ইসলামে চুলের পরিচর্যা

স্ত্রীলোকের মাথার চুল পুরুষদের দাড়ির মতো সৌন্দর্য ও শ্রীবর্ধক। ইসলামি শরিয়তে নারীর চুল মু-ানো বা কর্তন করা জায়েজ নয়। তবে নারীর মুখে দাড়ি উঠলে তা মু-ানো ওয়াজিব। নারীদের মধ্যে কেউ কেউ চুল কর্তন করে পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে। অথচ এ কাজ ইসলামি শরিয়তে জায়েজ নেই। আর পুরুষের সাদৃৃশ্যতা গ্রহণকারী নারী অভিশপ্ত হয়। তাই ইসলামে অপ্রয়োজনে নারীর মাথার চুল কাটা নিষিদ্ধ

মাথার চুল মানব জাতির সৌন্দর্য। এটি মানবদেহের শ্রীবৃদ্ধি করে। মাথার চুল সাজগোছ করে পরিপাটি রাখা একটি পছন্দনীয় কাজ। এলোমেলো চুল দেহকে মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্রে পরিণত করে। তবে ইসলাম চুলের সৌন্দর্য ধরে রাখতে আঁচড়ানোর বিধান দিয়েছে। চুল আঁচড়ানো মানুষের স্বভাবজাত কাজ। এরপরও কিছু কিছু মানুষ এর প্রতি লক্ষ্য রাখে না। অথচ নবীজি (সা.) স্বীয় চুল চিরুনি দ্বারা আঁচড়িয়েছেন এবং উম্মতদের আঁচড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আর তিনি মাথার চতুর্র্দিক সমানভাবে চুল রাখতেন এবং কোনো দিকে বেশি-কম করতেন না। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান মুসলিম যুবসমাজ চুল সংরক্ষণে ইসলামি আদর্শের প্রতি তোয়াক্কাই করছে না। তারা মাথার চুলকে বিধর্মীদের আচরণে পরিণত করেছে। মাথার একদিকে লম্বা, আরেক দিকে ছোট। আবার একদিকে মু-ানো, আবার অন্যদিকে লম্বা চুল। এ হলো অধুনা মুসলিম যুবসমাজের স্বভাব। এভাবে চুল রাখা ইসলাম সমর্থন করে না। মহান আল্লাহ এ অপসংস্কৃতি থেকে মুসলিম উম্মাহকে হেফাজত করুন। 
ইসলামে চুল রাখার বিধান : ইসলাম ইহ-পরকালীন প্রত্যেক বিষয়ের সমাধান দিয়েছে। সমাধানহীনতায় মানব জাতির কোনো আমল-কর্মকে ছেড়ে দেয়নি ইসলাম। সুতরাং মানবমাথার চুলের বিধানও ইসলামি শরিয়ত বলে দিয়েছে। নবী করিম (সা.) বাবরি চুল রাখতে বেশি পছন্দ করতেন। ইসলামের দৃষ্টিতে বাবরি চুল তিন প্রকারÑ ১. ওয়াফরাÑ যে চুল কানের লতি পর্যন্ত পৌঁছে, ২. লিম্মাÑ যে চুল ঘাড়ের মধ্যখান পর্যন্ত পৌঁছে, ৩. জুম্মাÑ যে চুল ঘাড়ের নিচ পর্যন্ত পৌঁছে। তবে নবী করিম (সা.) সাধারণত লিম্মা অবস্থায় চুল রাখতেন। 
এছাড়াও নবীজি (সা.) পুরা মাথা মু-ানো অথবা চতুর্দিক সমানভাবে চুল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। একদিকে লম্বা, আবার অন্যদিকে ছোট এমন চুল রাখতে নিষেধ করেছেন রাসুল (সা.)। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও রাসুল (সা.) একই পাত্র থেকে গোসল করতাম। তখন রাসুল (সা.) এর মাথার চুল জুম্মার ওপরে এবং ওয়াফরার নিচে ছিল। (তিরমিজি : ১৮৫৯)।
হাদিসে আরও আছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্র্ণিত, একদিন রাসুল (সা.) এমন একটি ছেলেকে দেখতে পেলেন, যার মাথার চুলের কিছু অংশ মুড়ানো হয়েছে আর কিছু অংশ রেখে দেওয়া হয়েছে। তখন তিনি তাদের এরূপ করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, পুরা মাথা মুুড়িয়ে ফেল অথবা পুরা মাথার চুল রেখে দাও। (আবু দাউদ : ৪১৯৭)।
মাথার চুল আঁচড়ানো এবং চুলের সিঁথা কাটা সুন্নত : নবী করিম (সা.) মাথার চুল এবং মুখের দাঁড়ি আঁচড়ানোকে পছন্দ করতেন। তিনি এ আমল প্রায়ই করতেন। তবে প্রতিদিন চুল আঁচড়ানো উচিত নয়। বরং একদিন পর একদিন আঁচড়ানোই উত্তম। কারণ, সর্বক্ষণ পরিপাটিতে ব্যস্ত থাকা বিলাসিতার পরিচায়ক। কিন্তু প্রয়োজনে প্রত্যহ মাথা আঁচড়ানো নিষেধ নয়। আর চুল আঁচড়ানোর মতো চুলের সিঁথি কাটাও সুন্নত। নবীজি (সা.) মাথার ঠিক মধ্যখান দিয়ে এবং চুলগুলো দুুই ভাগ করে সিঁথি কাটতেন। এটাই হলো সিঁথি কাটার সুন্নত পদ্ধতি। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি ঋতুবস্থায় রাসুুল (সা.) এর মাথা আঁচড়িয়ে দিতাম। (বোখারি : ৫৯৮৭)।
অন্য হাদিসে আছে, হজরত আবদুল্লাহ বিন মুগাফফাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) প্রত্যহ মাথা আঁচড়াতে নিষেধ করেছেন। তবে একদিন পর একদিন আঁচড়ানোর অনুমতি দিয়েছেন। (তিরমিজি : ১৮৬০)।
আরেক হাদিসে আছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি যখন রাসুুল (সা.) এর মাথায় সিঁথি কাটতাম, তখন আমি তাঁর মাথার মধ্যস্থল থেকে সিঁথি কাটতাম এবং মাথার সম্মুখের চুল উভয় চক্ষুর মাঝামাঝি স্থান বরাবর থেকে উভয় পাশে ছেড়ে দিতাম। (আবু দাউদ : ৪১৯১)।         
মাথার চুলে বেশ-কম করা সুন্নত পরিপন্থি : বর্তমানে মানব সমাজকে বিচিত্রবর্ণে চুল কর্তন করতে দেখা যায়। এসবের প্রায় পদ্ধতি ইসলামি শরিয়ত পরিপন্থি। অনেকে মাথার চুল কাটতে গিয়ে একপাশে মু-িয়ে ফেলে, আবার অন্যপাশে লম্বা চুল রাখে। কেউ কেউ একদিকে ছোট রাখে, অন্য দিকে একটু বড় রাখে। এভাবেই মাথার চুল কাটতে গিয়ে কম-বেশি করে থাকে। আর এটাই মানব সমাজে ফ্যাশন হিসেবে পরিণত হয়েছে। অথচ এ ফ্যাশন ইসলামি আদর্শের অনুকূলে পড়ে না। কারণ, ইসলামি শরিয়তে মাথার চুল কাটার ক্ষেত্রে বেশ-কম করতে নিষেধ করা হয়েছে। হজরত নাফে (রা.) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.) কে কাজা থেকে নিষেধ করতে শুনেছি। নাফেকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কাজা কি? তিনি বললেন, বালকদের মাথার চুল কতেক মুুড়িয়ে ফেলা এবং কিছু চুল রেখে দেওয়া।  (মুসলিম : ৫৬৮১)।          
চুলে তেল দেওয়া সুন্নত : রাসুল (সা.) সবসময় স্বীয় মাথার চুল ও দাড়িতে তেল ব্যবহার করতেন। তিনি তেল ব্যবহারকে উম্মতের জন্য সুন্নত করে দিয়েছেন। তেল ব্যবহারে চুল দেরিতে পাকে এবং মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে। তবে তেল দেওয়ার একটি সুন্নত পদ্ধতিও রয়েছে, যে পদ্ধতিতে রাসুল (সা.) তেল ব্যবহার করতেন। নবী করিম (সা.) তেল দেওয়ার সময় তেলগুলো বাম হাতের তালুতে নিতেন আর ডান হাতের শাহাদাত আঙুলি দ্বারা প্রথমে ভ্রƒ-যুগলে, তারপর দুই চোখের পাতায় এবং শেষে মাথায় লাগাতেন। এটাই হলো তেল দেওয়ার সুন্নত তরিকা। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মাথায় খুব বেশি তেল ব্যবহার করতেন এবং দাড়ি আঁচড়াতেন। আর প্রায়ই মাথায় একখানা কাপড় রাখতেন। ওই কাপড়টি দেখতে তেলিদের  কাপড়ের মতো মনে হতো। (মেশকাত : ৪২৪৮; বেহেশতি জেওর : ৮/৫৬)।
সাদা চুল উপড়ানো উচিত নয় : মানুষের মাথার চুল বয়সের ভারে সাদা হয়ে যায়। আবার অনেকের শারীরিক অসুস্থতার দরুন চুল সাদা হয়ে যায়। এসব সাদা চুল উপড়ানো ঠিক নয়। কারণ, সাদা চুল মর্যাদার প্রতীক এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য নুর স্বরূপ। এছাড়াও যার দেহের একটি পশমও সাদা হবে, তার জন্য একটি নেকি লেখা হবে এবং তার একটি গোনাহ ক্ষমা করা হবে। সুতরাং সাদা চুল বা পশম মুসলিম উম্মাহর জন্য সম্মান বৃদ্ধির উপায়। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা সাদা চুলগুলো উপড়ে ফেলো না। কেননা, তা মুসলমানদের জন্য নুর। বস্তুত ইসলামের মধ্যে থাকা অবস্থায় যে ব্যক্তির একটি পশম সাদা হবে, এর উসিলায় আল্লাহ তায়ালা তার জন্য একটি নেকি লিপিবদ্ধ করবেন। আর একটি গোনাহ ক্ষমা করবেন এবং তার একটি দরজা বুলন্দ করবেন। (আবু দাউদ : ৪২০৪)।
এলোমেলো চুল অভদ্রতার পরিচায়ক : নারী-পুরুষের মাথার চুল পরিপাটি রাখা ভদ্রতার পরিচায়ক। আর এলোমেলো চুল অভদ্রতার পরিচয় বহন করে। হাদিসের ভাষায় এলোমেলো চুল রাখাকে শয়তানের স্বভাব বলা হয়েছে। পুরুষের জন্য দাড়িও অগোছালো রাখা উচিত নয়। এলোমেলো দাড়ি-চুল মানবদেহের সৌন্দর্য নষ্ট করে দেয়। নবী করিম (সা.) এলোমেলো চুল-দাড়িকে অপছন্দ করতেন। হজরত আতা ইবনে ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুল (সা.) মসজিদে ছিলেন। এ সময় দাড়ি-চুলে এলোমেলো এক ব্যক্তি এলো, তখন রাসুল (সা.) হাত দ্বারা তার প্রতি ইঙ্গিত করলেন, যেন তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন, সে যেন তার চুল-দাড়ি ঠিক করে আসে। লোকটি তাই করল। অতঃপর নবীজি (সা.) এর খেদমতে ফিরে এলো। তখন রাসুল (সা.) বললেন, তোমাদের কেউ কেউ শয়তানের মতো এলোমেলো চুলে আসতে, তা অপেক্ষা এখন যে অবস্থায় আছএটা কি উত্তম নয়? (মুুয়াত্তা মালেক : ১৭৩৯)।  
শরয়ি দৃষ্টিকোণে নারীর চুল : স্ত্রীলোকের মাথার চুল পুরুষদের দাড়ির মতো সৌন্দর্য ও শ্রীবর্ধক। ইসলামি শরিয়তে নারীর চুল মু-ানো বা কর্তন করা জায়েজ নয়। তবে নারীর মুখে দাড়ি উঠলে তা মু-ানো ওয়াজিব। নারীদের মধ্যে কেউ কেউ চুল কর্তন করে পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে। অথচ এ কাজ ইসলামি শরিয়তে জায়েজ নেই। আর পুরুষের সাদৃৃশ্যতা গ্রহণকারী নারী অভিশপ্ত হয়। তাই ইসলামে অপ্রয়োজনে নারীর মাথার চুল কাটা নিষিদ্ধ। নারীদের চুল কাটার ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধি-নিষেধ মানতে হবে। নারীর মাথার চুল অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে বা শারীরিক কোনো সমস্যা দেখা দিলে তখন শরিয়তের শর্তসাপেক্ষে চুল কর্তন বা মু-ন জায়েজ হবে। অন্যথায় নারীদের স্বীয় মাথার চুল কাটা বা মু-ন থেকে বিরত থাকতে হবে। হাদিসে আছে, হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) স্ত্রীলোকের মাথা মুড়িয়ে ফেলতে নিষেধ করেছেন। (নাসায়ি : ৫০৬৬)।

লেখক : শিক্ষক, নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম


তওবার স্তর সর্বোচ্চ মর্যাদা
তওবা ছিল নবী-রাসুলদের রীতি ও অভ্যাস, যা তাদের কাছে নিজেদের
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
(পর্ব-১১) নবীজির বিনয় নবীজি (সা.) সবচেয়ে চরিত্রবান ব্যক্তি। তিনি কোরআন মতে
বিস্তারিত
মানবতার হারানো শান্তি ইসলামে
গোটা বিশ্বে মানবতা আজ পদদলিত, নিগৃহীত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। মানবতার
বিস্তারিত
শুক্রবার আসরের পর পূর্বসূরিদের আমল
১. তাউস ইবনে কায়সান (রহ.) জুমার দিন আসর নামাজের পর
বিস্তারিত
অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ভয়াবহতা
রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ অপরাধী হওয়ার জন্য কোনো মুসলমান ভাইকে
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
ফজরের পর  আগের পর্বে আমরা নবীজি (সা.) এর রাতের ইবাদত
বিস্তারিত