প্রসন্ন সাঁঝের পাখি ও ভয়াল রাতের নদী

পাটাতনে বসে আহত পালাসি-গাঙচিল বিস্ফারিত নয়নে আমাদের দেখছে। ধীরে ধীরে এর চোখ থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত ভাবটা চলে গেছে। মনে হয় অনুমান করতে পেরেছে যে তার গলায় ছুরি চালাতে আমরা উৎসাহী নই। এর চঞ্চুর ব্যথা কতক্ষণে প্রশমিত হবে আমরা তাই ভাবছি। দিগন্তে প্রসন্ন সন্ধ্যা নেমে আসছে। পাখির পাশে আমরা সবাই যেন সমাধিস্থ। এক সময় টুক করে ডানা দুটি মেলে পাখিটি বাতাসে ভেসে উঠল। তারপর আমাদের মাথার উপর দিয়ে সজোরে ডানা 

ঝাপটে সে উড়ে গেল দক্ষিণে

বাংলাদেশের উপকূলে আমাদের নিত্য আনাগোনা। পাখি শুমারির জন্য একটানা অনেকটা সময় এখানে থাকতে হয় আমাদের। ঘোলাপানি আর কাদাচরের এই জনবিরল জগতে টিকে থাকার সব রসদ আমাদের সঙ্গে আনতে হয়। শক্তিশালী জোয়ার-ভাটার এ দেশে আসতে আমাদের মতো শহুরে মানুষের মেলা প্রস্তুতি লাগে।  
জানুয়ারি মাসে উপকূলে গেলে ঝড়-বাদল মোকাবিলার জন্য আমাদের প্রস্তুতি কম থাকে। আমাদের দুশ্চিন্তা থাকে কুয়াশা নিয়ে, ঝড় নিয়ে নয়। কুয়াশা বেশি হলে সকাল বেলার পাখি দেখাটা প- হয়। এবার বলা নেই কওয়া নেই জানুয়ারির শুরুতেই হতচ্ছাড়া এক ঝড় এসে আমাদের পাকড়াও করল।  
ঝড়ের সামনে দাঁড়ানোর মতো পেশি-বল আমাদের খুবই কম। মাছ ধরার ছোট এক ট্রলার ভাড়া করে আমরা পাখি গণনা করতে এসেছি। ট্রলারের ইঞ্জিন দুর্বল; একবার বন্ধ হলে চালু হতে চায় না। আমাদের দু’জন সঙ্গী সাঁতার জানে না। সঙ্গে কোনো লাইফ জ্যাকেট নেই। 
বিকাল থেকেই আকাশটা বীভৎস। জনহীন চরশাহজালালে থাকলে বিপদ আছে। চরের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তুফান এসে সজোরে ঘা মারে। অগত্যা আমাদের ট্রলার চলল ঢালচরের দিকে। ঢালচরের সরু খালে ঢুকতে পারলে ট্রলার ঝড়ে মারা পড়বে না। 
সন্ধ্যা-নাগাদ সরু খালের মুখে পৌঁছানো গেল; কিন্তু ঢোকা গেল না। জেলে নৌকা সব ঠাসাঠাসি করে ঢুকে খালটি ভরে ফেলেছে। আমাদের ট্রলারের কোনো ঠাঁই নাই। বেগতিক ঢালচরের ঢালে উথাল-পাথাল সাগরে ডবল নোঙ্গর দিয়ে ট্রলার রাখা হলো। রাত নেমে এলো। ঝড় শুরু হয়ে গেল। 
রাত ঘনিয়ে এলে ঝড় বেগবান হলো। জোয়ারের হুংকার বেড়ে চলল। ঝোড়ো হাওয়ায় নোঙ্গরের রশি ছিঁড়ে গেলে ইঞ্জিন চালু করার আগেই হয়তো ট্রলার সাগরে ভেসে যাবে। তারপর তুফানের তোড়ে কোথায় গিয়ে যে আমরা হার মেনে নেব তা কে জানে! 
সারারাত ট্রলারটি ঝড়ের পিটুনি খেলো অনেক; কিন্তু শ্রান্ত হয়ে পানিতে শুয়ে পড়ল না। নাগরদোলায় চড়ার দীর্ঘ, অনাকাক্সিক্ষত অভিজ্ঞতা হলো আমাদের। অবশেষে পুবের আকাশে আলো ফুটল। আশ্রয়হীন উপকূলে ভয়াল একটি রাত পার হলো। গাঙচিল ও জেলেদের কলরবে একটি নতুন দিনের সূচনা হলো।  
ট্রলার চলল উত্তর পানে। শিশুর খেয়ালি হাতে আঁকা একটা বিশাল আঁকাবাঁকা ইংরেজি ভি আকারের রেখা আকাশে দেখা দিল। দুরবিনে চোখ রেখে বোঝা গেল ওটা গিরিয়া হাঁসের সারি। হাঁসের সারির নিচ দিয়ে উড়ে গেল সৈকৎপাখির দুটি ঝাঁক। এদের গন্তব্য চরশাহজালাল। 
তেঁতুলিয়া নদী দিয়ে ট্রলার এগিয়ে যাচ্ছে। ডানে ভোলা জেলার জনবিরল চর। বাঁয়ে পটুয়াখালীর জনহীন প্যারাবন। পলির ভারে নদীর পানি ভারি, খয়েরি, মন্থর। উর্বর এ ঘোলা পানিতে আহারে মগ্ন হয়েছে হাজার হাজার পরিযায়ী হাঁস। সারি সারি জাল পেতে জেলেরা নৌকায় বসে প্রহর গুনছে।  
অনন্য এই স্থানটি এ দেশের অনেক শহুরে মানুষের এখনও দেখা হয়নি। ‘বিশ্বের উর্বরতম মোহনা’ নামে ভিনদেশি পাখি-দর্শকরা এর কথা জানেন। জীবনে একবার এখানে পাখি পর্যবেক্ষণে আসার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। আমরা স্বপ্ন দেখি না। প্রতি শীতে এখানে পাখি পর্যবেক্ষণে আসি। 
পরিযায়ী হাঁস দেখে মন্থর একটি দিন বয়ে গেল। দিন শেষে দেখি প্যারাবনের ধারে অগভীর পানিতে এক পালাসি গাঙচিল মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। দুরবিনে দেখলাম পাখির চঞ্চুতে একটি বড়শি বিঁধে আছে। পানি ছেড়ে উড়ে উঠলেই বড়শিতে বাঁধা সুতার টানে সে আবার পানিতে পড়ছে।  
এ দেশের পনেরো প্রজাতির গাঙচিল-পানচিলের মধ্যে সবচেয়ে বড় এই পালাসি গাঙচিল। উপকূলের মানুষ একে বড় গাঙচিল বলে। আগের দিনে মানুষ গাঙচিলের মাংস সুখাদ্য বলে গণ্য করত না। তাই এরা তখন নিরুপদ্রবে ছিল। সে দিন শেষ। চরের মানুষ এখন এ পাখিও খেতে শুরু করেছে।   
পাখিটিকে বাঁচাতে চাই। আমরা ট্রলার ঘোরালাম। কিন্তু লাভ হলো না। অগভীর পানিতে থাকা পাখির কাছে ট্রলার যেতে অপারগ। ততক্ষণে একটা ডিঙি নৌকা চালিয়ে শিকারিরা হাজির হয়েছে। বড়শি খুলে তারা দ্রুত পাখিটিকে কবজা করল। 
চিৎকার করে শিকারিদের বললাম, আমরা পাখি কিনব। সাহসী শিকারিরা ডিঙি চালিয়ে কাছে এলো। সরল, দরিদ্র, পরিশ্রমী দুজন জেলে। শুধু মাছ ধরে হয়তো তাদের পেট চলে না। মাছ ধরার পাশাপাশি পাখি শিকারেও হাত দেন। ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে সরস আলাপ চলল।  
: ‘আপনারা কোন চরের লোক?’ 
: ‘বাংলারচর, চরবিশ্বাস ইউনিয়ন, গলাচিপা থানা।’
: ‘পাখি কিভাবে ধরলেন?’
: ‘বড়শি পাইত্তা।’
: ‘বড়শি কী দিয়ে পাতেন?’
: ‘মাছ দিয়া।’
: ‘পাখি এরকম প্রতিদিনই ধরা পড়ে?’
: ‘নেত্ত পড়েনি! দু-একদিন পড়ে।’
: ‘বেচবেন পাখিটা?’ 
: ‘জে।’
: ‘এক দাম কন।’
: ‘জে। পঞ্চাশ টাকা।’
আমরা হতবাক। সাতসাগরে উড়ে বেড়ানো এই অপরূপ, অনবরোধী, অনন্য বিহঙ্গের মূল্য পঞ্চাশ টাকা! তদুপরি বিক্রয় মূল্যের ওপর ভ্যাট নেই। আমাদের বিস্ময় ও ফিসফাসের ভুল অর্থ করলেন শিকারিরা। দক্ষ বিপণন কর্মীর মতো পণ্যের গুণাগুণের ওপর আলোকপাত করে একজন বললেন : ‘ওজন দ্যাহেন, ওজন দ্যাহেন, দেড় কেজি গোশত হইবে।’
পঞ্চাশটি টাকা দিতেই পাখিটি আমাদের হাতে উঠিয়ে দিলেন শিকারিরা। আমরা পাখিটিকে ট্রলারের পাটাতনে রাখলাম। আহত, ক্লান্ত, হতভম্ব পাখিটি পাটাতনে স্থির বসে রইল। পাখিটির গলায় ছুরি অথবা পায়ে দড়ি দেওয়া হলো না দেখে শিকারিরা অবাক। আমাদের পঞ্চাশ টাকার পণ্য যে অচিরে খোয়া যাবে এ সতর্কবাণী দিয়ে তারা বিদায় হলেন।  
সূর্য ডুবে গেছে। আমরা পাখির চারদিক ঘিরে বসে আছি। বড়শিতে কেটে যাওয়া চঞ্চুর ব্যথায় সে কাতর। বঙ্গোপসাগরের নওল কিশোর অথবা কিশোরী এ পাখি। পালকের মেটে রং দেখে বোঝা যায় সে এখনও সাবালক নয়। আগামী বর্ষায় মেটে পালক ঝরে যাবার পর এর ডানা হবে ধবধবে সাদা। তখন সে প্রথম যৌবনে পদার্পণ করবে। এক সময় সে জোড়া বাঁধবে। আজকের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাটা সঙ্গীকে হয়তো সে বলবে। 
জার্মানির অবিস্মরণীয় প্রাণী বিজ্ঞানী ড. পিটার সাইমন পালাসকে স্মরণ করে আমরা এ পাখির নাম দিয়েছি পালাসি গাঙচিল। প্রায় আড়াইশ’ বছর আগে কাস্পিয়ান সাগর থেকে তিনি এ পাখির প্রথম নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি এর বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছিলেন ‘লারাস ইকথায়েটাস’। এর অর্থ মৎস্যলোভী গাঙচিল। 
ডক্টর পালাস এ পাখিকে কেন যে ‘লোভী’ নাম দিলেন! জীবন ধারণের তাগিদে চারটি চুনামাছ মারার জন্য পাখিকে লোভী আখ্যা দিলে তো মানুষকে বলতে হয় ‘বিশ্ব-লোলুপ’। জীবন ধারণের জন্য নয়, শুধু শখের বশে, বৈচিত্র্যের খোঁজে, উত্তেজনার আশায় কিংবা লোভে পড়ে মানুষ কি কম প্রাণী হত্যা করে!  
পাটাতনে বসে আহত পালাসি-গাঙচিল বিস্ফারিত নয়নে আমাদের দেখছে। ধীরে ধীরে এর চোখ থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত ভাবটা চলে গেছে। মনে হয় অনুমান করতে পেরেছে যে তার গলায় ছুরি চালাতে আমরা উৎসাহী নই। এর চঞ্চুর ব্যথা কতক্ষণে প্রশমিত হবে আমরা তাই ভাবছি।  
দিগন্তে প্রসন্ন সন্ধ্যা নেমে আসছে। পাখির পাশে আমরা সবাই যেন সমাধিস্থ। এক সময় টুক করে ডানা দুটি মেলে পাখিটি বাতাসে ভেসে উঠল। তারপর আমাদের মাথার উপর দিয়ে সজোরে ডানা ঝাপটে সে উড়ে গেল দক্ষিণে। 
আমরা সবাই চেতন ফিরে পেলাম। আনন্দে হাততালি দিয়ে বললাম: ‘দীর্ঘজীবী হও পালাসি গাঙচিল, দীর্ঘজীবী হও।’ কুয়াশায় মিলিয়ে গেল পালাসি গাঙচিল। প্যারাবনের ওপরে জ্বলজ্বল করে জেগে উঠল সন্ধ্যাতারা।
আমরা আবার গোল হয়ে পাটাতনে বসলাম। উড়ে যাওয়া পালাসি গাঙচিল যেন তখনও আমাদের মাঝে বসে আছে। সবাই একসঙ্গে কথা বলছি। যারা পাখিটিকে স্পর্শ করেছিলাম তারাই বেশি উত্তেজিত। নিশ্চিত সর্বনাশ থেকে রক্ষা পাওয়া গাঙচিলটির ধক ধক করে ধেয়ে চলা হৃৎস্পন্দন এখনও আমাদের হাতে অনুভূত হচ্ছে।


জল : ০১
কাজল কাননে পায়ের আলোতে রবির ঘুম ভাঙে রোজ যাপিত সংসার সুখ-দুখে
বিস্তারিত
মাঝ রাতে মির্জা গালিবের শের
আরেক বার দেখা হলে অশুদ্ধ কিছু হবে না মহাভারত, চাই
বিস্তারিত
১৪ বছর বয়সি
রেখা এখন ক্লাস টেন, ক্লাস সিক্স থেকে শুরু হওয়া অপেক্ষা
বিস্তারিত
তুমি যদি এসে
এইসব শিশির ভেজা ফসলের মাঠ নতুন ভোরের সোনালি রোদ্দুর  কৃষকের হাসিমাখা
বিস্তারিত
দেহের নিমন্ত্রণে
কেউ ডাকে দেহের নিমন্ত্রণে কেউ প্রেমেরÑ সঙ্গোপনে কেউবা নিছক খেয়ালের বশে
বিস্তারিত
গাজী আবদুল্লাহেল বাকীর রুবাইয়াতে রূপ
গাজী আবদুল্লাহেল বাকীর রুবাইয়াত মিলবিন্যাস, ছন্দ, বিষয়-বৈচিত্র্য ও আঙ্গিক শোভনে
বিস্তারিত