হজ সফরের সমস্যা উত্তরণের পথ

হজের জন্য প্রি-রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত হওয়ার আগে সরকারি ফি ছাড়া কোনো টাকা-পয়সা কাউকে দেবেন না। চূড়ান্ত রেজিস্ট্রেশনের আগে প্রকৃত এজেন্সি মালিকের সঙ্গে প্যাকেজ মূল্য এবং সুবিধা জেনে শুধু ব্যাংকের মাধ্যমেই লেনদেন করবেন। কোনো অবস্থাতেই সরকার অনুমোদিত এজেন্সি ছাড়া কোনো কাফেলা, মুআল্লিম, গাইড বা অন্য কারও সঙ্গে চুক্তি বা লেনদেন করবেন না

হজের মাসআলা-মাসায়েল ভালো করে শিখে নেবেন। যেমন : পাক-নাপাক, হালাল-হারাম, জায়েজ-নাজায়েজ ইত্যাদি। হজের মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ দৃষ্টিগোচর হয়। হাজীদের এসব দিকে দৃষ্টি না দেওয়াই উত্তম। নিজ নিজ মাজহাব মতো আমল করবেন। 
আপনার ব্যাগে ইংরেজিতে আপনার নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার এবং মুআল্লিমের নাম্বার, এজেন্সি নাম্বার লিখে নেবেন। যাতে ব্যাগ হারিয়ে গেলে মুআল্লিম অফিসে ফেরত আসতে পারে। বাসে ওঠানো-নামানোর সময় ও বিমানবন্দরে একই ধরনের অনেক ব্যাগের মধ্যে তা খুঁজে পেতে সহজ হবে, যদি আপনার ব্যাগে কোনো ধরনের চিহ্ন দেওয়া থাকে। 
জেদ্দা এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন চেকিংয়ে পাসপোর্ট, ভিসা এবং স্বাস্থ্যগত সনদপত্র (হেলথ কার্ড) দেখাতে হবে। সেজন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাগ বা সুটকেসের চাবি হাত ব্যাগে রাখবেন। প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে এয়ারপোর্টে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এখানে দোকান থেকে নাশতা কিনে খেতে পারেন। 
সৌদি আরবে কোনো কুলি পাওয়া যায় না। সুতরাং যতটুকু মালামাল আপনি নিজে সহজেই বহন করতে পারবেন, শুধু ততটুকু মালামাল সঙ্গে নেবেন। সব স্থানে আপনাকেই আপনার মালামাল বহন করতে হবে। বাসে ওঠার সময় দলের সাথিদের সঙ্গে একই বাসে উঠবেন এবং নিজ নিজ মালামাল ওই বাসে ওঠানো হয়েছে কি না, তা দেখে নেবেন। তা না হলে আপনার মালামাল জেদ্দা এয়ারপোর্টে পড়ে থাকবে। সাবধান! কোথাও থামলে ড্রাইভারকে বা গাইডকে না বলে বাস থেকে নামবেন না। 
আপনার সঙ্গের ব্যাগ যত হালকা হবে, তত বেশি সুবিধা হবে; আর আপনার ব্যাগ যত ভারী হবে তত বেশি অসুবিধা হবে। তাই মিনার উদ্দেশে হোটেল ত্যাগের সময় এ বিষয়টি খেয়াল রেখে ব্যাগ সাজাতে হবে। (এক্ষেত্রে পিঠে বহন করা যায়, সাকুল্যে দুই কেজির বেশি নয়, এমন মজবুত ব্যাগই আদর্শ)। 
মুআল্লিম পরিচিতি কার্ড ও কব্জি বেল্ট আপনার পাসপোর্টের কাজ করবে; তাই এগুলো সযতেœ সংরক্ষণ করা জরুরি। যদি কোনো সময় কোনো কারণে পাসপোর্ট বা মুআল্লিমের কার্ড হারিয়ে যায়, বাংলাদেশ মিশনের বা মুআল্লিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিকল্প পাসপোর্ট বা একটা সার্টিফিকেট অবশ্যই নিয়ে নেবেন। আপনার পাসপোর্ট নাম্বার, প্লেনের টিকিট নাম্বার এবং ট্রাভেলার্স চেক নাম্বার, নিজের মোবাইল নাম্বার ও বাড়ির কারও ফোন নাম্বার এবং এজেন্সির নাম্বার ও এজেন্সি কর্মকর্তাদের ফোন নাম্বার সঙ্গের নোট বইয়ে ও একাধিক কাগজে লিখে সঙ্গে ব্যাগে এবং বিভিন্ন জায়গায় রাখবেন। 
মক্কা ও মদিনা শরিফে বাংলাদেশ হজ মিশনে অভিজ্ঞ বাঙালি চিকিৎসক দ্বারা উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে। মিশন থেকে বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়া হয়। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকেও সমগ্র স্থানে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে। হাসপাতাল ও ডাক্তারখানা দিবারাত্রি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। আরাফাত ও মিনাতেও সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত আছে। 
মক্কা শরিফে থাকাকালে ছোট বোতলে জমজমের পানি ভরে সাইড ব্যাগে সবসময় রাখবেন। জমজমের পবিত্র পানি যত খুশি পেট পুরে খাবেন। সৌদি আরবে অবস্থানকালে প্রচুর পানি পান করা প্রয়োজন। ছাতা ব্যতীত রোদে যাবেন না। জ্বর বা সর্দি হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসাকেন্দ্রে যাবেন। সবসময় জায়নামাজ সঙ্গে রাখবেন। এতে মসজিদুল হারামের মধ্যে জায়গা না পেলেও রাস্তায় দাঁড়িয়ে জামাতে শরিক হতে সুবিধা হবে। একটা ছোট ব্যাগ সঙ্গে রাখবেন। এতে প্রয়োজনীয় দোয়া-দরুদের বই, ফোল্ডিং ছাতা, পানির বোতল, জায়নামাজ এবং প্রয়োজন হলে জুতাও খুলে রাখতে পারেন। 
তাওয়াফকালে মোবাইল ফোন বন্ধ রাখবেন। হজের সফরে অধিক সেলফি বা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন। ইবাদতকে প্রদর্শনী বানাবেন না। হজব্রত পালনে অশ্লীল কথা, কুৎসা এবং ঝগড়া বিবাদ থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘হজ হয় সুবিদিত মাসগুলোতে। অতঃপর যে কেউ এই মাসগুলোতে হজ করার স্থির করে, তার জন্য হজের সময় স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ বিবাদ বিধেয় নহে।’ (সূরা বাকারা : ১৯৭)। 
কম টাকায় হজে যাওয়ার সুবিধা-অসুবিধা : কম টাকায় হজে গেলে আপনাকে দূরে থাকতে হবে অথবা ফিতরা পদ্ধতিতে থাকতে হবে। হাজীদের আবাস পদ্ধতি দুই প্রকারÑ স্থায়ী ব্যবস্থা ও ফিতরা পদ্ধতি। স্থায়ী ব্যবস্থা হলো মক্কা শরিফে পুরো সময় একই হোটেলে বা একই বাড়িতে থাকা। মিনা, আরাফা, মুজদালিফায় গেলেও হোটেল বা বাড়ি থাকবে এবং মালসামানা, জিনিসপত্র হোটেলেই থাকবে; যার যার রুমের চাবি তার কাছেই থাকবে।
ফিতরা পদ্ধতি হলো হজের আগে কিছুদিন এক বাড়িতে বা হোটেলে থাকা এবং হজের সময় ৭ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ পর্যন্ত মিনা, আরাফা, মুজদালিফা ও পুনরায় মিনায় অবস্থান করা। (এই সময় প্রত্যেকের যার যার ব্যাগেজ-লাগেজ তার তার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্বে রাখতে হবে)। এরপর শীর্ষা বা আজিজিয়া অথবা অনুরূপ দূরতম কোনো স্থানে (মিনার কাছাকাছি) বাড়ি বা হোটেলে রাখা হয়। এ ফিতরা পদ্ধতিতে বাড়ি ভাড়া অনেক কম লাগে। 
মুআল্লিমের গাড়ি ও এজেন্সির রিজার্ভ গাড়ি : মিনা, আরাফা, মুজদালিফা যাওয়া-আসার গাড়ি সাধারণত মুআল্লিমই ব্যবস্থা করে; কিন্তু মিনা থেকে মুজদালিফায় যাওয়ার গাড়ি ঠিকমতো ও সময়মতো পাওয়া যায় না। আবার আরাফা থেকে মুজদালিফা আসার সময় লোক সংখ্যার অর্ধেক আসনের গাড়ি বরাদ্দ থাকে এবং মুজদালিফা থেকে মিনা ও জামারাতে যাওয়ার কোনো গাড়ি দেওয়া হয় না। তাই এসব ক্ষেত্রে এজেন্সির নিজস্ব রিজার্ভ গাড়ি হলে সবচেয়ে ভালো হয়। এ তিন দিনের রিজার্ভ গাড়ির জন্যও অতিরিক্ত অর্থ অনেক বেশি ব্যয় হয়। 
আবাসন ও পানাহার : হজ বুকিংয়ের আগেই জেনে নিন আপনার আবাসন কত কাছে বা কত দূরে, পাহাড়ে টিলায় নাকি সমতলে, হোটেলে নাকি বাড়িতে, লিফট কয়টি ইত্যাদি। আপনার মক্কা-মদিনার খাবারের দায়িত্ব এজেন্সি আদৌ নেবে কি না? নিলে কতটুকু নেবে এবং খাবারের পদ ও ধরন কী হবে তা-ও পরিষ্কারভাবে জেনে নিশ্চিত হোন। সকালের নাশতা ব্যক্তিগতভাবে করাই সহজতর। প্রায় সব হজ এজেন্সিই মক্কা ও মদিনা শরিফে হাজীদের তিন বেলা বা দুই বেলা খাবার সরবরাহ করে থাকে, (যদি হজ প্যাকেজে খাবার অন্তর্ভুক্ত করা থাকে)। তা ছাড়া মক্কা ও মদিনা শরিফে প্রচুর বাঙালি হোটেল আছে। এখানে ভাত, ভাজি, সবজি, তরকারি, মাছ, গোস্ত, ডাল ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। এছাড়া অনেক পাকিস্তানি হোটেলও আছে। সেখানে রুটি, গোস্ত ও ডাল, ভাজি পাওয়া যায়। আফগানি ও আরবি মোগলাই, পরোটা এবং শিক কাবাব, তন্দুরি রুটিও পাওয়া যায়। 
কোরবানি সাধারণ হজ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত থাকে না। কোরবানি নিজে কিনে করা অনেক ঝামেলা। আপনার নিজস্ব বা পরিচিত কেউ থাকলে তাকে দিয়ে বা তার মাধ্যমে করাতে পারেন। কোরবানির টাকা সৌদি ব্যাংকেও জমা দিতে পারেন, এটাই বর্তমানে সর্বোত্তম পন্থা। এজেন্সির মাধ্যমে কোরবানি না দেওয়াই শ্রেয়। 
কাফেলা, মুআল্লিম ও এজেন্সি মালিক : হজের জন্য প্রি-রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত হওয়ার আগে সরকারি ফি ছাড়া কোনো টাকা-পয়সা কাউকে দেবেন না। চূড়ান্ত রেজিস্ট্রেশনের আগে প্রকৃত এজেন্সি মালিকের সঙ্গে প্যাকেজ মূল্য এবং সুবিধা জেনে শুধু ব্যাংকের মাধ্যমেই লেনদেন করবেন। কোনো অবস্থাতেই সরকার অনুমোদিত এজেন্সি ছাড়া কোনো কাফেলা, মুআল্লিম, গাইড বা অন্য কারও সঙ্গে চুক্তি বা লেনদেন করবেন না। 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম; যুগ্ম মহাসচিব : বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি


হজের প্রধান লক্ষ্য ও শিক্ষা
হজের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ও প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর জিকির প্রতিষ্ঠা
বিস্তারিত
ফিকহ অব সোশ্যাল মিডিয়া
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : শায়খ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার
বিস্তারিত
ধর্ষণ প্রতিরোধের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম কুপ্রবৃত্তি
দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ ধর্ষণ। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ এটাকে
বিস্তারিত
রোগীকে হেলা করবেন না
আমাদের আশপাশেই হয়তো এমন অনেক আল্লাহর বান্দা-বান্দি আছেন, যাদের হয়তো
বিস্তারিত
হজ-পরবর্তী জীবন হোক পাপমুক্ত
হজ ইসলামি শরিয়তের অন্যতম ভিত্তিমূল। তবে ব্যতিক্রমী ব্যাপার হলো, হজ
বিস্তারিত
খুবাইব (রা.) শহীদ হওয়ার মর্মস্পর্শী
আমর ইবনু আবু সুফিয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর
বিস্তারিত