খুনখারাবি রোধে কিসাসের বিধান

‘হে ঈমানদাররা, তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির বদলায়, দাস দাসের বদলায় এবং নারী নারীর বদলায়। অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেওয়া হয়; তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালোভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব। হে বুদ্ধিমানরা, কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৭৮-১৭৯)

বিশ্বের সর্বত্র অন্যায়ভাবে মানব হত্যা এবং এ সংক্রান্ত অপরাধের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সর্বদা উৎকণ্ঠিত থাকতে হয় কখন কী হয়, তা নিয়ে। কারণ কেউ এখন নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছে না। এর ভয়াবহতা থেকে রক্ষার জন্য সচেতন মহল এর প্রতিরোধের নানা উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। খুনখারাবির মতো জঘন্য অপরাধের প্রতিকার হিসেবে কোরআনের একটি পন্থা হলো ‘কিসাস’। মূলত মৃত্যুর বিনিময়ে মৃত্যু কিংবা কোনো ধরনের জখমের বিনিময়ে অনুরূপ জখমের পরিভাষা হলো ‘কিসাস’ বা ‘অনুরূপ প্রতিবিধান’। ইসলামি অপরাধ আইনের গুরুত্বপূর্ণ এ পরিভাষাটি সরাসরি কোরআন ও হাদিসে ব্যবহৃত হয়েছে। 
উল্লেখ্য, ইসলামি অপরাধ আইনে তিন ধরনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যথা : ১. কিসাস (অনুরূপ প্রতিবিধান), ২. হুদুদ (আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি দ-বিধি) এবং ৩. তাজির (ভীতিপ্রদর্শনমূলক শাস্তি)। এসব শাস্তির মূল উদ্দেশ্য হলো : ১. অপরাধীকে শোধরানো, ২. ক্ষতিগ্রস্তদের সান্ত¡না এবং ৩. অন্যদের নিরুৎসাহিত করা। 
কিসাস মূলত কয়েকটি অপরাধকে অন্তর্ভুক্ত করে : ১. হত্যা (ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃত উভয়ই), ২. উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানবতাবিরোধী এমন অপরাধ, যা মৃত্যু কিংবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে, ৩. ভুলকৃত হত্যা এবং ৪. ভুলক্রমে মানবতাবিরোধী এমন অপরাধ, যা মৃত্যু কিংবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। 
পবিত্র কোরআনে কিসাসের বিধানের পাশাপাশি তার উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। কিসাসের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে দুটি সূরায় তিনটি আয়াতে বর্ণনা এসেছে। দুটি আয়াতে বিধান এবং অন্যটিতে উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির বদলায়, দাস দাসের বদলায় এবং নারী নারীর বদলায়। অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেওয়া হয়; তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালোভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে তার জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আজাব। হে বুদ্ধিমানরা, কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৭৮-১৭৯)।
অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন, ‘আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমের বিনিময়ে সমান জখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গোনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালেম।’ (সূরা মায়িদা : ৪৫)। 
উপরিউক্ত আয়াত তিনটি থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়। যেমন : ১. ন্যায়বিচার সবার জন্য, ২. ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার আছে বৈধ উপায়ে প্রতিশোধ নেওয়ার, ৩. সমবস্থার প্রতিশোধের বাইরেও শর্তসাপেক্ষে টাকা ও সম্পদের ক্ষতিপূরণও চাইতে পারবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কিংবা তার উত্তরাধিকারীরা, ৪. ন্যায়বিচার অবশ্যই আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী হতে হবে, ৫. আল্লাহর দেওয়া বিধান উপেক্ষাকারীদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং ৬. কিসাসের মধ্যেই অন্যদের জীবনের নিরাপত্তা রয়েছে। 
এখানে একটি প্রশ্ন উঠতে পারে, হত্যাকারীকে হত্যার মধ্য দিয়ে কীভাবে জীবনকে বাঁচানো যায়? উত্তরে বলা যেতে পারে : ১. যখন কোনো অপরাধী ঠিক সমপরিমাণ শাস্তি পাবে, তখন সমাজের অন্য কেউ ওই অপরাধে জড়াতে চাইবে নাÑ এটাই মানব প্রকৃতি। সুতরাং একজনের মৃত্যুদ-ের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের অনেকের জীবনকে নিরাপদ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে ২. ‘হাতের বিনিময়ে হাত’, ‘পায়ের বিনিময়ে পা’, ‘চোখের বিনিময়ে চোখ’ বা অন্য কোনো অঙ্গের বিনিময়ে যদি অনুরূপ শাস্তি অপরাধীকে দেওয়া যায়, তাহলে ওই অপরাধী সমাজের জন্য ন্যায়বিচারের একটি জীবন্ত শিক্ষা হিসেবে কাজ করবে। তখন অন্যরা সেই ভয়াবহতা সরাসরি অনুভব করবে এবং এ ধরনের কোনো অন্যায়ের সঙ্গে কখনও সম্পৃক্ত হতে চাইবে না। 
কিন্তু একটা কথা অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে, তা হলো : ১. কিসাসের শাস্তি কিন্তু কোনো ব্যক্তি দিতে পারবে না। এটির মূল দায়িত্ব সরকার বা বিচার ব্যবস্থার ওপর, ২. প্রত্যেক অপরাধীরই শাস্তি হতে হবে। এটি এমন নয় যে, আপনজনরা শাস্তি পাবে না; কিন্তু অন্যরা পাবে। অর্থাৎ কোনো বৈষম্য করা যাবে না, ৩. অনুরূপভাবে প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার আছে প্রতিশোধ নেওয়ার, ৪. দিয়তের (টাকা বা সম্পদের বিনিময়ে প্রতিশোধ) ব্যাপারে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি আগে থেকেই থাকতে হবে, ৫. অপরাধী যদি ক্ষতিপূরণ দিতে অসমর্থ হয়, তাহলে তার পরিবার এবং পরিবার অসমর্থ হলে সমাজের ওপর, এমনকি পর্যায়ক্রমে সরকারের ওপরও বর্তাবে, ৬. যে কোনো ক্ষতিপূরণ অবশ্যই নির্ধারিত নিয়মনীতির মাধ্যমে এবং বৈধ উপায়ে আদায় করতে হবে। এটি ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হয়ে বরং বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। 
পরিশেষে বলা যায়, সত্যিকার অর্থেই যদি মৃত্যু ও এতদসংক্রান্ত কোনো অপরাধের জন্য সমপরিমাণ প্রতিশোধ অপরাধী থেকে নেওয়া যায়, তাহলে বিশ্বজিৎ কিংবা রিফাতের মতো আর কাউকে অন্যায়ভাবে প্রাণ দিতে হবে না। বর্তমান বাংলাদেশে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যার বিভীষিকা রোধ করতে হলে কোরআনে বর্ণিত কিসাসের বিধান বাস্তবায়ন করার কোনো বিকল্প নেই।


তাওয়াফের কিছু ভুলত্রুটি
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি কাবা ঘরে ঢুকে সালাত আদায় করতে
বিস্তারিত
ইসলামে নৈতিকতার চর্চা
ইসলাম মহান আল্লাহপাকের দেওয়া এক পূর্ণাঙ্গ পরিপূর্ণ ও প্রগতিশীল জীবন
বিস্তারিত
ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি আচরণবিষয়ক সেমিনার
গেল ১২ জুলাই সন্ধ্যায় ফিকহ একাডেমি বাংলাদেশ কর্তৃক ফিকহবিষয়ক চতুর্থ
বিস্তারিত
বিদায় হজের ভাষণে জানমালের নিরাপত্তার
মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজে আরাফার দিন উরনা উপত্যকায় নিজ
বিস্তারিত
মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিমের সমর্পিত
হজের মৌসুম এলে হৃদয়পটে যার স্মৃতি ঝলমল করে তিনি ইবরাহিম
বিস্তারিত
তামাত্তু হজের সহজ নিয়ম
পবিত্র হজ ইসলামের মৌলিক ইবাদতের মধ্যে অন্যতম। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত
বিস্তারিত