কোরআন-সুন্নাহর আলোকে লেনদেন

ইসলামি অর্থনীতি হলো কোরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থা। ইসলামি কৃষ্টি ও তমুদ্দুন সমৃদ্ধ যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে; তাই ইসলামি অর্থনীতি। সমাজ বিজ্ঞানী ইবনে খালদুন বলেন, ইসলামি অর্থনীতি হলো জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিজ্ঞান। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নীতি-পদ্ধতি অনুসরণে সৃষ্টির লালন-পালনের যাবতীয় জাগতিক সম্পদের কল্যাণধর্মী ব্যবস্থাপনাই হলো ইসলামি অর্থনীতি। মাওলানা হিফজুর রহমান বলেন, শরিয়তের পরিভাষায় যে বিদ্যা বা জ্ঞানের মাধ্যমে এমন সব উপায় সম্বন্ধে জ্ঞাত হওয়া যায় যার দ্বারা ধনসম্পদ আহরণ ও ব্যয়ের উপযুক্ত ও সঠিক পন্থা এবং বিনষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ নির্দেশ করা হয়Ñ তাকে ইসলামি অর্থনীতি বলা হয়। পুঁজিবাদ এক অর্থনৈতিক অভিশাপ। পুঁজিবাদী অর্থনীতি মানুষকে বল্গাহীন স্বাধীন, নিপীড়ক, স্বার্থপর ও স্বেচ্ছাচারী করে তোলে। পুঁজিবাদের ইতিহাস শোষণ, –নিপীড়ন, বঞ্চনা, অন্যায় যুদ্ধ ও সংঘাতের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। এর দর্শন ভোগবাদী ও ইন্দ্রিয় পরায়ণতার দর্শন। পুঁজিবাদ ব্যক্তিকে নিজস্ব মালিকানার সীমাহীন অধিকার দিয়েছে। এর মাধ্যমে সবধরনের উৎপাদনের উপায় এবং যন্ত্রপাতি ইচ্ছেমতো ব্যবহার ও প্রয়োগেরও অধিকার রয়েছে। 
গরিবদের কল্যাণে ইসলামি অর্থনীতি কাজ করে, গরিবরা যেন অনাহারে-অর্ধাহারে মারা না যায় সেজন্য জাকাত, উশর, খারাজ ইত্যাদির বিধান রাখা হয়েছে। ইসলামি অর্থনীতি হারামকে কঠোরভাবে বর্জন করে। ধন-বৈষম্য সৃষ্টিকারী শোষণমূলক সুদ, জুয়া, লটারি, কালোবাজারি, মজুদকারি, ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল ইত্যাদি উপার্জনের উপায়কে হারাম করা হয়েছে। বস্তুত, ইসলামি অর্থব্যবস্থায় কোনোরূপ জুলুম, শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের অবকাশ নেই। সাতটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ইসলামি অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হচ্ছেÑ সব ক্ষেত্রে আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকার-এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাজকিয়া (আত্মশুদ্ধি) ও তাকওয়া ও আল্লাহভীরুতা অর্জন। সব কর্মকা-ে শরিয়তের বিধান মান্য করা। সর্বক্ষেত্রে আদল ও ইহসান প্রয়োগ। ব্যক্তির সম্পদে সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ইসলামি অর্থনীতির মূলনীতি হচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের প্রয়াস। মৌলিক মানবিক প্রয়োজন পূরণ নিশ্চিত করা এবং যুগপৎ দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ অর্জন। ব্যক্তির সম্পদে সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা ইসলামি অর্থনীতির মূলনীতি। পুঁজিবাদী  অর্থনীতিতে ব্যক্তি ইচ্ছেমতো সম্পদ উপার্জন করতে পারে। যেখানে ইচ্ছে সেখানে কারখানা স্থাপন করতে পারে। যতদূর ইচ্ছে মুনাফাও লুটতে পারে। শ্রমিক নিয়োগের যেমন সুযোগ রয়েছে, তাদের শোষণ করে একচ্ছত্রভাবে মুনাফা লুণ্ঠনের পথেও সেখানে কোনো বাধা নেই। পুঁজিবাদের কিছু ত্রুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এগুলোর মধ্যেÑ ১. অপচয়মূলক প্রতিযোগিতা, ২. অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বেকারত্ব, ৩. সম্পদের ত্রুটিপূর্ণ বণ্টন, ৪. একচেটিয়া ব্যবসায়ের উদ্ভব ও তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা সংহতকরণ, ৫. বাণিজ্যচক্রের পর্যায়ক্রমিক উপস্থিতি ও চরম নৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের ক্রম বিস্তৃতি। 
প্রতিটি মুসলমানের ইসলামি অর্থনীতি মেনে চলা আবশ্যক। ঈমান ও আমলের ক্ষেত্রে যেমন আল্লাহর বিধান মেনে চলা প্রয়োজন, তেমনি অর্থনৈতিক লেনদেনে আল্লাহর বিধান মেনে চলা আবশ্যক। অর্থনৈতিক জীবনে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ইসলামে আর্থিক ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিধান রাখা হয়েছে। কেউ কেউ ইসলামি অর্থনীতির স্বপ্ন বলেন অলীক, এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অথচ নবীজি (সা.) মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্রের বাস্তবতা দেখিয়েছেন। ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবের অধিবাসীরা বৈষম্য ও দরিদ্রের শিকার ছিল। ইসলামি অর্থনীতির কল্যাণে তখনকার ইসলামি সমাজের জীবনধারা পাল্টে যায়। ইসলামি অর্থনীতি সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও ভোগের নিশ্চয়তা দেয়। জাগতিক সম্পদের সামগ্রিক ও কল্যাণধর্মী ব্যবস্থাপনা ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। এতে শরিয়তের বিধি-নিষেধ সম্বন্ধীয় জ্ঞান ও তার বাস্তব প্রয়োগÑ বস্তুগত সম্পদ আহরণ ও বিতরণে কোরআন-সুন্নাহর বাস্তব প্রতিফলন। ইসলামি অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছেÑ ‘আদল’ ও ‘ইহসান’ কায়েম করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় কাজ ও অবাধ্য হতে নিষেধ করেন।’ (সূরা নাহল : ৯০)। ইসলাম বঞ্চিত ও নির্যাতিতদের পক্ষে বিধান দিয়েছে। মানুষ তার সম্পদের একচেটিয়া মালিক হতে পারে না। সম্পদশালী বা ধনীদের সম্পদে গরিবের হক রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাদের সম্পদে সাহায্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সূরা জারিয়াত : ১৯)। ইসলামি অর্থনীতি দুর্বলদের জন্য কল্যাণকর ব্যবস্থা রেখেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আর আমরা ইচ্ছা করলাম তাদের প্রতি অনুগ্রহ করব, যাদের দেশে দুর্বল করে রাখা হয়েছে তাদের নেতৃত্বের আসনে আসীন করতে এবং দেশের উত্তরাধিকারী করতে চাই।’ (সূরা কাসাস : ৫)। ইসলাম কল্যাণকর দ্রব্য উৎপাদনে মানুষকে উৎসাহ দেয়। ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের স্বার্থে স্বাস্থ্যসম্মত দ্রব্যের পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করা। ইসলাম কল্যাণকর বস্তু উৎপাদনে সমর্থন করে না। নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, বেদি ও শুভাশুভ নির্ণয়ের তীরগুলো নাপাক ও শয়তানি কাজ। অতএব আমরা এসব থেকে বিরত থাকব, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। (সূরা মায়েদা : ৯০)। ইসলাম অকল্যাণকর দ্রব্যের উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিষিদ্ধ করেছে। মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর দ্রব্যগুলোকে হারাম করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হারাম খাদ্যে গঠিত শরীর জান্নাতে যাবে না।’ (মেশকাত : ২৭৮৭)। ইসলাম সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর গুরুত্বারোপ করে আল্লাহ বলেন, ‘ধনৈশ্বর্য যেন শুধু তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়।’ (সূরা হাশর : ৭৬ )। ইসলামি অর্থনীতির লক্ষ্য হচ্ছে আইন ও পলিসির মাধ্যমে সম্পদের বিস্তার ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।  
লেখক : প্রভাষক, সাংবাদিক ও  ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা


পবিত্র শবে মেরাজ কবে, জানা
১৪৪১ হিজরি সনের পবিত্র শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারণ এবং রজব
বিস্তারিত
মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : আল-কুরআনে শিল্পায়নের ধারণা লেখক : ইসমাঈল হোসাইন মুফিজী প্রচ্ছদ :
বিস্তারিত
উম্মতে মুহাম্মদির মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা যে বিষয়কে আমাদের জন্য পূর্ণতা দিয়েছেন, যে বিষয়টিকে
বিস্তারিত
যেভাবে সন্তানকে নামাজি বানাবেন
হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর
বিস্তারিত
আবু বাকরা (রা.)
নোফায় বিন হারেস বিন কালাদা সাকাফি (রা.)। তার উপনাম আবু
বিস্তারিত