্রমণ করবে বিস্ময়কর গতিতে। যেভাবে মেঘকে দ্রুতগতিতে টেনে নিয়ে যায় বাতাস।
দাজ্জালের আরেক ফেতনা হবে এমনÑ সে এক জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানাবে। এতে তারা ঈমান আনবে। দাজ্জাল তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করার জন্য আকাশকে আদেশ দেবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে, জমিন ফসল উৎপন্ন করবে এবং তাদের পশুপাল ও চতুষ্পদ জন্তুগুলো অধিক মোটাতাজা হবে আর আগের তুলনায় বেশি দুধ প্রদান করবে। অতঃপর অন্য একটি জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনার আহ্বান জানাবে। লোকরা তার কথা প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাদের কাছ থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসবে। এতে তারা চরম অভাবে পড়বে। তাদের ক্ষেত-খামারে চরম ফসলহানি দেখা দেবে। দাজ্জাল পরিত্যক্ত ভূমিতে গিয়ে বলবে, তোমার নিচে লুকায়িত গুপ্তধন বের কর। গুপ্তধনগুলো বের হয়ে মৌমাছির দলের মতো তার পিছে পিছে চলতে থাকবে। 
দাজ্জাল একজন টগবটে যুবককে ডাকবে। তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করে দুই টুকরো করে ফেলবে। এরপর তাকে সে ডাকবে, অমনি সেই যুবকটি হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে এগিয়ে আসবে। এ যুবকটির বিবরণ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে : তিনি হবেন ওই যুগের সর্বোত্তম মানুষ। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর শহর থেকে বের হয়ে দাজ্জালের কাছে আসবেন। দাজ্জালকে দেখে তিনি বলবেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি সেই দাজ্জাল, যার সম্পর্কে রাসুল (সা.) আমাদের সাবধান করেছেন। তখন দাজ্জাল উপস্থিত মানুষকে লক্ষ করে বলবে, আমি যদি একে হত্যা করে জীবিত করতে পারি তাহলে কি তোমরা আমার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ পোষণ করবে? লোকরা বলবে, না। অতঃপর সে ওই মোমিনকে হত্যা করে ফের জীবিত করবে। এ পর্যায়ে যুবকটি বলবে, আল্লাহর শপথ! আজকের চেয়ে তোমার ব্যাপারে আমি অধিক জ্ঞাত ছিলাম না। (আজ তোমার ধোঁকা সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হলাম)। দাজ্জাল তাকে দ্বিতীয়বার হত্যা করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। 
এই কানা মিথ্যাবাদীর ফেতনা এমন পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হবে যে, এক গ্রাম্য লোককে বলবে : ‘আমি যদি তোমার মৃত বাবা-মাকে জীবিত করে দেখাই তাহলে কি তুমি আমাকে প্রভু হিসেবে সাক্ষ্য দেবে? সে বলবে অবশ্যই দেব। এ সুযোগে শয়তান তার বাবা-মায়ের আকৃতি ধরে সন্তানকে বলবে, হে সন্তান! তুমি তার অনুসরণ কর। সে তোমার প্রতিপালক।’
আর সে পৃথিবীতে অবস্থান করবে চল্লিশ দিন। তবে এর কয়েকটি দিন হবে দীর্ঘ। প্রথম দিনটি হবে এক বছরের মতো লম্বা। দ্বিতীয় দিনটি হবে এক মাসের মতো। তৃতীয় দিনটি হবে এক সপ্তাহের মতো। আর বাকি দিনগুলো দুনিয়ার স্বাভাবিক দিনের মতোই হবে। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! যে দিনটি এক বছরের মতো দীর্ঘ হবে, সেদিন কি একদিনের নামাজই যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেন, ‘না; বরং তোমরা অনুমান করে সময় নির্ধারণ করে নামাজ পড়বে।’ 
এমন আরও বহু অলৌকিক ঘটনা ঘটবে দাজ্জালের হাতে। আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও মুসিবত হিসেবে। যাতে সংশয়বাদী ধ্বংস হয় এবং দৃঢ়বিশ্বাসী মুক্তি পায়। নবীজি (সা.) আমাদের দাজ্জালের সব বিবরণ বলে দিয়েছেন। সেগুলো জানা আর দোয়ার মাধ্যমে এর ফেতনা থেকে বাঁচা সম্ভব। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এবং সব মুসলিমকে দাজ্জালের ফেতনা থেকে রক্ষা করেন। 

১৪ শাবান ১৪৪০ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ 
আলী হাসান তৈয়ব


ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি উদযাপনে সুদানিরা
  দ্বীপাঞ্চলের আবদুল কাইয়ুম রাজধানী খার্তুমে সেনা কর্তৃপক্ষ ও বিরোধী জোটের
বিস্তারিত
শ্রীলঙ্কায় ইস্টার হামলার পর কেমন
  মাত্র কয়েক মাস আগেও পশ্চিম শ্রীলঙ্কায় মোহাম্মদ ইলিয়াসের ব্যবসা রমরমা
বিস্তারিত
মালয়েশিয়ায় জাকির নায়েককে নিয়ে বিতর্ক
  ডা. জাকির নায়েক ইস্যুতে মালয়েশিয়ান রাজনীতি বেশ টালমাটাল। নানা কথা
বিস্তারিত
নরেন্দ্র মোদি ও কাশ্মীর ইস্যু
  ১৫ আগস্ট লন্ডনভিত্তিক  আরবি-ইংরেজি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউ অ্যারাবে প্রকাশিত ইমাদ
বিস্তারিত
কাশ্মীরকে দমাতে দিল্লির ৪ দফা নীলনকশা
কড়া নিরাপত্তা বলয়ে ভারত অধিকৃত গোটা জম্মু-কাশ্মীর। কারফিউয়ের সঙ্গে পরিস্থিতি
বিস্তারিত
নারী শিক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে পড়াশোনা করতে, জ্ঞানার্জনে ব্রতী হয়ে আল্লাহর
বিস্তারিত