ফাসাদ ও অনাচারের জন্য দায়ী কে

আল্লাহ তায়ালা অপর এক আয়াতে আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সূরা শূরা  : ৩০)। পবিত্র কোরআনের এসব আয়াত থেকে যে বিষয়টি প্রতীয়মান হয়, তা হলো আসলে আমরা সবাই আমাদের সমাজের এই ফাসাদের কারণ। কেউই দায়মুক্ত নয়; বরং আমাদের প্রত্যেকের সুন্দর সমাজ নির্মাণ ও সমাজ সংশোধনে ভূমিকা পালন করতে হবে

ফাসাদ শব্দটি আরবি শব্দ। ‘লিসানুল আরব’ অভিধানের প্রণেতা আল্লামা ইবনে মানযুর (রহ.) এর মতে, ফাসাদ শব্দটি সালাহ এর বিপরীত। (খ. ১০, পৃ. ২৬১)। অর্থাৎ ফাসাদ শব্দের অর্থ বিশৃঙ্খলা বা অন্যায় আর সালাহ শব্দের অর্থ শৃঙ্খলা বা ন্যায়। বাংলায় আমরা এককথায় বলতে পারি অনাচার। 
আজকে আমাদের সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে যে অনাচার, এর জন্য আসলে কে দায়ী? এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু সবার কাছে এক নয়। যেমনÑ কেউ বলবে সরকার দায়ী, কেউ বলবে আমেরিকা দায়ী, কেউ বলবে ভারত দায়ী, আবার কেউ বলবে এসব কিছুর জন্য ইয়াহুদিরা দায়ী। ওরা অবশ্যই নাটের গুরু। কারণ এ জাতীয় কোনো উত্তরই অবহেলা করার মতো নয়। সবার কথার পেছনেই কোনো কোনো যুক্তি আছে। আমরা কোরআন মজিদে এ প্রশ্নের কোনো উত্তর পাই কি না দেখব।  
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা রুম : ৪১)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ‘তাফসিরুল ওয়াসিত’ এর প্রণেতা ড. মুহাম্মদ সাইয়্যেদ তানতাবি (রহ.) বলেন, জলে ও স্থলে ফাসাদের কারণ হলো মানুষ গোনাহ ও প্রবৃত্তির মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার আদেশ ও নিষেধের দিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপ না করা। 
আল্লাহ তায়ালা অপর এক আয়াতে আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘তোমাদের ওপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সূরা শূরা  : ৩০)। পবিত্র কোরআনের এসব আয়াত থেকে যে বিষয়টি প্রতীয়মান হয়, তা হলো আসলে আমরা সবাই আমাদের সমাজের এই ফাসাদের কারণ। কেউই দায়মুক্ত নয়; বরং আমাদের প্রত্যেকের সুন্দর সমাজ নির্মাণ ও সমাজ সংশোধনে ভূমিকা পালন করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।  
বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করলে সমাজের বিপর্যয় ও বিদ্যমান অনাচারের পেছনে পাঁচটি স্তরে আমরা এর জন্য দায়ী। স্তরগুলো হলো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, দেশ ও বিশ্ব ব্যবস্থা। আমরা আমাদের প্রত্যেকেই এই পাঁচটি স্তরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 
ব্যক্তি : সমাজের প্রত্যেকটি মানুষই চায় ভালোভাবে বাঁচতে। সেজন্য অন্যের ওপর ভরসা করে থাকার কোনো অবকাশ নেই। নিজেকে গড়ার জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও অবিরাম চেষ্টা। একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়তে হলে দরকার জ্ঞান অর্জন ও তার প্রয়োগ। কেননা শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না বরং সেই জ্ঞানের আলোকে নিজেকে পরিচালিত করতে হবে। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের যে দায়িত্ব পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহের আলোকে আমাদের জীবনকে গঠন করা। হককে হক হিসেবে মান্য করা আর বাতিলকে বাতিল হিসেবেই পরিহার করা। আর আমরা যখন সঠিকভাবে নিজেকে গঠন করতে সচেষ্ট হব তখন আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রহমতের দুয়ার আমাদের জন্য উন্মোচন করে দেবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে আছেন।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৯)। অপর এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে কষ্ট স্বীকার করে, সে তো নিজের জন্যই কষ্ট স্বীকার করে। আল্লাহ বিশ্ববাসী থেকে অমুখাপেক্ষী।’ (সূরা আনকাবুত : ৬)। কাজেই কোনো ব্যক্তি যদি নিজকে গড়ার চেষ্টা না করে তার জন্য কে দায়ী। জ্ঞানের দাবি অনুসারে কেউ যদি ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দ হিসেবে মেনে না নেয় তা হলে তার জন্য সে নিজেই দায়ী। এ জন্য ব্যক্তি সংশোধনের কোনো বিকল্প নেই।
পরিবার : মানুষ জীবনে উন্নতির জন্য পরিবারের ভূমিকা অনেক বেশি। তেমনিভাবে পরিবারের অবহেলা আর অনিয়মের জন্যও রয়েছে বড় ধরনের বিপদ হওয়ার কারণ। আজকে আমাদের সমাজের অধিকাংশ পরিবারেই ইসলামের সঠিক চর্চা নেই। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে পৃথিবীর মধ্যে আমাদের দেশ পিছিয়ে নেই। কিন্তু তারপরও আমাদের নৈতিক অবক্ষয়েরও শেষ নেই। প্রতিটি পরিবারের যারা মুরব্বি তাদের উচিত তাদের অধীনদের ব্যাপারে সঠিক দায়িত্ব পালন করা। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দেই, তাহলে তারা আলোর সন্ধান পাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোর স্বভাব ফেরেশতারা। তারা আল্লাহ তায়ালা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।’ (সূরা তাহরিম  : ৬)।
সমাজ : আমাদের বিপর্যয় ও অনাচার-অবক্ষয়ের জন্য সমাজ ব্যবস্থাও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। আজকে সমাজে মানুষের প্রতি মানুষের যে দায়িত্ব রয়েছে তা বলতে গেলে অনুপস্থিত। অধিকাংশ মানুষই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। অন্যকে নিয়ে ভাবার সময় কারও নেই। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পরস্পর হিংসা করো না, একে অপরের জন্য নিলাম ডেকে দাম বাড়াবে না, পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করবে না, একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যেও না, একজনের ক্রয়ের ওপর অন্যজন ক্রয় করো না (অর্থাৎ একজন দামাদামি করছে সেখানে তুমি গিয়ে দাম হাঁকাবে না)।  হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই, সে তার ওপর জুলুম করে না এবং তাকে সঙ্গী ও সহায়হীনভাবে ছেড়ে দেয় না। সে তার কাছে মিথ্যা বলে না এবং তাকে অপমান করে না। তাকওয়া হচ্ছে এখানে তিনি নিজের বুকের দিকে তিনবার ইশারা করেন। কোনো মানুষের জন্য এতটুকু মন্দ যথেষ্ট যে, সে আপন মুসলিম ভাইকে নীচ ও হীন মনে করে। এক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও মান-সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম।’ (মুসলিম : ২৫৬৪)।
দেশ : একটা দেশের সরকার তার জনগণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আল্লাহ তায়ালা আখেরাতে তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন। দেশের মধ্যে দুর্নীতি, জুলুম, ব্যভিচারসহ সব ধরনের অন্যায়কে কঠোর হস্তে দমনসহ সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমির তার অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং সে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
বিশ্ব ব্যবস্থা : বাস্তবতার নিরিখে তাকালে আমরা দেখব আজ সারা বিশ্বই ফেতনা ও ফাসাদের দ্বারা ভরপুর। সব জায়গা থেকে শোনা যায় মজলুমের করুণ কান্নার আওয়াজ। ‘জোর যার মুল্লক তার’Ñ এ নীতির ওপর পরিচালিত প্রতিটি অঙ্গন। অনিয়ম, অত্যাচার আর দুর্বলের ওপর সবলের শোষণ সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে আজ। একে প্রতিরোধ করার একমাত্র পথ হচ্ছে সর্বজনীনভাবে বিশ্বের দেশে দেশে প্রতিটি সমাজে সত্য ও ন্যায়ের চর্চা আর অন্যায় অসত্য ও ফাসাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা।  
মোটকথা একটি সুন্দর পরিবার, সমাজ ও দেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। আর তাই অন্যরা দায়িত্ব পালন করছে কী করছে না সেদিকে না তাকিয়ে আমাদের প্রত্যেককে এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। নচেত আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গায় দায়িত্বে আবহেলাকারী হিসেবে পরিগণিত হব। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। 

লেখক : পিএইচডি গবেষক কোরআন অ্যান্ড সুন্নাহ স্টাডিজ, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, মালেয়শিয়া


হজের প্রধান লক্ষ্য ও শিক্ষা
হজের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ও প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর জিকির প্রতিষ্ঠা
বিস্তারিত
ফিকহ অব সোশ্যাল মিডিয়া
এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল : শায়খ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার
বিস্তারিত
ধর্ষণ প্রতিরোধের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম কুপ্রবৃত্তি
দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ ধর্ষণ। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ এটাকে
বিস্তারিত
রোগীকে হেলা করবেন না
আমাদের আশপাশেই হয়তো এমন অনেক আল্লাহর বান্দা-বান্দি আছেন, যাদের হয়তো
বিস্তারিত
হজ-পরবর্তী জীবন হোক পাপমুক্ত
হজ ইসলামি শরিয়তের অন্যতম ভিত্তিমূল। তবে ব্যতিক্রমী ব্যাপার হলো, হজ
বিস্তারিত
খুবাইব (রা.) শহীদ হওয়ার মর্মস্পর্শী
আমর ইবনু আবু সুফিয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর
বিস্তারিত