একাত্মবাদ ইসলামের প্রাণ

রিবঈ বিন আমের (রা.) পারস্যের সেনাপতিকে লক্ষ্য করে কত চমৎকার করেই না বলেছেন ‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের পাঠিয়েছেন যেন আমরা আল্লাহর মর্জিতে মানুষকে মানুষের ইবাদত থেকে বের করে আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে আসি, তাদের দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখেরাতের প্রশস্ত দিগন্তে নিয়

ইসলাম আগমনের আগে কাবায় অসংখ্য দৈত্য, জিন ও অন্যান্য দেবদেবীর মূর্তি ছিল। এগুলো ছিল প্রাক-ইসলামি আরবের বহুদেববাদী সংস্কৃতির প্রতিভূ। কাবা ছিল হুবাল নামে এক দেবতার প্রতি উৎসর্গিত। এখানে তিন প্রধান দেবী লাত, উজ্জা ও মানাতের মূর্তি ছিল। এই বৈচিত্র্য থেকে বোঝা যায়, আরব্য পুরাণ এক ব্যতিক্রমী প্রসার লাভ করেছিল। প্রাক-ইসলামি দেবদেবীদের অনেক মূর্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। বিশেষ করে কাবার কাছে এরকম মূর্তি অনেক ছিল। এ ধরনের মূর্তির সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৩৬০। 
রাসুল (সা.) ওহির নির্দেশনায় মানুষকে দেবদেবী ও মূর্তির  ইবাদত-উপাসনা থেকে বের করে এক আল্লাহর ইবাদত-উপাসনায় ফিরিয়ে আনেন। ফলে মানুষ এক আল্লাহ ছাড়া সব মাখলুকের উপাসনা ও  গোলামি থেকে মুক্তি পাওয়ার মাধ্যমে তারা পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাধীনতা লাভ করেছে। এটা নিঃসন্দেহে অনেক বড় সম্মান ও গৌরবের বিষয়। 
রাসুল (সা.) আগমনের আগে আরব দুনিয়ার ওপর  ধনদৌলত এবং প্রভু দাসত্বের ভিত্তিতে একটি বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থা ছিল। যেখানে ধনদৌলত ও ক্ষমতাবানদেরই শুধু রাজত্ব চলত। তাদের আদেশ-নিষেধকে শীরোধার্য ও কর্তব্য মনে করা হতো। গরিব-মিসকিনদের সমাজের নিম্নশ্রেণিতে গণ্য করা হতো। যাদের কাজ হলো শুধু মানুষের গোলামি ও দাসত্ব করা।
ক্রয়-বিক্রয় ও উপহার-উপঢৌকনে এসব দাস-গোলাম ও অন্যান্য মালিকানাধীন বস্তুর মাঝে মৌলিক কোনো পার্থক্য ছিল না। অবস্থা এ পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ক্রয়-বিক্রয়ের সময় মা-ছেলে, বাপ-বেটা ও স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদে বিয়োগ ব্যথা কিংবা কোনো ধরনের মানবীয় আবেগ-অনুভূতিও জাগ্রত হতো না।
তারা শুধু বৃক্ষ, পাথরের পূজায়ই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং তাদের নৈকট্য লাভের জন্য আরও নানা ধরনের মূর্তিপূজার বিস্তার ঘটে। এদিকে গোত্রের সর্দাররা একের পর এক ফরমান জারি করে বিভিন্ন ধরনের রেওয়াজ-রুসুমের নির্দেশ দিত, যার গুরুত্ব মানুষের কাছে ইশ্বরের নির্দেশ থেকে কোনো অংশে কম ছিল না। তাছাড়া মানুষ তাদের দাপটের ভয়ে সব কিছু বিনা বাক্যে মেনে নিত। সমাজের এই শাসক শ্রেণি প্রকৃত রবের ইবাদতে বাধা হয়ে দাঁড়াল, যার ইবাদত করা ধনী, গরির, মনিব ও গোলাম নির্বিশেষ প্রত্যেকের ওপর আবশ্যক। তাই আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.) কে ইসলামের শাশ্বত সত্যের পয়গাম দিয়ে পাঠান, যার মূল ভিত্তি হলোÑ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
রাসুল এসে মানুষদের এক রবের ইবাদত-বন্দেগি করতে এবং সৃষ্টির থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে এক সত্তার উপাসনায় মনোনিবেশ করতে বলতেন। কারণ আল্লাহই একমাত্র ইবাদতের যোগ্য যেমন তিনি এরশাদ করেণÑ ‘হে লোক সকল! একটি উপমা বর্ণনা করা হলো, অতএব তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোন; তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের পূজা কর, তারা কখনও একটি মাছি সৃষ্টি করতে পারবে না, যদিও তারা সবাই একত্রিত হয়। আর মাছি যদি তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে নেয়, তবে তারা তার কাছ থেকে তা উদ্ধার করতে পারবে না, প্রার্থনাকারী ও যার কাছে প্রার্থনা করা হয়, উভয়েই শক্তিহীন।’ (সূরা হজ : ৭৩)।
আল্লাহর নবীর এক সাহাবি ওই ইনকিলাব ও জাগরণের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ইসলাম এসে আরব জাতিকে দাসত্বের জিন্দেগি থেকে বের করে ইজ্জত ও সম্মান প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা আর মানুষের সামনে মাথানত করে না। তারা এখন এক আল্লাহর সামনে মাথানত করে দাঁড়ায়! তারা বুঝতে পেরেছে সৃষ্টি যার ইবাদত তাঁর। বিষয়টিকে রিবঈ বিন আমের (রা.) পারস্যের সেনাপতিকে লক্ষ্য করে কত চমৎকার করেই না বলেছেনÑ ‘আল্লাহ তায়ালা আমাদের পাঠিয়েছেন যেন আমরা আল্লাহর মর্জিতে মানুষকে মানুষের ইবাদত থেকে বের করে আল্লাহর ইবাদতের দিকে নিয়ে আসি, তাদের দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে আখেরাতের প্রশস্ত দিগিন্তে নিয়ে আসি এবং বিভক্ত ধর্মের জুলুম অন্যায় থেকে সত্য ও ন্যায়ের ইসলামের ছায়ায় ডেকে আনি।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৭/৩৯)।
ইতিন নামক এক ফ্রান্সিস যিনি জাজায়িরে মুসলমান হয়েছেন (পরে তার নাম নাছরুদ দ্বীন রাখা হয়), তিনি তার লিখিত ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ গ্রন্থে রিসালাতের বৈশিষ্ট্য, এর সর্বজনীনতা ও ভবিষ্যতে এর আশা-ভরসা আলোচনা করতে গিয়ে লেখেনÑ স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে কোনো মাধ্যম কায়েম না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামের এই ব্যতিক্রম পদ্ধতি বিজ্ঞানীদেরও নজর কেড়েছে, কারণ ইসলাম এই বিশ্বাসের মাধ্যমে মধ্যবর্তী গোপন ফাঁকফোকর ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইবাদত-উপাসনা থেকে মুক্ত হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুসলমানরা স্রষ্টার ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য কোনো ইবাদতখানা ও উপাসনালয়ের দরকার হয় না। কেননা ইসলাম ধর্ম বলে, আল্লাহর পুরো জমিনই ইবাদতের জন্য মসজিদ নামান্তর।
ইসলামের সবচেয়ে পছন্দনীয় দিক হলো, এ ধর্মে শুধু আল্লাহ তায়ালাকেই বিশ্বাসের স্থান দেওয়া যায়। মুসলমানদের হৃদয় শুধু মহান আল্লাহর বিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে ওঠে এবং তাদের ধ্যান-সাধনায় শুধু আল্লাহর নামই বিরাজমান থাকে। ফলে ইবাদতে বিশুদ্ধতা ও আন্তরিকতা আসে। 

লেখক : শিক্ষক, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, মদিনাতুল উলুম মাহমুদিয়া মাদ্রাসা


তওবার স্তর সর্বোচ্চ মর্যাদা
তওবা ছিল নবী-রাসুলদের রীতি ও অভ্যাস, যা তাদের কাছে নিজেদের
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
(পর্ব-১১) নবীজির বিনয় নবীজি (সা.) সবচেয়ে চরিত্রবান ব্যক্তি। তিনি কোরআন মতে
বিস্তারিত
মানবতার হারানো শান্তি ইসলামে
গোটা বিশ্বে মানবতা আজ পদদলিত, নিগৃহীত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। মানবতার
বিস্তারিত
শুক্রবার আসরের পর পূর্বসূরিদের আমল
১. তাউস ইবনে কায়সান (রহ.) জুমার দিন আসর নামাজের পর
বিস্তারিত
অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ভয়াবহতা
রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ অপরাধী হওয়ার জন্য কোনো মুসলমান ভাইকে
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
ফজরের পর  আগের পর্বে আমরা নবীজি (সা.) এর রাতের ইবাদত
বিস্তারিত