আধুনিক ইসলামি অর্থনীতি-চিন্তার বিকাশ ।। আবদুস সাত্তার আইনী ।।

ইসলামিক ব্যাংক অব ব্রিটেন

বর্তমানে বিশ্বে ১ হাজার ১৪৩টি ইসলামি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৩৮ শতাংশ ইসলামিক ব্যাংক, ২৭ শতাংশ তাকাফুল বিমা কোম্পানি এবং ৩৫ শতাংশ ফিন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি রয়েছে। মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি দেশের সরকার তাদের অর্থব্যবস্থাকে ইসলামি অর্থব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেমনÑ পাকিস্তান, সুদান ও ইরান। যদিও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নেতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হচ্ছে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মুসলিম দেশগুলো থেকে ঔপনিবেশিক শাসকরা পাততাড়ি গোটাতে শুরু করে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে। ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। তখন থেকেই ‘ইসলামি অর্থনীতি’ পরিভাষাটির সৃষ্টি হয় এবং ইসলামি অর্থব্যবস্থার ওপর এতদিন যে ছায়াচ্ছন্নতা ছিল তা সরে গিয়ে আলো জ্বলে ওঠে।  কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা এবং যুগের বাস্তবিকতার সমন্বয়ে একটি সুঠাম অর্থব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যায়। পরনির্ভরতার দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ উন্মোচিত হয় এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন গতিশীল হয়। 
কয়েকজন ন্যায়নিষ্ঠ ইসলামপন্থি মনীষী ইসলামি অর্থনীতি-চিন্তার পরিচর্যায় আত্মনিয়োগ করেন এবং কিছু দেশের সরকারও এ চিন্তাকে গ্রহণ করে। উল্লেখ্য, এসব দেশ কখনও পুঁজিবাদের বশ্যতা স্বীকার করেছে এবং কখনও সাম্যবাদের গুণগান গেয়েছে। কখনও এই দুটির মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছে। তারা সামরিক দিক থেকে ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হলেও ঔপনিবেশিক চিন্তার আগল ছিঁড়তে ব্যর্থ হয়।
ইসলামি অর্থচিন্তাবিদরা তাদের সমাজের সমস্যা ও সংকটের স্বরূপ উন্মোচনে প্রচেষ্টা ব্যয় অব্যাহত রাখেন এবং ইসলামি অর্থব্যবস্থার কাঠামোতে এসব সমস্যা ও সংকটের উপযোগী নানা প্রকারের চিকিৎসা প্রদান করেন। এভাবে আধুনিক ইসলামি অর্থনীতি-চিন্তার বিকাশ সাধিত হয়। মুদ্রা, মুনাফা, ইসলামি ব্যাংক, জাকাত, কর ও শুল্ক, অর্থনৈতিক মূল্যবোধ, মূল্যস্ফীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইসলামি অর্থনীতি-চিন্তার বেশ কিছু অবদান পরিলক্ষিত হয়। ইসলামি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও আর্থিক লেনদেনও এসব অবদানে পরিপুষ্ট হয়। 
ইসলামি ফকিহ ও অর্থনীতিবিদদের ব্যক্তিগত রচনায় উপর্যুক্ত অবদানের কথা আলোচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কনফারেন্সের মধ্য দিয়েও ইসলামি অর্থনীতির গতিশীলতার বিষয়টি বোঝা যায়। গত কয়েক দশক ধরে ইসলামি অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক কনফারেন্স ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মক্কা মুকাররমায় বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক কনফারেন্স। জেদ্দায় স্থাপিত ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অধীন ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট কর্তৃক বেশ কয়েকটি সেমিনার ও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে সালেহ কামাল সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিক্স। ইসলামি অর্থনীতিতে এই প্রতিষ্ঠানটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আন্তর্জাতিক ফিকহ কাউন্সিল ও একাডেমিগুলোও ইসলামি অর্থনীতি প্রসঙ্গে ফিকহের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিকগুলো তুলে ধরেছে। এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে ওআইসির অধীন জেদ্দায় ও মক্কায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি। 
প্রাতিষ্ঠানিক পঠন-পাঠন, গবেষণা ও উচ্চাশিক্ষায়ও ইসলামি অর্থনীতি যথেষ্ট আনুকূল্য লাভ করেছে। ইসলামি বিশ্বের বহু বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি অর্থনীতিকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, সুদানের উমদুরমান ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক ইকোনমিক্স, মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জর্ডানের ইয়ারমুক বিশ্ববিদ্যালয় এবং লেবাননের ইমাম আল-আওযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়।
ইসলামি অর্থনীতির পঠন-পাঠনের বিষয়টি শুধু ইসলামি বিশ্বেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং পশ্চিমাবিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও তা জায়গা করে নিয়েছে। যেমনÑ যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে তাদের সভা-সমিতিতে ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করছে এবং তাদের কাছে ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ে গবেষণামূলক তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। ইসলামি অর্থনীতিতে মাস্টার্স ও ডক্টরেট প্রোগ্রাম পরিচালনায় ব্রিটেনের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। ডারহাম (উঁৎযধস) বিশ্ববিদ্যালয়, লাফবারাফ (খড়ঁমযনড়ৎড়ঁময) বিশ্ববিদ্যালয়, ডান্ডি (উঁহফবব) বিশ্ববিদ্যালয়, নিউক্যাসল (ঘবপিধংঃষব) বিশ্ববিদ্যালয়, রিডিং বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংগোর (ইধহমড়ৎ) বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ে মাস্টার্স ও ডক্টরেট প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। লন্ডনে রয়েছে ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স (ওওইও)। এছাড়াও ব্রিটেনে রয়েছে আল রায়ান ব্যাংক, যা এর আগে ‘ইসলামিক ব্যাংক অব ব্রিটেন’ নামে পরিচিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (ওওওঞ)। ফ্রান্সের প্যারিস-দাওফিন (চধৎরং-উধঁঢ়যরহব) বিশ্ববিদ্যালয়েও ইসলামি অর্থনীতিতে মাস্টার্স প্রোগ্রাম রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রব (খধ ঞৎড়নব) বিশ্ববিদ্যালয়েও ইসলামি অর্থনীতিতে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।
ইসলামি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ইসলামি অর্থনীতি-চিন্তার বিকাশে জোরালো ভূমিকা পালন করেছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে রয়েছে ইসলামি ব্যাংকগুলো। অন্য যেসব কমার্শিয়াল ব্যাংক ইসলামিক শাখা খুলেছে তাদের সংখ্যাও কম নয়। তারা ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য ইসলামি তাকাফুল বা বিমা প্রতিষ্ঠান। এগুলোর পাশাপাশি রয়েছে ইসলামি ফিন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি।
বর্তমানে বিশ্বে ১ হাজার ১৪৩টি ইসলামি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৩৮ শতাংশ ইসলামিক ব্যাংক, ২৭ শতাংশ তাকাফুল বিমা কোম্পানি এবং ৩৫ শতাংশ ফিন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি রয়েছে। 
মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি দেশের সরকার তাদের অর্থব্যবস্থাকে ইসলামি অর্থব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেমনÑ পাকিস্তান, সুদান ও ইরান। যদিও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নেতিবাচক দিক পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামি অর্থনীতির বিকাশ ও বাস্তবিক প্রয়োগ অব্যাহত থাকার ফলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি হালে পানি পায়নি; অথচ আশির দশকের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত এসব দেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চিন্তার জয়জয়কার ছিল। ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার যে সেøাগান ছিল, তা রূপকথায় পর্যবসিত হয়। 
প্রচলিত অর্থব্যবস্থা যে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও বস্তুগত স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, তা অতীতের ঘটনাবলি ও বর্তমানের বাস্তবিকতার দ্বারা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। মানুষ মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যও লাভ করেনি। তাছাড়া উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষ মুসলিম রাষ্ট্রগুলো উন্নত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবধান কমিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু মুসলিম রাষ্ট্র ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের শিকার হয়েছে; তাদের নিজেদের আর্থিক সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেনি এবং মাথাপিছু ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের বাজেটে আয়-ব্যয়ের বিপুল ঘাটতি থাকার ফলে ঋণের দুষ্টচক্র থেকে তারা কখনও বেরুতে পারে না। ইসলামি অর্থনীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে এসব সংকট মোকাবিলা ও সমস্যার সমাধান সম্ভব। 


মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে ইসলাম
গত ১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে গেল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য
বিস্তারিত
জুলুমবাজ ও হত্যাকারীর পরিণতি
বর্তমানে চারদিকে একটি দৃশ্য ফুটে উঠছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার।
বিস্তারিত
কোরআনের আলোকে পরস্পরের প্রতি শিষ্টাচার
আমরা মানুষ, পৃথিবীতে আমাদের বসবাস। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা,
বিস্তারিত
পোশাকের শালীনতা
পোশাক-পরিচ্ছদ মানুষের লজ্জা নিবারণ করে। পোশাকে মানুষের রুচি, ব্যক্তিত্ব, ঐতিহ্য,
বিস্তারিত
কে এই নোবেল বিজয়ী আবি
তিনি নিজেও ওরোমো মুসলিম ছিলেন। তার বাবা ছিলেন মুসলিম আর
বিস্তারিত
মুসলিম নোবেল বিজয়ীরা
  ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রথম মুসলমান
বিস্তারিত