দীপা

পহেলা ফাল্গুন।
বইমেলায় শাড়ি পরিহিতা সুশ্রী একজন লেখিকা ৩০১ নম্বর স্টলে অটোগ্রাফসহ বই বিক্রি করছেন। লেখিকা বয়সে তরুণী, তার রূপের বিভা ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। এ যেন স্তিমিত দিনের শেষে উদ্যত দিনের আলোর ঘনঘটা। দূর হতে কিছুটা সময় মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকার পর কাছ গিয়ে জিজ্ঞেস করলুম,
ক্ষমা করবেন। কারও দিকে মুগ্ধ চোখে তাকালে কি পাপ হয়?
পাপ পূণ্যের বিচার পরে। আগে তো চক্ষুলজ্জার ব্যাপার। 
নারী যখন ফুল হয়ে ফোটে/তাকিয়ে থাকি মুগ্ধ চোখে/
এতেও যদি দোষ কিছু হয়/নিশ্চয় ক্ষতি নেই তাতে।
ফুল দূর হতেই সুন্দর, কাছে এলে কাঁটাও থাকে। 
ঘ্রাণও তো আছে।
কিন্তু একটি মাত্র ফুল কি করে পৃথিবীর সবাইকে সৌরভ দেবে?
আজ বসন্ত কিনা! ভ্রমর তো আসবেই।
স্টলের চারপাশে ছোকরার দল ভিড় করছে, কথা না বাড়িয়ে অটোগ্রাফসহ বই কিনে নিলাম লেখিকার। লেখিকা সুন্দর করে স্বাক্ষর করলেন, দীপা।
সেই প্রথম দেখা।
তারপর থেকেই দীপা এবং রাতের ঘুম দুটোই অধরা।
চলতে ফিরতে হুটহাট মনে পড়ে যায় দীপার কথা।
সেদিন মতিঝিল থেকে বাসায় ফিরব। পকেটে হাত দিয়ে দেখি মানিব্যাগ নেই; নেই মানে কোথাও ফেলে এসেছি কিংবা চুরি গেছে। পল্টন মোড় পর্যন্ত হেঁটে আসার পর চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তার বাম পাশে ফুটপাতে। তারপর নাটক কিংবা টেলিফিল্মে যে রকম হয় আর কি, দীপা রিকশায় ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে আছে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই শুকনো মুখে একটুখানি হাসি দিলাম। দীপা আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
কোথায় যাবেন?
মালিবাগ।
আপত্তি না থাকলে উঠে আসতে পারেন।
আমার সৌভাগ্য।
রিকশায় চেপে বসে বললাম, এই প্রথম।
কি?
এমন সুশ্রী মেয়ের সঙ্গে রিকশায় এমন চাপাচাপি করে বসা।
এর বাইরে আর কি করেন আপনি?
কিসের বাইরে?
বাঁদরামির।
ওহ্। রিকশা থেকে নামিয়ে দেবেন বুঝি?
উঁহু, জিজ্ঞেস করছি।
ছবি আঁকি। আপনি কি শুধুই লেখালেখি?
না। একটা ব্যাংকে চাকরি করছি।
ব্যাংকার আবার লেখিকা? কতো সময় আপনার!
আপনাকে কেন লিফট দিচ্ছি, বলুন তো?
আপনার বইটা কেমন লাগল সেটা জিজ্ঞেস করার জন্য।
আপনার বুদ্ধি আছে।
তবু ভবঘুরে।
এবার বলুন?
আপনার লেখা পড়ে মুগ্ধ হইনি, রূপে মুগ্ধ হয়েছি।
কি!
রিকশা থেকে নামিয়ে দিবেন বুঝি?
দুজনেই হেসে ফেললাম। 
ঢাকার পথ, কোনো কোনো দিন রাস্তায় দীর্ঘ যানজটের প্রয়োজন, খুব বেশি। সবার কি তা জানা আছে?
অল্প সময়েই কথা বাড়ে, বাড়ে আন্তরিকতা।
এর মধ্যেই চোখাচোখি, হাসি বিনিময়।
এর মধ্যেই ফোন নম্বর নিয়েছি, কল্পনাতে যেমন হয়।

রাতের বেলায় ফোন দিয়ে বললাম, আপনার শ্যাম্পু কোন ব্র্যান্ডের?
কেন?
ঘ্রাণটা ভালো ছিল।
এত লম্পট কেন আপনি? এর মধ্যেই এতকিছু?
শিল্পী মানুষ তো। ঘ্রাণ না খুঁজে পেলে ছবি সজীব হয়ে ওঠে না।
আমার ছবি আঁকবেন বুঝি?
এঁকে ফেলেছি, রঙ-তুলি ছাড়াই।
পস্তাবেন কিন্তু পরে।
আপনার নিশ্চয় এর জন্য খারাপ লাগবে না।
কথায় এতো প্যাঁচ দেন কেন? 
সরল স্বীকারোক্তির জন্য।
কি শুনতে চান?
আগে শোনাতে চাই
কি?
হৃৎকম্পন।
কয়েকদিনের মধ্যেই দীপার সঙ্গে আমার সম্পর্ক বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছুতে পরিণত হলো অথচ এর পরিণয় ভেবে দেখার সময় ছিল না আমার তখন। সেদিন একটা কফিশপে দেখা করে জিজ্ঞেস করলাম,
বয়ফ্রেন্ড আছে আপনার?
আমার বয়সি নারীর সংসার থাকে জনাব, কিন্তু আমার মন্দ কপাল।
আমিও ছোটো বাচ্চা নই; কিন্তু সুখের বিষয় বউ নেই আমার।
সুখের কেন?
এতদিন বাদে আপনার সঙ্গে দেখা হবে তাই।
দেখাই তো হলো, প্রেম তো নয়।
হলে খুব আপত্তি আছে বুঝি?
দীপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর কিছু না বলে উঠে চলে গেল।
আমি বাইরে এসে সিগারেট ধরালাম। নিকোটিনের ধোয়া ছড়িয়ে দিলাম বৃত্তাকারে। অস্পষ্টতা আজ আকাশের গায়ে! জীবনেরও কিছু কিছু সময় অস্পষ্ট, ঠিকঠাক বুঝে ওঠা যায় না। দীপা কেন এলো? দীপা কেন চলে গেল? মাঝেমাঝে স্রষ্টাকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে খুব, তুমি এত নির্বিকার কেন?
সেদিন শুক্রবার ছিল। আমার বিরহ যাপনের ১১তম দিন। বিনা মেঘে বৃষ্টিপাতের মতো দীপা ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
কোথায় আপনি?
বাসায়
আমি আসছি।
কেন?
ছবি এঁকে দেবেন আমার তাই।
ওহ্, আচ্ছা।
দীপা আমাকে অন্যদিকে তাকাবার অনুরোধ করল। 
কিছুক্ষণ বাদে আমি দীপার দিকে ফিরে তাকাতেই দেখি, দেয়ালের দিকে মুখ করে নগ্ন পিঠে চুপচাপ বসে আছে দীপা। ফর্সা পিঠের ওপর কালো রেখাপাত, বহুদিন আগে দেওয়া তপ্ত লোহার ছ্যাঁকা, এতগুলো দাগ।
বললাম, এর মানে কি?
আমার নীরবতা।
মানে?
পিঠের ছবি আঁকুন। প্রতিটা আঘাত, একেকটা ক্ষতচিহ্ন ফুঁটিয়ে তোলা চাই।
কি করে হলো?
বালিকাবধূর প্রতি শাশুড়ির নির্যাতন, স্মৃতিচিহ্ন।
খুলে বলুন।
ছোটোবেলায় বাবা মা-কে হারাই। চাচারা বিয়ে দিয়ে দেন, আমি তখন এক অজপাড়াগাঁয়ের ১৫ বছরের বালিকা। দেড় বছরের সংসার জীবনে স্বামী-শাশুড়ি মিলে এতগুলো দাগ উপহার দিলে দিশেহারা হয়ে পালিয়ে আসি মামার বাসায়। তারপর আবার নতুন করে শুরু হয় জীবন; কিন্তু সেদিনের বিভীষিকা আমাকে কলঙ্ক এঁকে দিয়ে গেছে পিঠে, আপনার আঁকা ছবি কি এর চেয়েও জীবন্ত হবে?
ভেবেছিলাম চুপ করে সরে যাব; কিন্তু নিশ্চয় সারাজীবন অভিশাপ দিয়ে যেতেন মনে মনে।
আমার চোখে জল চলে এলো। রুম ছেড়ে বেলকোনিতে এলাম। আকাশের দিকে তাকালাম, দিনের আকাশে সূর্যের কলঙ্ক কি? চারপাশে ঘুরে  বেড়ানো দীপার মতন ফর্সা রমণীদেরও দুঃখ আছে, কখনও কি ভেবে দেখেছি এমন করে?
কিন্তু দীপার পিঠের কালো দাগ যে আমার হৃদয়ে স্নো-হোয়াইটের চেয়েও বেশি শুভ্রতা ছড়িয়ে দিয়ে গেল, দীপা কি সেটা জানে?


আরিফ মঈনুদ্দীন বৃষ্টিভেজা তুমি
  নন্দনতত্ত্বে হাত রেখেছিÑ উঠে আসছে নৈপুণ্য নিপুণ শিল্পের ঘরে জমজমাট
বিস্তারিত
একাকী-নিঃসঙ্গ
একাকী-নিঃসঙ্গ নিঃসঙ্গের চেয়েও একাকী হতে পারে মানুষ কখনো-বা একাকী থাকাকে
বিস্তারিত
দ্যূতক্রীড়া
সাইয়্যিদ মঞ্জু  দ্যূতক্রীড়া অতল গহ্বরে হাবুডুবু-প্রমত্ত উল্লাস ভূলুন্ঠিত মানবতা সভ্যতার দ্যূতক্রীড়ায়
বিস্তারিত
এ শহর
এ শহরে বৃক্ষ আছে ছায়া নেই, মানুষ আছে মায়া নেই
বিস্তারিত
নিরু এখনও মরেনি
এক অনাকাক্সিক্ষত ভুলে, অথবা নিয়তির নিষ্ঠুর অভিঘাতে দোষী হয়েছিল নিরু,
বিস্তারিত
স্মৃতিরা কাঁদায়
পুরোনো শার্ট হ্যাঙ্গারে আছে ঝুলে পরে না কেউ চশমাটিও ধুলোময়... ছবির
বিস্তারিত