মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

দিন-রাতের পরিক্রমার শিক্ষা ও উপদেশ

‘হে আল্লাহ, আপনি জানেন, আমি নদনদীর বয়ে চলা ও বৃক্ষরোপণের জন্য দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে চাইনি, বরং দ্বিপ্রহরের তীব্র গরমের তৃষ্ণা, রাতের কষ্ট সহ্য করা ও জিকিরের মজলিসে হাঁটু গেড়ে আলেমদের সঙ্গে ভিড় করার জন্য বেঁচে থাকতে চেয়েছি।’

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ রাত ও দিনকে পরিবর্তন করেন, তার মধ্যে রয়েছে বুদ্ধিমানদের জন্য শিক্ষা।’ (সূরা নুর : ৪৪)। সময় ও কালের পরিক্রমায় আছে শিক্ষার বিষয়। দিন-রাতের পরিবর্তনে রয়েছে উপদেশ। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই রাত্রি ও দিবসকে পরস্পরের অনুগামীরূপে সৃষ্টি করেছেন তার জন্য, যে উপদেশ গ্রহণ করতে ও কৃতজ্ঞ হতে চায়।’ (সূরা ফুরকান : ৬২)।
অনুগামী শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো একটিকে অন্যটির বিপরীত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। উভয়টিই একে অপরের পরে আসে। একটা আরেকটার পরে। আলো ও আঁধার, হ্রাস ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উভয়ে একটার পরে আরেকটা আসে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি রাত্রির নিদর্শনকে অপসারিত করেছি এবং দিবসের নিদর্শনকে আলোকপ্রদ করেছি।’ (সূরা ইসরা : ১২)। তদ্রƒপ আল্লাহ বলেন, ‘তাদের জন্য একটি নিদর্শন রাত্রি, তা হতে আমি দিবালোক অপসারিত করি, তখন তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।’ (সূরা ইয়াসিন : ৩৭)।
শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুগামী শব্দটির আরও একটি অর্থ হয়, সেটি হলো আল্লাহ দিন-রাতের একটাকে অন্যটার প্রতিনিধি বানিয়েছেন, যেন এক অংশে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত কোনো আমল ছুটে গেলে অন্য অংশে তা পূরণ করা যায়। শাকিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক লোক ওমর ফারুক (রা.) এর কাছে এসে বলল, রাতের বেলায় আমার নামাজ ছুটে গেছে অর্থাৎ রাতের নামাজ, তখন তিনি বললেন, ‘তোমার রাতের বেলায় যেটা ছুটে গেছে তোমার দিনের বেলায় সেটা আদায় করে নাও।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো লোকের রাতের বেলার কোনো নামাজ বা তার কোনো অংশ বাকি থাকলে সে যদি তা ফজরের নামাজ ও জোহরের নামাজের মধ্যখানে পড়ে নেয়; তবে আল্লাহ তার নামাজের প্রতিদান দেবেন। তার নিদ্রা তার জন্য সদকায় পরিণত হবে।’ (মুসলিম)।
এজন্য যে ব্যক্তি বেতরের নামাজ রেখে ঘুমিয়ে পড়ে কিংবা তা পড়তে ভুলে যায় অথবা রোগ বা অন্য কারণে তা ছুটে যায়, তাহলে রাতের বেলা সে যা নামাজ পড়ত সেটা সে দিনের বেলায় পড়বে। প্রতি দুই রাকাতে সালাম দেবে। বেতরের নিয়তে বেতরকে দুই রাকাত বানিয়ে দেবে। আলেমদের পক্ষ থেকে এটা সঠিক একটি মত। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) ঘুম বা রোগের কারণে বেতরের নামাজ ছুটে গেলে দিনের বেলায় তিনি ১২ রাকাত নামাজ পড়তেন।’ (মুসলিম)।
এ আয়াতটির উদ্দেশ্য হলো, আমরা যেন জেনে রাখি, দিন ও রাতের পরিবর্তনে ও সময়ের বৈশিষ্ট্যের তারতম্যে বিশাল বড় ও মহৎ একটি শিক্ষা এবং উপদেশ রয়েছে, যা সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে আল্লাহর বিরাট ক্ষমতা, তাঁর নিরঙ্কুশ ইচ্ছা ও তাঁর অশেষ বড়ত্ব নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানায়। ফলে মুসলিম আল্লাহর কাছে মাথানত করতে বাধ্য হয়। তাঁর সামনে বিনয়ী হয়, যা তার ওপর আল্লাহর প্রতি প্রকৃত মনোনিবেশকে অবধারিত করে দেয়। আল্লাহর সঠিক শরিয়তের ডাকে সাড়াদানকে আবশ্যক করে। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনিই রাত্রি ও দিবসকে পরস্পরের অনুগামীরূপে সৃষ্টি করেছেন তার জন্য, যে উপদেশ গ্রহণ করতে ও কৃতজ্ঞ হতে চায়।’ (সূরা ফুরকান : ৬২)।
ঈমানদার লোকরাই উপকারী উপদেশ গ্রহণ করে থাকে। এ শিক্ষা তাদের জন্য নিজেদের সৃষ্টিকর্তার ভয়ভীতি তৈরি করে। তাঁর শাস্তির ব্যাপারে ভীষণ ভীতি জাগিয়ে দেয়। তাঁর ক্রোধের প্রতি প্রকৃত সতর্কতা তৈরি করে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই রাত ও দিনের পরিবর্তনে এবং আসমান-জমিনে আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার মাঝে খোদাভীরু সম্প্রদায়ের জন্য বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা ইউনুস : ৬)।
তিনি আরও বলেন, ‘তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাতে প্রশান্তি লাভ করতে পার। আর তিনি দিবসকে আলোকিত করেছেন। নিশ্চয়ই এর মধ্যে কর্ণপাতকারী সম্প্রদায়ের জন্য বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা ইউনুস : ৬৭)।
হ্যাঁ, এসব লোকরাই আল্লাহর মহাবৈশ্বিক নিদর্শনগুলো দ্বারা উপকৃত হয়। এগুলো থেকে তারা উপদেশ গ্রহণ করে ও শিক্ষা লাভ করে। ফলে তা তাদের জন্য একনিষ্ঠ ঈমান ও আন্তরিক আমলের ফলাফল বয়ে আনে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি ভেবে দেখে না, আমি রাত সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা তাতে প্রশান্তি লাভ করে। আর দিনকে বানিয়েছি আলোকিত। নিশ্চয়ই তাতে ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে বিভিন্ন নিদর্শন।’ (সূরা নামল : ৮৬)।
তাই হে মোমিন, সময়ের পালা পরিবর্তন থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করুন। সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন, তাঁর আনুগত্য পালনকারী হন এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর অন্যতম দয়া হলো, তিনি তোমাদের জন্য রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাতে প্রশান্তি লাভ করতে পার এবং তাঁর অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার। যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ (সূরা কাসাস : ৭৩)। ইবনে কাসির (রহ.) বলেছেন, ‘অর্থাৎ দিনে ও রাতে বিভিন্ন ধরনের ইবাদতের মাধ্যমে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে।’
সময়ের বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তনের অন্যতম উপদেশ ও শিক্ষা হলো, গ্রীষ্মকালে মানুষ যে তীব্র গরম অনুভব করে এবং এর ফলে ছায়াময় আশ্রয় ও কোমল শীতল বাতাসের অনুসন্ধান করে, তখন মুসলিমের কর্তব্য হলো, এ ঋতু হতে সে জাহান্নামের আগুন ও এর তীব্র তাপের উপদেশ গ্রহণ করবে। এজন্য এমন আমল করবে, যা তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে। আমরা জাহান্নামের আগুন ও তাপ থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাচ্ছি। ‘আর তারা বলেছিল, তোমরা গরমের মধ্যে বের হয়ো না, বলে দিন, জাহান্নামের আগুন আরও বেশি উত্তপ্ত। হায় যদি তারা বোধসম্পন্ন হতো!’ (সূরা তওবা : ৮১)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জাহান্নাম নিজের প্রতিপালকের কাছে অভিযোগ করে বলল, আমার এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলেছে। তখন তিনি তাকে দুটি নিঃশ্বাস ছাড়ার অনুমতি দিলেন। একটি নিঃশ্বাস শীতকালে, আরেকটি নিঃশ্বাস গ্রীষ্মকালে। সেটা তোমরা যে গরম অনুভব কর তার চেয়ে বেশি উত্তপ্ত আর তোমরা যে শৈত্য দেখতে পাও তার চেয়ে বেশি ঠান্ডা।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
তাই আপনারা খুবই দ্রুত, অবিলম্বে প্রত্যেক সৎকর্মের জন্য তৎপর হন, যা আপনাদের মহাপ্রতাপশালী আল্লাহর নৈকট্য প্রদান করবে। যাবতীয় গোনাহ ও ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে সাবধান ও সতর্ক হয়ে যান। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের লেলিহান আগুন থেকে সতর্ক করেছি। সেখানে দুর্ভাগা ছাড়া কেউ প্রবেশ করবে না, যে অবিশ্বাস করেছে ও পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে। খোদাভীরু ব্যক্তিকে সেখান থেকে বাঁচিয়ে রাখা হবে, যে পবিত্র হওয়ার জন্য নিজের সম্পদ দান করে।’ (সূরা লাইল : ১৪-১৮)।
এ কারণেই এ উম্মতের পূর্বসূরিদের তোমরা দেখতে পাবে, তারা আল্লাহকে পূর্ণরূপে ভয় পাওয়ার কারণে সময়ের বিভিন্ন পরিবর্তন থেকে উপদেশ ও শিক্ষাগ্রহণ করতেন। ওমর (রা.) নিজের ছেলেকে ঈমানের বৈশিষ্ট্যের উপদেশ দান করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, তীব্র গরমের দিনে রোজা রাখবে। আবু দারদা (রা.) যখন মৃত্যুশয্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি জানেন, আমি নদনদীর বয়ে চলা ও বৃক্ষরোপণের জন্য দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে চাইনি, বরং দ্বিপ্রহরের তীব্র গরমের তৃষ্ণা, রাতের কষ্ট সহ্য করা ও জিকিরের মজলিসে হাঁটু গেড়ে আলেমদের সঙ্গে ভিড় করার জন্য বেঁচে থাকতে চেয়েছি।’ 
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ও অন্যান্য পূর্বসূরি থেকে বর্ণিত আছে, তারা গ্রীষ্মকালে যখন ঠান্ডা পানি পান করতেন, তখন কাঁদতেন। তারা কাফেরদের প্রসঙ্গে আল্লাহর এ বাণী স্মরণ করতেন : ‘জাহান্নামবাসীরা জান্নাতবাসীদের ডেকে বলবে, আমাদের ওপর পানি অথবা আল্লাহ তোমাদের যা দান করেছেন তা ঢেলে দাও। তারা বলবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদের জন্য এ দুটোকে হারাম করে দিয়েছেন।’ (সূরা আরাফ : ৫০)।

২ জিলকদ ১৪৪০ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


তাওয়াফের কিছু ভুলত্রুটি
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি কাবা ঘরে ঢুকে সালাত আদায় করতে
বিস্তারিত
ইসলামে নৈতিকতার চর্চা
ইসলাম মহান আল্লাহপাকের দেওয়া এক পূর্ণাঙ্গ পরিপূর্ণ ও প্রগতিশীল জীবন
বিস্তারিত
ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি আচরণবিষয়ক সেমিনার
গেল ১২ জুলাই সন্ধ্যায় ফিকহ একাডেমি বাংলাদেশ কর্তৃক ফিকহবিষয়ক চতুর্থ
বিস্তারিত
বিদায় হজের ভাষণে জানমালের নিরাপত্তার
মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজে আরাফার দিন উরনা উপত্যকায় নিজ
বিস্তারিত
মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিমের সমর্পিত
হজের মৌসুম এলে হৃদয়পটে যার স্মৃতি ঝলমল করে তিনি ইবরাহিম
বিস্তারিত
তামাত্তু হজের সহজ নিয়ম
পবিত্র হজ ইসলামের মৌলিক ইবাদতের মধ্যে অন্যতম। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত
বিস্তারিত