ইসলামে নৈতিকতার চর্চা

ইসলাম মহান আল্লাহপাকের দেওয়া এক পূর্ণাঙ্গ পরিপূর্ণ ও প্রগতিশীল জীবন ব্যবস্থা। সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব ও সাম্যের সেতুবন্ধন হলো ইসলাম। ইসলাম ন্যায়, নীতি, নৈতিকতা, সততা ও আদর্শের পতাকাবাহী ধর্ম।

ইসলামে উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতা শিক্ষার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত। নীতি-নৈতিকতা মূলত একটি প্রশিক্ষণ। এটা শেখার জন্য ব্যবস্থা, অনুশীলন ও চর্চার প্রয়োজন জরুরি। ইসলাম সে অনুশীলন ও চর্চাকে করেছে অবারিত। মানুষের জীবনের সততা, মহানুভবতা, উদারতা, ন্যায়পরায়ণতা, সভ্যতা, সাধুতা, অখ-তা, একত্রতা, পূর্ণতাÑ সর্বোপরি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, চরিত্র, মহত্ত্ব ও আদর্শিক গুণাবলির সংমিশ্রিত আত্মশুদ্ধির স্বর্ণফসল হলো নৈতিকতা। তাই মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধের জাগরণকেই নৈতিকতা বলা হয়। নৈতিকতা আত্মার অস্তিত্বের ও আত্মোপলব্ধির ক্ষেত্রে নিবেদিত ও উৎসর্গীকৃত। তাই পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যে নিজেকে (আত্মাকে) শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। এবং যে নিজেকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়।’ (সূরা শামস : ৯-১০)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবে সে, যে শুদ্ধ হয়।’ (সূরা আ’লা : ১৪)।

ইসলাম নৈতিকতা ও চারিত্রিক উন্নতি বিকাশকে অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেছে। এমনকি তা ইসলামের অন্যতম একটি চর্চা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ মতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা সমগ্র মানব সমাজের নৈতিক উন্নয়নে প্রচুর নির্দেশনা বিদ্যমান। মূলত মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এ চরিত্রের আলোকেই হয়ে থাকে। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীকুলের নীতি-নৈতিকতাজনিত কোনো জ্ঞান নেই বলেই তারা চতুষ্পদ জন্তু। পক্ষান্তরে আকার ও গঠনে মানুষ হয়েও যার ভেতরে নৈতিকতার শিক্ষা ও ছোঁয়া নেই প্রকারান্তরে সে চতুষ্পদ জন্তুই। তাদের কথাই আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন এভাবে, ‘তাদের হৃদয় আছে উপলব্ধি করে না, চোখ আছে দেখে না, কান আছে শোনে না। এরা হলো চতুষ্পদ জন্তুর মতো। বরং তার চেয়েও নিকৃষ্ট। আর এরাই হলো গাফিল।’ (সূরা আরাফ : ১৭৯)। বস্তুত নৈতিকতা হলো মানুষের সবচেয়ে উন্নত গুণ ও বৈশিষ্ট্য। নৈতিকতার জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেই ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেন, ‘হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের মাঝে পাঠান এমন রাসুল, যিনি আপনার আয়াত পাঠ করবেন, কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী স্নেহশীল ও কৌশলী।’ (সূরা বাকারা : ১২৯)।

ইসলামি শিক্ষার বড় উদ্দেশ্য হলো মানুষের হৃদয়ে নৈতিকতার প্রতিফলন ঘটানো। ন্যায় ও সততার আলোকায়ন, যা তাকে সব ধরনের অপরাধ থেকে বিরত রাখবে। নৈতিকতার জ্ঞান যার অর্জন হলো, উত্তম চরিত্র যে ধারণ করল সেই প্রকৃত জ্ঞানী। রাসুল (সা.) বলেন, ‘উত্তম চরিত্র থেকে মিজানে অধিক উত্তম কোনো আমল নেই।’ (আবু দাউদ : ৪১৬৬)। নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বোত্তম ব্যক্তি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি উত্তম যার চরিত্র উত্তম।’ (সহিহুল জামে : ১৩৪)। 

নৈতিকতার শিক্ষাই মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তার ভেতর থেকে যাবতীয় মন্দ গুণাবলি দূরীভূত করে। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, লালসা, রিয়া, কিবর, অহংকার, মিথ্যা, গিবত, পরনিন্দা, হিংসা, অহমিকা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি ঘৃণিত স্বভাবের মূলোৎপাটন করে। এর পাশাপাশি সততা, সদাচার সৌজন্যমূলক আচরণ সুন্দর স্বভাব মিষ্টি কথা ও উন্নত চরিত্র এ সবকিছুর সমন্বয় হলো নৈতিকতা। একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চালচলন, ওঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া, আচার-ব্যবহার, লেনদেন সবকিছুই যখন প্রশংসনীয় ও গ্রহণযোগ্য হয় তখন তাকে নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন ব্যক্তি বলে। 

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নৈতিকতার অভাবে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে বিভিন্ন অপরাধ। গুম, হত্যা, ধর্ষণের মতো অপরাধ ছড়িয়ে পড়ছে মহামারির মতো। সন্তানের হাতে খুন হচ্ছে বাবা। মায়ের হাতে শিশু। শিক্ষকের কাছে ধর্ষিত হচ্ছে শিক্ষার্থী। পাঁচ বছরের শিশু থেকে আশি-নব্বই বছরের বৃদ্ধা কেউ নিরাপদ নয় আজ। মাদকাসক্তে জড়িয়ে ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ, যাদের হাতে আগামীর দেশ। দুর্নীতির করাল গ্রাসে বিপন্ন হচ্ছে রাষ্ট্র। সমাজপতি থেকে রাষ্ট্রপ্রতি, ঠিকাদার থেকে মন্ত্রী-এমপি কারও হাতেই নিরাপদ নয় রাষ্ট্রের সম্পত্তি। ভোগ ও নেশায় ভেসে যাচ্ছে দেশ। এসবের একমাত্র কারণ নৈতিকতার অভাব। মানুষের মাঝে নীতি ও নৈতিকতার বালাই নেই। সমাজ ও রাষ্ট্রের অবক্ষয় রোধ করতে, যুবসম্প্রদায়কে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে, হত্যা, ধর্ষণ বন্ধ করতে, সর্বোপরি মানুষ কর্তৃক সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে। চর্চা ও প্রসার ঘটাতে হবে নৈতিকতার। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতার সমন্বয় আনতে হবে। মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে নৈতিকতার বিকল্প নেই। তাহলেই একজন মানুষ সৎ, চরিত্রবান, আল্লাহভীরু, দেশপ্রেমিক ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিরে আসবে শাশ্বত শান্তি।


জনসমাবেশের ‘শব্দদূষণ’ নিয়ন্ত্রণ
যানবাহনের হর্নের শব্দ, মানুষের হল্লা, চিৎকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রোগ্রামের মাইকের
বিস্তারিত
প্রাত্যহিক জীবনে ধৈর্য ও স্থিরতার
  ধৈর্য ব্যক্তিজীবনকে সম্মানের শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ধৈর্য মানব জাতির আত্মোন্নয়নের
বিস্তারিত
মোমিনের অন্যতম গুণ ক্ষমা
  মোমিনের অন্যতম গুণ হলো তার ক্ষমা এবং উদারতা। ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণে
বিস্তারিত
আত্মীয় স্বজনের সম্পর্ক
হজরত জুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) এরশাদ
বিস্তারিত
ঘুষখোরদের ওপর আল্লাহর লানত
অবৈধ আয়ের উদ্দেশ্যে জনগণের ওপর কখনও সরাসরি কখনও পরোক্ষভাবে জুলুম
বিস্তারিত
বাজারে সরবরাহ অব্যাহত রাখার ফজিলত ফিরোজ
  আল্লাহ আমাদের রিজিক দাতা। তিনি আমাদের দুনিয়ায় পাঠানোর আগে রিজিকের
বিস্তারিত