ইস্তানবুলের পথে পথে

ব্লু মক্স সুলতান আহমদের অমর কীর্তি

শেষ পর্ব

ইস্তানবুলের প্রাচীন স্থাপত্যের এক অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে আহমেদীয়া মসজিদ। পশ্চিমারা একে ব্লু মক্স বলে। ইস্তানবুল বেড়াতে গেছেন আর এ মসজিদটি দেখেনি এমন পর্যটক মেলা ভার। আমরাও ঠিক করলাম হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকালে মসজিদটি দেখতে যাব। তাই বেসিকতাস ফেরিঘাটে ফিরে এসে মেট্রোতে চেপে বসলাম। গন্তব্য সুলতান আহমেদ স্টেশন।

আমাদের হোটেল এ স্টেশনের কাছেই। হোটেলে ফিরে আসতেই ক্লান্ত অবসন্ন দেহ নিয়ে অভ্যর্থনা কক্ষে বসে পড়লাম। হোটেলের কর্মীরা হাসি মুখে জানতে চাইলেন চা চলবে কিনা। এ সময় এক কাপ চা শরীরকে চাঙ্গা করতে বড় ভুমিকা রাখে। তাই হাসি মুখে মাথা নাড়লাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে তারা পরিবেশন করলেন আনারের গন্ধ ও স্বাদযুক্ত গরম চা। চুমুক দিতেই মনে হল-এ এক সঞ্চিবনী সুধা। খেয়াল করলাম হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছ থেকে চা এবং পানির কোনো দাম নিচ্ছেন না। কেন নিচ্ছেন না জানতে চাইলেই তারা বললেন, এটি আমাদেরকে মনে রাখার একটি কৌশল। বুঝলাম তুর্কিরা কেবল রাজ্য নয়, মনও জয় করতে জানে।

কিছুক্ষণ রুমে সময় কাটিয়ে বিকাল ছয়টায় আমরা আবারও বের হলাম। লক্ষ্য ব্লু মক্স বা আহমেদীয় মসজিদ। মসজিদটি আমাদের হোটেল থেকে আনুমানিক এক কিলোমিটার দূরে। তাই হেঁটেই রওনা হলাম।

ইস্তানবুলে মাগরিবের আজান রাত নয়টায়। তাই মসজিদটি ঘুরে দেখতে হাতে অনেকটা সময় পাওয়া গেল। ব্লু মক্স মসজিদটি নির্মাণ করেন অটোম্যান সুলতান আহমেদ (প্রথম)। এর নির্মাণকাল ১৬০৯ থেকে ১৬১৬।

সুলতান আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন ১৫৯০ সালে। তখন তাঁর পিতা একজন শাহজাদা ছিলেন। কিন্তু সুলতান আহমেদের দাদা সুলতান মুরাদ (তৃতীয়) এর মৃত্যুর পর তার বাবা শাহাজাদা মেহমেদ (তৃতীয়) সুলতান হন। মেহমেদ সিংহাসনে আহোরণ করেই তার ১৯ জন সহোদরকে হত্যা করেন। এ হত্যাকাণ্ড অটোম্যান শাসনেরই একটি কঠোর রীতি। তবে আহমেদের কচি মনে নৃশংসতার প্রভাব পড়ে।

যার ফলশ্রুতিতে তিনি পিতার মৃত্যুর পর ১৬০৩ সালে শাসনভার গ্রহণ করে এবং ভ্রাতৃ হত্যা রীতি কঠোরভাবে রোধ করেন। ১৬১৭ সালে তিনি মারা যান। ইতিহাসে তাকে একজন হৃদয়বান শাসক হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

সুলতান আহমেদ মসজিদের নকশার স্থ্যপতির নাম সেদেফকার মেহমেদ আঁগা। অন্য মসজিদের মতো এ মসজিদ প্রঙ্গনে আমরা কোনো কবরস্থান দেখতে পেলাম না। এর ভেতর কোনো ফুলের বাগানও নেই। তবে মসজিদটি যথেষ্ট বড় এবং কারুকার্য খচিত। উচু বেষ্টনী সম্পন্ন।

লেখক ও তার পরিবারের সদস্যরা

যার মধ্য স্থলে বাঁধানো বিশাল খোলা চত্বর। চত্বরের বাম পাশে বিশাল মসজিদ। বাকি তিন পাশে রয়েছে মাদ্রাসা, লাইব্রেরী এবং এতিমখানা। যা পর্যটকদের দান এবং সরকারের অনুদান দিয়ে পরিচালিত হয়। মসজিদের প্রবেশ দ্বারে রাখা হয়েছে অসংখ্য পরিস্কার ওড়না। যারা মসজিদে নামাজ পড়বে কিন্তু সাথে ওড়না নেই তাদের জন্য বিনামূল্যে এই সুব্যবস্থা। এ দেশের এই বিষয়টি আমাকে খুব চমৎকৃত করেছে। কোনো নারী চাইলে চলার পথেই মসজিদে নামাজ পড়ে নিতে পারেন। তার জন্য তাকে পোশাক নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না।

ব্লু মক্স মসজিদটি তার অপর তিন অংশের সাথে বড় টানা বারান্দা দ্বারা সংযোগ করা। আর বারান্দায় রয়েছে বিশাল আকৃতির মোটা স্তম্ভ। এসব স্তম্ভ শ্রেত পাথরের কারুকার্য দ্বারা তৈরি।

মসজিদে প্রবেশের আগে চারপাশ ঘুরে বারান্দায় বসলাম। খেয়াল করলাম এখানে অনেক পর্যটকের ভীড়। ঈদের ছুঁটিতে অনেকেই এখানে বেড়াতে এসেছেন। মসজিদ প্রাঙ্গনে বড় কোনো গাছ না থাকলেও বাতাসের কোনো কমতি নেই। পাশের মরমরা বা কৃষ্ণ সাগর থেকে উঠে আসছে শীতল বাতাস। যা সব সময় মনকে প্রফুল্ল রাখে।

নামাজের জন্য মসজিদে প্রবেশ করেই আশ্চার্য হয়ে গেলাম। এতো সুন্দর রঙিন কারুকার্য করা কোনো মসজিদ হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাসই হতো না। মসজিদের ছাদ বিশাল একটি গম্বুজের উপর। তবে তার চারপাশে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি ছোট ছোট গম্বুজ।

প্রতিটি গম্বুজের ভেতরই চোখ ধাঁধানো কারুকার্য। আমরা মন্ত্রমুদ্ধের মতো চোখ উপরের দিকে তুলে তা দেখতে থাকলাম। ভেবে অবাক হলাম চারশ’ বছর আগে এতো সুন্দর কারুকার্য নিপুনভাবে শিল্পীরা কিভাবে করতো! সত্যি বড় বিস্ময়ের ব্যাপার!

এ মসজিদটিও সকলের জন্য উন্মুক্ত। সে যে ধর্মেরই নারী কিংবা পুরুষ হোক। মসজিদের ভেতরে সমানের দিকে পুরুষ এবং পিছনের দিকে নারীদের নামাজ পড়ার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। খেয়াল করলাম পুরুষের পাশাপাশি বহু সংখ্যক নারীও জামাতে নামাজে অংশ নিলেন। তবে আমরা মসজিদের অনেক কিছুই দেখতে পারিনি। কারণ সেখানে সংস্কার কাজ চলছিল।

নামাজান্তে মসজিদ থেকে বেরিয়ে কিছু দূর হাঁটতেই সামনে এলো একটি বিশাল পার্ক। আর পার্কের মধ্যে হঠাৎ নজরে আসলো উচু তিনটি আলাদা পিলার। যার দু’টি চৌকোনা এবং অপরটি গোলাকৃতির।

গোলাকৃতি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারলাম না। তবে এর ভাঙা মাথা দেখে মনে হলো- প্রাচীন যুগের বাতিঘর। অপর দু’টির একটিতে পুরো পিলার জুড়ে হাইরো গ্লাফিক্স খোদাই করা। হাইরোগ্লাফিক্স হলো রোমান যুগের হরফ। এ হরফ দেখতে অনেকটা ছবির মতো। যা দেখে মনে হল এ হরফ দিয়ে পুরো পিলার জুড়ে কিছু লেখা হয়েছে। তবে আমাদের কাছে তা দূর্বোদ্ধ পিলার গুলি মাটির স্তর থেকে প্রায় ১০/১১ ফিট নিচে অবস্থিত। যা লোহার বেষ্টনী দিয়ে ঘেরাও করা। রোমান শাসকরা যে এক সময় ইস্তানবুল শাসন করতেন এ পিলারটি তার স্মরক বহন করছে।

অপর পিলারটি হচ্ছে কলাম অব কন্সটাইন। এটি ১০ খৃস্টাব্দে নির্মিত। এ কলামটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাইজেন্টাইন শাসকরা এ অঞ্চল বিজয়ের সুচনা করেছিল। তারই বিজয় কেতন ধারণ করে আছে স্তম্ভটি। আমরা দেখে অশ্চার্যাম্বিত হলাম প্রায় দু’হাজার বছরের পুরানো কোনো কলাম এখনো অক্ষত আছে। কন্সটাইননোপল বিজয়ের পরও অটোম্যানরা এ স্তম্ভটি ধবংস করেননি।

লেখক- নাজমুন নাহার রহমান, চিত্রশিল্পী ও লেখিকা।


১৫ আগস্ট: বঙ্গবন্ধুর ২০ উক্তি
আজ জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীনতাবিরোধীদের চক্রান্তে
বিস্তারিত
বিশ্বের বিস্ময়ের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য ইতিহাস। দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি
বিস্তারিত
এখনো রক্তের রঙ ভোরের আকাশে
‘ ... ১১ (১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস) তারিখে রেণু এসেছে
বিস্তারিত
কাশ্মীরের পরিস্থিতি কোন দিকে
কাশ্মীরের পরিস্থিতি এখন কোন দিকে? কাশ্মীরের উত্তেজনার পরিস্থিতি কি আরেকটি
বিস্তারিত
খালের পানিতে বিষ প্রয়োগে মাছ
হায়রে ক্ষুদে প্রজন্ম তোমাদের জন্মদিয়ে ছেড়ে দিয়েছি ধরণীর আস্তাকুড়ে। একটিবারও
বিস্তারিত
যে পাঁচটি কথা বাবা-মাকে না
সন্তান লালন-পালন করা প্রত্যেক বাবা-মার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তবে সন্তানকে
বিস্তারিত