মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

চাকচিক্য নয়, চাই বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ

কোরআন মজিদের নির্দেশ হলো, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসুলের আনুগত্য কর, আর তোমাদের মধ্যকার উলুল আমরের আনুগত্য কর।’ মওলানা রুমির জীবন দর্শনে সেই উলুল আমরের ভূমিকায় রয়েছেন স্বচ্ছ অন্তঃকরণের অধিকারী ওলিআল্লাহ। মওলানা বলতে চান, আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের আনুসরণের মধ্য দিয়ে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য উদ্ভাসিত হবে

সুলতান মুহাম্মদ খারেযমশাহ সাবযাওয়ারে অভিযান পরিচালনা করেন। তার সৈন্যবাহিনী কঠিন অবরোধ সৃষ্টি করে সাবযাওয়ারের বাসিন্দাদের ওপর। ইরানের সাবযাওয়ার অঞ্চল ছিল রাফেজি অধুষ্যিত। কঠিন অবরোধের কবলে রাফেজিরা অনুনয়-বিনয় করে সুলতানের কাছে জানমালের নিরাপত্তার আর্জি জানায়। 
রাফেজি রফজ ধাতু থেকে উদ্ভূত। রফজ মানে ত্যাগ করা, বর্জন করা। যারা যুদ্ধ ও কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের নেতাকে নিঃসঙ্গ ত্যাগ করে তাদের রাফেজি বলা হয়। রাফেজিরা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ও হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর খেলাফত অস্বীকার করে। এজন্য তারা ইতিহাসে রাফেজি নামে চিহ্নিত।
রাফেজিরা সুলতানের কাছে নতমস্তক হয়ে প্রাণ ভিক্ষা চায়। ধন-রতœ, স্বর্ণরৌপ্য যা ছিল সবাই তার খেদমতে সমর্পণ করে। সবার একটিমাত্র আর্জি, আপনি আমাদের প্রাণভিক্ষা দিন। বিনিময়ে স্বর্ণরৌপ্য যা আছে সব নিন। প্রত্যেক মৌসুমে যত চান খাজনা দেব, আপনার রাজদরবারে দিয়ে আসব। তবু গণহত্যার হাত থেকে আমাদের প্রাণ বাঁচান। আপনার বদান্যতার কাছে আমাদের এ আবদার, ফেরত দেবেন না, হে মহীয়ান। 
সুলতান মুহাম্মদ খারেযমশাহ বললেন, তোমরা যতই বিনয় কর, আমার পাকড়াও থেকে তোমাদের রক্ষা নেই। তবে একটি শর্তে আমি তোমাদের নিরাপত্তা দিতে পারি। তাহলো তোমাদের এ এলাকা থেকে এমন কোনো লোক আমার সামনে হাজির করতে হবে, যার নাম আবু বকর। কিন্তু রাফেজিদের সমাজে আবু বকর নামের লোক কীভাবে পাওয়া যাবে। সুলতান ঘোষণা দিলেন, অন্যথায় আমি তোমাদের কচুকাটা করে ছাড়ব। তারপর বিরাট অঙ্কের খাজনার বোঝা বহন করতে হবে তোমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে। কাকুতি-মিনতির ভণিতা দেখিয়ে লাভ হবে না আমার কাছে। এরই মধ্যে চারদিক থেকে লোকেরা স্বর্ণরৌপ্যের উপহার নিয়ে হাজির হলো সুলতানের দরবারে। তাদের সবার একই কথা, জাহাঁপনা! আমাদের যত ধনসম্পদ আপনার জন্য উৎসর্গিত। কিন্তু আবু বকর নামের লোক হাজির করার কঠিন হুকুম থেকে মাফ চাই। আমাদের মাঝে আবু বকর নামে কোনো লোক থাকা তো পুকুরের তলায় শুষ্ক মাটি পাওয়ার মতো অসম্ভব। 
সুলতান সাবযাওয়ারবাসীর স্বর্ণরৌপ্যের স্তূপের দিকে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করলেন না। বললেন, তোমরা আমাকে বাচ্চা পেয়েছ নাকি? হাতে খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে চাও। আমার একটিই হুকুম, হয় তোমাদের এলাকার কোনো আবু বকরকে হাজির করবে, নতুবা আমার খড়গের সামনে গর্দান প্রস্তুত রাখবে। অগত্যা সাবযাওয়ারবাসী দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল আবু বকর নামে মানুষের খোঁজে। চেনা-অচেনা লোক ধরে নাম জিজ্ঞেস করে শহর-গ্রামে। দেখা গেল, দূরে মুসাফিরদের সরাইখানার পাশে বিরানভূমিতে জীর্ণশীর্ণ এক লোক পড়ে আছে। কাছে গিয়ে নাম জানতে চাইলে বলল, আবু বকর। সবাই চমকে উঠল নামটা শুনে। আবু বকর বলল, এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছি। কেউ খোঁজ নেয় না। অনাদর-অবহেলায় আমার এ দুরবস্থা। আবু বকরকে নিয়ে উৎসবের আমেজে হইচই তখন চারদিকে। তাকে জানানো হলো, স্বয়ং সুলতান আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। চলুন, আপনি গেলে নিজে খেলাত (উত্তরীয়) পাবেন আর আমরা শহরবাসী গণহত্যার হাত থেকে রেহাই পাব। 
আবু বকর বলল। কী বল তোমরা? কীভাবে আমি যাব। হাঁটার শক্তিই যদি থাকত, তাহলে তো এই দুশমন এলাকা অনেক আগেই ছেড়ে যেতাম। আমি তো এখন চলৎশক্তিহীন। কালবিলম্ব না করে লোকেরা নিয়ে এলো লাশ বহনের খাটিয়া। আবু বকরকে খাটিয়ায় নিয়ে ছুটে চলল সুলতানের দরবারে। 
মওলানা রুমি এখন বলেন, আমি যে সাবযাওয়ারের কথা বলেছি, তা তো এ দুনিয়া। এখানে যারা আল্লাহর পুরুষ, আল্লাহওয়ালা তাদের অবস্থা করুণ। তারা অজ্ঞাত পরিচয়। খারাযেমশাহের কথা বলেছি, তিনি তো মহামহিম আল্লাহর প্রতীকী নাম। তিনি হতভাগা মানুষের কাছ থেকে ধনসম্পদ চান না। মানুষের কাছে মানুষের দিলটাই চান। আবু বকর সেই দিলের প্রতীক।
সবযাওয়ার আস্ত ইন জাহান ও মর্দে হক
আন্দরীন জা’ যায়ে’ আস্ত ও মুমতাহাক
সাবযাওয়ার হলো এই জগৎ আর আল্লাহওয়ালারা
এই জগতে অসহায় মর্যাদাহীন অজ্ঞাত পরিচয় তারা।
হাস্ত খা’রেযামশাহ ইয়াযদা’নে জলীল
দিল হামি খা’হাদ আয ইন কওমে রযীল
খারেযামশাহ বলতে তো উদ্দেশ্য মহান প্রভু
হতভাগা মানুষের কাছে তিনি চান অন্তর শুধু।
সবযাওয়ার, আবু বকর, সুলতান খারেযমশাহ এখানে রূপক ও প্রতীকী উপমা। সাবযাওয়ার মানে এ জগৎ। আবু বকর মানে মানুষের স্বচ্ছ অন্তর কিংবা আল্লাহর নেক বান্দারা, যাদের দেখলে দুনিয়াবি বিচারে পদপদবির অধিকারী লোক বলে মনে হয় না। তারা সাদাসিধা সরল অজ্ঞাতপরিচয়। আর খারেযমশাহ বলে মহামহিম আল্লাহ তায়ালার কথাই বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের কাছে কী চান? ধনসম্পদ, স্বর্ণরৌপ্য? নাকি অন্যকিছু। হ্যাঁ, বান্দার স্বচ্ছ নির্মল অন্তরটাই তিনি চান। কোরআন মজিদে এরশাদ হয়েছেÑ ‘যেদিন ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি (মানুষের) কোনোই কাজে আসবে না, সেদিন লাভবান হবে শুধু সে ব্যক্তি, যে (গোনাহমুক্ত স্বচ্ছ নির্মল) বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।’ (সূরা শোয়ারা : ৮৮, ৮৯)।
কোরআন মজিদের এই বাণীকে হাদিসে আরও সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন প্রিয় নবীজি। মওলানা রুমির ভাষায়Ñ
গোফত লা’ ইয়ানযুর ইলা’ তাসবীরেকুম
ফাবতাগু যাল কালবে ফী তাদবীরেকুম
বলেন, তিনি দেখেন না তোমাদের অবয়ব ছবি
কাজেই কাজেকর্মে খুঁজে নাও অন্তরওয়ালা যিনি।
এ বয়েতের প্রথম লাইনে একটি হাদিসের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়েছে। নবীজি এরশাদ করেনÑ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক বেশভূষা ও ধনসম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তঃকরণ ও বাস্তব কর্মের দিকে তাকান।’ অর্থাৎ তোমাদের মনের স্বচ্ছতা ও বাস্তব আমলই আল্লাহর কাছে বিবেচ্য, তোমাদের ধনসম্পদ বাহ্যিক বেশভূষা নয়। 
বয়েতের পরের লাইনে মওলানা তার নিজস্ব জীবনদর্শনটি ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ কেউ যদি নিজে স্বচ্ছ নির্মল অন্তঃকরণের অধিকারী হতে না পারে, তাহলে যদি অন্তত কোনো অন্তরওয়ালা বুজুর্গের সাহচর্য গ্রহণ করে তাতে অন্তরের স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা অর্জন করতে পারবে। প্রাণহীন ইবাদত-বন্দেগি দিয়ে কেউ আত্মিক উন্নতির উচ্চ মার্গে পৌঁছতে পারবে না বিধায় একজন পথপ্রদর্শকের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। 
কোরআন মজিদের নির্দেশ হলো, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসুলের আনুগত্য কর, আর তোমাদের মধ্যকার উলুল আমরের আনুগত্য কর।’ মওলানা রুমির জীবন দর্শনে সেই উলুল আমরের ভূমিকায় রয়েছেন স্বচ্ছ অন্তঃকরণের অধিকারী ওলিআল্লাহ। মওলানা বলতে চান, আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের আনুসরণের মধ্য দিয়ে আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য উদ্ভাসিত হবে। কেননা আল্লাহ বলেনÑ
মন যে সাহেবদিল কুনাম দর তো নযর
নেই বে নকশে সাজদা ও ইসারে যর
অন্তরওয়ালার দৃষ্টিতে দেখব আমি তোমার দিকে
বিচার করব না সিজদার আকৃতি ও স্বর্ণ বিলানো দেখে।
যারা আল্লাহওয়ালা তারা তোমাকে কোন দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করে আল্লাহর কাছে তা বিবেচ্য। কারণ ইবাদত-বন্দেগির আকার-আকৃতি ও দান-দক্ষিণায় কপট লোকরাও চমৎকারিত্ব দেখাতে পারে। এ কারণেই উলুল আমর বা জমানার ওলি বা ইমামের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মুসলিমের হাদিসে বর্ণিতÑ ‘যে ব্যক্তি আমিরের আনুগত্য ত্যাগ করল এবং মুসলমানদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তার মৃত্যু হয়েছে জাহেলিয়াতের ওপর।’ কাজেই দ্বীনের সঠিক পথে অবিচলতার জন্য একজন আল্লাহওয়ালা বুজুর্গের সাহচর্য গ্রহণ করতেই হবে। 
মওলানা রুমি (রহ.) আরও বলেন, তুমি নিজেকে অন্তরওয়ালা বলে ধারণা করেছ। এ কারণেই কোনো অন্তরওয়ালাকে খোঁজ করার প্রয়োজনীয়তা তুমি অনুভব করো না। হকিকতের দিল তো সেই দিল, যার মধ্যে ঊর্ধ্ব আসমানের মতো সাতশ আসমান প্রবেশ করলেও হারিয়ে যাবে। তুমি ছোটখাটো এসব দিলকে দিল বলো না। সাবযাওয়ারে আবু বকরকে সন্ধান করে পাবে না। যে অন্তরওয়ালার কথা বলছি তার অন্তরটা ছয়মুখী আয়নার মতো। আল্লাহর সরাসরি নজর পতিত তার ওপর। আসমানি ফয়েজ বিতরণ হয় সেখান থেকে। এ জগতে ও তোমার জীবনে তার ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য একটি হাদিসের মর্ম অনুধাবনের চেষ্টা কর। বেহেশতের মালিক আল্লাহ সত্য; কিন্তু সন্তানের জন্য মা-বাবা সেই বেহেশতের উপলক্ষ। বলেছেন, মা-বাবার পায়ের নিচে (তাদের খেদমতের বিনিময়েই) সন্তানের বেহেশত নসিব হবে। এখানে মা-বাবা যেমন সন্তানের বেহেশত লাভের উপলক্ষ, জীবন জগতেও উলুল আমর বা অন্তরওয়ালা ওলি আসমানি ফয়েজ বিতরণের যোগসূত্র। বিষয়টির গভীরতর পর্যালোচনার জন্য মূল মসনবির শরণ নিতে হবে।
সে যাই হোক, হে সাধক! তোমার একটি দিল চাই স্বচ্ছ নির্মল বিশুদ্ধ। সব দিলের যিনি মালিক, তিনি সেই দিলের জন্য অপেক্ষারত। 
আয বরা’য়ে অন দিলে পুরনূর ও বির
হাস্ত অন সুলতানে দিলহা মুন্তাজির
নুরে ভরপুর স্বচ্ছ তোমার দিলের জন্য শোনো
সকল দিলের বাদশাহ এখন অপেক্ষমাণ জানো।


(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ
৫খ. বয়েত-৮৪৫-৮৮৮)


দোয়া কবুলের সেরা ১০ সময়
আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দার দোয়া সব সময় কবুল করে থাকেন।
বিস্তারিত
মিডিয়ার গুরুত্ব আমাদের দায়িত্ব
ইসলামের প্রচার ও তালিমের জন্য নবী করিম  (সা.) শুরু থেকে
বিস্তারিত
দাওয়াত প্রচারে মিডিয়ার ব্যবহার
মহান আল্লাহ তায়ালা মানব জাতি সৃষ্টি করে তাদের হেদায়েতের জন্য
বিস্তারিত
যখন আঁধার নামে হৃদয়জুড়ে
মানব হৃদয় একটি স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন ক্যানভাসের মতো। মানুষ তার
বিস্তারিত
বিসমিল্লাহ আমলেই অফুরন্ত নেয়ামত
বিসমিল্লাহ ছোট একটি শব্দ। বিসমিল্লাহ আমলে অসংখ্য ফজিলত পাওয়া যায়।
বিস্তারিত
ইসলামে মালিকানার স্বাধীনতা
মালিকানা যদি অবৈধ পন্থায় বা উপায়ে অর্জিত  হয়, তাহলে ইসলাম তার
বিস্তারিত