মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

হকিকতে পৌঁছার সাধনার পথ

(কিস্তি-১৭৫)

এমন বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক পেতে হলে তোমাকে কোমরে গামছা বেঁধে নামতে হবে। নিজের আমিত্ব অহমিকা ভুলে যেতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, টেনারির শ্রমিকরা চামড়া ধোলাই করতে ময়লা কাপড় গায়ে দেয়, লোহালক্কড় নিয়ে যারা কাজ করে তারাও ময়লাযুক্ত কাপড় পরিধান করে এবং এই সময়ের জন্য তা দোষের নয়। তোমাকেও হকিকতের জ্ঞান রপ্ত করেত হলে উপযুক্ত ওস্তাদের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে হবে। বড়াই অহমিকা পায়ে দলতে হবে। নচেত কাক্সিক্ষত দক্ষতা অর্জন করতে পারবে না

 

মসনবি শরিফের এক গভীর প্রান্তরে ভ্রমণ করতে চাই আজ আমরা। সংবাদপত্র পাঠকদের জন্য কঠিন হলেও মন চাচ্ছে না বিষয়টি এখানে এড়িয়ে যাই। মওলানা রুমির ভাষায় ‘হকিকত’ বা ‘বাস্তব’কে আমরা ‘অবাস্তব’ মনে করি, আর ‘অবাস্তব’ আমাদের সামনে ‘বাস্তব’ হিসেবে উদ্ভাসিত। উদাহরণস্বরূপ, সাগর তীরে গিয়ে আমরা ভাসমান ফেনা দেখি, ঢেউয়ের খেলা দেখে আহ্লাদিত হই; কিন্তু সাগরের ফেনারাশি ও ঢেউয়ের নিচের জলরাশি দেখি না, তার গভীরতা বুঝি না। ঘূর্ণিবায়ুতে ধূলিঝড় দেখি অথচ ধূলিঝড়ে লুকায়িত বায়ু চোখে দেখি না। মনে করি, ধূলিঝড়ের কু-লীর ঘূর্ণনই বাস্তব; বায়ু চোখে দেখি না বিধায় তা অবাস্তব। আমরা মুখের বোলচাল শুনি, কথা বলা দেখি, এর বাস্তবতায় বিশ্বাস করি; কিন্তু যে চিন্তা মুখে কথার প্রকাশ ঘটায়, সেই চিন্তাকে বাস্তব হিসেবে গণ্য করি না। মোটকথা, ‘হকিকত’ ও ‘হকিকতের সুরত’ বা ‘বাস্তব’ আর ‘বাস্তবের আকৃতি’র মাঝে অবশ্যই তফাত আছে। এ জগৎ হকিকত নয়; বরং হকিকতের সুরত। হকিকত বা প্রকৃত বাস্তব বিরাজ করে এ সুরত বা আকৃতির অন্তরালে। যদিও হকিকতের সুরত বা এ জগৎই সবার চোখে দৃশ্যমান; আর সবার দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে হকিকতের অবস্থান। 
মওলানা আরও বলেন, আমরা ‘নাই’কে মনে করি ‘আছে’। আর ‘আছে’কে মনে করি ‘নাই’। কারণ আমাদের চোখ নাই দেখে দেখে অভ্যস্ত। যে চোখ ঘুমের ঘোরে ঢুলুঢুলু তা কি কাল্পনিক জিনিস ছাড়া অন্যকিছু দেখে? কতক কাল্পনিক বস্তু ও প্রেতাত্মার ছায়াই তার মনে ভেসে ওঠে। আমাদের দৃষ্টিশক্তিও অবহেলা ও মূর্খতার ঘোরে ঢুলুঢুলু। তাই সব অবাস্তকে বাস্তবরূপে দেখি কল্পনার চোখে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, আল্লাহ তায়ালা আপন কারিশমায় অবাস্তবকে আমাদের সামনে বাস্তবরূপে দৃশ্যমান করেছেন। আর বাস্তবকে লুকিয়ে রেখেছেন আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে। 
শুধু কি তাই? এ অবাস্তব দুনিয়াটাই আমাদের সামনে উপস্থিত আছে জাদুকরের মতো। জাদুকর যেভাবে অবাস্তবকে বাস্তবরূপে দেখিয়ে বড় বড় মাথাওয়ালাদের ধোঁকায় ফেলে, তেমনি এ দুনিয়া আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে অবাস্তবের পেছনে ছুটে চলতে প্ররোচিত করছে। ফলে জীবনের প্রকৃত লাভ কীসে, তা নিয়ে চিন্তা করার ফুরসত আমরা পাই না। শুধুই খাইখাই, আরও পাই, আরও চাইয়ের ধান্ধায় ঘুম নেই। এ অবস্থা থেকে নিস্তার পেতে হলে তোমার উচিত ‘কুল আউজু’ পড়া, তার কাছে আশ্রয় চাওয়া। 
কুল আউযাত খান্দ বা’য়দ কাই আহাদ
হীন যে নাফফা’সা’ত আফগা’ন ওয়ায উকাদ
কুল আউজু পড় আর বল হে একক সত্তা মহান!
ঝাড়ফুঁককারী গিঁট দেওয়া নারী থেকে দাও পরিত্রাণ।
কিন্তু ‘কুল আউজু’ সূরা শুধু মুখে পড়া নয়, বাস্তব কর্ম দিয়ে হতে হবে এই পাঠ। অনেকে অনেক সময় দোয়া পড়ে শয়তান থেকে নিস্তার চায় বটে; বাস্তবে অনুসরণ করে শয়তান ও শয়তান চরিত্রের লোকদের। কাজেই শুধু মুখের কথায় চিঁড়া ভিজবে না, বাস্তবে তুমি কার অনুসরণ করছ, কার সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব তার হিসাব রাখতে হবে। বিশেষত তিনজন বন্ধু তো তোমার নিত্যসাথি হয়ে আছে। 
দার যমা’না মর তোরা’ সে হামরাহান্দ
অ’ন য়্যকী ওয়াফী ওয়ীন দো গদরমান্দ
সবসময় তোমার সঙ্গে চলে তিনজন নিত্যসাথি
তাতে একজন বিশ্বস্ত, বাকি দুজনে আস্থা নাহি।
এক সাথি তোমার ধনসম্পদ। দ্বিতীয়জন তোমার বন্ধুমহল, আপনজন। তৃতীয় সাথির পরিচয় চাও, সে তোমার নেক আমল। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে প্রথম সাথি তোমার কাছ থেকে বিদায় নেবে। এতদিনের আপনজনরাই তোমার সম্পদের মালিক বনে যাবে। তার সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। দ্বিতীয় সাথি কবরের পাড় পর্যন্ত তোমার সঙ্গে থাকবে। কাফন পরিয়ে, জানাজা দিয়ে কবরস্থ করার পর তোমাকে একা ছেড়ে চলে আসবে। অন্ধকার কবরে তোমার সম্পদ বা আপনজন কেউ সঙ্গ দেবে না। কবরে ও হাশরে তোমাকে সঙ্গ দেবে একজন পরম বন্ধু, তার নাম নেক আমল। কাজেই সেই বন্ধুর সঙ্গেই তোমার সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি মজবুত করা চাই। এই বক্তব্য নবীজির হাদিসের বাণী।
গর বুয়াদ নেকূ আবদ য়্যা’রত শাওয়াদ
ওয়ার বুয়াদ বদ দর লাহাদ মা’রত শাওয়াদ
আমল যদি হয় নেক, চিরকাল তোমার সাথি হবে
যদি হয় মন্দ, কবরে দংশন করবে বিষধর সর্প হয়ে।
তোমার আমল যদি মন্দ হয়, সে আমলই কবরে সর্পের রূপ ধারণ করবে, আর তোমাকে দংশন করতে থাকবে। জঘন্য অপরাধ করে কেউ যদি আইনের ফাঁকে ছাড়া পায়, যখন নির্জন নিরালায় বসে আত্মমগ্ন হয়, নিজের বিবেক তাকে দংশন করে। কবরের চিরনির্জনতার দেশে সাপের দংশনের বাস্তবতা এখান থেকে অনুমেয়। 
মওলানা রুমি বলছেন, নিজের আমলকে ভালো বা মন্দ করার এ যোগ্যতা কি শুধু জ্ঞান দিয়ে হবে? দুনিয়ার অতি ক্ষুদ্র পেশাও তো কোনো ওস্তাদ ছাড়া রপ্ত করা যায় না।
ইস্তায়ীনূ ফিল হেরাফ ইয়া যান নুহা
মিন করীমিন সালেহিন মিন আহলিহা’
পেশা আয়ত্ত করতে সাহায্য চাও হে বুদ্ধিমান
খোঁজো যোগ্য বিশ্বস্ত, দক্ষ অভিজ্ঞের সন্নিধান।
এমন বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক পেতে হলে তোমাকে কোমরে গামছা বেঁধে নামতে হবে। নিজের আমিত্ব অহমিকা ভুলে যেতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, টেনারির শ্রমিকরা চামড়া ধোলাই করতে ময়লা কাপড় গায়ে দেয়, লোহালক্কড় নিয়ে যারা কাজ করে তারাও ময়লাযুক্ত কাপড় পরিধান করে এবং এই সময়ের জন্য তা দোষের নয়। তোমাকেও হকিকতের জ্ঞান রপ্ত করেত হলে উপযুক্ত ওস্তাদের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে হবে। বড়াই অহমিকা পায়ে দলতে হবে। নচেত কাক্সিক্ষত দক্ষতা অর্জন করতে পারবে না। 
দেখ, জ্ঞান অর্জনের পথ হলো কথা ও বচনের চর্চা। কিন্তু কোনো পেশায় দক্ষতা চাইলে তা হবে মুখের কথা নয়, হাতে-কলমে শেখার পালা। তুমি চাও যে, দুনিয়ার জীবন থেকে নাই হয়ে যাই। প্রকৃত দারিদ্র্য বরণ করে জীবন সার্থক করি। কিন্তু তরিকতের দারিদ্র্য ভিক্ষুকের দারিদ্র্যের চেয়ে ভিন্নতর। এ দারিদ্র্যের হকিকত যদি রপ্ত করতে চাও, দুনিয়ার হাজারো ব্যস্ততার মাঝে যারা একান্ত আল্লাহর কাছে বিনয়ী, ফকির, যাদের কথায় ও কাজে আল্লাহর কাছে ভিখারির চরিত্র কাতরতা উদ্ভাসিত, তাদের সাহচর্য চাও। তখনই প্রকৃত প্রশংসিত দারিদ্র্যের সৌন্দর্য তোমার দিলে উদ্ভাসিত হবে। এ কথার তাৎপর্য বুঝতে হলে তোমাকে সূরা ‘আলম নাশরাহ’ (সূরা ইনশিরাহ) পাঠ করতে হবে। তাহলে প্রকৃত দারিদ্র্যের উদ্ভাস আল্লাহই তোমার অন্তরে ঢেলে দেবেন। 
তোমার প্রশ্ন অন্তরের সেই উদ্ভাস, দারিদ্র্যের আনন্দ কোথায় পাব, তাফসিরের ভাষায় যার নাম শরহে সদর, অন্তরের প্রসারতা? Ñভালো করে দেখ, তোমার অন্তরেই তা বিরাজিত। সান্নিধ্যে যাওয়ার চেষ্টা কর, তখন দেখবে, ‘আমি তো তোমাদের কাছে তোমাদের নিজেদের চেয়েও কাছে; কিন্তু তোমরা আমায় দেখতে পাও না।’ (সূরা ওয়াকিয়া : ৮৫)।
তোমার অবস্থা হয়েছে, মাথায় রুটির ঝুড়ি নিয়ে খাদ্যের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছ, অথচ রুটি তোমার মাথার ওপরে, সেই হুঁশ তোমার নেই। দিনের বিপরীত রাত আছে; তাই দিন বা রাতকে চিনি। পরস্পর বিপরীত রাত-দিন না থাকলে কোনোটাই চেনা সম্ভব হতো না। সৃষ্টির সর্বত্র আল্লাহর বিপরীত কোনো অস্তিত্ব নেই; তাই আল্লাহকে আলাদা করে চেনার উপায় নেই। দোয়ার মধ্যে এ কথাই এসেছে, ‘ওহে যিনি লুক্কায়িত আপন প্রকাশমানতার আতিশয্যে। তুমি অন্তর্হিত তোমার নুরের ঝলকে।’ সূরা হাদিদের চতুর্থ আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গেই আছেন।’ (সূরা হাদিদ : ৪)। 
এই স্তরে যেতে হলে তোমাকে ফকর ও দারিদ্র্যের প্রান্তরে পাড়ি দিতে হবে। এ প্রান্তর মুখের কথার বা বড় বড় দাবির নয়। সাধক যতক্ষণ মনে করবে যে, আমি ফকরের স্তরে পৌঁছে গেছি, আমি সুফি, আমি ফকির ততক্ষণ প্রকৃত ফকরের সন্ধান সে পায়নি। 
শেখ সাদি গুলিস্তানের ভূমিকায় বলেন, হে মোরগ! শেষ রাতে উচ্চৈঃস্বরে বাগ দিয়ে মানুষের ঘুম ভাঙাও, কারণ বল। মোরগ বলে, প্রেমের জ্বালা সহ্য করতে পারি না। তাই গলা ছেড়ে বাগ দিয়ে দুনিয়ার মানুষকে জানান দিই, আমি তার প্রেমিক। তাকেই চাই। সাদি বলেন, হে শেষ রাতের মোরগ! তুমি প্রেম কাকে বলে, পরওয়ানা (পতঙ্গ) এর কাছ থেকে শেখ। পতঙ্গ সন্ধ্যাবেলা প্রদীপের চারপাশে দেওয়ানার মতো ঘোরে, আর আগুনে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়। পতঙ্গ তো প্রেমের জ্বালার কথা বলে নিজেকে জাহির করে না, উহ্ শব্দও করে না, প্রচার করে না যে, আমি প্রেমিক, আমি সাধক, আশেক। বরং প্রেমের আতিশয্যে আগুনের ঝাঁপ দিয়ে প্রিয় প্রাণটাই প্রেমাষ্পদের হাতে তুলে দেয়। কাজেই যারা নিজেরা সুফি দরবেশ, বুজুর্গ, কামিল বলে প্রচার কর, তারা জেনে নাওÑ ‘কা’নরা’ কে খবর শুদ খবরি বা’য নয়া’মদ’Ñ ‘যেজন তার খবর পেয়েছে তার খবর আর পাওয়া যায়নি।’ তিনি তার সন্ধান পেয়ে হারিয়ে গেছেন। নিজেকে গোপন করে ফেলেছেন। 
সাধনার এই স্তরে পৌঁছার জন্য তোমার সামনে পথ খোলা। তা হচ্ছে, শুধু নামাজে নয়, সদাসর্বদা অন্যদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে একান্ত তার দিকেই মুতাওয়জ্জিহ থাক। অন্তরকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে, আজেবাজে কাজ ও চিন্তা থেকে মুক্ত রাখ আর তার রহমতের ছোঁয়া পাওয়ার আশায় ভিখারি বনে থাক। আশা করা যায়, তোমার অন্তরের চোখের পর্দা সরে যাবে, বুঝতে পারবে, যাকে পাওয়ার সাধনা করছ, তিনি তোমার সঙ্গেই আছেন। 

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৫খ. বয়েত-১০২৬-১০৮৩)


মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে ইসলাম
গত ১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে গেল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য
বিস্তারিত
জুলুমবাজ ও হত্যাকারীর পরিণতি
বর্তমানে চারদিকে একটি দৃশ্য ফুটে উঠছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার।
বিস্তারিত
কোরআনের আলোকে পরস্পরের প্রতি শিষ্টাচার
আমরা মানুষ, পৃথিবীতে আমাদের বসবাস। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা,
বিস্তারিত
পোশাকের শালীনতা
পোশাক-পরিচ্ছদ মানুষের লজ্জা নিবারণ করে। পোশাকে মানুষের রুচি, ব্যক্তিত্ব, ঐতিহ্য,
বিস্তারিত
কে এই নোবেল বিজয়ী আবি
তিনি নিজেও ওরোমো মুসলিম ছিলেন। তার বাবা ছিলেন মুসলিম আর
বিস্তারিত
মুসলিম নোবেল বিজয়ীরা
  ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রথম মুসলমান
বিস্তারিত