আমিওতো কত শত বার এবিউজের শিকার হয়েছি

ভদ্রমহিলা যখন তার এবিউজের শিকার হওয়া চার বছরের মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে উঠোনে বসে বিলাপ করছিলেন তখন এবিউজকারি দেবর অর্থাৎ মেয়েটির চাচা রুমে আত্মহত্যা করার জন্য হন্তদন্ত হয়ে ওড়না/ছুরি/ওষুধ এসব খুঁজছিল। চিৎকার চেচামেচি শুনে পাড়াপ্রতিবেশি অনেকেই ইতোমধ্যে জড়ো হয়েছে।

মেয়েটির মা একবার চিৎকার করে কাঁদছেন, পরক্ষনেই আবার চুপচাপ মেয়েটিকে বুকে আগলে কি যেনো এক চিন্তায় ডুবে হারিয়ে যাচ্ছিলেন অন্য কোথাও। আমি উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে। তখন আমি সবে এসএসসি পাশ। মূলত এ বাড়ির চিল্লাচিল্লি শুনেই আমার এখানে আসা।

বাচ্চা পছন্দ করি সেই সুবাদে এবিউজের শিকার হওয়া মেয়েটির খেলার সাথী ছিলাম আমি। দুধে আলতা গায়ের রঙ মেয়েটির, মাথার চুল ব্রাউন কালার। গরীবের ঘরে এতো সুন্দর মেয়ে খুব একটা নজরে আসেনি আমার। ওর যে বড় বোন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়তো সেও ছিল বেশ সুন্দর, আদুরে।

বিলাপের এক পর্যায়ে ভদ্রমহিলা বলছিলেন, “আমার বড় মাইয়ারেও ছাড়ে নাই শু..বাচ্চা, আমারে সবাই কইছে আমি মিছা কতা কইছি, দেবররে লগে রাখতে চাই না, খাওয়াইতে চাইনা দেইখা মাইয়া দিয়া বদনান উঠাইছি। আজকা আমার ছোট মাইয়ারে কি সর্বনাশ কইরা দিলো। আমি ওইদিন ক্যান ঘরেত্তে বাইর কইরা দিলাম না?”

আসলে সেসময় আমি এবিউজ শব্দটার সাথে পরিচিত ছিলাম না। অবশ্য তারাও কেউ এই শব্দ ব্যবহার করেনি। সবাই শুধু বলছিল, “মেয়েটার সর্বনাশ করছে”। এও বলছিল, “চাচায় এই কাম করতে পারে, কও? ভাতিজিতো মাইয়ার মতোই। কি খারাপ পোলা। ওরে বিয়া করাও না ক্যা তোমরা? যা করার বউয়ের লগেই করতো। দেবরের কামাই খাইতে বিয়া দেওনা, এইবার মাইয়ারে দিয়া লোভের খেসারত দিলা।”

আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম সব। বড় মেয়ের মতো ছোট মেয়ের বেলাতেও ভদ্রমহিলাকেই দোষারোপ করা হচ্ছে! ওদিকে চাচা লোকটা অস্বীকার করছে তার উপর আসা অভিযোগ নিয়ে। কিন্তু ইতোমধ্যেই ভদ্রমহিলা বাড়িওয়ালিকে সব দেখিয়েছেন, মেয়ের শরীরটা নিজেই নিখুঁত ভাবে দেখিয়েছেন যাতে অপরাধী অস্বীকার করতে না পারে, মিথ্যে বলতে না পারে। পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার কথা বলছিল অনেকেই।
কিন্তু বাড়িওয়ালা এক্ষেত্রে নিজের কথা চিন্তা করে ওসব ঝামেলায় যেতে চাইলেন না। তার বাড়িতে পুলিশ আসবে, ওদিকে আবার আত্মহত্যার চেষ্টা চলছে সব মিলিয়ে বাড়িওয়ালা গা বাঁচিয়ে কৌশলে এবিউজকারিকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে বলেন, “আর কোনদিন যাতে আমার বাড়ির আশেপাশে না দেখি”। ভীড় জমানো সবাইকে একে একে তাড়িয়ে দিয়ে নিজের বাড়ির পরিবেশ স্বাভাবিক করে নিলেন।

আমরা চলে গেলাম যে যার মতো, উঠোন থেকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো মা, মেয়েকে। এরপর ঘটনা লোক মুখে রটে রটে মাস খানেক পর হয়ে গেলো, “চাচায় ভাস্তিরে আকাম কইরা মাইরা ফালাইছে।” মানুষ পারেও বটে…..

বছর ঘুরে ঘুরে আমি অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। আমি তখন অনেক কিছুই বুঝি। বান্ধবীর বাড়িতে আড্ডা দিতে গিয়েছি। হঠাৎ পাশের বাড়ির দিকে চোখ যায়। বাচ্চা একটি মেয়েকে কোলে তুলে বারবার ওখানটায় চুমু খাচ্ছিল ছেলেটা। আমি নিশ্চিত হবার জন্য বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে জানালার পর্দা টেনে দিলো ছেলেটা। রুমে এসে অস্থির হয়ে গেলাম আমি। মেয়েটার সর্বনাশ হবে নাতো?
ছেলেটাই বা কে? মেয়ের মা কোথায়? নানা রকম প্রশ্ন ব্রেইনে আঘাত করতে লাগলো আমার। শেষ অবধি বান্ধবীকে নিয়ে ছুটে গেলাম সেই বাড়িতে। বান্ধবীর মাকে চেনার সুবাদে বাড়িওয়ালা গেট খুলে দিলেন, কলিং বেল চাপলাম সেই ফ্লাটের। কয়েকবার বেল বাজানোর পর ছেলেটি দরজা খুললো। ভাবটা এমন যে সে ঘুমিয়ে ছিলো। তার এই মিথ্যে বাহানা আমাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করলো। বাচ্চাটি ভেতরের রুম থেকে মাকে ডেকে কাঁদছে।

গিয়ে দেখি ওখানটায় ধরে ও কাঁদছে। ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম দৃশ্যপট। বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক বাচ্চার মাকে ফোন দিলেন।
আমাদেরকে বললেন, “বদমাইশটারে পুলিশে দিয়া দেই। কি বলো মামনীরা?” আমরা সাপোর্ট দিলাম। মেয়ের মা বাজার থেকে এলেন। না, তিনি সব ঘটনা শুনে সেই ভদ্রমহিলার মতো বিলাপ করলেন না, বরং নিজের ওড়না এগিয়ে দিয়ে বললেন, “যা..মর, নাহলে আমিই তোকে মারবো।” বাড়িওয়ালা পুলিশ কল করলেন। ধরে নিয়ে গেলো শয়তানটাকে। বাড়িওয়ালা আংকেলই সেই পরিবারকে বাসা ছেড়ে দিতে বললেন।

তিনি বললেন, “মেয়েটা ছোট, বড় হতে হতে সব বদলে যাবে। এখানে থাকলে লোকের কান কথায় বড় বেলায় মেয়েটা কষ্ট পেতে পারে। বাসা বদলে অন্য জায়গায় চলে গেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ সুন্দর হবে। ওর আর দোষ কি? ও বেঁচে থাকুক সুন্দরভাবে।”

শুনেছি তাঁরা চলে গিয়েছিলেন বাড়ি ছেড়ে। বাড়িওয়ালা আঙ্কেল তার পরের বছরই মারা যান। কিন্তু সেদিনের সেই ঘটনার পর এই মানুষটার প্রতি কি যে সম্মান আর শ্রদ্ধা জন্মালো আমার মনে, তা আজও কমলো না। আর সেই বাড়িওয়ালা, যে বেলায় আমি ছিলাম ছোট্ট দর্শক, সেই বাড়িওয়ালাকে প্রচন্ড ঘৃণা হতো আমার। বড় হয়ে একবার গিয়েছিলামও সেখানে। টিনের ঘর ভেঙ্গে পাঁচতলা করেছে। শুনেছি তারও নাকি দুটো মেয়ে হয়েছে। আমি নিথর হয়ে গেলাম। মেয়ে শব্দটা শুনলেই কেমন চিন্তা হয় আমার, হোক না সে অন্য কারও মেয়ে। তবুও চিন্তা হয়।

বস্তিতে জন্ম হওয়া মেয়েটা এবিউজের শিকার হয় অশিক্ষিত স্বজন দ্বারা, ফ্লাটে জন্ম হওয়া মেয়েটাও এবিউজের শিকার হয় শিক্ষিত স্বজন দ্বারা। বাংলাদেশে এমন কোন মেয়ে কি আছে যে কোন দিন এবিউজের শিকার হয় নি? এই যে আমি লিখছি, আমিওতো কত শত বার এবিউজের শিকার হয়েছি। চিন্তা হয় আমার…মেয়ে শব্দটা শুনলেই চিন্তা হয়।

রোমানা আক্তার, শুদ্ধবালিকা।


এইচএসসিতে মা পেলেন জিপিএ ৪,
উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে আজ।
বিস্তারিত
ব্লু মক্স সুলতান আহমদের অমর
ইস্তানবুলের প্রাচীন স্থাপত্যের এক অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে আহমেদীয়া মসজিদ। পশ্চিমারা
বিস্তারিত
অপরূপ নিদর্শন ইস্তানবুলের সুলাইমানিয়া মসজিদ
তৃতীয় দিন আমরা ঠিক করলাম সুলাইমানিয়া মসজিদটি দেখতে যাবো। সেখানে
বিস্তারিত
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে তালের শাঁস
পাকা তালের রস, কচি তালের শাঁস, অংকুরিত তালের আটির ভেতরের
বিস্তারিত
ইস্তানবুলের পথে পথে
ঈদের ছুটিঁতে স্বপরিবারে তুরস্কের রাজধানী ইস্তানবুলে গিয়েছিলাম। যার আবেশ এখনো
বিস্তারিত
নিষিদ্ধ নেশার কালো পথ এবার
যারা মারছে, যারা মরছে, যারা মৃত্যুর প্রহর গুনছে- এরা সবাই
বিস্তারিত