পায়ে লিখেই জীবন গড়ার স্বপ্ন

মানুষ যেকোনও লেখালেখির কাজ সাধারণত হাত দিয়েই করে থাকে। হতে পারে সেটা ডান হাত কিংবা বাম হাত। কিন্তু এই লেখার কাজটি যদি কেউ পা দিয়ে করে তাহলে সেটা প্রায় অসম্ভব তো বটেই, বিরলও। আর এমন কঠিন কাজটিই বহুদিন ধরে অতি সূক্ষ্ম ও সুনিপুনভাবে করে যাচ্ছে এক কিশোর শিক্ষার্থী। তার পা দিয়ে লিখাও যেকারও হাতের লিখার চেয়ে সুন্দর। অচল হাত-পায়ের কাছে হার না মেনে পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে অসম্ভব দক্ষতায় পা দিয়ে লিখেই জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন বুনছে কুড়িগ্রামের রৌমারি উপজেলার শারীরিক প্রতিবন্ধী মেধাবী শিক্ষার্থী দুখু মিয়া। 

নাম দুখু মিয়া। বাস্তব জীবনেও খুবই দুঃখের সঙ্গেই তার দিনমান। কারণ জন্মগতভাবেই সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। সঠিকভাবে চলাফেরা না করতে পারলেও চলার পথে সকল  প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়েছে সে। দুখু মিয়ার বয়স আনুমানিক ১০-১২ হবে, চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। অভাবের সংসারে দুখু মিয়ার পড়াশোনার সামান্য খরচ যোগাতেও হিমশিম খাচ্ছে তার পরিবার। 

আর মাত্র ক’দিন বাদেই ঈদের উৎসব আর খুশির আনন্দে ভাসবে গোটা দেশ। কিন্তু দুখু মিয়ার জীবনে ঈদ মানে দু-পয়সা রোজগারের বাড়তি হাতড়ে চলা। আর তাইতো এবার ঈদকে সামনে রেখে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছে সে। উদ্দেশ্য পা দিয়ে লেখালেখি করে মানুষকে বিনোদন দেয়া এবং কিছু পয়সা রোজগার করে দেশে ফিরে ঈদ ঈদ উল্লাসে সামিল হওয়া। পরিবারের মুখে এক ফালি হাসি এনে দেয়া। 

দুখু মিয়ার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ই চোখে পড়ে, প্রতিবন্ধী এই কিশোরের পা দিয়ে চমৎকার লেখা দেখে অনেকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছেন। কেউ আবার এই মুহূর্তটাকে মুঠোফোনে ধারণ করছেন। কেউ আবার তার লেখার শৈল্পিকতা দেখে খুশি হয়ে  দিয়ে যাচ্ছেন কিছু টাকা। স্বপ্নকে জয় করতে দৃঢ় মনোবল নিয়ে শত বাধা উপেক্ষা করে অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে এভাবেই কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে এ পর্যন্ত এগিয়ে এসেছে এই দুখু মিয়া। 

গত রবিবার বিকেলে রাজধানী সাইন্সল্যাব এলাকায় ফুটপাতের ধারে বসে পা দিয়ে লেখার এই জাদু দেখাচ্ছিল মিয়া। এসময় কথা হয় তার সঙ্গে। সে জানায়, পাঁচ ভাইবোনের সংসারে খুবই অভাবে তাদের দিনযাপন। তাই ঈদটা ভালভাবে কাটানোর জন্য মাকে নিয়ে ঢাকা এসেছেন কিছু টাকা রোজগার করতে। দুখু স্বপ্ন দেখছেন পা দিয়ে লিখেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের জন্য কিছু করবেন। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে হতে চান শিক্ষক। ঢাকায় এসে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে তার, আয় রোজগারে বাধা সৃষ্টি করছে পুলিশ। যেখানেই বসে তার পায়ের কারুকার্য দেখিয়ে জনসাধারণকে আকৃষ্ট করে কিছু টাকা রোজগার করতে সেখানেই বাধা সৃষ্টি করে পুলিশ। দুখু যেন তাতেও ভেঙে পড়ে না। বরং আরও দৃঢ় হয় তার মনোবল। 

দুখু বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। আমার অনেক স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দেশের মানুষের কাছে আমি সাহায্য চাই। সবাই সাহায্য করলেই আমি অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবো।’ 

দুখুর মা হালিমা বেগম বলেন, ‘জন্ম দেখেই ওর দুটো পা এবং হাত প্রতিবন্ধী। আর দশটা ছেলের মতো সে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে না। নিজে চলতে পারে না। আমিই ওকে বয়ে নিয়ে বেড়াই। ওকে পড়াশোনা করতে আমি নিষেধ করেছি। কিন্তু ও সেটা শোনেনি। ও প্রতিবন্ধী বলেই হার মানতে নারাজ। স্বপ্ন পূরণ করতে ওর পরিশ্রম অব্যাহত আছে, তাই এখন আর ওকে বাধা দিই না বরং আরো সাহায্য করি।’ 

তবে সহজ জীবনেও নানা বাধাবিপত্তি আছে দুখু মিয়াদের মতো স্বপ্নবাজ মানুষদের। মা হালিমা বলেন, ‘সকাল থেকে এখানে পুলিশ এসে কয়েকবার আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। তারপরেও এখানে এসে বসেছি। অনেক অনুরোধ করেছি পুলিশ মামারে যে আমরা গরিব মানুষ আমগো একটু শান্তি মত বসে রোজগার করতে দিন। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনেনি।’

দুখু মিয়ার পায়ের লিখার জাদু নজরে পড়েছে পথচারী হাসান আবিদের। তিনি বলেন, ‘ছেলেটি খুবই সুন্দরভাবে পা দিয়ে লিখে যাচ্ছে। আর ওর লেখাটা এতো ভাল যে একজন শিক্ষত মানুষ হাত দিয়েও হয়তো এত সুন্দরভাবে গুটিগুটি হরফে লিখতে পারবে না। আমি গত দুদিন যাবত অফিস থেকে ফেরার পথে দাঁড়িয়ে মনোযোগ সহকারে ওর লেখা দেখি। ওর ইচ্ছাশক্তি আর মনোবল দেখে আমার খুবই আশ্চর্য লাগে। সরকারের উচিত এসব প্রতিভাবানদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো। তবেই তো এসব দুখু মিয়াদের স্বপ্ন একদিন না একদিন বাস্তবে রূপায়িত হবে। অন্যথায় দুখু মিয়াদের কাছে ঋণীই থেকে যাবে রাষ্ট্র।’

দুখুর মায়ের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সাইন্সল্যাব মোড়ে কর্তব্যরত পুলিশের এসআর রাকিবুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘দেখুন, সামনে ঈদ। লোকজনের ব্যস্ততা একটু বেশি। আর ঈদকে কেন্দ্র করে ঢাকায় অনেক মানুষ এসেছে। তাই মানুষের চাপও একটু বেশি। ফুটপাত বসে তারা সাহায্য চাচ্ছে এতে মানুষের চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে বলেই তাদের এখান থেকে উঠে দূরে গিয়ে বসতে বলেছি। এতে আমার কোনও দোষ হয়নি। আমার কর্তব্য যেটা সেটা আমি পালন করেছি।’ 

ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারের কোনও কর্তব্য পালনে বাধা হওয়ার ইচ্ছে কিংবা শক্তি কোনোটাই তো দুখু মিয়াদের নেই। এরা তো শুধু স্বপ্নটাকে ফেরী করে পাড়ি দিতে চায় জীবন ঝড়ের গহীন সাগর।


বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড় থাকে
বিরিয়ানি পছন্দ করেন না এমন লোক বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া কষ্ট
বিস্তারিত
ফের প্রকৃতির বুকে বিলুপ্ত হয়ে
প্রায় ১ লক্ষ ৩৬ হাজার বছর আগে সমুদ্রের তলদেশে নিশ্চিহ্ন
বিস্তারিত
সবচেয়ে বেশি হাসে যে দেশের
‘কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি হাসে?’ এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে
বিস্তারিত
ভালোবেসে পালিয়ে বেড়ানো যুগলেরা
ভারতে বেশিরভাগ পরিবারই নিজেদের ধর্ম ও জাত বা বর্ণের মধ্যেই
বিস্তারিত
পৃথিবীর যে ৯টি ছবি আজও
বলা হয়ে থাকে, একটি ছবিতে যা প্রকাশ করা যায়, তা
বিস্তারিত
পোল্ট্রি খামারে স্বপ্ন পূরণ বেকার
মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানে পোল্ট্রি খামার করে অনেক শিক্ষিত বেকার যুবকরা
বিস্তারিত