ক্বিমার ও ক্যাসিনো : ইসলামি অর্থনীতির দৃষ্টিতে

‘ক্যাসিনো’ জুয়া খেলার আধুনিক রূপ। এখানে সাধারণ শ্রেণির মানুষরা আসতে পারে না। সমাজের ধনিক-শ্রেণিই এখানে আসতে পারে। কোনো ক্যাসিনো ক্লাবে সদস্য হতেই লাগে কোটি টাকা। বাংলাদেশে নব্বই দশকের শেষের দিক থেকে এর প্রচলন দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যবহার প্রচুর। আর সেটাও হচ্ছে মসজিদের শহর নামে খ্যাত বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা শহরে। চলতি বছরের গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে অবৈধ জুয়ার আসর, ক্যাসিনো ক্লাবে ধরপাকড়াও শুরু হয়। কারণ দেশীয় আইনে জুয়া নিষিদ্ধ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ৬০টির অধিক ক্যাসিনোর সন্ধান মিলেছে। তবে গণমাধ্যমের ভাষ্যমতে, অভিজাত শ্রেণির পানশালা ও ক্যাসিনো ক্লাব এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

মাওলানা আবদুল্লাহ মাসুম

সম্পদ বিনিময়ের ক্ষেত্রে এক পক্ষের সম্পদ প্রাপ্তি নিশ্চিত থাকবে, আর অপরপক্ষের প্রাপ্তি থাকবে সীমাহীন অনিশ্চয়তায়Ñ এমনটি ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যেমনÑ কেউ কাউকে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ প্রদান করল। বিনিময়ে সে আরও অতিরিক্ত পাবে। তবে সেটা লটারির মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। পেতে পারে, না-ও পেতে পারে। 
তদ্রƒপ কারও থেকে নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে মাছ ধরার জন্য জালের এক ক্ষেপ কিনে নিল। তবে মাছ প্রাপ্তি অনিশ্চিত। মাছ জালে আসতেও পারে, না-ও আসতে পারে। এলে কমও হতে পারে, বেশিও হতে পারে। এভাবে একপক্ষের প্রাপ্তি নিশ্চিত, অপরপক্ষের অনিশ্চিত থাকা ইসলামি অর্থনীতিতে নিষিদ্ধ। দুপক্ষের কোনো একজনের প্রাপ্তিও অনিশ্চিত কোনো কিছুর ওপর রাখা নিষিদ্ধ। যেমনÑ দুই বন্ধু চুক্তি করল, খেলায় বাংলাদেশ জিতে গেলে তাকে তার বন্ধু খাওয়াবে, আর হেরে গেলে সে তার বন্ধুকে খাওয়াবে। 
ইসলামি অর্থনীতির পরিভাষায় এসব অনিশ্চিত লেনদেনকে ‘ঘারার’ (টহপবৎঃধরহঃু) ও ‘ক্বিমার’ (এধসনষরহম) বলে থাকে। ইসলামি অর্থনীতিতে এসব লেনদেন নিষিদ্ধ করার কারণ হলো, এতে অর্থনীতির ভারসাম্যতা বিনষ্ট হয়। সমাজে অর্থের সুষ্ঠু প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। সম্পদ কুক্ষিগত হয়। এক রাতে কেউ বনে যায় কোটিপতি, কেউ হয়ে যায় ফকির। আর এটি সরাসরি কোরআনুল কারিমে নিষিদ্ধ। কোরআনুল কারিমে এরশাদ হয়েছেÑ ‘সম্পদ যেন শুধু তোমাদের ধনীদের মাঝে আবর্তিত না হয়।’ (সূরা হাশর : ৭)। 
বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাতে আদিকাল থেকে জুয়া প্রচলিত। তবে ক্যাসিনোর প্রচলন খুব একটা পুরোনো নয়। ‘ক্যাসিনো’ ইতালি ভাষার শব্দ। মূল শব্দ ক্যাসা, মানে অর্থঘর। সর্বপ্রথম এর প্রচলন হয় ইতালির ভেনিসে ১৬৩৮ সালে। প্রথমদিকে শব্দটি দ্বারা গ্রীষ্মকালীন ঘর কিংবা সামাজিক ক্লাব বোঝানো হতো। পরে এর দ্বারা বোঝানো হয় এমন ভবন বা বাড়িকে, যেখানে অবৈধ বিনোদনমূলক সব কাজ হতো। যেমনÑ নাচ, গান, অবৈধ যৌন সম্পর্ক, জুয়া ইত্যাদি। 
‘ক্যাসিনো’ জুয়া খেলার আধুনিক রূপ। এখানে সাধারণ শ্রেণির মানুষ আসতে পারে না। সমাজের ধনিক-শ্রেণিই এখানে আসতে পারে। কোনো ক্যাসিনো ক্লাবে সদস্য হতেই লাগে কোটি টাকা। বাংলাদেশে নব্বই দশকের শেষের দিক থেকে এর প্রচলন দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যবহার প্রচুর। আর সেটাও হচ্ছে মসজিদের শহর নামে খ্যাত বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা শহরে। চলতি বছরের গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে অবৈধ জুয়ার আসর, ক্যাসিনো ক্লাবে ধরপাকড়াও শুরু হয়। কারণ দেশীয় আইনে জুয়া নিষিদ্ধ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ৬০টির অধিক ক্যাসিনোর সন্ধান মিলেছে। তবে গণমাধ্যমের ভাষ্যমতে, অভিজাত শ্রেণির পানশালা ও ক্যাসিনো ক্লাব এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। 
ইসলামি অর্থনীতিতে শুধু জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং জুয়া খেলার মূল থিম ক্বিমারকেই সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করা হয়েছে। ক্যাসিনো ক্বিমারের একটি প্রয়োগ মাত্র। নিম্নে ক্বিমারের মূল কথা তুলে ধরা হলোÑ
‘ক্বিমার’ শব্দটি আরবি। এর মূল অর্থ : শুভ্রতা, যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বা কমে-বাড়ে। এর থেকে চাঁদকে আরবিতে ‘আল-কামার’ বলা হয়। তদ্রƒপ এখান থেকেই ‘ক্বিমার’ বলা হয়। কারণ জুয়াড়ির সম্পদ কখনও এক অবস্থায় থাকে না। কখনও বাড়ে কখনও কমে। এ শব্দটি হাদিসে এসেছে।
এ বিষয়ে কোরআনুল কারিমে বর্ণিত শব্দ হলোÑ ‘মাইসির’। শব্দটির মূল অর্থ : ভাগ-বণ্টন করা। ভাগ-বণ্টনকারীকে বলা হয়Ñ ‘ইয়াসির’। আর যে বস্তু বণ্টন করা হয় (জাহেলি প্রথানুযায়ী উট) তাকে বলা হয়Ñ ‘মাইসির’।
‘মাইসির’ শব্দটির উৎস য়ুসরুন থেকে। অর্থ : সহজ। জুয়ার মাধ্যমে যেহেতু সহজে সম্পদ অর্জন হয়; তাই একে ‘মাইসির’ বলা হয়। এ শব্দটি কোরআনুল কারিমে এসেছে।

ক্বিমার ও মাইসির
ক্বিমার বলতে যা বোঝায় সবই ‘মাইসির’ অথবা বলুন-মাইসির মানেই ক্বিমার। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), মুজাহিদ (রহ.) প্রমুখ থেকে তা বর্ণিত হয়েছে। অবশ্য সালাফের কেউ কেউ মাইসিরকে ব্যাপক বলেছেন। 
ইসলামি ফিকহে ক্বিমার বলতে বোঝায়, অনিশ্চিত কোনো বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এভাবে টাকা লাগানো যে, হয় তা বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে আসবে। নতুবা ওই টাকা হারাবে। বিচারপতি মুফতি তাকী উসমানী সুপ্রিমকোর্ট অব পাকিস্তানের শরিয়া এফিলিয়েট বেঞ্চের লটারিবিষয়ক এক লিখিত ফয়সালায় লিখেছেন। উর্দুতে সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষায় ক্বিমারের পরিচিতি পেশ করেছেন মুফতি শফী (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাফসিরে মাআরেফুল কুরআনে’। তিনি তাতে লিখেছেনÑ ‘যে কোনো লেনদেনে, কারবারে কেউ কোনো কিছুর মালিক হওয়াটাকে এমন শর্তের ওপর, এমন বিষয়ের ওপর মওকুফ রাখা, যা হওয়া না হওয়া দুটিই বরাবর। আর এরই ভিত্তিতে লেনদেনের উভয়পক্ষ হয় কখনও লাভবান হবে, কিংবা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ লাভ-লসের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষ বরাবর। উদাহরণস্বরূপ এরও সম্ভাবনা আছে যে, লস জায়েদ বহন করবে। আবার এরও সম্ভাবনা আছে যে, অপরপক্ষ তথা খালেদ লস বহন করবে। এর যত প্রকার পূর্ববর্তী জমানায় প্রচলিত ছিল, বর্তমানে আছে ও ভবিষ্যতে হবেÑ সবই মাইসির, ক্বিমার ও জুয়া।’
বোঝা গেল, ইসলামি অর্থনীতিতে ক্বিমার একটি আর্থিক বিনিময়মূলক লেনদেনের নাম, যা খেলায় হতে পারে, ক্রয়-বিক্রয়ে হতে পারে। অন্যান্য লেনদেনেও হতে পারে। খেলার আর্থিক জুয়া শুধু এর একটি প্রয়োগক্ষেত্র মাত্র। সুতরাং বাংলায় যাকে জুয়া বলা হয়, সেটা ক্বিমারের একটি অক্ষম অনুবাদ। জুয়া আর ক্বিমার এক নয়। জুয়াও ক্বিমার। তবে ক্বিমার মানেই জুয়া নয়। 

কোরআনুল কারিমে ক্বিমার নিষিদ্ধতার ক্রমধারা
জাহেলি যুগে কিছু কিছু অপরাধ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গিয়েছিল। ব্যাপক বিস্তৃত। এসব অপরাধকে ইসলাম প্রথমেই এককথায় নিষিদ্ধ করেনি। বরং ধীরে ধীরে নিষেধ করা হয়েছে। মানুষের পক্ষে তা গ্রহণ করা ও মানা যেন সহজ হয়। 
এটি ইসলামের বিধান আরোপের একটি সুন্দরতম দিক। মদের নিষিদ্ধতা, রিবার নিষিদ্ধতার ক্ষেত্রে এমনটি করা হয়েছে। তদ্রƒপ ক্বিমারের নিষিদ্ধতার ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে। মক্কি জীবনে ক্বিমার নিষিদ্ধ করা হয়নি। বরং মাদানি জীবনে নিষেধ হয়েছে। তা-ও অন্তত দুটি ধাপে। যথাÑ

ধাপ-১ : ক্বিমারের মন্দ দিক তুলে ধরে তা বর্জনের পরামর্শ
প্রথম ধাপে মদ ও ক্বিমারকে সরাসরি স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়নি। শুধু এ দুটির মন্দ দিক তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছেÑ এ দুটি বিভিন্ন গোনাহ ও খারাপির কারণ। সঙ্গে কিছু আর্থিক ফায়দাও আছে। তবে ফায়দার তুলনায় ক্ষতি বেশি। তাই বর্জনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ধাপটি নিম্নোক্ত আয়াতে মদিনায় ঘোষিত হয়েছেÑ
‘লোকেরা তোমার কাছে মদ ও মাইসির (জুয়া) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বল, দুটির মধ্যে আছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য উপকারও। তবে উপকারের চেয়েও পাপ অধিক।’ (সূরা বাকারা : ২১৯)।
এ আয়াতটি হলো মদ ও ক্বিমার বিষয়ক সর্বপ্রথম আয়াত। এই আয়াতে মদ ও ক্বিমারকে সরাসরি ‘পাপ’ বলা ও নিষিদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য হলোÑ এ দুটির মাধ্যমে অধিকাংশ সময় বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। কারণ মদ্যপানে বিবেক-বুদ্ধি স্বাভাবিক থাকে না। এতে পাপ করা সহজ হয়ে যায়। ক্বিমার মানুষকে সম্পদের লোভ বৃদ্ধি করে দেয়, যা বহু পাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং ওই আয়াত দ্বারা মদ ও ক্বিমারের নিষিদ্ধতা উদ্দেশ্য নয়। তবে এ দুটিতে ক্ষতিকর দিক যেহেতু অধিক; তাই তা বর্জনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এজন্য ওই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর অনেকেই মদ্যপান ও ক্বিমার ছেড়ে দিয়েছিল। 
এই আয়াতে ‘উপকার’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলোÑ অর্থনৈতিক উপকার। মদের ব্যবসার আর্থিক ফায়দা। জুয়ার আর্থিক ফায়দা।

ধাপ-২ : স্পষ্ট নিষেধ
দ্বিতীয় ধাপে ক্বিমারকে স্পষ্টভাষায় হারাম করে দেওয়া হয়েছে। এর থেকে বিরত থাকার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একে শয়তানের কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছেÑ ‘হে মোমিনরা, মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি, লটারির তীরÑ এসবই ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো। যেন তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না?।’ (সূরা মায়েদা : ৯০)।
ওই আয়াতে মাইসির মানে ক্বিমার। পূর্বে তা উল্লেখ হয়েছে। 
ওই আয়াতে নিষিদ্ধ চারটি বস্তুর মধ্যে মূল উদ্দেশ্য হলো দুটি। যথাÑ মদ ও মাইসির, যা চূড়ান্তরূপে নিষেধ করা হয়েছে। 

ক্বিমারের নিষিদ্ধতা ও ভয়াবহতা
পূর্বোক্ত আয়াতের মাধ্যমে আমরা ক্বিমারের নিষিদ্ধতা জেনেছি। ওই আয়াতে ক্বিমারকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমনÑ প্রথমত আয়াতটি শুরু হয়েছে ‘ইন্নামা’ দ্বারা, যা আরবি ভাষায় বিশেষ গুরুত্ব বোঝায়। দ্বিতীয়ত, একে ‘রিজসুন’ বা ঘৃণ্য বস্তু বলা হয়েছে। তৃতীয়ত, একে শয়তানের কাজ বলা হয়েছে। চতুর্থত, একে মূর্তিপূজার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। বোঝানো হয়েছেÑ ঘৃণা হওয়ার দিক থেকে এগুলো একই কাতারের। সর্বশেষ বলা হয়েছেÑ ‘তোমরা তা পরিহার করো।’ এখানেই শেষ নয়Ñ এরপর এর দুনিয়াবি ক্ষতির দিকও বলা হয়েছে যে, এটি এমন, যা পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে রাখে।
হাদিসে ক্বিমার পরিহার করাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, শুধু ক্বিমারযুক্ত লেনদেনকেই হারাম করা হয়নি; বরং ক্বিমারের শুধু ইচ্ছা প্রকাশ করাকেই গোনাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে। (ইসলাম আওর জাদীদ মাআশী মাসায়েল, খ. ৩, পৃ. ৩৫৪)।
আর কেউ যদি কাউকে ক্বিমারের দিকে শুধু দাওয়াত দেয়; তবে তাকে আদেশ করা হয়েছে, শুধু এ দাওয়াতের কারণে গোনাহের কাফফারা হিসেবে কিছু সদকা করতে। হাদিসে এরশাদ হয়েছেÑ ‘যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে ডেকে বলে, আসো, তোমার সঙ্গে ক্বিমারের মোআমালা করব। তাহলে আহ্বানকারীর উচিত, ওই গোনাহের কারণে কিছু সদকা করা।’ (বোখারি : ৪৮৬০)।
ভাবার বিষয় হলোÑ শুধু ক্বিমারের কথা বলাকেই গোনাহ বলা হয়েছে। শাস্তি আরোপ করা হয়েছে। তাহলে ক্বিমার করলে সেটা কত বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে, তা সহজেই অনুমেয়। মোটকথা উপরিউক্ত আয়াত ও হাদিস থেকে ক্বিমারের নিষিদ্ধতা ও ভয়াবহতা স্পষ্ট। এটি কবিরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত। 

ক্যাসিনো-ই শুধুু ক্বিমার নয়
যেমনটি আগে উল্লেখ করেছি, ক্যাসিনো ইসলামি অর্থনীতিতে নিষিদ্ধ ক্বিমারের শুধু একটি প্রয়োগক্ষেত্র মাত্র। এর বাইরেও আমাদের সমাজে বিভিন্ন লেনদেনে ক্বিমার আছে। কিছু উদাহরণ দেওয়া হলোÑ
Ñঅনিশ্চিত বিষয়ের ওপর অর্থ প্রদানের শর্ত করা। যেমনÑ জায়েদ ওমরকে বলল, অমুক খেলায় কামাল যদি জিতে যায়, তাহলে আমি তোমাকে ১ হাজার টাকা দেব। আর যদি রাশেদ জিতে যায় তাহলে তুমি আমাকে ১ হাজার টাকা দেবে।
Ñলটারির কুপন বিক্রি। যেমনÑ আমাদের দেশে প্রচলিত চল্লিশ লাখ টাকার লটারি, ২০ লাখ টাকার লটারি ইত্যাদি। এসবে প্রথমে ৫০ টাকা বা ১০০ টাকা দিয়ে কুপন ক্রয় করতে হয়। কিন্তু এর বিপরীতে অর্থ প্রাপ্তি পুরোই অনিশ্চিত। হয় ৫০ বা ১০০ টাকা পুরোই খোয়া যাবে। অথবা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে আসবে।
Ñবর্তমানে ভিডিও গেম, কেরাম বোর্ড ইত্যাদি খেলায় এ ধরনের চুক্তি পরিলক্ষিত হয়, যে হেরে যাবে, সে অপরপক্ষকে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হবে। এ শর্তারোপের কারণে এটিও ক্বিমারের অন্তর্ভুক্ত। কোথাও এ প্রচলনও আছে, যে হারবে, সে পুরো ফি শোধ করবে। এটিও ক্বিমার।
Ñআমাদের দেশে বিভিন্ন এলাকায় ষাঁড়ের লড়াই হয়। প্রত্যেকে তার মোটাতাজা ষাঁড় নিয়ে আসে। এরপর এর লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। এ ধরনের খেলা তো এমনিতেই অবৈধ। তারপর এর সঙ্গে যুক্ত হয় মাইসির। আগেই চুক্তি হয় যার ষাঁড় হারবে, সে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা দিতে হবে। আবার একে কেন্দ্র করে এলাকার মানুষও বাজি ধরে। এটিও ক্বিমারের প্রথম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। 
Ñপ্রচলিত কনভেনশনাল বিমা ব্যবসায়। আমরা জানি, প্রচলিত বিমা দুই ধরনের হয়ে থাকে। যথা জীবন বিমা ও সম্পত্তি বিমা। জীবন বিমার অনেক প্রকার আছে। মূল কথা হলোÑ নির্ধারিত প্রিমিয়াম জমা করা হয়। এরপর একটা সময় মোটা অঙ্কের অর্থ লাভ হয়। এ মোটা অঙ্কের অর্থ প্রাপ্তিটা কখনও বাড়ে, কখনও কমে, কখনও কোনো কারণে তামাদি বা বাতিল হয়ে যায়। সুতরাং এতে অগ্রগণ্য বক্তব্য অনুযায়ী ক্বিমার আছে। এটিও ক্বিমারের দ্বিতীয় প্রকার। 
তদ্রƒপ সম্পত্তি বিমায় প্রথম থেকেই নির্ধারিত প্রিমিয়াম আদায় করে যেতে হয়। ভবিষ্যতে কখনও সম্পত্তি ধ্বংস হলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থ পাওয়া যাবে। সেটাও কম হতে পারে, বেশি হতে পারে। আবার কখনও কিছুই পাওয়া যাবে না। এটিও ক্বিমারের দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। উভয় প্রকার লেনদেনে ক্বিমার ছাড়া সুদও নিহিত। উল্লেখ্য, ইসলামে এর বিকল্প হলো তাকাফুল ব্যবস্থা। 
Ñখেলায় ম্যাচ বিজয়ীদের লটারির মাধ্যমে পুরস্কৃত করা হয়। এ পুরস্কার প্রদানের জন্য যারা খেলায় অংশগ্রহণ করে তাদের সবার কাছ থেকে প্রথমে চাঁদা নেওয়া হয়। এরপর ওই টাকা দিয়ে শুধু বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। এটিও ক্বিমারের অন্তর্ভুক্ত।
এ রকম আরও বহু উদাহরণ আছে, যেখানে জুয়া খেলার বাইরে বিভিন্ন লেনদেনে ক্বিমার চর্চা হয়। ইসলাম এর মূলোৎপাটন করেছে। আমাদের দেশে শুধু খেলায় জুয়া নিষিদ্ধতার আইন কার্যকর আছে। তবে ক্বিমার নয়। আমরা বলতে চাই, মূলত আর্থিক লেনদেনে ক্বিমারের চর্চাই মানুষকে ক্যাসিনো পর্যন্ত নিয়ে যায়। তাই ক্বিমার নিষিদ্ধ করে আইন করা হোক। এতে আর্থিক লেনদেনে ক্বিমারের যাবতীয় চর্চা বন্ধ হবে। ক্যাসিনো-পাশা খেলার মূলোৎপাটন হবে। একটি সুষ্ঠু অর্থব্যবস্থা ও সামাজিক অবকাঠামোর জন্য শুধু ক্যাসিনো দায়ী নয়; আর্থিক লেনদেনে ক্বিমার চর্চাও দায়ী। তাই এর শেকড় উপড়ে ফেলা আবশ্যক। 

লেখক : সহকারী মুফতি, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা


আজানের মহিমা
সর্বোপরি আজান হচ্ছে নামাজের আহ্বান। আর নামাজের গুরুত্ব যে সর্বাধিক,
বিস্তারিত
আল-মাদ্রাসাতুস সাওলাতিয়াহ মক্কা মোকাররমা
  আল-মাদ্রাসাতুস সাওলাতিয়াহ। পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থিত আরব উপদ্বীপের প্রাচীনতম দ্বীনি
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
ধৈর্য ও সহনশীলতা : নবীজির (সা.) বাড়িতে শুধু শান্তি আর
বিস্তারিত
ফুটপাতে ক্রয়-বিক্রয় প্রসঙ্গে
  প্রশ্ন : আমি ফুটপাতের দোকান থেকে বিভিন্ন জিনিস ক্রয় করি।
বিস্তারিত
২৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক কেরাত সম্মেলন
আসছে ২৯ নভেম্বর শুক্রবার বাদ আসর বাংলাদেশ কারি সমিতির উদ্যোগে
বিস্তারিত
সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা
ইসলাম অতীত ক্ষমা করে দিয়েছে। কারণ ইসলাম পূর্বকৃত সব গোনাহ
বিস্তারিত