প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় ইসলাম

ইসলামে ফলদ বৃক্ষরোপণ ও ফসল ফলানোকে সবিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে সদকায়ে জারিয়া বা প্রবহমান দানরূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেননা কোনো ব্যক্তি যদি একটি বৃক্ষরোপণ ও তাতে পরিচর্যা করেন, তাহলে ওই গাছটি যত দিন বেঁচে থাকবে এবং মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু যত দিন তার ফল বা উপকার ভোগ করতে থাকবে, তত দিন ওই ব্যক্তির আমলনামায় দানের সওয়াব লেখা হতে থাকবে। সদকায়ে জারিয়ার জন্য ছায়াদানকারী ফলবান বৃক্ষই তুলনামূলক বেশি উপকারী

ইসলাম ধর্ম জীবনের সব দিক নিয়ে আলোচনা করেছে। একজন মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেসব বিষয়ের সম্মুখীন হয়, হোক তা ব্যক্তি, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয়, সেসব বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছে ইসলাম। বর্তমান বিজ্ঞান কোরআনের প্রতিটি বিশ্লেষণের সত্যতা অকপটে স্বীকার করে চলেছে।
কোরআনুল কারিমে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে মানুষকে যে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে যদি আমরা সবাই সে অনুযায়ী আমাদের জীবন পরিচালিত করতাম, তাহলে আজ পৃথিবী এবং মানবতা এমনভাবে সুরক্ষিত থাকত যে, সেখানে কোনো শত্রু আক্রমণ করতে পারত না এবং কেউ কারও থেকে সামান্য ক্ষতির আশঙ্কাও করত না।
বর্তমান পৃথিবীর সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃতির পরিবর্তন। অর্থাৎ আবহাওয়া, মৌসুম ইত্যাদির পরিবর্তন। এ প্রকৃতির পরিবর্তন পৃথিবীর জন্য কতটা অশনিসংকেত যে বয়ে আনতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। একটি কথা মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি মানুষ ছাড়া বাঁচতে পারে; কিন্তু মানুষ প্রকৃতি ছাড়া বাঁচতে পারে না। তাই আমরা বাঁচতে চাইলে আমাদের এ সুন্দর প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে। এ প্রকৃতি রক্ষার্থে আমাদের যেসব উদ্যোগ নিতে হবে, তার মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, অপচয় রোধ ও বৃক্ষরোপণ অন্যতম। কারণ এগুলো ছাড়া সুন্দর এ পৃথিবী রক্ষা করা সম্ভব নয়।
পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য বিজ্ঞানের দীর্ঘ গবেষণা যেসব পরামর্শ প্রদান করেছে কোরআন তা আমাদের সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগেই জানিয়ে দিয়েছে।
কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী ইসলামি জীবন বিধানে যেমন মানুষ ও সব প্রাণীর সঙ্গে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে, তেমনি বৃক্ষ, ফুল, পাতা ও পরিবেশের যতœ নিতে এবং খোদা প্রদত্ত নেয়ামতের অপচয় রোধে কঠোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক
মদিনার নিকটবর্তী কোবা এলাকার লোকজনের পরিচ্ছন্নতার প্রশংসা করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন,
‘সেখানে এমন কিছু লোক আছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ (সূরা তওবা : ১০৮)।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্রতাকে পছন্দ করেন। আল্লাহ পরিচ্ছন্ন। তিনি পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। আল্লাহ মহৎ, তিনি মহত্ত্ব পছন্দ করেন, আল্লাহ বদান্য, তিনি বদান্যতা পছন্দ করেন। অতএব তোমরা তোমাদের উঠানগুলো পরিচ্ছন্ন রাখবে।’ (তিরমিজি : ২৭৯৯)।
অন্য হাদিসে এরশাদ হয়েছে, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ (মুসলিম : ২২৩)।
আমাদের ছোট শিশুদেরও এই হাদিসটি মুখস্থ আছে। আমরা কখনও এই হাদিসের গভীরে গিয়ে দেখেছি? তার অন্তর্হিত মর্ম উপলব্ধি করার কোশেশ করেছি? অর্থাৎ আমরা যদি পরিচ্ছন্নতা পছন্দ না করি, তাহলে আমাদের ঈমানও অর্ধেক। তাই পোশাক-পরিচ্ছেদ, রাস্তাঘাট, অলিগলি, শহর ও গ্রামের প্রত্যেক জায়গা পরিচ্ছন্ন হওয়া ওই এলাকার লোকদের ঈমানদার হওয়ার পরিচয় বহন করে।
তবে আমাদের বদনসিব যে, আমরা ইসলামের এই সুন্দর জীবন বিধানকে উপেক্ষা করেই চলেছি। যার প্রমাণ আমাদের চতুর্পাশ। ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে মাঝেমধ্যে মন চায় শহর ছেড়ে পলায়ন করি। যত্রতত্র ময়লা স্তূপের কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে প্রতিটি নাগরিক। শুধু কি তাই? না জানি এই ময়লার কারণে পরিবেশ দূষিত হয়ে কত ধরনের বিমারি ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের দেহে। ময়লা মানেই দূষিত পরিবেশ। ময়লা মানেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ময়লা মানেই অশান্তি ও দুশ্চিন্তা। কারণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ যেরকম মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ঠিক তদ্রƒপ তার মানসিকতার ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। ফলে ময়লা-আবর্জনায় বসবাসরত লোকরা অনেক সময় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে থাকে। কিছুটা ক্ষেপাটে ও বদমেজাজিও হয়ে থাকে। আসল কথা হলো, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি পরিবেশ মানুষকে দৈহিক ও মানসিক উভয় দিক থেকে প্রশান্তিতে রাখে। তাই মানুষের দেহ-মনে যখন প্রশান্তি বিরাজ করে, তখন তার দ্বারা সমাজের অপরাধ বহুলাংশে হ্রাস পায়। ফলে ঝগড়াঝাটি, খুনখারাবি, গালাগালসহ নানা ধরনের অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায়। এতে করে সমাজ ব্যবস্থারও উন্নতি ঘটে। 

অপচয় রোধ
জীবনকে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আয় অনুযায়ী ব্যয় করা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন অপচয় ও অপব্যবহার না করা। 
প্রয়োজন অতিরিক্ত কোনো কিছুই কখনও ভালো হয় না। বিশেষ করে ওই বস্তু যদি হয়ে থাকে মৌলিক চাহিদার অংশ, তাহলে তো কথাই নেই। কোরআনুল কারিমে শক্ত ভাষায় অপচয়-অপব্যয়কে প্রতিহত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং তোমরা অপচয় করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আনআম : ১৪১)।
এই অপচয় ও অপব্যবহার ক্রমান্বয়ে পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অপচয় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। তাই এ অপচয় রোধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
বৃক্ষরোপণ
একটি গাছ রোপণের রয়েছে বহুবিধ উপকারিতা। যেমনÑ গাছ আমাদের জন্য তাজা বাতাস গ্রহণকে সহজ করে দেয়, যা ছাড়া আমাদের বাঁচাই অসম্ভব। অশুদ্ধ বাতাসকে পরিশোধন করে আমাদের উপহার দেয় নির্মল-কোমল বাতাস। কখনও ফল, কখনও ফুল, কখনওবা আরামদায়ক সুশীতল ছায়া প্রদান করে দেহ-মনে বয়ে আনে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। তাই তো ইসলাম বৃক্ষরোপণে উৎসাহ প্রদান করেছে। নিজ হাতে বৃক্ষরোপণ সুন্নত তো বটেই। মহান আল্লাহর সৃষ্টি বৃক্ষ যে কত বড় নেয়ামত পবিত্র কোরআনে একাধিক আয়াত থেকে তা প্রতীয়মান হয়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘তারা কি লক্ষ করে না, আমি উষর ভূমির ওপর পানি প্রবাহিত করে তার সাহায্যে উদ্গত করি শস্য, যা থেকে তাদের গবাদিপশু এবং তারা নিজেরা আহার গ্রহণ করে।’ (সূরা সাজদা : ২৭)।
ইসলামে ফলদ বৃক্ষরোপণ ও ফসল ফলানোকে সবিশেষ সওয়াবের কাজ হিসেবে সদকায়ে জারিয়া বা প্রবহমান দানরূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কেননা কোনো ব্যক্তি যদি একটি বৃক্ষরোপণ ও তাতে পরিচর্যা করেন, তাহলে ওই গাছটি যত দিন বেঁচে থাকবে এবং মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তু যত দিন তার ফল বা উপকার ভোগ করতে থাকবে, তত দিন ওই ব্যক্তির আমলনামায় দানের সওয়াব লেখা হতে থাকবে। সদকায়ে জারিয়ার জন্য ছায়াদানকারী ফলবান বৃক্ষই তুলনামূলক বেশি উপকারী। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘যদি কোনো মুসলমান একটি বৃক্ষরোপণ করে অথবা কোনো শস্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে; তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকাস্বরূপ গণ্য হবে।’ (বোখারি ২৩২০; মুসলিম : ১৫৬৩)।
তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এ সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করি। পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কোরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করি।


তাওয়াফের কিছু ভুলত্রুটি
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি কাবা ঘরে ঢুকে সালাত আদায় করতে
বিস্তারিত
ইসলামে নৈতিকতার চর্চা
ইসলাম মহান আল্লাহপাকের দেওয়া এক পূর্ণাঙ্গ পরিপূর্ণ ও প্রগতিশীল জীবন
বিস্তারিত
ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি আচরণবিষয়ক সেমিনার
গেল ১২ জুলাই সন্ধ্যায় ফিকহ একাডেমি বাংলাদেশ কর্তৃক ফিকহবিষয়ক চতুর্থ
বিস্তারিত
বিদায় হজের ভাষণে জানমালের নিরাপত্তার
মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজে আরাফার দিন উরনা উপত্যকায় নিজ
বিস্তারিত
মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিমের সমর্পিত
হজের মৌসুম এলে হৃদয়পটে যার স্মৃতি ঝলমল করে তিনি ইবরাহিম
বিস্তারিত
তামাত্তু হজের সহজ নিয়ম
পবিত্র হজ ইসলামের মৌলিক ইবাদতের মধ্যে অন্যতম। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত
বিস্তারিত