মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

আল্লাহর দেওয়া মানবজাতির বহুমাত্রিক মর্যাদা

শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান হুজায়ফি

ইবনে আসাকির (রহ.) আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘ফেরেশতারা বলল, হে আমাদের রব, আপনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আদম সন্তানকে সৃষ্টি করেছেন। তাদের খাদ্য আহার করতে ও পানীয় পান করতে সক্ষম করেছেন। তারা পোশাক পরে, বিয়ে করে, বাহনে চড়ে, ঘুমায় ও বিশ্রাম করে। আর আমাদের জন্য আপনি এসব কিছুই নির্ধারণ করেননি। তাই তাদের জন্য দুনিয়া বরাদ্দ করুন আর আমাদের জন্য আখেরাত বরাদ্দ করুন।’ তখন আল্লাহ বললেন ‘আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি এবং তার মধ্যে আমার রুহ ফুঁকে দিয়েছি তাকে আমি তার মতো বানাব না, যাকে আমি বলেছি, হও, ফলে তা হয়ে যায়।’ (তাবরানি)

মানুষ আল্লাহর একটি বিস্ময়কর সৃষ্টি। মানুষের মাঝে আল্লাহ এমন কিছু বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, যা অন্যদের থেকে আলাদা ও ভিন্ন। আল্লাহ বলেন ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা ত্বিন : ৩)। তিনি আরও বলেন ‘তোমরা কি নিজেদের অস্তিত্বে দৃষ্টি নিক্ষেপ করো না?’ (সূরা জারিয়াত : ২১)।
তিনি আরও বলেন ‘তাঁর অন্যতম নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমরা মানবজাতি আকারে বিস্তার লাভ করেছ।’ (সূরা রুম : ২০)। মানবজাতিকে মর্যাদা ও সম্মান দিয়ে আল্লাহ তাদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। তিনি বলেছেনÑ ‘আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি। তাদের স্থলভাগে ও জলভাগে অধিষ্ঠিত করেছি। তাদের উত্তম উপাদেয় জীবিকা দান করেছি। তাদের আমার সৃষ্টজীবের মাঝে অনেকের ওপর বিশেষ শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছি।’ (সূরা ইসরা : ৭০)। এ পার্থিব জগতে বিভিন্ন নেয়ামত ও অনুগ্রহ দিয়ে আল্লাহ ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছেন। আর আল্লাহর সন্তোষ ও সুখময় জান্নাতের মাধ্যমে পরকালের বিশেষ সম্মাননা মোমিনদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। পরকালে কাফেরের জন্য কোনো কিছুই বরাদ্দ নেই। ‘আপনার রব কারও প্রতি অবিচার করেন না।’ (সূরা কাহফ : ৪৯)। 
পরকালে তো আল্লাহ বরং জিন ও মানবের মাঝে যে তাঁর আনুগত্য করেছে শুধু তাকেই সম্মানিত করবেন। ইবনে আসাকির (রহ.) আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘ফেরেশতারা বলল, হে আমাদের রব, আপনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আদম সন্তানকে সৃষ্টি করেছেন। তাদের খাদ্য আহার করতে ও পানীয় পান করতে সক্ষম করেছেন। তারা পোশাক পরে, বিয়ে করে, বাহনে চড়ে, ঘুমায় ও বিশ্রাম করে। আর আমাদের জন্য আপনি এসব কিছুই নির্ধারণ করেননি। তাই তাদের জন্য দুনিয়া বরাদ্দ করুন আর আমাদের জন্য আখেরাত বরাদ্দ করুন।’ তখন আল্লাহ বললেন ‘আমি যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি এবং তার মধ্যে আমার রুহ ফুঁকে দিয়েছি তাকে আমি তার মতো বানাব না, যাকে আমি বলেছি, হও, ফলে তা হয়ে যায়।’ (তাবরানি)। 
আদম সন্তানের ওপর আল্লাহর বিশাল বিশাল নেয়ামতের মধ্যে অন্যতম হলো তিনি তাদের জন্য যেসব উপকারী, কল্যাণকর বিষয় ও অনুগ্রহ প্রস্তুত করে দিয়েছেন, সেগুলো। আল্লাহ বলেন ‘তোমরা কি লক্ষ করনি আল্লাহ নভোম-লে ও জমিনে যা কিছু আছে, সেগুলোকে তোমাদের জন্য প্রস্তুত করে দিয়েছেন। তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতগুলোকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।’ (সূরা লুকমান : ২০)।
মানবজাতির ওপর এসব অনুগ্রহের আসল রহস্য ও তাৎপর্য হলো তারা যেন আল্লাহর আনুগত্য করতে আত্মসমর্পণ করে, তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করে। আল্লাহ বলেন ‘এভাবেই তিনি তাঁর নেয়ামতগুলোকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করেন; যেন তোমরা আত্মসমর্পণ কর।’ (সূরা নাহল : ৮১)।
ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন ‘অর্থাৎ এভাবে তিনি তোমাদের জন্য সেসব জিনিস বরাদ্দ করে দেন, যেগুলোর সাহায্যে তোমরা নিজেদের বিষয়টি সম্পন্ন করতে পার এবং যেসব তোমাদের প্রয়োজন হয়, যাতে তাঁর ইবাদত ও আনুগত্য করতে এগুলো সহায়ক হয়।’
আল্লাহ নিজ হাতে আদমকে সৃষ্টি করার পর থেকে মানুষের কথা উল্লেখ করে তাদের প্রশংসা করেছেন, এ মানুষের বিভিন্ন স্তর ও অবস্থার বিবরণ দিয়েছেন, এসবের উদ্দেশ্য শুধু এটাই যে, তিনি এ দুনিয়ায় মানুষের দায়িত্ব বলে দিচ্ছেন, তাকে তার করণীয় শিক্ষা দিচ্ছেন, তাকে সৃষ্টি করার কারণ ও রহস্য জানিয়ে দিচ্ছেন। আল্লাহর আদেশ, নিষেধ ও বিধান পালনের ক্ষেত্র হলো মানুষই। মানুষ শরিয়তের আমানত ও তার রবের ইবাদতের গৌরব বহনকারী। আল্লাহ বলেনÑ ‘মানুষ কি মনে করে তাকে এমনি এমনিই ছেড়ে দেওয়া হবে?’ (সূরা কিয়ামাহ : ৩৬)। ইমাম শাফি (রহ.) বলেন সে কি ভাবে তাকে আদেশ করা হবে না ও নিষেধ করা হবে না? আল্লাহ আরও বলেছেন ‘তোমরা কি মনে করেছ আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি, আর তোমরা আমার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে না?’ (সূরা মোমিনুন : ১১৫)।
এ জগতের যেসব অমোঘ নীতি ও বিধান আল্লাহ আমাদের জন্য বর্ণনা করে দিয়েছেন, এ জগতে যেসব উপায়-উপকরণ তিনি সৃষ্টি করেছেন, যা পরবর্তী পর্যায়ে প্রভাব ফেলে থাকে, এ জীবনে আমাদের জন্য আল্লাহর বর্ণিত সেরকম একটি নীতি হলো, মানুষের কর্ম যদি ভালো হয়; তবে তার জীবন ভালো হবে। জীবনে ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা চলে আসবে যদি আদম সন্তানের কর্ম ভ্রান্ত হয়। মানুষের কর্মের ভালো ও মন্দের সংক্রমণ অন্য প্রাণী, উদ্ভিদ ও ফলফলাদির মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এটা আল্লাহর দয়া ও ন্যায়বিচার। তাই মানুষ যেন আনুগত্য ও ইবাদতকে আঁকড়ে ধরে। হারাম কাজ বর্জন করে। সৎকাজের কল্যাণে জীবনের বরকত, সমৃদ্ধি ও মঙ্গল হয় : এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন ‘যদি জনপদবাসী ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত; তবে আমি তাদের জন্য আসমানের ও জমিনের বরকতগুলো উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা অবিশ্বাস করেছে। ফলে আমি তাদের পাকড়াও করেছি তাদের কৃতকর্মের কারণে।’ (সূরা আরাফ : ৯৬)।
মুসলিমদের জন্য ও আহলে কিতাবদের জন্য আল্লাহ কোরআন নাজিল করেছেন। কেউ এটাকে পরিবর্তন করতে পারবে না। আল্লাহ বলেন ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা যদি আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য কর; তবে তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন।’ (সূরা মুহাম্মাদ : ৭)। মানুষের সৎকর্মের সুফল ও কল্যাণ যেভাবে বিস্তার লাভ করে, ঠিক তেমনি তা আমলকারীর জন্যও কল্যাণ বয়ে আনে। আল্লাহ বলেন ‘যে মোমিন পুরুষ বা নারী সৎকর্ম করে আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব। তাদেরকে তাদের আমলের জন্য সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদান করব।’ (সূরা নাহল : ৯৭)। বিপরীতে মানুষের কর্মের কুফল তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মানুষের জীবনেও দুর্গতি বয়ে আনে। আল্লাহ বলেন ‘মানুষের হাতের কর্মের ফলে স্থলভাগে ও জলভাগে দুর্গতি ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সূরা রুম : ৪১)।
হে মানুষ লক্ষ করে দেখ, আল্লাহ তোমাকে কী কী নেয়ামত ও অনুগ্রহ দান করেছেন। আল্লাহ ছাড়া কেউ সেগুলো হিসাব করতে পারবে না। এগুলোর শোকর আদায় কর। তিনি যদি তোমার ন্যূনতম কোনো নেয়ামতকেও ছিনিয়ে নেন, সেটা কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। আর আল্লাহর নেয়ামতে অল্প বলতে কিছু নেই। হে মানব, তুমি তোমার নিজের অবিচলতা, তোমার আত্মশুদ্ধি ও কল্যাণের খাতিরে তোমার প্রচেষ্টার মাধ্যমে ও অনিষ্টকর কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখার মাধ্যমে তোমার সমাজকে রক্ষা করার সহযোগী হতে পারবে। নিজেকে অমঙ্গল ও শাস্তি থেকে উদ্ধার করতে পারবে। 
জেনে রাখ, তুমি তোমার জীবদ্দশায় ও তোমার মৃত্যুর পরে তোমার আমলগুলোর দায়িত্বশীল। তাই চিন্তা করে দেখ তোমার রবকে তুমি কী বলবে। আল্লাহ বলেন ‘হে মানব, নিশ্চয়ই তুমি তোমার রবের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত কঠোর চেষ্টা-সাধনা করে থাক, তারপর তাঁর সঙ্গে দেখা হবে। যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব নেওয়া হবে সহজ করে। সে তার পরিজনের কাছে আনন্দচিত্তে ফিরে যাবে। আর যার আমলনামা তার পিঠের পেছন দিয়ে হবে, সে মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে। সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সূরা ইনশিকাক : ৬-১২)। 
হাদিসে বর্ণিত আছে ‘চারটি বিষয়ে প্রশ্ন করার আগ পর্যন্ত বান্দার উভয় পা নড়তে পারবে না : তার জীবন কীসে ব্যয় করেছে? তার যৌবন কীসে খরচ করেছে? তার সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে ও কোথায় ব্যয় করেছে? তার ইলম অনুসারে কী কী আমল করেছে?’
হে মানব জেনে রাখ, তোমার চিরস্থায়ী আবাস হলো সেটাই, যা তোমার মৃত্যুর পরে তোমার সামনে আসছে। তাই তুমি যদি জীবনকে সৎকর্ম দিয়ে সমৃদ্ধ কর; তবে তোমার জন্য সুসংবাদ। আর তুমি যদি তোমার দুনিয়া নিয়েই সন্তুষ্ট থাক আর তোমার আখেরাতকে ভুলে যাও; তবে তোমার জন্য দুঃসংবাদ ও দুর্গতি। তোমার দুনিয়া তো তোমার পেছনেই পড়ে থাকবে, তাকে ভালোবাস কিংবা ঘৃণা কর। আখেরাত তোমার সামনে আসন্ন তোমার কৃতকর্ম অনুসারে, আর তা চিরস্থায়ী।

১৪ মহররম ১৪৪১ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে ইসলাম
গত ১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে গেল বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য
বিস্তারিত
জুলুমবাজ ও হত্যাকারীর পরিণতি
বর্তমানে চারদিকে একটি দৃশ্য ফুটে উঠছে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার।
বিস্তারিত
কোরআনের আলোকে পরস্পরের প্রতি শিষ্টাচার
আমরা মানুষ, পৃথিবীতে আমাদের বসবাস। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষের সঙ্গে মেলামেশা,
বিস্তারিত
পোশাকের শালীনতা
পোশাক-পরিচ্ছদ মানুষের লজ্জা নিবারণ করে। পোশাকে মানুষের রুচি, ব্যক্তিত্ব, ঐতিহ্য,
বিস্তারিত
কে এই নোবেল বিজয়ী আবি
তিনি নিজেও ওরোমো মুসলিম ছিলেন। তার বাবা ছিলেন মুসলিম আর
বিস্তারিত
মুসলিম নোবেল বিজয়ীরা
  ১৯০১ সাল থেকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রথম মুসলমান
বিস্তারিত