গাজী আবদুল্লাহেল বাকীর রুবাইয়াতে রূপ ও রঙ

গাজী আবদুল্লাহেল বাকীর রুবাইয়াত মিলবিন্যাস, ছন্দ, বিষয়-বৈচিত্র্য ও আঙ্গিক শোভনে নতুন মাত্রা পেয়েছে। শরাব-সাকী-প্রিয়া-এসব উপকরণ তো আছেই, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে আধুনিক যাপিত জীবনচিত্র ও বাস্তবতাবোধ। এসব বিষয় রুবাইয়াতের আদলে সাজানো হলেও শব্দ ও পদবিন্যাস, বাকভঙ্গি নতুনতর দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকাশ পেয়েছে। বেশিরভাগ রুবাইয়াত প্রতীকধর্মী। চেনা-অচেনা শব্দ এ প্রতীকের প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে এ চতুষ্পদী কবিতা নতুন এক ব্যঞ্জনা পেয়েছে। কোথাও বা পাঠকের কাছে শব্দের চমক লাগে, আবার কোনো বর্ণনায় ধীর-শান্ত ও ব্যাকুল ভাবনা এক বিস্ময়ের ভুবনে এনে হাজির করে দেয়।

বাকী বাংলা শব্দের সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দের মিশেল করেছেন অবলীলায়। আরবি-ফারসি-হিন্দি-তৎসম-তদ্ভব-দেশি শব্দ মিশে একাকার হয়ে ভাবকে গতিময় করেছে, যা গভীরতর অনুভবকে নাড়া দিতে পারে সহজে। মুসলিম জীবনের ঘরোয়া ঐতিহ্য মিশ্রিত শব্দ চিক চিক করে আলো ছড়িয়ে দেয় কবিতার স্নিগ্ধ পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে। যেমন :
‘তম্বী সাকীর আনন খানি সুগন্ধময় ফেরদৌস
 অক্ষি দুটি ঐশী নাহার তরতরিয়ে ধায় ঢাউস।
 অধরদুটি কাউসারের কূপ হিম-শীতলের শরাব-নীর
 পৃথীবী মাঝে বিত্ত এসব আর যদি পাই দিল-তাউস।’
‘র‌্যাবো তার স্বরমালায় লিখে রাখেন, আ কৃষ্ণ, অ শ্বেতবর্ম, ই-রক্ত, উ-সবুজ, ও-নীল। যদি বর্ণের এত রূপ রঙ, তবে শব্দে আর শব্দের পরম্পরায় আরও কিছু আছে নিশ্চয়ই, দৃশ্যতই কবিতা একটা প্রকৃতি গঠন অর্জন করে নেয়, কবি তাই তাকে ভেঙে ভেঙে নিত্যনতুন গড়েন বানান।’ রুবাইয়াতের বেলায় একথা প্রযোজ্য। এর পঙ্ক্তি কখনও কখনও অন্যজাতের শব্দের পাশে দু-একটি লোকজ শব্দ উঁকি মারে। জানান দেয় নিজের অস্তিত্বকে, যা রুবাইয়াতকে আধুনিকতার দিকে একধাপ নিয়ে গেছে। 
তার রুবাইয়াতে এসেছে লোকজ শব্দের ব্যবহার, যা এ কবিতার বিষয়কে আরও স্বচ্ছ করেছে, বুঝিয়েছে বেশি। কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারেন কাব্য-সৌন্দর্যের ঘাটতি হয়েছে, গভীরতার দিকটা খানিকটা ক্ষুণœ হয়ে পড়েছে। আসলে পদ্য ও কবিতার মধ্যে অনেকটা অনিরূপিত ব্যবধান থাকে। কবিকে তা অনুভব করতে হয়। এ ক্ষেত্রে শব্দ একটি বিশেষ বিষয়ও। পদ্য ঘরের মেয়ে আর কবিতা অচিন ঘরের বউ। বউকে জড়োয়া-অলংকার পরে সেজেগুজে থাকতে হয়, বাড়ির মেয়ের মতো সবকিছু করা যায় না, কবিতারও সেই অবস্থা। কিন্তু নিত্য গৃহকর্মের প্রয়োজনে এ পোশাক রেখে সাধারণ পোশাক পরা লাগে। তেমনি ভাবকে আরও অন্তরগামী করতে পোশাকি শব্দের পাশে লোকজ শব্দ প্রয়োগ করতে হয়। এতে বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। লোকঐতিহ্য সফলভাবে ধারণ করতে পেরেছে রুবাইয়াত, যা একেবারে নতুন। একই শব্দের ভিন্নতর অর্থ হয় এবং ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন শব্দকে প্রয়োগ করলে কবিতার উৎকর্ষতা বেড়ে যায়। যেমনÑ ‘বর’ শব্দটি। ‘বর’ হলো উপহার (আশীর্বাদ), ‘বর’ হলো শ্রেষ্ঠ, আর বর মানে নওশা বা দামান। শেষের অর্থটিই বাঙালি সমাজ জীবনের ঐতিহ্যকে বেশি প্রকাশ করে। তেমনি রুবাইয়াতের কবি যখন বলেন, ‘দাপ-দাপানি’ (২৭৫/১), ‘জারিজুরি’ (৩৯৮/১), ‘হুরছুড়ি’ (৪০৭/১), ‘গতরগা’ (৭৪১/১) অথবা এ রকম আরও একগুচ্ছ লোকজ শব্দ তখন কবিতার আঙিনায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে লোকজীবনের নিখাঁদ বাস্তবতার অনুভব। এসব লোকজ শব্দের প্রমিত বাংলা শব্দ হয়তো খুঁজে পাওয়া যেত; কিন্তু বিষয়কে তুলে ধরার জন্য যে অকৃত্রিম অন্তরঙ্গতা দরকার তা ব্যাহত হতো। ‘হুরছুড়ি’ ও ‘গতরগা’-এর বিকল্পে মার্জিত শব্দ ‘হুরকন্যা’ ও ‘শরীরকায়া’ ব্যবহার করলে করা যেত ঠিকই কিন্তু তাতে অর্থের স্বচ্ছতা ও পূর্ণতা আসত না। বক্তব্য সপ্রাণ হতো না। নতুন মাত্রার আবেদন সৃষ্টি করতে পারত না। এছাড়া শব্দের শ্লীলতার সীমা পেরুনোর কথা তুললে বলা যায়, শিলা শ্লীল-অশ্লীলের তোয়াক্কা করে না, যা মানবিক, লৌকিক ও হৃদয়জাত তাই শিল্পিত করার দায়িত্ব শিল্পীর, কবির। রুবাইয়াতের এসব লোকজ শব্দের সঙ্গে পাঠক একাত্ম হতে পারে, নতুন সান্নিধ্য তৈরি হয় তার সঙ্গে। এখানে একমুঠো লোকজ শব্দের পঙ্ক্তি দেখানো হলো :
পালানোর পথ নেইকো কোথা চারিদিকে উতলা ঢেউ,
দাপ-দাপানি ঐখানে শেষ অগত্য শের হয় যে নতি। [২৭৫/১]
এক যে আছে কক্ষ কাচের তৈরি মাটির মহল ঘেরা,
জ্বলছে প্রদীপ তারই খোপে জলদ আড়ে বিজলী চেরা। [৮০৪/১]
রক্তজবার লাল আলোয়ান মউ নহরের পোশাক-পাট,
পক্ব আনার ছানলে পরে আমেজ গন্ধে মন ভরাট। [৭৪১/১]
দগদগে ঘা সারার আগে পড়ল আরেক খাঁড়ার ঘা,
এ সংসারে এমন কষ্টে জীবাত্মা আর গতর-গা। [৭৫৯/১]
উড়াল ছন্দে বাজায় বীণা গাছাল ঝিঁ ঝিঁ মৌ পোকারা। [৭৬২/১]
জোড়াতালির জরিন ফিতায় বাঁধা থাকে মিঞা বিবি, [৪৯/২]
ধ্যান-ধারনার চিত্তমূলে রয় যে খালি হা-হুতাশ, (’খালি’ অর্থ শূন্য নয়। এখানে ‘কেবল’ অর্থে ব্যবহৃত। উপভাষার শব্দ।) [৩৬৮/১]
যায় না চেনা যায় না বোঝা তা সে হাজার জারিজুরি, [৩৯৮/১] 
ফালতু বচন ছেড়ে দিয়ে প্রেমের গানে যাও ভেসে,
তোমার সুরের আকর্ষণে উঠবে নেচে হুর-ছুড়ি। [৪০৭/১]

রুবাইয়াতের মৌলিক কাঠামো বুকে নিয়ে ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে। পুরো কাব্যই স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত। চারমাত্রার পর্বে ভাগ করা যায়। সব বদ্ধাক্ষর এখানে এক মাত্রার মর্যাদা পায়। পঙ্ক্তি শেষে অপূর্ণ পর্বও চোখে পড়ে। কবি নজরুল কর্তৃক খৈয়ামের অনুবাদে এ একই ছন্দ কাঠামো পরিলক্ষিত হয় : 
‘মাফ করে দাও/মহান খোদা/অধম বাকীর/এই আরজ
কবুল করে/নাও গো সেজদা/দাও গো করে/দিল সহজ।
তোমার পথে/চালাও খোদা/আমি পাপী/দীন ফকির,
পারি নাকো/করতে পালন/তোমার আদেশ/সব ফরজ। [৭৬৬/২] 
মাত্রাবিন্যাস: ৪+৪+৪+৩ (অপূর্ণ পর্ব) 
৪+৪+৪+৩ (অপূর্ণ পর্ব)
৪+৪+৪+৩ (অপূর্ণ পর্ব) 
৪+৪+৪+৩ (অপূর্ণ পর্ব)
তবে পূর্ণ পর্বের পঙ্ক্তি রয়েছে বেশি। সে ক্ষেত্রে সব ক’টি পর্বই পুরোপুরি চার মাত্রার মর্যাদা নিয়ে বসেছে :
সাকীর করে/চুমলে শরাব/ভবিষ্যতের/ভাবনা উধাও/
অমরালয়/খোঁজে জীবন/লক্ষ তারার/ফুলে ভরাও।/
অপার্থিবের/দ্বার খুলে যায়/রেণুর ঝালর/উড়তে থাকে/
মৌন আঁচল/ছিন্ন করে/প্রণয় সাকীর/দেলে জাগাও/ [৮/১]
মাত্রাবিন্যাস : ৪+৪+৪+৪; ৪+৪+৪+৪; ৪+৪+৪+৪; 
৪+৪+৪+৪।
স্বরবৃত্তছন্দের জন্য রুবাইয়াতের লয় বেশ দ্রুত। সরব পাঠ একটু তাড়াতাড়ি হয়। বাকভঙ্গি কথ্যরীতির; যাতে ঘরোয়া ঢং অনুসৃত।
বাকীর রুবাইয়াত নানা অলংকারে ঋদ্ধ হয়ে উঠেছে। শব্দালংকার ও অর্থালংকার দু-ই রয়েছে যা অনন্য ও সুখপাঠ্য। শব্দালংকারের মধ্যে অনুপ্রাসের ব্যবহার চোখে পড়ে। ধ্বনির ব্যঞ্জনায় মুখর হয়ে ওঠে কবিতার পঙ্ক্তি।
বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণের শুরু ‘ক’ দিয়ে। এই ‘ক’কে কয়েকটি কিসিমে শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থে প্রকাশ করেন কবি। সৃষ্টি হয় এক অনবদ্য অনুপ্রাসের অনুনাদ :
‘কৌটিল্য মন কৌশলী নয় কোষ্টি বিচার কুহেলীময়,
কোঁচড়ভরা দল-কোকনদ কেলিগৃহে কুরসিপায়।
কুসংস্কারের কুহর হতে ক্লাসিক ক্রিয়ায় ঘটলে ক্রান্তি,
কুল কুশীলব কুযশ মুক্ত থাকতে কোমল কুরছিনামায়। 

রুবাইয়াতে রূপকের ব্যবহার সবখানে। বস্তুর সঙ্গে বস্তুর অভেদ কল্পনা করতে দেখা যায়। রূপকের ব্যঞ্জনা বিমোহিত করে বার বার। একমুঠো রূপকের উদাহরণ :

‘লজ্জা ভেঙে বলবো কতো ঘোমটা খোলো সুন্দরী!
বোঝে না সে আত্মভোলার হৃদ-কমলের অসীম সুখ।’ [৩৯৬/১] 

কাব্যের রঙিন ভুবনে উপস্থিত হয় অসংখ্য চিত্রকল্প। টুকরো টুকরো ছবি ভেসে ওঠে পাঠকের কোমল মনের পর্দায়। তাকে এক মুহূর্তেই নিয়ে যায় অসীম চেতনালোকের স্বপ্নঘেরা সীমানায়। নিসর্গের সঙ্গে মিশে যায় অবুঝ প্রাণীও। কবি প্রিয়ার সঙ্গে একাত্ম হয়। প্রেম ও সংরাগে উন্মাতাল হয় সবাই :
‘নিসর্গের নীল তরুনপথে প্রিয়া যখন থমকে চলে, 
পুষ্পলতা নোয়ায় মাথা সুবাস ছড়ায় বকুল তলে।
ঝিঁঝিরা সব গান গেয়ে যায় জানায় কুশল বুলবুলিরা,
মিনেরা সব ঘিরে ধরে প্রিয়া যখন ঝর্ণা জলে।’ [৬১৩/২]
বাকরীতি আধুনিক গদ্যের বিশিষ্টতাকে চিহ্নিত করে। পদ্যেও এর প্রয়োগ হয়েছে। তবে কথাকে গতিময় করা বাকরীতির আসল লক্ষণ। বাকীর রুবাইয়াত বাকরীতির গতিতে উচ্ছল, উচ্চকিত। বলা যায়, এক ধরনের বাচনভঙ্গি তার এ চতুষ্পদী কবিতাগুলো বুকে ধারণ করে আছে। মুখর হয়ে ওঠে তার পঙ্ক্তির শব্দালি। কবিতা পাঠককে নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত করে। মনে হয় যেন কথায় কথায় সাজানো পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি। কবি নিজেই উচ্চরণ করেন কোনো কোনো বিষয়, যা তার নিজের হয়েও পরে সবার হয়ে যায়। ব্যক্তি আবেগ আরোপ করেন নিজস্ব বৃত্তের ভেতর থেকে। কিন্তু তা উপভোগ করতে পারে সর্বজন। বিদগ্ধ পাঠকের বোধে তার অনুরণন হয়, আর তার ছবি বিস্মিৃত হয় হৃদয় মুকুরে। 
তার বাকরীতির সঙ্গে এসেছে প্রতীঈ শব্দ, যা আলাদা এক ব্যঞ্জনায় মুখরিত। কখনও ইঙ্গিতবাহী, কখনও রহস্যে ঘেরা। ভাবনা দিগন্তজোড়া কুয়াশায় আবারিত। সব মিলিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এ রুবাইয়াতের জন্য কবির প্রতি রইল সশ্রদ্ধ ধন্যবাদ।


প্রসন্ন সাঁঝের পাখি ও ভয়াল
পাটাতনে বসে আহত পালাসি-গাঙচিল বিস্ফারিত নয়নে আমাদের দেখছে। ধীরে ধীরে
বিস্তারিত
জল : ০১
কাজল কাননে পায়ের আলোতে রবির ঘুম ভাঙে রোজ যাপিত সংসার সুখ-দুখে
বিস্তারিত
মাঝ রাতে মির্জা গালিবের শের
আরেক বার দেখা হলে অশুদ্ধ কিছু হবে না মহাভারত, চাই
বিস্তারিত
১৪ বছর বয়সি
রেখা এখন ক্লাস টেন, ক্লাস সিক্স থেকে শুরু হওয়া অপেক্ষা
বিস্তারিত
তুমি যদি এসে
এইসব শিশির ভেজা ফসলের মাঠ নতুন ভোরের সোনালি রোদ্দুর  কৃষকের হাসিমাখা
বিস্তারিত
দেহের নিমন্ত্রণে
কেউ ডাকে দেহের নিমন্ত্রণে কেউ প্রেমেরÑ সঙ্গোপনে কেউবা নিছক খেয়ালের বশে
বিস্তারিত