ইস্তানবুলের পথে পথে

অপরূপ নিদর্শন ইস্তানবুলের সুলাইমানিয়া মসজিদ

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় দিন আমরা ঠিক করলাম সুলাইমানিয়া মসজিদটি দেখতে যাবো। সেখানে রয়েছে কানুনি সুলতান সুলেমানের কবর এবং তিনি বেঁচে থাকতেই এ মসজিদটি নির্মাণ করে যান।

সকালের নাস্তা করে আমরা রওনা হলাম। আমাদের হোটেল ছিল সুলতান আহমেদ রোডে। আর মসজিদটি ইমুনিনুতে আবস্থিত। আমাদের হোটেল থেকে কিছুটা দূরে মেট্রো স্টেশন। আমরা মেট্রোতে করে রওনা হলাম। খেয়াল করলাম ইস্তানবুলের মেট্রো রেল রাস্তার উপর দিয়ে চলে। রাস্তায় একই সাথে মেট্রো রেল, বাস, টেক্সি ও প্রাইভেট কার চলাচল করে।

অল্প কিছু হোন্ডার দেখা পাওয়া যায়। তবে শহরের অধিকাংশ মানুষই চলাচল করে মেট্রো ও ফেরিতে। মেট্রো ও ফেরিতে চলতে একটি ইস্তানবুল কার্ড-ই যথেষ্ট। কার্ডে টাকা রিচার্জ করে বার বার ব্যবহার করা যায়।

একবার চড়তে দুই টার্কিশ লিরা মানে বাংলাদেশি টাকার ৩০ টাকার মতো খরচ হবে। ইমুনিনু স্টেশনে নেমে আমাদের কিছুটা হেঁটে যেতে হবে। কারণ মসজিদটি পাহাড়ের উপর নির্মিত। এ মসজিদটিকে স্থানীয়রা সোলাইমানিয়া জামে নামে চিনে। ইমুনিনুতে নেমে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তায় পাশে একটি চত্বরের মতো জায়গায় আমাদের নজরে আসলো প্রচুর সংখ্যক জালালি কবুতর। তারা অবাধে বিচরণ করছে আর লোকেদের দেয়া খাবার খাচ্ছে। আমার দুই মেয়েও তাদের খাবার দিল। ছোট বাচ্চারা তাদের ধাওয়া দিলেই তারা একটু উড়েই, আবার নিচে নেমে আসে।

এটি একটি দেখার মতো দৃশ্য। কবুতরদের পিছনে ফেলে একটু এগুতেই আমরা পাহাড়ে উঠার রাস্তা পেয়ে গেলাম। পাহাড়ী পথ হলেও রাস্তার দু’পাশে বাড়ি ও কিছু দোকানের দেখা পাওয়া যায়। আধাঘণ্টা হাঁটার পর আমরা পৌছে গেলাম সোলাইমানিয়া জামে মসজিদে।

মসজিদের সেই অপরূপ শোভা! মসজিদের সামনের প্রাঙ্গনে সবুজ ঘাসের মাঠের উপর রোদের খেলা। আর রাস্তার পাশে বড় বড় গাছের ছায়া। কী অপরূপ সে দৃশ্য! আর এরই সাথে সমুদ্র থেকে ভেসে আসার ঠান্ডা ঝিরঝিরে বাতাস। আপনার দেহ ও মনকে জুড়িয়ে দেবে।

মসজিদ প্রাঙ্গনে রয়েছে বসার জায়গা। সবুজ ঘাসের ওপাশে মসজিদের প্রবেশদ্বারের দু’পাশে রয়েছে অজুর ব্যবস্থা। আমরা অজু করে মসজিদের ভেতর প্রবেশ করলাম। সাথে সাথে লক্ষ্য করলাম, মসজিদটির প্রবেশদ্বারের সাথে মক্কার মসজিদুল হারামের কিছু দরজার সাথে সাদৃশ্য রয়েছে।

আমরা সকলে মসজিদে প্রবেশ করলাম। মসজিদের ভেতরের বড় গম্বুজটির কারুকার্যের সাথে উসমানীয় শাসকদের প্রসাদ তোপকাপির ভেতরের গম্বুজের কারুকার্যের বেশ মিল রয়েছে। যা ইসলামি ঐতিহ্যের নান্দনিকতা প্রকাশ করছে। মসজিদের ভেতর বেশ কয়েটি বড় বড় ঝাড় বাতি ও দেওয়ালে কারুকার্য রয়েছে।

বড় গম্বুজ ছাড়াও এর চারপাশে ছোট ছোট অনেকগুলো গম্বুজ রয়েছে। জানালাগুলোও বেশ বড় সাইজের। মসজিদের ভেতরের পুরোটাই লাল কার্পেট দিয়ে মোড়ানো। এখানে এবাদত করলে এক অন্যরকম আমেজ সৃষ্টি হয়। সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে যাওয়ার চেষ্টা মনে হয় সম্পন্ন হল।

মসজিদের ভেতর সকলেরই শালীন পোশাকের প্রবেশাধিকার রয়েছে। তাছাড়া মহিলাদের জন্যও নামাজের সুব্যবস্থা রয়েছে। যেসব মহিলার শালীন পোশাক পরিধান করেননি। মসজিদের পক্ষ থেকে তাদেরও দেয়া হয় ওড়নাসহ বড় একখন্ড কাপড়। যা দিয়ে তিনি পুরো শরীর ঢেকে নিতে পারবেন। মসজিদের পেছনে সামনের মতো সবুজ ঘাসের চত্বর রয়েছে। এ চত্বরের এক পাশের দরজা দিয়ে চলে গেলাম কবরস্থানে।

সেখানেও দু’ধারে রয়েছে অপরূপ ফুলের বাগান। বাগানের বড় বড় গোলাপ এ বাগানে এক স্বর্গীয় শোভা ছাড়াচ্ছে। এ বাগানের মাঝেই ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বড় বড় উজির ও পাশাদের কবর রয়েছে। এতো সাজানো এবং গুরু গাম্ভিজ্যময় কবরস্থান আমি আগে কখনো দেখিনি। করবস্থানের শেষ প্রান্তে রয়েছে এক গম্বুজ বিশিষ্ট ছোট আকৃতির দু’টি বাড়ি।

এর একটি হল অটোম্যান শাসন আমলের সবচে প্রতাপশালী কানুনি সুলতান সুলেমান খানের, অপরটি তাঁর প্রাণ প্রিয় স্ত্রী হাসিকী হুররাম সুলতানের। সুলতান সুলেমানের শাসন আমলে রাজ্য জয় ছাড়াও সর্বপ্রথম রাজ্যের আইন ও নীতি লিপিবদ্ধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠান করা হয়। এ কারণে তাঁকে কানুনী সুলতান উপাধি দেয়া হয়।

সুলেমানের কবরের পাশে রয়েছে তাঁর দুই মেয়ে, মাসহ দুই শাহাজাদার কবর। সুলতান সুলেমান সবচে বেশি সময় আটোম্যানদের মধ্যে রাজ্য শাসন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর শাহাজাদা সেলিম সুলতান হন। তাঁর কবর রয়েছে তোপকাপি প্রসাদের বাইরে।

সুলতান সুলেমানের কবরের উপর নির্মিত গম্বুজটির কারুকার্য চোখ ধাঁদিয়ে দেয়। অপর বাড়িটিতে রয়েছে হুররাম সুলতানের কবর। তার কবরের পাশেও আরো তিন চারটি করব রয়েছে। কিন্তু এ কবরের উপর নির্মিত গম্বুজটির কারুকার্য সাধারণ। তবে দেয়ালের কারুকার্য শৈল্পিক।

আমরা দুটি কবরই যেয়ারত করলাম। মসজিদের ভেতর জোহরের নামাজ আদায় করে আমরা সেখান থেকে বের হয়ে গেলাম। পায়ে হাঁটতে হাঁটতে আসলাম গ্রান্ডবাজরে। ইস্তানবুলের মধ্যে গ্রা-বাজার জায়গাটি বেশ প্রাচীন।

বিশ্বের প্রাচীন বাজারগুলো মধ্যে একটি। এখানে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা চলে আসলাম পাশ্ববর্তী বেসিকতাস ফেরিঘাটে। আমাদের গন্তব্য উজকান্দার। অর্থাৎ কৃষ্ণ সাগর পার হয়ে আমরা আবারও তুরস্কের এশিয়া অঞ্চলে চলে আসলাম। কেন যে কৃষ্ণ সাগর নাম হলো -তা বুজতে পারলাম না। কারণ কী সুন্দর মায়াময় ঘন নীল পানি, তার উপর ঝাঁক বেঁধে সিগালদের উড়াউড়ি।

সে এক অপরূপ দৃশ্য, যা ভাষায় প্রকাশ করা দুরহ। এতো সুন্দর সাগরের নাম কেন ‘কালো সাগর’ হবে। বুঝে পাই না। উসকান্দারে নেমে কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘুরাঘুরি করে টার্কিশ চা পান করে আবার ফেরিতে উঠলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সাগরের বুকে কিছু সময় কাটানো। ফেরি চলাচলের মধ্য দিয়ে সে সাধ পূর্ণ হল। (আগামীতে পড়ুন- শেষ পর্ব)

লেখক- নাজমুন নাহার রহমান, চিত্রশিল্পী ও লেখক।


শিশু কথা বলে না! কান
আপনার সন্তান যদি ২/৩ বছর বয়সেও কথা বলতে না শেখে,
বিস্তারিত
১৫ আগস্ট: বঙ্গবন্ধুর ২০ উক্তি
আজ জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্তে
বিস্তারিত
বিশ্বের বিস্ময়ের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস। দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি
বিস্তারিত
এখনো রক্তের রঙ ভোরের আকাশে
‘ ... ১১ (১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস) তারিখে রেণু এসেছে
বিস্তারিত
কাশ্মীরের পরিস্থিতি কোন দিকে
কাশ্মীরের পরিস্থিতি এখন কোন দিকে? কাশ্মীরের উত্তেজনার পরিস্থিতি কি আরেকটি
বিস্তারিত
খালের পানিতে বিষ প্রয়োগে মাছ
হায়রে ক্ষুদে প্রজন্ম তোমাদের জন্মদিয়ে ছেড়ে দিয়েছি ধরণীর আস্তাকুড়ে। একটিবারও
বিস্তারিত