শায়খ ড. উসামা বিন আবদুল্লাহ খাইয়াত

বিদায় হজের ভাষণে জানমালের নিরাপত্তার সনদ ঘোষণা

মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজে আরাফার দিন উরনা উপত্যকায় নিজ উটনীর পিঠে বসলেন। বক্তব্যের উদ্দেশে পবিত্র ওই জনসমুদ্রের অভিমুখী হলেন। যে সমবেত জনতা অর্জন করেছে নবীজি (সা.) এর সঙ্গে হজের সৌভাগ্য। যাদের হৃদয় বিগলিত, চোখ অশ্রুসিক্ত ও কান উৎকর্ণ। প্রাণগুলো প্রস্তুত ও প্রাণবন্ত শেখা, নির্দেশনা লাভ ও অনুসরণের জন্য। মহানবী (সা.) তাঁর মহান বক্তব্য শুরু করলেন প্রেরণাবর্ধক ও বেদনানাশক প্রসঙ্গ দিয়ে। এমন কথা বলে যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং সচেতনতা ও গুরুত্ব দাবি করে। ইমাম মুসলিম কর্তৃক তার সহিহ গ্রন্থে সংকলিত সে বাণীতে তিনি বলেন : ‘হে লোকসকল, তোমরা আমার কথা শোন, কারণ আমি জানি না সম্ভবত এ বছরের পর এ জায়গায় আর কখনও তোমাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে না।’ 

অতঃপর তিনি বান্দাদের ইহ ও পরকালীন অবস্থা সংশোধনের পরিকল্পনা পেশ করলেন। এর উপায় ও পদ্ধতি বর্ণনা করলেন। উদ্বুদ্ধ করলেন সেসব আঁকড়ে ধরতে। সূচনা করলেন মানুষের জানমালের প্রসঙ্গ দিয়ে। এ দুইকে বেষ্টন করে দেন ব্যাপক বেড়া দিয়ে, যা এ দুইকে সংরক্ষণ করে তাদের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে। মানুষের রক্তকে নিরাপদ করেছে অবৈধভাবে তা ঝরানো থেকে এবং অত্যাবশ্যক কারণ ছাড়া তার জন্য হুমকি হতে। কেননা তা রক্ষা ও তার মর্যাদা সংরক্ষণের মাধ্যমেই জাতি টিকে থাকবে। সমাজ গঠন সহজ হবে। তাই তো নবীজি (সা.) বলেন, ‘হে লোকসকল, নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদÑ আর নাসাঈ (রহ.) সংকলিত সুনান কুবরার ভাষায়Ñ নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্মান তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্যন্ত তোমাদের আজকের এ দিন, তোমাদের আজকের এ মাস, তোমাদের আজকের এ শহরের মতোই তোমাদের জন্য হারাম।’

কোরবানি দিবসে (পরের দিন) প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি আবার বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ ও তোমাদের সম্মান তোমাদের জন্য হারাম তোমাদের আজকের এ দিন, তোমাদের আজকের এ শহর ও তোমাদের আজকের এ মাসের মতোই।’ কথাটি তিনি কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করেন। (হাদিসটি ইমাম বোখারি তদীয় সহিহ গ্রন্থে সংকলন করেছেন)।

জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা হলো অপরিহার্য পাঁচ উপকরণ, যা ছাড়া সৃষ্টি জীবন টিকতে পারে না। জীবনের নিরাপত্তা বিধান করে আমাদের রব অন্যায়ভাবে নিরাপদ জীবন হরণের অপরাধের গুরুতরতা তুলে ধরেছেন। সচেতন ও সজীব হৃদয়ের অধিকারীর জন্য ঘোষণা করেছেন ভয়ংকর হুমকি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সূরা নিসা : ৯৩)। 

আর তাঁর রাসুল (সা.) নিজ বাণী, ‘তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্যন্ত তোমাদের জন্য হারাম’ বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, মুসলমানের জানমালের এ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা হলো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা। শরিয়তের কারণ ছাড়া যা লঙ্ঘন হওয়ার নয়। যেমনÑ হত্যাকারীর ওপর হদ বা বিবাহিত ব্যভিচারীর ওপর কিসাস নামের প্রাণদ- প্রয়োগ অথবা জাকাত অস্বীকারকারী থেকে জরিমানাসহ জোরপূর্বক জাকাত আদায়ের বিধান। যেমনটি এসেছে নবী (সা.) থেকে প্রমাণিত সহিহ হাদিসগুলোতে।

এ মহান ও মর্মবহুল খুতবায় উল্লেখিত সম্পদের নিরাপত্তা বিষয়ে পবিত্র শরিয়ত বৈধ উপায়ে ও জায়েজ পন্থায় মানুষের জন্য সম্পদের মালিকানার স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। তার জন্য আরও নিশ্চিত করেছে নিজ সম্পদে অনুমোদিত পন্থায় হস্তক্ষেপের স্বাধীনতা। বলে দিয়েছে মালিক হওয়ার পথ-পন্থা ও তার শর্ত, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে তাদের লেনদেন ও আদান-প্রদানে ভারসাম্য বাস্তবায়িত হয়। নিশ্চিত করেছে নিজ সম্পদে বৈধ হস্তক্ষেপের পাশাপাশি অন্যের হকের প্রতি লক্ষ রাখাও। অতএব তা কোনোভাবেই কোনো উপায়েই লঙ্ঘন করা জায়েজ নেই। উপরন্তু তার জন্য অত্যাবশ্যক করেছে অন্যের হক লঙ্ঘন করলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া। অন্যের হক হরণ, নষ্ট বা অবৈধভাবে ভোগ করলে তার উপযুক্ত মাশুল দেওয়া। এক্ষেত্রে ভিত্তি ও মূলনীতি হলো আল্লাহ তায়ালার বাণী : ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ।’ (সূরা নিসা : ৯৩)। অন্যত্র তিনি এরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।’ (সূরা বাকারা : ২৭৫)। 

সম্পদের নিরাপত্তা এবং অপরের জবরদখল থেকে তা রক্ষার উদ্দেশেই আল্লাহ চোরের হাত কাটার বিধান প্রবর্তন করেছেন। হারাম ঘোষণা করেছেন ধোঁকা, প্রতারণা ও পরের মাল নষ্ট করা। তেমনি বাধ্যতামূলক করেছেন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। নিজের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার জানে না, এমন অবুঝদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন হাজর বিধি তথা তার সম্পদ সে নিজে ব্যবহার না করে অভিভাবক কর্তৃক ব্যয়ের বিধান। আরও নিষিদ্ধ করেছেন সুদ। এসবের মাধ্যমে অন্যের সম্পদ হরণের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ক্ষতি করা নেই, কোনো ক্ষতির শিকার হওয়াও নেই।’ (ইমাম আহমাদ তার মুসনাদ এবং ইবনে মাজাহ তার সুনান গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন)। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর খুতবার এ অংশটি শেষ করেছেন হৃদয়ে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের ভয় এবং তাঁর সামনে হিসাব ও পর্যালোচনার অনুভূতি জাগিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। তিনি বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের সঙ্গে মিলিত হবে। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের আমল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। আমি কি তোমাদের কাছে (আল্লাহর বার্তা) পৌঁছে দিয়েছি?’ 

এরপর নবী (সা.) অবতারণা করেছেন আমানত আদায় এবং মোমিনের হকের প্রতি লক্ষ রাখার প্রসঙ্গ। ব্যক্তির হক আদায়, জিম্মি তথা অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার বাস্তবায়ন এবং মুসলিমদের পরস্পর আস্থা রক্ষার বিষয়। তিনি বলেন, ‘যার কাছে অন্যের কোনো আমানত রয়েছে, সে যেন আমানতদাতার কাছে তা পৌঁছে দেয়।’ এটাই মূলত আল্লাহর বাণীর ব্যাখ্যা : ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতগুলো প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সূরা নিসা : ৫৮)। 

অতঃপর মহানবী (সা.) ব্যক্তিগত লেনদেনের চেয়েও ভয়াবহ ব্যাধি সামাজিক অবৈধ লেনদেনের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেন। জাহেলি যুগ যেটাকে মেনে নিয়েছিল এবং জাহেলি সমাজ যা বৈধ ভাবত। আর সেটি হলোÑ সুদ খাওয়া। নবী (সা.) বলেন, ‘জাহেলিয়াতের সব বিষয় আমার পদতলে স্থাপিত। জাহেলিয়াতের সব সুদ আমার পদতলে স্থাপিত।’ শুধু মুখে বলা নয়, মহানবী (সা.) তৎক্ষণাৎ সেটি বাস্তবায়নেরও সূচনা করলেন। শুরু করলেন নিজের পরিবারের সুদ রহিত ও ক্ষমা করা। যাতে এ আদর্শ অনুসৃত হয়। যাতে দৃষ্টান্ত বাস্তবায়িত হয়। এরপর তিনি বললেন, ‘আর জাহেলি যুগের প্রথম যে সুদ রহিত করছি, তাহলো আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের সুদ। কারণ তার সবটাই রহিত।’ 

এর মাধ্যমেই প্রচলন থেকে বের হয়ে গেলেন ও পরবর্তী চর্চার পর বন্ধ করে দিলেন সেই উপার্জনের, যে ব্যাপারে আমাদের মহান রব দাতা ও গ্রহীতা উভয়কে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন : ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যেসব বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর; তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর; তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে। তোমরা কারও প্রতি অত্যাচার করো না এবং কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৭৮-২৭৯)। 

মহানবী (সা.) যেভাবে সুদ রহিত ও পরিবার থেকে ক্ষমার সূচনা করেছেন, একইভাবে জাহেলিয়াতের রক্তের বদলা ও প্রতিশোধ-প্রবণতাও রহিত করলেন, যা ছিল তাদের মধ্যে অস্থিরতা ও আগুন জ্বলার উৎস। সূচনা করলেন তিনি নিজের পরিবারের রক্তমূল্য ক্ষমার মাধ্যমে। তিনি বললেন, ‘জাহেলি যুগের সব রক্তের বদলাও রহিত করছি। সর্বপ্রথম আমাদের যে হত্যার বদলা রহিত করছি, তা হলো ইবন রবিআ বিন হারেছের হত্যার প্রতিশোধ। সে বনু সাদ গোত্রে স্তন্যদানকারীর সন্ধানে গিয়েছিল। যেখানে হুজাইল তাকে হত্যা করেছিল।’

এটিই মূলত আদর্শ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সফল উপায় ও কার্যকর পদ্ধতি, যে প্রতিষ্ঠাতা নিজের ও নিজের লোকদের ক্ষেত্রে প্রথমে তা বাস্তবায়ন করবে। 

 

২ জিলকদ ১৪৪০ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 

ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব


ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি উদযাপনে সুদানিরা
  দ্বীপাঞ্চলের আবদুল কাইয়ুম রাজধানী খার্তুমে সেনা কর্তৃপক্ষ ও বিরোধী জোটের
বিস্তারিত
শ্রীলঙ্কায় ইস্টার হামলার পর কেমন
  মাত্র কয়েক মাস আগেও পশ্চিম শ্রীলঙ্কায় মোহাম্মদ ইলিয়াসের ব্যবসা রমরমা
বিস্তারিত
মালয়েশিয়ায় জাকির নায়েককে নিয়ে বিতর্ক
  ডা. জাকির নায়েক ইস্যুতে মালয়েশিয়ান রাজনীতি বেশ টালমাটাল। নানা কথা
বিস্তারিত
নরেন্দ্র মোদি ও কাশ্মীর ইস্যু
  ১৫ আগস্ট লন্ডনভিত্তিক  আরবি-ইংরেজি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিউ অ্যারাবে প্রকাশিত ইমাদ
বিস্তারিত
কাশ্মীরকে দমাতে দিল্লির ৪ দফা নীলনকশা
কড়া নিরাপত্তা বলয়ে ভারত অধিকৃত গোটা জম্মু-কাশ্মীর। কারফিউয়ের সঙ্গে পরিস্থিতি
বিস্তারিত
নারী শিক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে পড়াশোনা করতে, জ্ঞানার্জনে ব্রতী হয়ে আল্লাহর
বিস্তারিত