প্রথম পর্ব

ইস্তানবুলের পথে পথে

নাজমুন নাহার রহমান, চিত্রশিল্পী ও লেখিকা

ঈদের ছুটিঁতে স্বপরিবারে তুরস্কের রাজধানী ইস্তানবুলে গিয়েছিলাম। যার আবেশ এখনো মনের কোনো মৃদুবাতাসের শিহরণ দিয়ে যাচ্ছে। ইস্তানবুল একটি প্রচীন শহর। তাই ভাবছি এ শহরে বেড়ানোর স্মৃতি নিয়েই আজ লিখবো।

ঈদের একদিন পর পরিবারের সকলকে নিয়ে তুরস্কে রওনা হলাম। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা। ঢাকা থেকে বিমানযোগে সরাসরি ইস্তানবুল। ইস্তানবুল শহরটির এক পাশে মারমারা সাগর, অপর পাশে ফসফরাস প্রণালী। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আপনার চোখের সামনে চলে আসবেঘন নীল সাগর। দেখে মনে হয় কেউ যেনো ঘননীল রং এই বিপুল জলরাশীতে ঘুলিয়ে দিয়েছে।

বিমানের জানালা দিয়ে এ দৃশ্য দেখে আপনার দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিই দূর হয়ে যাবে। সারাদিন সাদা ও ধুসর রংয়ের সীগাল পাখিগুলো আশে পাশে উড়ে ও ঘুরে বেড়াবে যা দেখে আপনার মন প্রশান্তিতে ভরে উঠবে। মনে হবে হাত বাড়ালেই এসব পাখী ধরা যায়। কিন্তু হাত বাড়াতেই তারা পাখা মেলে সেই নীলসাগরেই দেবে ফুড়ুৎ।

ইস্তানবুল একটি পর্যটক বহুল শহর। এখনে সরা বছরজুড়েই পর্যটকদের আনা গুনা। এ শহরের মানুষগুলোও তা ধারণ করে। তারা অতিথী পরায়ণ, আন্তরিক। পর্যটকদের সাহায্য করে ভালবাসে। রাস্তায় অপরিচিত কারোর সাথে দেখা হলেই সালাম বিনিময় করবে এবং আপনি কিছু জানতে চাইলেই হাসি মুখে উত্তর দেবে। চা পানের আমন্ত্রণ জানাবে।

এ শহরে দেখার ও জানার মতো অনেক কিছুই আছে। তবে মাত্র তিন দিনের সফরে আমাদের অনেক কিছুই দেখা সম্ভব হয়নি। এক কালে আমাদের বাংলাদেশসহ তিন মহাদেশ শাষণ করতেন তুরস্কের সুলতানরা।

একদিকে, এশিয়ার প্রায় সকল দেশ, অপরদিকে ইউরোপের হাঙেগরী থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত দেশটির উসমানীয় সুলতানদের সাম্রাজ্য ছিল। তাদের শাসন কালছিল ১২৯০ থেকে ১৯২৪ সালে ৩ এপিল পর্যন্ত। প্রায় ছয়শ বছর। যা মুসলিম শাসন যুগের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ইতিহাসে এই শাসনকালকে বলে ‘আটোম্যান’দের শাসনকাল।

সফরের প্রথম দিন আমরা গেলাম লিটল আয়াসুফিয়া মসজিদটি দেখতে। এটি ৬ষ্ঠ শতাব্দিতে নির্মিত। অর্থাৎ প্রায় ১২শ’ বছর আগে নির্মিত। কিন্তু স্থাপত্যটি এখনো বিরাজমান। এর গাঁয়ে রোমান কারুচার্য এখনো জ্বলজ্বল করে। এর নির্মাণ শৈলী ও সৌন্দর্য মানুষকে বিমোহিত করে।

প্রথমে বাইজেন্টাইন শাসকরা এটি একটি গির্জারূপে তৈরি করলেও অটোম্যান বাউসমানীয় শাসকরা কনস্টিটাইনো পাল বিজয়ের মধ্য দিয়ে একে মসজিদে রপান্তর করে।

মসজিদে সকলেরই প্রবেশাধিকারআছে। যেমন নারী, পুরুষ ও পর্যটক। পর্যটকরা যে ধর্মেরই হোক না কেন এখানে ঢুকতে পারবে। উপভোগ করতে পারবে এর কারুকার্য ও নির্মাণ শৈলী।

এখানে আমরা সপরিবার আছরের নামাজ আদায় করলাম। মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল। কেননা মসজিদে গিয়ে একজন মুসলিম নারী নামাজ আদায় করবে- যা তার জন্মগত অধিকার। এ সুযোগ আমার দেশের মসজিদগুলোতে রাখা হয়নি। অথচ তারা ও আমরা উভয়ই মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। মসজিদে আমি দেখলাম কিশোরী, বাচ্চা বৃদ্ধ ও মধ্য বয়সী সকলেই নামাজ আদায় করছেন। এর অনুভূতি আসলেই প্রকাশ করা যায় না -এতোই আনন্দের!

নামাজান্তে পাশের পার্কে বসে স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে কিছু সময় আলাপ করলাম। আড্ডা আরকি। চা পান করলাম। ইস্তানবুলে না গেলে আমি জানতানই না এখানে কত প্রকারের চা পাওয়া যায়। আমরা ধারণা ছিল কেবল আমাদের দেশ ও ভারতে বিভিন্ন প্রকার চা পাওয়া যায়। ইস্তানবুলে আমরা প্রমিগ্রেন্ড, আপেল রোজ এবং ঐতিহ্যবাহী টার্কিশ চা পান করে আনন্দ লাভ করেছি। লিটল আয়া সোফিয়ার পাশেই খাবার হোটেল। সেখানে রাতের খাবার শেষ করে হোটেলে চলে গেলাম। সারাদিনের ক্লান্তিতে এক ঘুমেই রাত পার হলে গেল।

দ্বিতীয় দিনে আমরা গেলাম অটোম্যান সম্রাটদের রাজ প্রসাদ ‘তোপকাপিপ্রসাদ’ দেখতে। তোপকাপির ইংরেজি হচ্ছে ‘ক্যানন গেট’। এটি ১৪৫৩ সালে নির্মিত। সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ ইস্তানবুল জয়ের ৬ বছর পর এ প্রসাদটি নির্মাণ করেন। এ প্রাসাদটি মুসলিম স্থাপত্যের এক মূলবান নিদর্শন। বিশ্বের বিভিন্ন পর্যটক, শিল্পী ও ইতিহাস বিদদের কাছে এ প্রাসাদটি একটি তীর্থ স্থানও বটে!

এ প্রাসাদের ভেতরে জাদুঘর, হেরেম, রন্ধনশালা, সুলতানের রাজসভা ও বেগম সাহেবার সভা ঘর রয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন মহল। এ বিশালতা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভাব। অটো ম্যানদের সেই যুগে এ প্রাসাদে চার হাজার লোকের জন্য প্রতিদিন রান্না হতো।

জাদুঘরটি রীতি মতো এক বিস্ময়! এখানে রয়েছে মুসা (আ:) এর ব্যবহৃত লাঠি। যার দ্বারা তিনি মহান আল্লাহ’র হুকুমেনীল নদের পানি দ্বিখন্ডিত করে তার মধ্য দিয়ে হেটে নদী পার হয়ে ছিলেন। তাঁকে ধাওয়া করতে গিয়েই ফেরাউন নদীতে ডুবে মারা যায়। এ ঘটনাটি পবিত্র আল কোরআনের সুরা কাসাস-এ উল্লেখ করা হয়েছে।

আরো আছে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) এর দুধ খাওয়ার বাটি, দন্ত ও চুল মোবারক। আছে মা ফাতেমা (রা:) ও তাঁর প্রিয় পুত্র ইমাম হোসাইন (রা:) জামা। শেষ খলিফা হযরত আলী (রা:) তরবারি ও নিজ হাতে লিখিত পবিত্র কোরান শরীফটিও এখানে সংরক্ষিত।

আছেম হানবী (সা.) ব্যবহৃত ও তার পরবর্তী খলিফাদের ব্যবহৃত তরবারি। আরো আছে পবিত্র কাবা ঘরের সোনার চৌকাঠ ও হাসরে আসোয়াত পাথরের রুপার তৈরি খাপ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে অটোম্যান শাসকদের তরবারি, যুদ্ধের পোশাক, মুকুট ও বিজয়ী দুর্গের চাবিও এখানে আছে।

এসব নিদর্শন নিজের চোখে দেখার অনুভূতিই আলাদা। সে অনুভূতি ভাষায় লিখে প্রকাশ করা আমার জন্য সত্যিই এক দু:সাধ্যের বিষয়। প্রাসাদের ভেতরের গোলাপ বাগানটিও যে কাউকে আনন্দ দেবে। গোলাপ বাগানের পাশের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় গিয়ে দাঁড়ালে মারমারা সাগর নয়ন জুড়িয়ে দিল।

প্রসাদ ও হেরেম এ প্রবেশ করতে আলাদা আলাদ টিকিট কাটতে হয়। প্রতিটি টিকিটের দাম ৩৫ টার্কিশলিরা। বাংলাদেশী টাকায় ৫২৫ টাকা।

লেখক-নাজমুন নাহার রহমান, চিত্রশিল্পী ও লেখিকা।


মাদকমুক্ত বরগুনা গড়তে প্রয়োজন সম্মিলিত
বরগুনা আমাদের আবেগ ও অনুভূতির জায়গা। এখানে বেড়ে ওঠা প্রতিটি
বিস্তারিত
৩৮ লাখ বছর আগের মাথার
আবিষ্কার হওয়া মাথার খুলি তৈরি করেছেন এক শিল্পী। আনামেনসিস দেখতে
বিস্তারিত
কেমন হবে মশার কার্যকর ও
বর্তমানে মশা বা মশাবাহিত রোগ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশসহ দক্ষিনপূর্ব
বিস্তারিত
আগস্ট শুধু শোকই নয়
পরাধীন বাংলার গণমানুষের এক সময় প্রাণের দাবী ছিল স্বাধীনতা। মানুষ
বিস্তারিত
শিশু কথা বলে না! কান
আপনার সন্তান যদি ২/৩ বছর বয়সেও কথা বলতে না শেখে,
বিস্তারিত
১৫ আগস্ট: বঙ্গবন্ধুর ২০ উক্তি
আজ জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্তে
বিস্তারিত