বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও মহাকবি হাফিজ

বিশ্বকবি বহুদেশ ভ্রমণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ কাহিনি থেকে তার পারস্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা জানা যায়। তার সত্তরতম জন্ম উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য এক সময়ের ইরানের প্রেসিডেন্ট রেজা শাহ পাহলবী তাকে আমন্ত্রণ জানান। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘দেশ থেকে বেরুবার বয়স গেছে এটাই স্থির করে বসে ছিলুম। এমন সময় পারস্যরাজের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ এল। মনে হলো এ নিমন্ত্রণ অস্বীকার করা অকর্তব্য হবে।’ তাই কবি ইরানের আমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য মনস্থ করলেন। কবি ইরানে পৌঁছে বুশেহরের গভর্নর 
মাহমুদ রেজার আতিথ্য গ্রহণ করেন

ফার্সি ভাষার সঙ্গে বাংলার অন্তর্নিহিত যোগসূত্র রয়েছে, যেমন প্রাচীনকালে পারস্যের সঙ্গে ভারতবর্ষের ছিল এক নিবিড় সম্পর্ক। এ দেশে আর্যদের জাতিগোষ্ঠী মূলত পারস্য থেকে এসেছিল আর তারাই সৃষ্টি করেছিল উপনিষদ। উপনিষদ তথা ধর্মের এক ধরনের এই মর্মগাথা রাবিন্দ্রিক কাব্যে সুস্পষ্ট অনুরণিত। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা ও গানের মূল সুর ও বিষয়বস্তু এই উপনিষদভিত্তিক। তাই বলা যেতে পারে অতীত পারস্যের সঙ্গে কবিগুরুর সম্পর্ক অনেক গভীর আর সেই বিশ্বাসের ওপর রবীন্দ্র কাব্যধারা প্রতিষ্ঠিত।
আমরা জানি এক সময়ে মোগল আমলে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফার্সি। সুলতানি আমলে তৎকালীন বাংলাদেশে যে ভাষা প্রচলিত ছিল তার নাম ছিল ফার্সি-বাংলা। শাসক সুলতানরা যেহেতু তুরস্ক থেকে এদেশে আগমন করেন এবং বহুদিন এদেশ শাসন করেন, তাই তাদের পরিবারের ভাষা ছিল তুর্কি, রাষ্ট্রীয় ভাষা ছিল ফার্সি আর জনগণের ভাষা ছিলো ‘ফার্সি-বাংলা’। তাই ফার্সির সঙ্গে বাংলা ভাষারও গভীর সম্পর্ক। জাতীয় কবি নজরুলের কবিতায় ফার্সি ভাষার প্রচুর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
প্রকৃতপক্ষে ফার্সি ভাষা একটি জাদুকরী ভাষা, এর রয়েছে এক মোহিনী শক্তি। আঠার এবং উনিশ শতকে বাংলাভাষা ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও ফার্সি ভাষার তখন প্রভূত চর্চা ছিল। অনেক অভিজাত পরিবারের ব্যক্তিদের মধ্যে ফার্সি জানার আগ্রহ ছিল যথেষ্ট পরিমাণে। সেই সূত্রে রবীন্দ্র পরিবারেও ছিল ফার্সির চর্চা। রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ফার্সি কবি শামসউদ্দিন হাফিজের অত্যন্ত ভক্ত। তিনি দেওয়ানে হাফিজ থেকে অনর্গলভাবে কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন। হাফিজের মূল নাম শামসউদ্দিন। ‘হাফিজ’ বলা হয় যেহেতু তিনি ছিলেন কোরআনে হাফেজ। বাংলায় ‘শামস’ অর্থ সূর্য অর্থাৎ রবি। একথা বলা ভুল নাও হতে পারে যে, ছেলের নাম রাখার সময় দেবেন্দ্রনাথের অন্তস্তলে তার প্রিয় কবির নামের ‘শামস’ শব্দটি হয়তো উদিত হয়েছিল। শব্দ অনুযায়ী শব্দের সৌন্দর্য, শক্তি ও প্রভাব রয়েছে, যা মানসিক অবস্থার ওপর ক্রিয়াশীল। তাই মানব চরিত্রের ওপর নামের প্রভাব পড়ে। সে জন্য সুন্দর অর্থের নাম রাখা উচিত। সত্য, একজন মানুষের কাছে তার যত কিছু প্রিয় বস্তু আছে, এর মধ্যে নামই তার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। যাহোক, মরমি দর্শনের দিক থেকে হাফিজ ও রবীন্দ্রনাথের কাব্যধারার মধ্যে যথেষ্ট মিল রয়েছে। 
বিশ্বকবি বহুদেশ ভ্রমণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ কাহিনী থেকে তার পারস্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা জানা যায়। তার সত্তরতম জন্ম উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য এক সময়ের ইরানের প্রেসিডেন্ট রেজা শাহ পাহলবী তাকে আমন্ত্রণ জানান। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘দেশ থেকে বেরুবার বয়স গেছে এটাই স্থির করে বসে ছিলুম। এমন সময় পারস্যরাজের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ এল। মনে হলো এ নিমন্ত্রণ অস্বীকার করা অকর্তব্য হবে।’ তাই কবি ইরানের আমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য মনস্থ করলেন। কবি ইরানে পৌঁছে বুশেহরের গভর্নর মাহমুদ রেজার আতিথ্য গ্রহণ করেন। সেখানে কবি যেমন পেলেন যতœ তেমনি পেলেন সম্মান। তাই কবি লেখেন, ‘পারসিকদের কাছে আমার পরিচয়ের আরো-একটু বিশিষ্টতা আছে। আমি ইন্দো-এরিয়ান। এদের সঙ্গে আমার রক্তের সম্বন্ধ। তার পরে এখানে একটি জনশ্রুতি রটেছে যে, পারসিক মরমিরা কবিদের রচনার সঙ্গে আমার লেখার আছে সাজাত্য। এরা যে অন্য সমাজের, অন্য ধর্মসম্প্রদায়ের, অন্য সমাজগোষ্ঠীর, সেটা আমাকে মনে করিয়ে দেবার মতো কোনো উপলক্ষই আমার গোচর হয় নি।’ 
ইরানের সিরাজ নগরীতে কবি হাফিজের মাজার অবস্থিত। কবিগুরু এক অপরাহ্ণে সিরাজের গভর্নরের সঙ্গে হাফিজের মাজার পরিদর্শনে যান; যে কবির কাব্যচর্চা হতো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে, তিনি তার বাবার সেই প্রিয় কবির মাজার দর্শনে আজ উপস্থিত। কবিকে মাজারের ভেতরে নিয়ে গেলে কবি তার মনোজগতে এক পরিবর্তন অনুভব করেন, যে পরিবর্তন ছিল এক নতুন অনুভূতির উপলব্ধি। তাই কবি লেখেন, ‘মনে হলো আমরা দুজনে একই পাঠশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। নিশ্চিত মনে হলো আজ, কত-শত বৎসর পরে জীবনমৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফেজের চিরকালের জানা লোক।’ এরপর ইরানে কবির জন্মদিনের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সময়টি ছিল ১৯৩২ সালের ৬ মে। কবি তেহরানে বসে তার জন্ম দিনের একটি কবিতাও রচনা করেন:
ইরান, তোমার যত বুলবুল,
তোমার কাননে আছে যত ফুল
বিদেশি কবির জন্মদিনেরে মানি
শুনালো তাহারে অভিনন্দনবাণী।
ইরান, তোমার বীর সন্তান
প্রণয়-অর্ঘ্য করিয়াছে দান
আজি এ বিদেশি কবির জন্মদিনে,
আপনার বলি নিয়েছে তাহারে চিনে।
ইরান, তোমার সম্মানমালে
নবগৌরব বহি নিজ ভালে
সার্থক হল কবির জন্মদিন।
চিরকাল তারি স্বীকার করিয়া ঋণ
তোমার ললাটে পরানু এ মোর শোকÑ
ইরানের জয় হোক।          
কবিগুরুর এই কবিতাই প্রমাণ করে যে, কবির সঙ্গে ইরানের কতো গভীর সম্পর্ক এবং এই গজল গোলাপের দেশে তিনি প্রভূত সম্মানিত হয়েছিলেন। এই ভ্রমণের পর থেকে ইরানে রবীন্দ্রচর্চা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা যথা ‘গীতাঞ্জলি’ ও ‘চিত্রা’; উপন্যাস ‘নৌকাডুবি’ এবং নাটক ‘রাজা ও রাণী’ এ ছাড়া কবির ‘ডাকঘর’ ও আরও কবিতাবলি  ফার্সি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। 
প্রাচীন ও মধ্যযুগে এশিয়া মহাদেশে জ্ঞান বিজ্ঞান ও দর্শন শাস্ত্রের এক উল্লেখযোগ্য পুনর্জাগরণ ঘটে। এ সময়কালে পারস্যের কবিরা ফেরদউসী, শেখ সাদী, রুদকী, জালালউদ্দিন রুমী, নেজামী, ওমর খৈয়াম ও হাফিজের কালজয়ী রচনাবলি সারা বিশ্বকে মোহিত করে ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশে কবি-সাহিত্যিকদের ওপর এর যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছাড়াও আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক ফার্সি সাহিত্য দ্বারা যথেষ্ট অনুপ্রাণিত হন। প্রকৃতপক্ষে পারস্য দর্শনের যে মূল অভিজ্ঞতা তাহলো হৃদয়বাদী ও ভাববাদী চেতনা। মহাকবি হাফিজের এই ভাববাদী চেতনা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কাব্যস্পৃহাকে উদ্বেলিত করে তোলে। মরমি ভাবধারার এক প্রবল আকর্ষণে ও সুন্দরের জয়গানে নিরাকার অন্তর্যামীর প্রতি উভয় কবির বহু কবিতাই নিবেদিত। একদিকে হাফিজের গজলগানে সুফিবাদের প্রেমতত্ত্ব অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে উপনিষদের সুর প্রস্ফুটিত। মহান সৃষ্টিকর্তা ও জীবন দেবতার প্রতি উভয়েরই প্রাণের আকুতিভরা প্রেমের ভাব ও ভাষা উৎসর্গীকৃত। বাক্যালঙ্কার ও কাব্যালঙ্কার উভয়ের লেখনীতে যথেষ্ট পরিদৃষ্ট হয়। উল্লেখ্য, কবিগুরু তার ‘দুইপাখি’ কবিতাটির বিষয়বস্তু ও ভাবধারা মওলানা রুমির মসনবি শরিফের একটি গল্প থেকে গ্রহণ করেছেন।   
মূলত গজলের জন্যই হাফিজের নামডাক আর এই গজলের বিষয় প্রেম ও মোদিরা। তবে হাফিজের রচনাশৈলী রবীন্দ্রনাথ থেকে একটু আলাদা, যা বলা যেতে পারে হাফিজের অনুভূতি প্রকাশের ধরন তা তার একান্ত নিজস্ব, যা চিরাচরিত ফার্সি কাব্য ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হাফিজ তার প্রেয়সীকে সাকার রূপে তুলে ধরেছেন আর রবীন্দ্রনাথ তার প্রভু ত্রাণকর্তাকে নিরাকার রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন। হাফিজ বলেন:
“রূপের রাজ্যে তুমি শাহান শাহ
এ জগতে জানি তুমিই পরম;
তোমার মনে এক কোণে ঠাঁই
প্রার্থনা করে এ দীন অধম।”
অনুবাদ : সুভাস মুখোপাধ্যায়
ওপরের স্তবকে হাফিজ তার প্রিয়ার রূপের স্তুতিগান করেছেন এবং নিজেকে অধম ভেবে তার মনের কোণে একটু স্থানের জন্য প্রার্থনা করেছেন। তেমনি রবীন্দ্রনাথ তার ‘শেষ নমস্কার’ কবিতায় বলেন :
“একটি নমস্কারে, প্রভু একটি নমস্কারে
সকল দেহ লুটিয়ে পড়–ক তোমার এ সংসারে।
ঘনশ্রাবণ মেঘের মতো রসের ভারে নম্র নত
একটি নমস্কারে, প্রভু, একটি নমস্কারে
সমস্ত মন পড়িয়া থাক্ তব ভবন-দ্বারে ॥                   
হাফিজ অত্যন্ত ব্যাকুল চিত্তে তার প্রিয়াকে খুঁজে ফিরেছেন। প্রিয়ার সাক্ষাৎ না পাওয়া পর্যন্ত তার অন্বেষণ বন্ধ করবেন না যদিও জীবন শেষ হয়ে যায়। তাই কবি বলেন:
“সন্ধানে থামবো না তার, যাবৎ না পাই তার মিলন!
হয় পাবো সেই জীবননাথ, নয় দেহ ছাড়বে এ জীবন।”
অনুবাদ : ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
রবীন্দ্রনাথ তেমনি রূপ সাগরে ডুব দিয়ে এক রূপহীন রতেœর অন্বেষণ করতে থাকেন। তার এই রূপহীন রতœ হয় সব রূপের সমাহারে সমৃদ্ধ অথবা তার এই রতœ নিরাকার এবং এর অস্তিত্ব নীরবে বিরাজমান। তাই কবি বলেন: 
“নীরব যিনি তাহার পায়ে নীরব বীণা দিব ধরি।
রূপ-সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ-রতন আশা করি ॥”        
এ ভাবে দেখা যায় হাফিজ সিরাজী ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গজল গানের মধ্যে মূল একই চেতনায় অভিন্ন ভাবধারার বিস্তার রয়েছে এবং উভয় কবি প্রভু ও প্রিয়ার অন্বেষণে আত্মতৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত হৃদয়ের প্রচেষ্টা চলমান রেখেছেন। উভয়েই যুক্তির পরিবর্তে ধরেছেন প্রেমের পথ, সাধনার পথ এবং এখানেই তাদের মহৎ কাব্য সৃষ্টির চরম সার্থকতা।


দীপা
পহেলা ফাল্গুন। বইমেলায় শাড়ি পরিহিতা সুশ্রী একজন লেখিকা ৩০১ নম্বর
বিস্তারিত
মেঘ শুধু মেঘ নয়
মেঘ শুধু মেঘ নয়; খুঁজেছো কি মেঘে তুমি কিছু  শাদা
বিস্তারিত
আলো অন্ধকারে যাই
ভ্যান থেকে যখন নামল সে, বহু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা
বিস্তারিত
চেতনা বিকাতে পারি
  যিনি চেতনাবাজ হয়ে বেঁচে আছেন এক মেরদ-ী শিক্ষকের কথা বলি যিনি
বিস্তারিত
টুপটুপ রক্ত ঝরছে
কপালে লাল টিপ সেঁটে দৌড়ে ছুটছে লাল ষাঁড় শিং ছুঁয়ে
বিস্তারিত
মায়ের শরীরের একাংশ আমি
আমার অস্তিত্বের অঙ্কুরোদগম হয়েছিল এক মায়াবী নারীর গূঢ় কর্ষিত জঠরে
বিস্তারিত