পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলাম

নবীজি (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষের চারা রোপণ করে অথবা ক্ষেত-খামার করে, অতঃপর তা মানুষ, পাখি বা অন্য কোনো জন্তু ভক্ষণ করে, তা তার জন্য 
সদকার সওয়াব হবে।’ (মুসলিম : ৫৫৩২)
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কেয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে যা রোপণ করা যায়, তবে 
সে চারাটি লাগাবে।’ (মুসলিম : ৫৫৬০)

গাছে গাছে ফুল-ফল, পাখিদের মিষ্টি-মধুর কলতান, সবুজাভ বৃক্ষরাজি, দিগন্তজোড়া সোনালি ফসলÑ সবই মহান আল্লাহ তায়ালার অমূল্য সৃষ্টি। এগুলো নিয়েই গঠিত আমাদের চারপাশের পরিবেশ। মানব সমাজের সেবার উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা এসব সৃষ্টি করেছেন। নির্দেশ দিয়েছেন আমাদের চারপাশের পরিবেশ সংরক্ষণেরও। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমাদের চারপাশের পরিবেশ পাল্লা দিয়ে দূষিত হচ্ছে। এ নিয়ে গোটা বিশ্বে চলছে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা। বিশ্বের তাবৎ চিন্তাশীল মানুষ এখন পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার কৌশল নিয়ে অহর্নিশ তৎপর। জ্ঞান-বিজ্ঞানে আজকের বিশ্ব উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করলেও পরিবেশ রক্ষায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরিবেশ দূষণের ফলে আমাদের সমাজে চলছে ভাঙন ও বিশৃঙ্খলা। নষ্ট হচ্ছে জীবন ও সম্পদ। বাড়ছে অশান্তি ও অস্থিরতা। পরিবেশ দূষণের কারণে রোগ-শোক, জ্বরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে অগণিত মানুষ। তাই আমাদের চারপাশের পরিবেশ সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি। 

প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে মহানবী (সা.) 
মানুষের অদূরদর্শিতা এবং অমানবিক আচরণের কারণে প্রাকৃতিক যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে তা তাবৎ বিশ্বের মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে বায়ুতে বেড়েছে দূষণ, বেড়েছে তাপমাত্রা, বৃদ্ধি পেয়েছে রোগ-শোক এবং প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ। তাই এসব বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য বিজ্ঞানীরা বন রক্ষা এবং বৃক্ষরোপণকে অন্যতম উপায় বলে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অথচ মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বৃক্ষ বা বন রক্ষার জন্য তাগিদ দিয়ে গেছেন সেই ১৪০০ বছর আগে। বৃক্ষ বা শস্য নষ্ট করাকে নিরুৎসাহিত করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন। 
গাছপালা, লতাপাতা মানুষ ও জীবজন্তুর জন্য খাদ্য সরবরাহ করে, মানুষ ও জীবের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত করে। গাছপালা ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ করে এবং মাটির ক্ষয়রোধ করে। এ প্রসঙ্গে নবীজি (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষের চারা রোপণ করে অথবা ক্ষেত-খামার করে, অতঃপর তা মানুষ, পাখি বা অন্য কোনো জন্তু ভক্ষণ করে, তা তার জন্য সদকার সওয়াব হবে।’ (মুসলিম : ৫৫৩২)।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কেয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে যা রোপণ করা যায়, তবে সে চারাটি লাগাবে।’ (মুসলিম : ৫৫৬০)।
তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি অনাবাদি জমি চাষ করে, সে সওয়াব পায়।’ (ইবনে হিব্বান : ৩৫২)।
হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি গাছ লাগায় সে গাছে যে পরিমাণ ফল ধরে সে পরিমাণ সওয়াব সে পায়।’ (মুসনাদে আহমদ : ৪৪৩)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনি বিভিন্ন ধরনের লতাবিশিষ্ট ও কা-ের ওপর দ-ায়মান বিশিষ্ট বাগান, খেজুর গাছ ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যের উদ্ভিদ, ভেষজ, ফলফলাদি, জয়তুন ও আনারের গাছ সৃষ্টি করেছেন, যা বাহ্যিকরূপে সাদৃশ্যপূর্ণ; কিন্তু স্বাদে সাদৃশ্যহীন।’ (সূরা আনআম : ১৪১)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘আমি মেঘ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দিয়ে উৎপাদন করি শস্য, উদ্ভিদ ও পাতাঘন উদ্যানরাজি।’ (সূরা আননাবা : ১৪-১৬)।
সব নবী-রাসুল প্রকৃতি ও পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি সংরক্ষণ করেছেন এবং তাঁদের অনুসারীদের উৎসাহিত করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘সব নবী-রাসুলই ছাগল পালন করেছেন।’ (বোখারি : ২১৪৩)।
আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে প্রথমেই কৃষিপণ্য, ফলগাছ ও প্রকৃতি পরিবেশের ওপর শিক্ষা দেন। হজরত নুহ (আ.) মহাপ্লাবন থেকে রক্ষার জন্য সব পশুপাখি ও উদ্ভিদ জোড়ায় জোড়ায় নৌকায় উঠিয়ে সংরক্ষণ করেন। সেখান থেকে বর্তমান পৃথিবীর এত মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, বনজঙ্গল, জীববৈচিত্র্যের বিস্তার লাভ করেছে। হজরত ইদ্রিস (আ.), হজরত হুদ (আ.), হজরত সালিহ (আ.), হজরত ইবরাহিম (আ.), হজরত ইউসুফ (আ.), হজরত মুসা (আ.), হজরত দাউদ (আ.), হজরত মোহাম্মদ (সা.)সহ সব নবী-রাসুল গাছপালা, পশুপাখি, পাহাড়-পর্বত, নদীনালা, সমুদ্রের প্রতি সদয় ছিলেন। অনেক নবী-রাসুল পাহাড়ে ও বনে ইবাদত করে নবুয়ত লাভ করেন। হজরত সোলায়মান (আ.) সব পশুপাখির ভাষা বুঝতেন, কথা বলতেন ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। প্রকৃতির সবকিছু তাঁর কথা অনুসারে চলত। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ফসল উৎপাদন, ছাগল পালন, বৃক্ষরোপণ, সেচ দেওয়া ইত্যাদি করেছেন। হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘তোমার জমির লুকায়িত ভা-ারে খাদ্যের অনুসন্ধান কর। যার জমি আছে সে যেন নিজেই তা চাষ করে।’

পানি সংরক্ষণে মহানবী (সা.) এর নির্দেশনা 
পানিÑ মানুষ এবং জীব জগতের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। পানি ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। পানি দূষিত হলে মাটি, বায়ু ও খাদ্যও দূষিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে পৃথিবীর ৬০ শতাংশ পানিই দূষিত। ফলে রোগ-শোক, জ্বরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ ও পশুপাখি। পানিদূষণের মূল কারণ হলো নর্দমার ময়লা, কারখানার বর্জ্য পদার্থ, মানুষ ও পশুপাখির মলমূত্র, কীটনাশকের মিশ্রণ প্রভৃতি। তাই আজ বিশ্বব্যাপী এ পানিকে বিশুদ্ধ রাখার জন্য জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। সুপেয় পানির অভাব এখন মানুষকে রীতিমতো উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, চলমান শতাব্দীতে দুনিয়ায় যদি বড় ধরনের কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হয় তা হলে তা হবে বিশুদ্ধ পানির জন্য লড়াই। অথচ এই অতি প্রয়োজনীয় এবং জীবন ধারণের অন্যতম উপকরণ পানিকে বিশুদ্ধ রাখার জন্য পানির উৎস যেমনÑ নদীনালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মহানবী (সা.)। তিনি পানিতে আবর্জনা, মলমূত্র ও বর্জ্য ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা লানত আনয়নকারী তিন ধরনের কাজ থেকে নিজেদের বিরত থাক। তা হলোÑ পানির উৎসগুলোয়, রাস্তাঘাটে ও বৃক্ষের ছায়ায় মলমূত্র ত্যাগ করা।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৬৬৩)।
তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা কেউ বদ্ধ পানিতে প্রস্রাব করে তাতে অজু করো না।’ (বোখারি : ৭৫৭৩)।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় মহানবী (সা.) 
বাঁচার জন্য দরকার নিজেদের দেহ-মনকে সতেজ ও নির্মল রাখা। আর এটা নির্ভর করে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর। মন ও জীবনকে সুন্দর ও কলুষতামুক্ত রাখা গেলে রোগ-শোক, অসুস্থতা ইত্যাদি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে দূষণমুক্ত করো এবং পবিত্র রাখ।’ (বোখারি : ৩৫৪৩)। তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা পবিত্র, তাই তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন। তিনি পরিচ্ছন্ন, তাই পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসেন। তিনি সম্মানিত এবং সম্মানিতকে ভালোবাসেন। তোমরা তাই তোমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে পবিত্র রাখ।’ (বোখারি : ৩৫৮৩)।
মানুষের দেহ-মনকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারেও মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে বায়ুদূষণের হাত থেকে দেহের ভেতরকে রক্ষা করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। কেননা, বায়ু অপরিচ্ছন্ন বা দূষিত হলে তা মানুষের দেহাভ্যন্তরে ক্ষতের সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাই বলেছেন, ‘সাবধান! মানুষের দেহাভ্যন্তরে একটি গোশতের টুকরা আছে, সে গোশতের টুকরাটি যখন ভালো ও সুস্থ থাকবে, পুরো শরীরই ভালো ও সুস্থ থাকবে। আর এটি বিনষ্ট বা কলুষিত হলে পুরো শরীরটাই খারাপ ও বিনষ্ট হয়ে যাবে। মনে রেখো, সে গোশতের টুকরাটি হচ্ছে মানুষের কালব বা হৃৎপি-।’ (বোখারি : ৩৫৩৩)।


ইসলামে জীবজন্তুর অধিকার
‘পথে চলতে চলতে একজন লোকের ভীষণ পিপাসা লাগল, সে
বিস্তারিত
বৃষ্টির দিনের ইবাদত বৃক্ষরোপণ!
  আবারও এলো আষাঢ় মাস। আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বৃষ্টির মাস। এ
বিস্তারিত
ইসলামে মায়ের মর্যাদা
  নারীরা হচ্ছেন মাতৃকুল। তাদের এমন একটি শব্দ রয়েছে, যা আকারে
বিস্তারিত
কাতারি অর্থনীতির হালচাল
  ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির মাইক্রো ইকনোমিক্স সেন্টারের পলিটিক্যাল ইকনোমি বিশেষজ্ঞ খালিদ বিন
বিস্তারিত
অখিলা হয়ে গেলেন হাদিয়া
শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে জিতে গেলেন হাদিয়া। ফিরে পেলেন তার
বিস্তারিত
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের
বিবিসি বাংলা ওমান উপসাগরে দুটি তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরান
বিস্তারিত