ব্যবসায় অসাধুতার বিরুদ্ধে ইসলাম

অসৎ উদ্দেশ্যে খাদ্য মজুতদারির নিন্দনীয়তা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন পর্যন্ত খাদ্য মজুত রাখল, সে আল্লাহর নিরাপত্তা থেকে বেরিয়ে গেল এবং আল্লাহও তার থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন। আর যে কোনো জনপদের একজন লোকও ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করল, সেই জনপদবাসী থেকেও আল্লাহর নিরাপত্তা উঠে গেল।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ২০৭৬৯)

ব্যবসায় অসাধুতার বিরুদ্ধে ইসলাম

মাওলানা আবদুল্লাহ্ আল হাদী

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর সৃষ্টিকুলকে খাদ্যের মুখাপেক্ষী করে সৃজন করেছেন। একমাত্র আল্লাহর মহান সত্তাই খাদ্যের মুখাপেক্ষী নয়; বরং তিনিই সৃষ্টিজগতের প্রতিটি সদস্যকে খাওয়ান। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, আল্লাহ বলেনÑ ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিজিক আল্লাহর জিম্মায় রয়েছে।’ (সুরা হুদ : ৬)।
প্রাণীজগতে মানুষ ছাড়া বাকি প্রাণিকুলের রিজিকের এক ব্যবস্থা, আর মানবজাতির রিজিকের ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা অন্যান্য প্রাণিকুলের কোনো সামাজিক, অর্থনৈতিক, বাজারব্যবস্থা, চাকরি-বাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কাঠামো নেই। তাদের রিজিক অন্বেষণের ব্যাপারে কোনো জায়েজ-নাজায়েজের প্রশ্ন নেই। পরকালে তাদের কোনো হিসাবও নেই। কিন্তু মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি। কোনো ধরনের সামাজিক ও বাজারব্যবস্থার শৃঙ্খলাহীন অন্যান্য প্রাণিকুলের মতো মানুষ পথেঘাটে, ইতিউতি যা পাবে তা-ই খাবে না, অথবা অন্যান্য প্রাণীর মতো একে অপরের মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে খাবে না, এটাই আল্লাহর অলঙ্ঘনীয় বিধান। তাই মানুষের উন্নত ও সম্মানজনক জীবনের জন্য আল্লাহ মানুষকে ওই সামাজিক, অর্থনৈতিক, বাজারব্যবস্থা, চাকরি-বাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের শৃঙ্খলে জড়িয়ে দিয়েছেন।
মানুষের খাদ্যের জোগানে একটি সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থার বিকল্প নেই। সেই বাজার ব্যবস্থাটি পরিচালিত হবে ব্যবসায়ীদের সাধারণ ভোক্তামুখী ব্যবসায়িক পলিসির মাধ্যমে। তবে আমাদের দেশে ব্যবসায়িক পলিসি বলতেই সাধারণ ভোক্তাদের অন্তঃকরণে ভেসে ওঠে এক বীভৎস ব্যবসায়িক পলিসির চিত্র। এ পলিসি ভোক্তাকে জিম্মি করে অধিক মুনাফা লাভের পলিসি। এ পলিসি পণ্য মজুতদারির মাধ্যমে ভোক্তাকে কোণঠাসা করার পলিসি। অথচ ইসলামি চেতনায় ভাস্বর হয়ে ব্যবসার মাধ্যমে একজন ব্যবসায়ী হয়ে যেতে পারেন জান্নাতের অধিবাসী। জান্নাতে তার আবাস হতে পারে নবী, মহাসত্যবাদী সিদ্দিক, আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারী মহান শহীদ এবং নেককার বান্দাদের সঙ্গে। হাদিসে পাকে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সা.) বলেনÑ ‘সত্যবাদী বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী (আখেরাতে) নবী, সত্যবাদী সিদ্দিক এবং শহীদদের সঙ্গী হবে।’ (তিরমিজি : ১২০৯; দারেমি : ২৫৮১)। এটি হচ্ছে আল্লাহভীরু সত্যবাদী ব্যবসায়ীর সততার পুরস্কার।
অপরদিকে অসৎ উপায়ে লোক ঠকিয়ে ব্যবসার শাস্তিও ইসলামে ভয়াবহ। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি খাদ্যের স্তূপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন তিনি স্তূপের ভেতরে তাঁর আঙুল প্রবেশ করালে আঙুলে আর্দ্রতা অনুভব করলেন। তখন তিনি বললেনÑ ‘হে খাদ্যের মালিক! এটা কী?’ ব্যবসায়ী বলল, হে আল্লাহর রাসুল, একে বৃষ্টিতে পেয়েছিল। তিনি বললেনÑ ‘তুমি একে খাদ্যের ওপরি ভাগে রাখলে না কেন? যাতে মানুষ তা দেখতে পায়।’ এরপর তিনি বলেনÑ ‘যে ধোঁকা দেয়, সে আমার উম্মতভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম : ১০২)। অধিক মুনাফার আশায় খাদ্য মজুত করে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়া ইসলামে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। 
অসৎ উদ্দেশ্যে খাদ্য মজুতদারির নিন্দনীয়তা সম্পর্কে হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি ৪০ দিন পর্যন্ত খাদ্য মজুত রাখল, সে আল্লাহর নিরাপত্তা থেকে বেরিয়ে গেল এবং আল্লাহও তার থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন। আর যে কোনো জনপদের একজন লোকও ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিনাতিপাত করল, সেই জনপদবাসী থেকেও আল্লাহর নিরাপত্তা উঠে গেল।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা : ২০৭৬৯)।
আল্লাহ সুদের বিপরীতে ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন। আমাদের প্রিয় নবীজি (সা.)-ও ব্যবসা করতেন। তবে সেই ব্যবসার মূলধন ছিল সততা ও সত্যবাদিতা। সৎ ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেনÑ ‘ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত, আর মজুতদার অভিশপ্ত।’ (ইবনে মাজাহ : ২১৫৩)। অপরদিকে অসৎ উপায়ে মুনাফালোভী ও মজুতদারি মনোভাবের ব্যবসায়ীদের দুনিয়াতেই ভয়াবহ পরিণতির কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্য মজুত রাখে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ এবং দারিদ্র্য দ্বারা শাস্তি দেন।’ (ইবনে মাজাহ : ২১৫৫)। আল্লাহ আমাদের সৎভাবে ব্যবসার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষাসচিব ও মুহাদ্দিস, জামিয়া হুসাইনিয়া সিরাজুল উলুম, সাভার, ঢাকা


তওবার স্তর সর্বোচ্চ মর্যাদা
তওবা ছিল নবী-রাসুলদের রীতি ও অভ্যাস, যা তাদের কাছে নিজেদের
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
(পর্ব-১১) নবীজির বিনয় নবীজি (সা.) সবচেয়ে চরিত্রবান ব্যক্তি। তিনি কোরআন মতে
বিস্তারিত
মানবতার হারানো শান্তি ইসলামে
গোটা বিশ্বে মানবতা আজ পদদলিত, নিগৃহীত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। মানবতার
বিস্তারিত
শুক্রবার আসরের পর পূর্বসূরিদের আমল
১. তাউস ইবনে কায়সান (রহ.) জুমার দিন আসর নামাজের পর
বিস্তারিত
অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ভয়াবহতা
রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ অপরাধী হওয়ার জন্য কোনো মুসলমান ভাইকে
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
ফজরের পর  আগের পর্বে আমরা নবীজি (সা.) এর রাতের ইবাদত
বিস্তারিত