মৌরিতানিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

পরিবর্তনের সুযোগ কি তবে হাতছাড়া হলো?

২২ জুন মৌরিতানিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। বর্তমান শাসক দলের প্রার্থী মুহাম্মদ ওয়ালাদ আল-গাজওয়ানি প্রথম পর্বেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়লাভ করেন। ১৯৭৮ থেকে ২০০৮ ধারাবাহিকভাবে সামরিক অভ্যুত্থানের পর এবারই প্রথম শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হতে যাচ্ছে।
তবে ২০০৭ সালে একবার মৌরিতানিয়ায় প্রথম বেসামরিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। কিন্তু ২০০৮ সালে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ ওয়ালাদ আবদুল আযিয বর্তমান প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হন। সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ ওয়ালাদ আবদুল আযিয আফ্রিকান ইউনিয়ন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত মৌরিতানিয়ার বিরোধী দলের কাছে নত হতে বাধ্য হন। দেশকে গণতান্ত্রিক পথে ফিরিয়ে আনতে সামরিক বাহিনী নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। যদিও মুহাম্মাদ ওয়ালাদ আবদুল আযিয সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হন এবং ২০০৯ ও ২০১৪ সালে দুই বারই নির্বাচিত হন। অবশেষে সাংবিধানিক কারণে ২০১৯ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। তবে তারই সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং প্রায় প্রতিটি অভ্যুত্থানে তার সঙ্গী মুহাম্মাদ ওয়ালাদ আল-গাজওয়ানি এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হন।
বর্তমান শাসক দলের জয়ের কারণ : ২০১৯ সালের নির্বাচনে ২০১৪ সালের তুলনায় অধিক ভোট কাস্ট হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ ওয়ালাদ আল-গাজওয়ানি প্রথম পর্বেই ৫২.০১ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। প্রশাসন, গোত্র ও সুফি জামাতের সমর্থনের কারণে তিনি সহজেই ভোটবাক্স ভর্তি করতে সক্ষম হন। তিনি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব ও সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকার কারণে সাবেক প্রশাসনের দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন। মৌরিতানিয়ার সুফিবাদ সংশ্লিষ্ট সম্ভ্রান্ত ধর্মীয় পরিবারের সন্তান হওয়ার পাশাপাশি দেশের উত্তরের সংখ্যাগরিষ্ঠ জাহবি গোত্রের হওয়ায় তাদের সমর্থনও পান। তা ছাড়া এ নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের প্রভাব ও তাদের রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এদিকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ও পুরোনো বিরোধী দলের শক্তিক্ষয়ও অন্যতম কারণ।
প্রশাসন কাঠামো ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব : স্বাভাবিকভাবে মনে হচ্ছে, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্পেস বাড়বে। তবে প্রয়োজনে যে দমনপীড়নে পিছপা হবে না বর্তমান সরকার, তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ, নির্বাচনের পর বিরোধীরা নির্বাচনী অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ তুললে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা-ের অজুহাতে রাস্তায় রাস্তায় সেনা মোতায়েন করা হয়। বিরোধী নেতাদের আটক করা হয়। তাদের অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব কিছু এই বার্তাই দেয়, যে কোনো সংকট মোকাবেলায় বর্তমান প্রশাসন তার পূর্বসূরি থেকে ভিন্ন হবে না।
তবে কারও কারও মতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিত্ব ও সম্ভ্রান্ত মানুষ হওয়ার কারণে মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনাও আছে। তাছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় সম্মিলিতভাবে দেশ গঠনের প্রতিশ্রুতিতে অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনে তিনি আগ্রহী হলেও সামরিক বাহিনীর পূর্ব আনুকূল্যের কারণে তার দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া ও মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়তো কঠিনই হবে।  
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধারণত মৌরিতানিয়া সবসময় নিরপেক্ষ থাকা পছন্দ করে। বিভিন্ন সংকটে মধ্যস্থতা করে। তবে কাতার অবরোধে মৌরিতানিয়া অবরোধকারী দেশগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের নিকটতম বন্ধু মুহাম্মাদ ওয়ালাদ আবদুল আযিয তার সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে কাতারের প্রতি বৈরিতা দেখিয়ে বলেন, আরব বসন্তের পরপরই আমি কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চেয়েছিলাম। মনে হচ্ছে, তিনি তার উত্তরসূরিকে তার রাজনৈতিক দর্শন অব্যাহত রাখার একধরনের আহ্বান রাখলেন। তাছাড়া বর্তমান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আবুধাবির যুবরাজ বিন যায়েদের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে। ফলে, ধারণা করা যায়, মৌরিতানিয়া সৌদি ও আমিরাতের অক্ষ হতে বের হবে না।
রাজনীতির মাঠে সাবেক প্রেসিডেন্টের বর্তমান ভূমিকা : বর্তমান প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী প্রচারণায় সাবেক প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। এটা বর্তমান প্রেসিডেন্টকে অতিরিক্ত সুবিধা এনে দিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অব্যাহত রাখার কথা গোপন রাখেননি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয় বরং দেশের জন্য শাসক দলের নেতৃত্ব দিয়ে দেশের সেবা করে যেতে চান। যেমন তিনি তার বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘তিনি প্রাসাদের ভেতর-বাইরে উভয় জায়গা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রকল্প দেখভাল করবেন।’ এটাকে অনেকেই ব্যাখ্যা করেন এভাবে যে, তিনি হয়তো বর্তমান সরকরের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতে চান, যাতে তার সময়ে বিভিন্ন দুর্নীতির দায়ে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে না হয়।  
নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশের প্রতিক্রিয়া : দেশের বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। তারা কারচুপি, নির্বাচনী পরিষদে একচেটিয়া সেনাবাহিনী ও শাসক দলের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অভিযোগে রাস্তায় নামার ঘোষণা দেয়। যদিও সরকারের ইন্টারনেট বন্ধসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করার কারণে তারা তা করতে পারেনি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠী সবাইকে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের প্রতি গুরুত্বারোপ করে। এদিকে আরব আমিরাত, মরক্কো ও স্পেন নির্বাচনে মুহাম্মাদ ওয়ালাদ আল-গাজওয়ানিকে অভিনন্দন জানান।
পরিশিষ্ট : বস্তুত গণতান্ত্রিক প্রস্থানে নির্বাচনই প্রকৃত মাধ্যম। তবে মৌরিতানিয়ায় সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন কঠিন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ, সামরিক বাহিনী এখনও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বজায় রাখতে আগ্রহী। নির্বাচনের ফলাফলে তারা বেসামরিক শক্তির পরিবর্তে উর্দিতেই বেশি আগ্রহ রাখে। এখানে এসে সবার সামনে চলে আসে ২০০৮ সালে মৌরিতানিয়ার প্রথম বেসামরিক নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাচ্যুতির কথা। যদিও এখানে ব্যালটবক্সের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হচ্ছে সামরিক বাহিনীর অফিসারদের মধ্যে। 
এখন দেখার বিষয়, বর্তমান মৌরিতানিয়ার প্রশাসন কি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চাপ প্রশমনে প্রশাসনে বেসামরিক শক্তিকে আনার মাধ্যমে ব্যালেন্স করবে নাকি তার পূর্ববর্তীর দমনপীড়ন ও দুর্নীতির পথ অবিরত রাখবে!
হ সূত্র : নিউ অ্যারাব আরবি


তাওয়াফের কিছু ভুলত্রুটি
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি কাবা ঘরে ঢুকে সালাত আদায় করতে
বিস্তারিত
ইসলামে নৈতিকতার চর্চা
ইসলাম মহান আল্লাহপাকের দেওয়া এক পূর্ণাঙ্গ পরিপূর্ণ ও প্রগতিশীল জীবন
বিস্তারিত
ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি আচরণবিষয়ক সেমিনার
গেল ১২ জুলাই সন্ধ্যায় ফিকহ একাডেমি বাংলাদেশ কর্তৃক ফিকহবিষয়ক চতুর্থ
বিস্তারিত
বিদায় হজের ভাষণে জানমালের নিরাপত্তার
মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজে আরাফার দিন উরনা উপত্যকায় নিজ
বিস্তারিত
মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিমের সমর্পিত
হজের মৌসুম এলে হৃদয়পটে যার স্মৃতি ঝলমল করে তিনি ইবরাহিম
বিস্তারিত
তামাত্তু হজের সহজ নিয়ম
পবিত্র হজ ইসলামের মৌলিক ইবাদতের মধ্যে অন্যতম। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত
বিস্তারিত