মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

সিজদা করুন এবং আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করুন

রমজান মাসে কল্যাণের পথে হে প্রতিযোগিতাকারী! সিজদা ও আনুগত্য দিয়ে নিজের রবের দিকে পদচারণা করতে দ্রুত ধাবিত হও। আল্লাহর সামনে সিজদা করার নেয়ামত থেকে কোনো বান্দা বঞ্চিত হলে সে হবে চরম বঞ্চনার অধিকারী

কোরআনের সবচেয়ে প্রথমে অবতীর্ণ সূরার সর্বশেষ দুটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘সিজদা কর এবং কাছে আস।’ (সূরা আলাক : ১৯)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সিজদারত অবস্থাতেই বান্দা নিজের রবের সবচেয়ে বেশি কাছে এসে থাকে। তাই তোমরা বেশি বেশি সিজদা কর।’ 
সিজদা বান্দার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত ও অবস্থা। সিজদায় আছে পরাক্রমশালী দয়ালু আল্লাহর প্রতি বিনত হওয়ার আনন্দ। আছে পরম করুণাময় দয়াময় আল্লাহর আনুগত্যের সৌন্দর্য। সিজদার মুহূর্তগুলো এমন বরকতময় ও মহত্ত্বপূর্ণ, যার কোনো সীমা নেই। সিজদায় রয়েছে অনির্বচনীয় স্বাদ ও তৃপ্তি। তাতে আছে এমন এক প্রফুল্লতা যা কোনো কলম ধারণ করতে পারে না, যা মুসলিমকে জমিনের সংকীর্ণ গ-ি থেকে আসমানের প্রশস্ত পরিসরের উচ্চতায় নিয়ে যায়। আয়েশা (রা.) নবী করিম (সা.) এর নামাজে দাঁড়ানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘তিনি সিজদা থেকে নিজের মাথা ওঠানোর আগে এ পরিমাণ সময় সিজদারত থাকতেন যতটুকু সময়ে তোমরা পঞ্চাশটি আয়াত পাঠ করতে পার।’
সিজদাকারীর চেহারায় সিজদা ঈমানের আলো যোগ করে, তার হৃদয়ে প্রশান্তির রেখাপাত ঘটায়। তার মাঝে ঢেলে দেয় পরম স্থিরতা। তাকে পরিয়ে দেয় গাম্ভীর্যের মহিমা। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের চেহারায় থাকবে সিজদার চিহ্ন।’ (সূরা ফাতহ : ২৯)।  
সিজদার মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে আল্লাহ তার নিকটবর্তী হন, তাঁকে যে ডাকে তিনি তার ডাকে সাড়া দেন, তাঁর কাছে যে আশা করে তিনি তা শোনেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে সে তার রবের কাছে পায় অশেষ প্রতিদান ও সুউচ্চ মর্যাদা। আল্লাহ বলেন, ‘যদি সে নৈকট্যপ্রাপ্তদের একজন হয় তবে তার জন্য রয়েছে আরাম, উত্তম জীবনোপকরণ ও সুখকর জান্নাত।’ (সূরা ওয়াকিআ : ৮৮-৮৯)। তাই সিজদা করুন ও নৈকট্য অর্জন করুন। প্রত্যেক সিজদায় আপনার জন্য রয়েছে মর্যাদার উন্নতি, অবস্থানের নৈকট্য ও স্তরের অগ্রগতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো বান্দা আল্লাহর জন্য একটি সিজদা করলে আল্লাহ তার জন্য সেটার কারণে একটি পুণ্য লেখেন, তার দ্বারা একটি পাপ মোচন করেন ও তার একটি মর্যাদা উন্নত করেন। তাই তোমরা বেশি বেশি সিজদা কর।’ 
সিজদা করুন আর আল্লাহর কাছে চলে আসুন। কারণ, আল্লাহর দান কখনও শেষ হয় না। যে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে তিনি তাকে নবী-রাসুল, সত্যবাদী, শহীদ, সৎলোকদের অবস্থান ও স্তরে উন্নীত করেন। সিজদা করুন ও আল্লাহর নিকটবর্তী হোন। কেননা সিজদায় ঈমান ও বিশ্বাসের চিহ্ন পরিস্ফুটিত হয়। আত্মসমর্পণ ও প্রত্যয়ের প্রতীক প্রকাশিত হয়। সিজদায় যান ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করুন। কেননা সিজদাই এমন ইবাদত যাতে গোটা জগৎ সমবেত হয়। আপনার রব ও আপনার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে করতে সিজদা করুন। আপনার মাওলার কাছে মিনতি করুন। তাহলে মনে হবে আপনি দুনিয়ার কোনো জান্নাতে আছেন।
বিনত লোকদের মতো সিজদা করুন যখন কোরআনের আয়াতে আয়াতে আপনার দুটি কান অলঙ্কৃত হবে এবং তার স্পষ্ট প্রমাণগুলো জয় করবে আপনার হৃদয়ের ভালোবাসা। আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি খ- খ-ভাবে যাতে আপনি তা মানুষের কাছে ক্রমে ক্রমে পাঠ করেন এবং আমি তা ক্রমশ অবতীর্ণ করেছি। বলুন, তোমরা কোরআনে বিশ্বাস কর, যাদের এর আগে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তাদের কাছে যখন তা পাঠ করা হয় তখনই তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।’ (সূরা ইসরা : ১০৬-১০৭)।
যখনই আপনার আমলের শিথিলতার কথা মনে পড়বে, আপনার গোনাহ ও উদাসীনতায় আপনি ব্যথা পাবেন এবং তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার দুয়ারে করাঘাত করতে থাকবেন, তখনই আপনি সিজদায় চলে যান এবং আল্লাহর কাছাকাছি চলে আসুন। নবী দাউদ (আ.) এর বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘দাউদ বুঝতে পারল, আমি তাকে পরীক্ষা করলাম, অতঃপর সে তার প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং নত হয়ে লুটিয়ে পড়ল ও তাঁর অভিমুখী হলো। অতঃপর আমি তা ক্ষমা করলাম। আমার কাছে তার জন্য রয়েছে নৈকট্যের মর্যাদা ও শুভ পরিণাম।’ (সূরা সোয়াদ : ২৪-২৫)।
আপনার ওপর বিভিন্ন সংকট ও আপদ প্রবলভাবে ধেয়ে এলে, নানা কঠিন পরিস্থিতি আপনাকে অবরুদ্ধ করে রাখলে এবং দুর্বিপাক-দুর্গতির সম্মুখীন হলে আপনি সিজদায় পড়ে যান এবং নৈকট্য লাভ করুন। কেননা সিজদা হবে সব দুঃশ্চিন্তার উপশমকারী। সিজদা দয়াময় আল্লাহর ক্রোধ নিভিয়ে দেয়। তাঁর সন্তোষ অবধারিত করে। সহিহ হাদিসে নবী করিম (সা.) থেকে বর্ণিত, ‘যখন মানুষ কেয়ামতের দিবসের চত্বরে দাঁড়াবে, সুপারিশের জন্য ছুটবে, নবীদের কাছে সুপারিশ করতে বলবে এবং পরিশেষে রাসলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মদ, আপনি কি দেখছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না আমরা কি বিপদে আক্রান্ত হয়েছি? তখন তিনি বলবেন, আমি এর জন্যই, তখন তিনি ছুটে চলবেন, আরশের নিচে সিজদায় পড়ে যাবেন। তিনি বলেন, তখন আমার রবের দরবারে আমি অনুমতি চাইব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমি তখন  সামনে দাঁড়াব। তাঁর এমন এমন প্রশংসা করব যা এখন করতে আমি সক্ষম, আল্লাহ সেগুলো আমার মাঝে ঢেলে দেবেন। তারপর আমি আবার সিজদায় লুটিয়ে পড়ব। তখন তিনি আমাকে বলবেন, হে মুহাম্মদ, তোমার মাথা তোল, তুমি বলতে থাক, তা শোনা হবে। তুমি চাও, তা তোমাকে দেওয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’
যখন আপনার ওপর কল্যাণের ফল্গুধারা ও দয়াময় আল্লাহর দানের প্লাবন বয়ে যাবে তখন শোকর আদায়ে আল্লাহর জন্য সিজদা দিন। নবী করিম (সা.) একদা সিজদা দিলেন, দীর্ঘ সিজদা দিয়ে নিজের মাথা তুললেন এবং বললেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমার কাছে এসে আমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন। তখন আমি আল্লাহর শোকর করে সিজদা দিলাম।’
রমজানের রাতগুলোতে সিজদার স্বাদ ও ফজিলতের সুবাস অর্জন করতে মুসলিম ব্যক্তির উদ্যোগ ও তৎপরতা কতই না সুন্দর বিষয়! আল্লাহ বলেন, ‘রাতের প্রহরে তাঁর জন্য সিজদা দাও এবং দীর্ঘ রাত ধরে তাঁর তসবি ও পবিত্রতা বর্ণনা কর।’ (সূরা ইনসান : ২৬)।
রমজান মাসে কল্যাণের পথে হে প্রতিযোগিতাকারী! সিজদা ও আনুগত্য দিয়ে নিজের রবের দিকে পদচারণা করতে দ্রুত ধাবিত হও। আল্লাহর সামনে সিজদা করার নেয়ামত থেকে কোনো বান্দা বঞ্চিত হলে সে হবে চরম বঞ্চনার অধিকারী। দুনিয়ায় যে ব্যক্তি আল্লাহকে সিজদা না করে অহংকার করবে আখেরাতে তাকে সিজদা করতে ডাকা হলে সে কিছুতেই সিজদা দিতে সক্ষম হবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার রব তাঁর পায়ের পর্দা উন্মোচন করবেন, তখন সব মোমিন পুরুষ ও নারী তাঁকে সিজদা করবে। যে দুনিয়ায় খ্যাতি ও লোক দেখাতে সিজদা করত সে পেছনে পড়ে থাকবে, সে সিজদা করতে গেলে তার পিঠ শক্ত হয়ে ফিরে আসবে।’ 

১২ রমজান ১৪৪০ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


দোয়া কবুলের সেরা ১০ সময়
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দার দোয়া সব সময় কবুল করে থাকেন।
বিস্তারিত
মিডিয়ার গুরুত্ব আমাদের দায়িত্ব
ইসলামের প্রচার ও তালিমের জন্য নবী করিম  (সা.) শুরু থেকে
বিস্তারিত
দাওয়াত প্রচারে মিডিয়ার ব্যবহার
মহান আল্লাহ তায়ালা মানব জাতি সৃষ্টি করে তাদের হেদায়েতের জন্য
বিস্তারিত
যখন আঁধার নামে হৃদয়জুড়ে
মানব হৃদয় একটি স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ক্যানভাসের মতো। মানুষ তার
বিস্তারিত
বিসমিল্লাহ আমলেই অফুরন্ত নেয়ামত
বিসমিল্লাহ ছোট একটি শব্দ। বিসমিল্লাহ আমলে অসংখ্য ফজিলত পাওয়া যায়।
বিস্তারিত
ইসলামে মালিকানার স্বাধীনতা
মালিকানা যদি অবৈধ পন্থায় বা উপায়ে অর্জিত  হয়, তাহলে ইসলাম তার
বিস্তারিত