কোরবানি : ফাজায়েল ও মাসায়েল

১০ জিলহজ ফজরের পর থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্তÑ এ তিন দিন কোরবানি করার সময়। তবে প্রথমদিনে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। বিধি মোতাবেক যেখানে জুমা ও ঈদের সালাত জরুরি, সেখানে ঈদের সালাতের আগে কোরবানি করা বৈধ নয়। আর যেখানে বিধি মোতাবেক ঈদের জামাত জরুরি নয়, সেখানে ফজরের পরেই কোরবানি করা যায়

 

কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ভোগের মানসিকতা পরিহার করে ত্যাগের মহিমায় অভ্যস্ত হওয়ার জন্য এটি একটি শিক্ষামূলক ইবাদত। স্বভাবগতভাবে আমরা সবসময় নিজের ভোগ-বিলাসের চিন্তায় মগ্ন থাকি। যে কারণে ত্যাগের অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইসলামি শরিয়ত ‘কোরবানি’র বিধান বিধিবদ্ধ করেছে। পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের সত্তার মাঝে লুকিয়ে থাকা পাশবিকতা, দোষত্রুটি, পশু-প্রবৃত্তি বিসর্জন দিতে শিখব; তাতেই আমাদের কোরবানি সার্থক হবে।
কোরবানির অর্থ : আরবি ‘কুরবান’ ও ‘কুরবাতুন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে নৈকট্য লাভ করা, হোক তা পশু কোরবানির দ্বারা বা অন্য কোনোভাবে। একইভাবে ‘কুরবাতুন’ যেসব নেক আমল দ্বারা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা হয়, যেমনÑ ইবাদত-আনুগত্য, কল্যাণকাজ ইত্যাদি। (আল-মুসত্বালিহাত ওয়াল-আলফায়ুল-ফিকহিয়্যা : খ-৩, পৃ-৮০, দারুল-ফাজিলাহ, কায়রো, মিসর)। 
বাংলা ভাষায় ‘কোরবানি’ মানে ত্যাগ, উৎসর্গ করা, পশু কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তবে হাদিস, ফিকহ-ফাতাওয়া ইত্যাদি গ্রন্থে ‘কোরবানি’-এর পরিবর্তে ‘উদ্বহিয়্যা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
পারিভাষিক অর্থ : আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনকল্পে কোরবানির দিনে যে পশু জবাই করা হয়, তারই নাম ‘কোরবানি’। একই কারণে কোরবানির দিনকে ‘ইয়াওমুল-আদ্বহা’ ও কোরবানির ঈদকে ‘ঈদুল-আদ্বহা’ বলা হয়। (কাওয়াইদুল-ফিকহি, মুফতি আমীমুল ইহসান, পৃ-১৮২)।
ফাজাইল : ১. মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘ঈদুল আজহা’র দিনগুলোতে মহান আল্লাহর কাছে আদম-সন্তানদের সর্বাধিক প্রিয় আমল হচ্ছে, তাদের পশু কোরবানি করা। আর এ পশুর শিং, লোম ও খুর কেয়ামত দিবসে তার পক্ষে (সাক্ষী হিসেবে) উপস্থিত হবে। এ কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো। (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)।
২. আরেকটি হাদিসে এসেছে, সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, এ কোরবানির স্বরূপ কী? মহানবী (সা.) উত্তরে বললেন, ‘এটা হচ্ছে তোমাদের পিতা ইবরাহিম (আ.) এর সুন্নত-আদর্শ।’ সাহাবারা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, এতে আমাদের কী লাভ হবে? নবীজি (সা.) উত্তরে বললেন, ‘তার প্রত্যেকটি লোমের বিনিময়ে একেকটি করে পুণ্য রয়েছে। তারা আরজ করলেন, পশমের (ভেড়া ও দুম্বা) ক্ষেত্রেও? তিনি জবাব দিলেন, এগুলোরও প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে।’ (মুসনাদে আহমদ ও ইবনে মাজাহ)।
৩. মহানবী (সা.) আরও এরশাদ করেন, ‘যার কোরবানি করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (তারগীব/মুসতাদরাকে হাকিম)।
৪. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেছেন, ‘ঈদুল আজহা দিবসের পরও আরও দুই দিন কোরবানি করা যায়। একই রকম বর্ণনা হজরত আলী (রা.) সূত্রেও বিদ্যমান।’ (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)।
মাসাইল : কোরবানি কার জন্য ওয়াজিব? যাদের ওপর জাকাত/ফেতরা ওয়াজিব হয়ে থাকে তাদের ওপর কোরবানিও ওয়াজিব। তবে পার্থক্য শুধু এটুকু যে, জাকাতের ক্ষেত্রে নিসাব পরিমাণ সম্পদ সারা বছর হাতে থাকা শর্ত; আর ফেতরা ও কোরবানির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ঈদুল ফিতরের দিন এবং কোরবানির তিন দিন ওই পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই ফেতরা ও কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে।
কোরবানির সময় : ১০ জিলহজ ফজরের পর থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্তÑ এ তিন দিন কোরবানি করার সময়। তবে প্রথমদিনে বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।
বিধি মোতাবেক যেখানে জুমা ও ঈদের সালাত জরুরি, সেখানে ঈদের সালাতের আগে কোরবানি করা বৈধ নয়। আর যেখানে বিধি মোতাবেক ঈদের জামাত জরুরি নয়, সেখানে ফজরের পরেই কোরবানি করা যায়। 
নিজের কোরবানির পশু নিজহাতে জবাই করা উত্তম; তবে মেয়েলোক হলে অথবা অন্য কোনো কারণে অপর কাউকে দিয়ে জবাই করলেও বাধা নেই।
কোরবানির পশু জবাই করার সময় মুখে নিয়ত করা বা দোয়া উচ্চারণ করা জরুরি নয়; করলে ভালো। তাই শুধু অন্তরে নিয়ত রেখে মুখে সশব্দে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করলেই কোরবানি সহিহ-শুদ্ধ হয়ে যায়।
কোরবানি শুধু ব্যক্তির নিজের ওপর ওয়াজিব হয়। পুত্র-কন্যা বা স্ত্রীর কোরবানিযোগ্য সম্পদ থাকলে তাদের কোরবানি পৃথকভাবে তাদের ওপর ওয়াজিব হবে। তাই পূর্ব-আলোচনা ব্যতীত এবং একে অপরকে দায়িত্ব বা অনুমতি প্রদান ব্যতীত কোরবানি করলে তা শুদ্ধ হবে না। সন্তান নাবালক হলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। সুতরাং নাবালকের সম্পদ থাকলেও তা থেকে কোরবানি করা বৈধ নয়। একইভাবে যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব, সে নিজের ওয়াজিব পরিহার করে স্ত্রী/বাবা-মা বা অন্য কারও নামে কোরবানি করলে তা শুদ্ধ হবে না।
নিজের ওয়াজিব পালনের পাশাপাশি সামর্থ্য থাকলে, নফল হিসেবে মহানবী (সা.) এর নামে, জীবিত বা মৃত বাবা-মা, দাদা-দাদি, শ্বশুর-শাশুড়ি, পীর-ওস্তাদ প্রমুখের পক্ষেও কোরবানি করা উত্তম। এতে তাদের আমলনামায়ও বিশাল সওয়াব যোগ হবে। উদাহরণত যারা এককভাবে এক বা একাধিক পশু বা একাধিক অংশ কোরবানি করেন, তারা একটি বা এক নাম নিজের ওয়াজিব হিসেবে দিয়ে অবশিষ্ট অংশে বাবা-মা, স্ত্রী প্রমুখের নামে দিতে পারেন।
কোরবানির পশু : ছাগল, খাসি, পাঁঠা, দুম্বা, ভেড়া নর-মাদি জন্তুতে শুধু একজন বা এক নামেই কোরবানি করা বৈধ হয়। আর গরু, মহিষ ও উটÑ এ তিন প্রকারের জন্তুতে এককভাবে অথবা সর্বোচ্চ সাতজনে মিলে কোরবানি দেওয়া বৈধ হয়। তবে শরিকদের কারও অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হলে কোরবানি শুদ্ধ হবে না।
কোরবানির জন্তু ক্রয় থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ, ঘাস খাওয়ানো, জবাই, বণ্টন ইত্যাদি সর্বপ্রকার যৌথ খরচ, দায়-দায়িত্ব আনুপাতিক হারে সব অংশীদারকে বহন করতে হবে; নতুবা কোরবানি সহিহ হবে না। অংশ অনুপাতে সমান হারে গোশত ইত্যাদি বণ্টন করতে হবে; তবে সম্মতি সাপেক্ষে পায়া/মাথা/ভুঁড়ি কোনো শরিক যদি না নেয় বা কম নেয়, তাতে কোনো সমস্যা নেই।
কোরবানির গোশত : কোরবানির গোশত কোরবানিদাতা, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সবাই খেতে পারে। এমনকি অমুসলিমদেরও তা প্রদান বা আহার করা বৈধ। তবে জাকাত, ফেতরা ও কোরবানির চামড়া ইত্যাদি বাধ্যতামূলক দানগুলো অমুসলিমদের প্রদান বৈধ নয়। তা ছাড়া কোরবানির গোশতের ক্ষেত্রে সাধারণ বিধান হচ্ছে, তা তিন ভাগ করে একভাগ নিজে, একভাগ স্বজনদের এবং একভাগ গরিবদের প্রদান ‘মুস্তাহাব’ তথা ভালো। কিন্তু প্রয়োজনে তার ব্যতিক্রম বা কমবেশি করলেও কোনো পাপ হবে না। অবশ্য যত বেশি পরিমাণ গরিবদের দেওয়া হবে ততবেশি উত্তম ও অধিক সওয়াব পাওয়া যাবে।
মান্নতের কোরবানি, অসিয়ত পালনের কোরবানি এবং যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব ছিল; কিন্তু বিশেষ কোনো কারণবশত কোরবানির সুনির্দিষ্ট তিন দিনে তা পালন করতে না পারায়, পরে তা কাজা করেছেনÑ এ তিন প্রকার কোরবানির গোশত নিজে বা ধনী কাউকে দান বা আহার বৈধ নয়। তা শুধু গরিবদের মাঝেই বণ্টন করতে হবে।
কোরবানির চামড়া : কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রয়ান্তে তা শুধু ফকির-মিসকিনের হক হয়ে যায়। যে কারণে চামড়ার মূল্য একমাত্র তাদেরই দেওয়া যাবে, যারা বিধি মোতাবেক জাকাত, ফেতরা গ্রহণ করতে পারে। কোনো ধনী বা সচ্ছল ব্যক্তিকে যেভাবে জাকাত, ফেতরা দেওয়া যায় না, কোরবানির চামড়াও দেওয়া যায় না। একইভাবে তা ব্যাপক জনকল্যাণমূলক কোনো কাজে বা প্রতিষ্ঠানেও প্রদান করা জায়েজ নয়। যেমনÑ মসজিদ, হাসপাতাল বা কোনো সমিতি বা সংস্থাকে। এতিমখানার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বৈধ ব্যয়খাত হিসেবে সংশ্লিষ্ট গরিব অসহায়দের সরাসরি মালিক বানিয়ে দেওয়ার শর্ত যদি এতিমখানা কর্তৃপক্ষ পালন করে তবে তা জায়েজ হবে। অবশ্য মাদ্রাসা বা এতিমখানার গরিব ছাত্রছাত্রীদের, গরিব শিক্ষক, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম প্রমুখকে দান করা বৈধ। কিন্তু এদের কাউকে তা বেতন বা পারিশ্রমিক বিবেচনায় প্রদান করা জায়েজ নয়।
কোরবানির নিয়ম : কোরবানি করার নিয়ম হচ্ছে, জন্তুটিকে দক্ষিণমুখী শায়িত করে যিনি জবাই করবেন তিনি কেবলামুখী হয়ে দাঁড়াবেন। যথাসাধ্য অধিক ধারালো চুরি/চাকু দ্বারা জবাই করবেন। ‘ইন্নি ওয়াজ্জাহতু... আরবি দোয়াটি পাঠান্তে, কার কার বা কয়জনের পক্ষে কোরবানি হচ্ছে, তা আগে জেনে নিয়ে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করবেন। জবাই-পূর্ব মুহূর্তে মনের মধ্যে এ চিন্তা থাকবে, ‘হে আল্লাহ! তুমিই এ পশুসম্পদ দিয়েছ এবং তোমার নামেই তা কোরবানি করছি’ এবং জবাই শেষে বলবে, ‘হে আল্লাহ! এ কোরবানিকে সেভাবে কবুল করে নাও, যেভাবে তা তোমার হাবিব হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তোমার খলিল হজরত ইবরাহিম (আ.) এর পক্ষ থেকে কবুল করেছিলে।’
মহান আল্লাহ আমাদের জেনে-শুনে, নিষ্ঠাপূর্ণ ও সহিহভাবে কোরবানি করার তৌফিক দিন। আমিন!

(তথ্যসূত্র : আল-বাহরুর রায়িক : খ-৯ যাকারিয়া বুক ডিপো, দেওবন্দ, ভারত; আলমগীরী; ফাতাওয়া শামী : খ-৯, যাকারিয়া বুক ডিপো, দেওবন্দ, ভারত, ইত্যাদি)।

লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন


আজানের মহিমা
সর্বোপরি আজান হচ্ছে নামাজের আহ্বান। আর নামাজের গুরুত্ব যে সর্বাধিক,
বিস্তারিত
আল-মাদ্রাসাতুস সাওলাতিয়াহ মক্কা মোকাররমা
  আল-মাদ্রাসাতুস সাওলাতিয়াহ। পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থিত আরব উপদ্বীপের প্রাচীনতম দ্বীনি
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
ধৈর্য ও সহনশীলতা : নবীজির (সা.) বাড়িতে শুধু শান্তি আর
বিস্তারিত
ফুটপাতে ক্রয়-বিক্রয় প্রসঙ্গে
  প্রশ্ন : আমি ফুটপাতের দোকান থেকে বিভিন্ন জিনিস ক্রয় করি।
বিস্তারিত
২৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক কেরাত সম্মেলন
আসছে ২৯ নভেম্বর শুক্রবার বাদ আসর বাংলাদেশ কারি সমিতির উদ্যোগে
বিস্তারিত
সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা
ইসলাম অতীত ক্ষমা করে দিয়েছে। কারণ ইসলাম পূর্বকৃত সব গোনাহ
বিস্তারিত