চাকরি

গাছপালা ও বাঁশবাগানের ছায়ায় ঘেরা বোয়ালিয়া গ্রামটি। এ গ্রামেই জন্ম পাপিয়ার। তার বাবা-মা অতি সহজ-সরল। চাষাবাদ করে চলে তাদের সংসার। বাবা-মায়ের অতি আদরে বেড়ে ওঠা পাপিয়া এবার গ্রামের এক স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। তার স্কুলে যোগ দিয়েছেন নতুন এক শিক্ষক। সদ্য বিএসসি পাস করেছেন তিনি। দেখতে সুন্দর। নাম দুলাল। গণিতসহ অন্যান্য বিষয়ে পাঠদান করান। শিক্ষার্থীরাও তার পাঠে খুশি। সেজন্য পাপিয়াসহ তার আরও কয়েক সহপাঠী মিলে ক্লাস শেষে বিকালে দুলাল স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়া শুরু করে।
সামনে এসএসসি পরীক্ষা। পাপিয়া পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সময়ে পাপিয়ার বিয়ের জন্য বাড়িতে ঘটক আসে। এ কথা দুলাল স্যারের কানেও আসে। কথায় কথায় দুলাল স্যার বলেন, ‘গ্রামের সহজ-সরল বাবা-মায়েরা ইকটু-ইকটু মেয়িদের বিয়ি দিয়ি দেয়, বাল্য বিয়ি দিওয়া অপরাধ ইরা তা বোঝেই না। আর গাঁ’র চিয়ারম্যানরাও ওরাম, ভোট নিওয়ার জন্যি বয়স বাড়িয়ে সার্টিফিকিট দিয়ি দেয়।’
বিকালে প্রাইভেট পড়তে পড়তে দুলাল স্যারের প্রতি পাপিয়ার দুর্বলতা বাড়ে। অবশ্য স্যার তা জানেন না। কথায় কথায় দুলাল স্যার একদিন বলেছিলেন, গ্র্যাজুয়েট মেয়ে ছাড়া তিনি বিয়ে করবেন না। আর তাই মনে মনে জেদ চেপে বসে পাপিয়ার। সে সিদ্ধান্ত নেয় গ্র্যাজুয়েট সে-ও হবে। সেজন্য বিয়ের প্রস্তাব এলেও সে তা ফিরিয়ে দেয়। বাবা-মাও তা মেনে নেয়।
ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে বাংলায় পড়ার সুযোগ পায় পাপিয়া। ইউনিভার্সিটির স্বাধীন জীবন, মুক্ত বিহঙ্গের মতো মনে হয় তার। নতুন পরিবেশে, বন্ধু-বান্ধব, সব যেন স্বপ্নের মতো লাগে তার কাছে। এসব পেয়ে স্কুলের দুলাল স্যারের স্মৃতি কখন যে মনে থেকে মøান হয়ে যায়, সেটা পাপিয়া নিজেও জানে না। খবর পায়, দুলাল স্যার প্রাইমারি স্কুলের এক শিক্ষিকাকে বিয়ে করে ঘর-সংসার করছে। দেখতে দেখতে পাপিয়া ইউনিভার্সিটির পড়ালেখা শেষ করে বাড়ি আসে। মাঝেমধ্যে শহরে যায় চাকরির আবেদন করতে।
গ্রামে পাপিয়ার সঙ্গে যেসব মেয়ে লেখাপড়া করত, তাদের অনেকেরই স্কুলের গ-ি না পেরোতেই বিয়ে হয়ে যায়। তাদের কারও কারও ছেলেমেয়ে এখন প্রাইমারি-হাইস্কুলে পড়ে। তাদেরই একজন সোনিয়া। পাপিয়া যখন সেভেনে, সোনিয়া তখন এইটে। তখনই তার বিয়ে হয়। ওর বর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। ওদের মেয়ে সামনে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। পাপিয়া সোনিয়ার বাড়ি সকাল-বিকাল আসে-যায়। গল্প করে সংসার জীবন নিয়ে।
পাপিয়ার বিয়ের জন্য তার বাবা-মা হন্য হয়ে ছেলে খুঁজছে। কিন্তু ব্যাটে-বলে মিলছে না। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পাপিয়া বিয়ে করবেÑ এমনই তার মানসিকতা। এদিকে বয়সটাও বাড়ছে। একসময় বিয়েতে সম্মতি দেয় পাপিয়া। অনেকটা আষাঢ়ের রৌদ্রে আওরিয়ে যাওয়া ফসলের মতো। দশে-চক্রে ভগবানও নাকি ভূঁত হয়। পাপিয়ার অবস্থা এখন সে রকম। ইউনিভার্সিটি জীবনে যে রফিককে গুরুত্ব দিত না, সেই রফিকই পাপিয়াকে দেখতে আসবে। রফিকও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছে। পাপিয়ার এক বছরের সিনিয়র। প্রায় ক্যাম্পাসে দেখা হতো। মুখোমুখি হলে দুই-একটি কথাও হতো। তবে পাশের গ্রামের ছেলে বলে কিছুটা এড়িয়ে যেত। এড়িয়ে যাওয়ার মূল কারণ রফিকের বাবার দরিদ্রতা। রফিকের বাবা নদীতে মাছ ধরে হাটে বিক্রি করে। এ কারণেই পাপিয়া রফিককে এড়িয়ে চলত। 
রফিক আসে পাপিয়াকে দেখতে। কনে সেজে রফিকের সামনে আসে পাপিয়া। পাত্রী দেখে রফিকরা বিদায় নেয়। দুদিন বাদে ঘটক আসে পাপিয়াদের বাড়িতে। খেতে খেতে সে জানাল, যেদিন পাপিয়াকে রফিক দেখতে আসে সেদিন রাস্তায় সোনিয়ার মেয়ে রুপাকে দেখেছিল। রুপাকে রফিকের ভালো লেগে যায়। সেদিনই বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। সোনিয়া ও তার স্বামীও নাকি রাজি। রফিক যুব উন্নয়নের কর্মকর্তা। সোনিয়ারা চাকরিজীবী জামাই পাচ্ছে; তাই তারা এ সুযোগ ছাড়তে নারাজ।
রুপাকে পছন্দের বিষয়টি পাপিয়ার কানে আসার পর থেকে মানসিকভাবে সে ভেঙে পড়ে। যে রফিক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটু সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে থাকত পেছনে, সেই রফিক হাঁটুর বয়সি কিশোরী মেয়েকে দেখে পাগল হয়ে গেল? রফিক নাকি বলেছে, একটু জুনিয়র মেয়ে বিয়ে না করলে একটা সন্তান হলেই বউকে বুড়ি বুড়ি দেখায়। হায় কপাল! 
বারবার বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে পাপিয়ার। পাপিয়ার মা মেয়ের জন্য ওসমানপুর গ্রামের কবিরাজ আমেনার কাছে আসে। লোকমুখে প্রচলিত কবিরাজ আমেনা জিনের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। আবার মানুষের সমস্যার সমাধানও করতে পারেন। সেজন্যই পাপিয়ার মা এখানে এসেছে মেয়েকে নিয়ে। কিন্তু পাপিয়ার এসব ভ- কবিরাজদের চেনা আছে। ভিড় ঠেলে পাপিয়া যখন আমেনার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, সেই আমেনা হাত-পা ছুড়ে এলোমেলো তাকিয়ে, সোজা হয়ে শুয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করে। এমন সময় আমেনার পোষা লোকজন পাপিয়াদের কিছু অশ্লীল কথা বলে ঠেলে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আসলে শিক্ষিত কোনো মানুষ দেখলেই আমেনা এই ভান করে। কারণ শিক্ষিতরা তার প্রতারণা ধরতে পারে। 
রফিকের দেওয়া অপমান আর লেখাপড়া শেষে বেকারত্বের যন্ত্রণা ঘিরে ধরে পাপিয়াকে। ভাবে শহরে গিয়ে কিছু একটা করবে। প্রয়োজনে গার্মেন্টসে কাজ করবে; তবু বাড়ি আর থাকবে না। এক দুপুরে পাপিয়া শুয়ে ছিল। তখন তার মা একটা খাম এনে পাপিয়াকে দিয়ে বলে, ‘পিয়ন দিয়ি গিছ, দেখো দিন কি লেইখিছে?’ ‘পাপিয়া খামটি খুলে কেঁদে ফেলে। ওড়না দিয়ে চোখ মোছে, মায়ের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলে, মা ব্যাংকে চাকরি হয়ি গিছে...।’


আরিফ মঈনুদ্দীন বৃষ্টিভেজা তুমি
  নন্দনতত্ত্বে হাত রেখেছিÑ উঠে আসছে নৈপুণ্য নিপুণ শিল্পের ঘরে জমজমাট
বিস্তারিত
একাকী-নিঃসঙ্গ
একাকী-নিঃসঙ্গ নিঃসঙ্গের চেয়েও একাকী হতে পারে মানুষ কখনো-বা একাকী থাকাকে
বিস্তারিত
দ্যূতক্রীড়া
সাইয়্যিদ মঞ্জু  দ্যূতক্রীড়া অতল গহ্বরে হাবুডুবু-প্রমত্ত উল্লাস ভূলুন্ঠিত মানবতা সভ্যতার দ্যূতক্রীড়ায়
বিস্তারিত
এ শহর
এ শহরে বৃক্ষ আছে ছায়া নেই, মানুষ আছে মায়া নেই
বিস্তারিত
নিরু এখনও মরেনি
এক অনাকাক্সিক্ষত ভুলে, অথবা নিয়তির নিষ্ঠুর অভিঘাতে দোষী হয়েছিল নিরু,
বিস্তারিত
স্মৃতিরা কাঁদায়
পুরোনো শার্ট হ্যাঙ্গারে আছে ঝুলে পরে না কেউ চশমাটিও ধুলোময়... ছবির
বিস্তারিত