আশুরা দিবসের মর্যাদা ও করণীয়

আল্লাহর বান্দারা, আশুরার দিন নবী (সা.) এর সিয়াম পালন এবং তাঁর আগে মুসা (আ.) ও তার জাতির ওপর সাহায্য এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়ে মারার জন্য আল্লাহর নবী মুসা (আ.) এর আল্লাহর শুকরিয়াস্বরূপ রোজা রাখা স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে, নেয়ামতের জন্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলে তা নেয়ামতকে স্থায়ী ও বৃদ্ধি করে। এ শোকর আদায়কারীর জন্যই আল্লাহ তাঁর নেয়ামতের ওয়াদা করেছেন নিজ বাণীতে : ‘যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর; তবে তোমাদের আরও দেব।’ (সূরা ইবরাহিম : ৭)

বান্দার ওপর আল্লাহর রহমতের ব্যাপকতা ও অনুগ্রহের প্রশস্ততা এবং তাদের জন্য মঙ্গলের ইচ্ছার প্রমাণ স্পষ্ট প্রতিভাত হয় নেকি ও পুণ্যের নানা পন্থার মধ্য দিয়ে। যেসবের আদেশ তিনি দিয়েছেন এবং যেসবে তিনি উদ্বুদ্ধ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যেসব দিয়ে তিনি নাজিল করেছেন তাদের ওপর তাঁর মহান গ্রন্থ। যে সহিহ সুন্নাহ নিয়ে এসেছেন তাঁর প্রিয়তম নবী ও রাসুল (সা.)।
প্রতিটি সময়েই রয়েছে কল্যাণ ও পুণ্যের কোনো না কোনো পথ। এটি বছরব্যাপী বিরাজমান। এমন কোনো মাস নেই, যার দিন বা রাতের কোনো ইবাদত নেই। যার মাধ্যমে বান্দা আনুগত্য দেখাতে পারে। নেই নৈকট্যের কোনো আমল, যার মাধ্যমে নিজ প্রভুর কাছে চলে যেতে পারে। যার উত্তম পরিণামে তার চোখ শীতল হয়ে যায়। 
মুসলিম একদিকে তার বছরটি শেষ করলেন আপন রবের এক মহান ইবাদতের মধ্য দিয়েÑ আল্লাহর সম্মানিত ঘরের হজ-ওমরা, তাশরিকের দিনগুলোতে জিকির-আজকার, হাদি ও কোরবানির পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং হাজীরা ছাড়া অন্যরা বছরের শেষ মাস জিলহজে আরাফা দিবসের রোজা ইত্যাদি পুণ্যের মাধ্যমেÑ অন্যদিকে তিনি নতুন বছর শুরুও করলেন আল্লাহর মাস মহররমের রোজার মতো একটি মর্যাদাবান ইবাদতের মধ্য দিয়ে। বছরের প্রথম মাস, যার সম্পর্কে নবী (সা.) জানিয়েছেন, এ মাসের রোজা রমজানের সিয়ামের পর সর্বশ্রেষ্ঠ। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে ইমাম মুসলিমের সহিহ ও সুনান গ্রন্থগুলোতে। 
এতে মুসলিম ব্যক্তি তার জীবনের সেই মহান লক্ষ্য স্মরণ করে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। যে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আল্লাহ পৃথিবীতে মানুষের বিস্তার ঘটিয়েছেন। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই আল্লাহ বলে দিয়েছেন নিজ কিতাবে স্বীয় বাণীতে : ‘আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে জীবিকা চাই না এবং এটাও চাই না যে, তারা আমাকে আহার্য জোগাবে। আল্লাহই তো জীবিকাদাতা শক্তির আধার, পরাক্রান্ত।’ (সূরা জারিয়াত : ৫৬-৫৮)। 
এই স্মরণই তাকে ধাবিত করে সদা সেই বাস্তবতা সামনে রাখতে, যা অধিকাংশ মানুষের চিন্তায় অনুপস্থিত থাকে। অথচ তা সুপ্রতিষ্ঠিত, সুস্পষ্ট এবং তার ওপর আল্লাহ তায়ালার কিতাবের পরিষ্কার প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত। আর তা হলো, মুসলিমের পুরো জীবন এবং তার সমূহ কাজকর্ম তারই স্রষ্টা, রিজিকদাতা ও মালিক আল্লাহর জন্য, যিনি তার সব বিষয়, যা দিয়ে যেভাবে চান পরিচালনা করেন। এজন্য তারও কর্তব্য, আল্লাহ সুবহানাহুকেই নিজের উদ্দিষ্ট ও অভীষ্ট এবং অন্তরের কেবলা ও কর্মের শেষ-সীমানা নির্ধারণ করা। এরশাদ হয়েছে : ‘আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্যশীল।’ (সূরা আনআম : ১৬২-১৬৩)। 
আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর মাস মহররমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোজা হলো আশুরার সিয়াম। যে এ দিন রোজা রাখবে তার জন্য ব্যাপক বিনিময় ও বড় প্রতিদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যেমন বোখারি ও মুসলিম তাদের সহিহ গ্রন্থে সংকলন করেছে, ইবনে আব্বাস (রা.) কে আশুরার রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলোÑ তিনি বললেন : ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে রোজা রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি; যত দেখেছি এ আশুরার দিন এবং এ মাস অর্থাৎ রমজানের রোজার প্রতি।’ 
ইমাম মুসলিম তার সহিহ গ্রন্থে আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবী (সা.) কে আশুরা দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। নবী (সা.) তখন এরশাদ করলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি আশুরার রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন।’ তেমনি বোখারি ও মুসলিমে আরও বর্ণিত হয়েছে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনা হিজরত করেন, ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এ দিনে রোজা রাখো কেন? তারা বলল, এটা এমন দিবস, যেদিন আল্লাহ তায়ালা মুসা ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়ে মেরেছেন। এর শুকরিয়াস্বরূপ মুসা এ দিন রোজা রেখেছেন। এ কারণে আমরাও রাখি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমরা তোমাদের অপেক্ষা মুসার অধিকতর আপন ও হকদার।’ অতঃপর তিনি নিজে এ দিন রোজা রাখেন এবং সবাইকে রোজা রাখার নির্দেশ দেন।’
আশুরায় রোজা রাখার জন্য এমন বিশাল প্রতিদানের পাশাপাশি রয়েছে আরও কিছু তথ্য, যা এ দিন রোজা রাখতে, এ সুযোগ লুফে নিতে এবং হাতছাড়া না করতে ব্যাপকভাবে উদ্বীপ্ত করে। সম্মানিত নবীর অনুকরণে এবং পূর্বসূরি পুণ্যবান মনীষীদের (রা.) এর পদাঙ্ক অনুসরণে। তারা এ দিনের রোজাকে তুলনাহীন গুরুত্ব দিতেন। যেমন বোখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছেÑ রুবাইয়্যি বিনতে মুআওয়াজ (রা.) বলেন, ‘আশুরার দিন সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ঘোষককে আনসারিদের পাড়ায় পাড়ায় এ মর্মে ঘোষণা করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন, যারা কিছু খেয়ে ফেলেছে তারা যেন দিনের অবশিষ্ট অংশ পানাহার থেকে বিরত থাকে। আর যারা রোজা রেখেছে তারা যেন সেটা পূর্ণ করে। বর্ণনাকারী বলেন, সে কারণে আমরা নিজেরা রোজা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদের জন্য তুলা দিয়ে খেলনা বানিয়ে দিতাম। ওদের কেউ যখন ক্ষুধায় কান্না করত, আমরা ওই খেলনা দিয়ে তাদের ইফতার পর্যন্ত ভুলিয়ে রাখতাম।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, তখন এ রোজা রাখা ওয়াজিব ছিল। পরে এ ওয়াজিব রহিত করা হয়। তারপর থেকে এ রোজা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি মুস্তাহাব হিসেবে রয়ে গেছে।’ এটি ইমাম আহমাদেরও একটি মত। 
বলাবাহুল্য আশুরার রোজা শিশুদের জন্য ওয়াজিব ছিল না। কারণ তারা শরিয়তের কোনো বিষয়ে আদিষ্ট নয়। তবু সাহাবায়ে কেরাম তাদের এ রোজায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। হাফেজ কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘তারা তাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন তাদের প্রশিক্ষিত ও অভ্যস্ত করতে এবং সুন্নাহর অনুসরণ ও আনুগত্যের আতিশয্যে।’ এটি তাদের শিক্ষাদানের এক সুন্দর ও মহত্তম চিত্র। কতই না মহৎ এর প্রভাব। কতই না সুদূরপ্রসারী এর কার্যকারিতা। 
আল্লাহর বান্দারা, আশুরার দিন নবী (সা.) এর সিয়াম পালন এবং তাঁর আগে মুসা (আ.) ও তার জাতির ওপর সাহায্য এবং ফেরাউন ও তার জাতিকে ডুবিয়ে মারার জন্য আল্লাহর নবী মুসা (আ.) এর আল্লাহর শুকরিয়াস্বরূপ রোজা রাখা স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে, নেয়ামতের জন্য ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলে তা নেয়ামতকে স্থায়ী ও বৃদ্ধি করে। এ শোকর আদায়কারীর জন্যই আল্লাহ তাঁর নেয়ামতের ওয়াদা করেছেন নিজ বাণীতে : ‘যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর; তবে তোমাদের আরও দেব।’ (সূরা ইবরাহিম : ৭)।
অতএব হে আল্লাহর বান্দারা, নেয়ামতের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজগুলোর মাধ্যমে তাঁর শুকরিয়া আদায়ের চেষ্টা করুন। তাঁর গোস্বা ও শাস্তির কারণ থেকে দূরে থাকুন। রোজা রাখুন আশুরার দিনের সঙ্গে তার আগে বা পরে একদিন। নবী (সা.) বলেন, ‘আমি যদি আগামী আশুরা পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তাহলে অবশ্যই ৯ তারিখও রোজা রাখব।’ (বর্ণনায় ইমাম মুসলিম তদীয় সহিহ গ্রন্থে)। 
অনুরূপ তাবরানি (রহ.) তদীয় মুজাম কাবিরে সহিহ সনদে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে ইনশাআল্লাহ নবম তারিখেও রোজা রাখব, যাতে আশুরা আমার ছুটে না যায়।’ এটিই ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ (রহ.) এর মত। আর ইমাম আবু হানিফা (রহ.) শুধু আশুরা তথা দশম তারিখ রোজা রাখা মাকরুহ বলেছেন।

৭ মহররম ১৪৪১ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত 
ভাষান্তর আলী হাসান তৈয়ব


মার্কিন জোটের হামলার বলি আফগান
  ‘নানকারহার’ প্রদেশের ‘কোত’ জেলার বাসিন্দা ছাওয়াব খান তাওয়াব। ষাটোর্ধ্ব বয়স।
বিস্তারিত
গাদ্দাফিকে হত্যায় ফ্রান্সের হাত থাকার
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের কাছে পাঠানো তিন হাজার গোপন
বিস্তারিত
‘পাক-ভারত পরমাণু যুদ্ধ ২০২৫ সালে সাড়ে
মিজানুর রহমান খান  যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, কাশ্মীর বিরোধের জের
বিস্তারিত
জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থা আতঙ্কে মুসলিমরা
জার্মানির হালে শহরে ইহুদিদের উপাসনালয়ে হামলায় মর্মাহত দেশটির মুসলিমরা। সেখানে
বিস্তারিত
বাবা হোক লোকমান হাকিমের মতো
সপ্তম উপদেশ সামাজিক শিষ্টাচার সম্পর্কে : এরশাদ হয়েছে: “অহংকারবশে তুমি
বিস্তারিত
মুসলিম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শংকরপাশা শাহি
কালের বিবর্তনে এক সময় মসজিদ সংলগ্ন এলাকা বিরান ভূমিতে পরিণত
বিস্তারিত