যে সমাজের মানুষ যেমন সেই সমাজের পেশাজীবি তেমন

যখন কোনো বন্ধুর সাথে সিভিল পোশাকে দেখা হয় তখন সবাই একটা কমন প্রশ্ন করে, কিরে ডিউটি নাই? সেটা সকাল ১০টা হোক বা রাত ১০টা হোক কিংবা সরকারি ছুটির দিন হোক। এই প্রশ্নটা পুলিশ ছাড়া অন্য আরেকটি পেশার মানুষদেরও শুনতে হয়, তারা হলেন ডাক্তার।
আমাদের আশেপাশে যখন কেউ বিপদে পরে তখন সবার আগে তার নিকটাত্মীয় পুলিশের কথা স্মরণ করেন। ঠিক তেমনি মানুষ যখন অসুখে আক্রান্ত হয় তখন সবার আগে তার ডাক্তার বন্ধু বা আত্মীয়কে স্মরণ করে সৃষ্টিকর্তার পর।

আবার কারো পরিচিত আত্মীয় বা বন্ধু বান্ধব যদি পুলিশে চাকরি হয় বা ডাক্তারি পাশ করে তাহলে দেখা হলে ফোন নাম্বার ছেয়ে বলেন, বিপদে আপদে কল দিবো। তাহলে সেই মানুষজনই কেন সবার আগে বিপদের বন্ধু এই দুই পেশার মানুষকে গালিগালাজ করেন?

যদি কেবল ঘুষ আর দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ এই দুই পেশার সদস্যদের গালিগালাজ করে থাকেন তাহলে এই দুটি পেশা থেকে হাজার গুণ বেশি দুর্নীতি করে এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আছে তাদের কেন সাধারন মানুষ গালিগালাজ করে না? গুরুত্বের দিক দিয়ে সমাজের সব থেকে বেশি প্রয়োজনীয় দুইটি প্রতিষ্ঠানের উপর মানুষের এই বিশ্বাসহীনতার কারন কি? কেনই বা এই দুটি সংস্থার সদস্যরা সাধারন মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারতেছে না?

ধুমপান ক্যান্সারের কারণ। এই কথাটা সিগারেটর গায়ে লেখা থাকে। ক্যান্সারের হলে চিকিৎসার জন্য অর্থ অপচয় হবে এবং যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হবে সে কথা জানার পরেও কিছু মানুষ ধুমপান করে। ধুমপান মৃত্যুর পরোক্ষ কারন যেনেও কেন ধুমপায়ীরা ক্ষতিকর বস্তু গ্রহন করে? কারণ মানুষ বর্তমানে বিশ্বাসী। সুদুর বা অদুর ভবিষ্যতে কি হবে না হবে সেটা নিয়ে মানুষ খুব কম ভাবে। ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকা লোটপাট কারীকে এই দেশের মানুষ ততটা ঘৃণা করে না যতটা ঘৃণা করে ১০ টাকা ঘুষ নেওয়া পুলিশ সদস্যকে।

কারণ এই হাজার কোটি টাকা লোকে চোখে দেখে না দেখে দশ টাকা নিতে। নিম্ন মানের নির্মাণ সামগ্রী বা রডের বদলে বাঁশ দিয়ে সরকারি ভবন নির্মাণ করে মানুষ হত্যা করার পরেও একজন ঠিকাদার বা ইঞ্জিনিয়ারকে মানুষ এতটা ঘৃণা করে না কিংবা কোনো রাস্তা যখন বছর না ঘুরতেই ভেঙ্গে গিয়ে বড় দুর্ঘটনার কারণ হয় তখন কাউকে বলতে শুনা যায় না ইঞ্জিনিয়ার আর ঠিকাদারের দুর্নীতির কথা।

কিন্তু শত চেষ্টার পরেও একজন ডাক্তার যখন মূমূর্ষ রোগিকে বাঁচাতে পারে না তখন রোগীর লোকেরা ঠিকই নিরীহ ডাক্তারের উপর হামলা চালায়। কারণ মানুষ ইঞ্জিনিয়ারকে সরাসরি কাজটি করতে দেখেনি কিন্তু ডাক্তারকে চিকিৎসা করতে দেখেছে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর ছাড়া মনে হয় না অন্য কোনো অফিস ঘুষ ছাড়া কাজ করে। কারণ আমরা এমন জাতি যারা ঘুষ দিতে ও নিতে পছন্দ করি। আর ঘুষ দেওয়া নেয়ার এই সামাজিক সংস্কৃতি কয়েক শত বছরের। সেখানে পুলিশ ও ডাক্তার এই সামাজিক সংস্কৃতির বাহিরে নয় বা থাকার কথাও নয়। কারণ পুলিশ ও ডাক্তার এই সমাজ ও সংস্কৃতির অংশ। এই সমাজ ও দেশের সন্তারাই ডাক্তার ও পুলিশ হয়। আমাদের আরেকটি সমস্যা হল আমরা সবকিছু শর্টকার্ট পছন্দ করি। ধনী  হওযার জন্য যেমন আমরা শর্টকার্ট পন্থা অবলম্বন করি তেমনি কোন কাজ করতেও ঘুষের মাধ্যমে শর্টকার্ট চিন্তা করি।

আরকে রায় নামের একজন সমাজ বিশ্লষকের মতে, ‘মানুষ বিপদে পরে প্রথমে সৃষ্টিকর্তার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে এর পরেই সাহায্য নিতে ছুটে যায় নিকটবর্তী পুলিশ স্টেশনে। কারণ সে বিশ্বাস করে পুলিশ বিপদের বন্ধু। সে বিশ্বাস করে পুলিশের পক্ষে তার সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিপদের ঐ মুহুর্তে সৃষ্টিকর্তার পর পুলিশকেই তার রক্ষাকর্তা মনে করে আর যখন প্রত্যাশার সাথে বাস্তবের মিল পায় না তখনই সে পুলিশের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

বাংলা অঞ্চলের পুলিশ বাহিনী গঠনের ইতিহাস পড়লেই জানা যায় এই অঞ্চলের পুলিশ কেন শুরু থেকেই জনবান্ধব হতে পারে নি। এবং সেই ধারা এখনো বিদ্যমান। অপর দিকে মানুষ সৃষ্টিকর্তার পরে ডাক্তারদের বেশি বিশ্বাস করে। সে বিশ্বাস করে তার যত বড় রোগই থাকুক না কেন ডাক্তার সেটা ভালো করে দিবে। কিন্তু যখন সে দেখে যে ডাক্তার তার বিশ্বাস নিয়ে বানিজ্য করে  তখন ডাক্তারের উপর তার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। মানুষ ডাক্তারের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে কশাই বলে গালি দেয়।’

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলার মতো দুর্নীতি বা অনিয়ম এ দুটি সংস্থার সদস্যরা করে না। তবে এই দুটি সংস্থার কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে মানুষ পত্যাক্ষভাবে ভুক্তভোগী। একজন মানুষ যখন একজন অসাধু পুলিশ দ্বারা হয়রানির শিকার হন তাহলে তার কাছে বাংলাদেশের সকল পুলিশকে খারাপ মনে হবে।

কারণ পুলিশ একটি বাহিনী। যার কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবার নির্দিষ্ঠ পোশাক আছে। কিন্তু অন্যান্য সরকারি বিভাগে কর্মরত নিম্ন পদস্থ থেকে উচ্চ পদস্থ কারো জন্য নির্দিষ্ঠ কোনো ড্রেস কোড নেই। তাই তাদের একজনের অপকর্মে অন্য জনকে লজ্জা পেতে হয় না।
অন্যদিকে পুলিশের একজন নিম্নপদস্থ কোনো সদস্যের অপকর্মে বাহিনীর সর্বোচ্চ ব্যাক্তিকেও বিব্রতকর পরিস্থতি সামাল দিতে হয়। পত্রিকার পাতায় হেড লাইন হয় “পুলিশের অপকর্ম”, অথচ অপকর্ম করেছে একজন ব্যাক্তি, আর দোষ হচ্ছে পুরো বাহিনীর। তেমনি একজন ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় কোনো রোগী মারা গেলে পত্রিকার পাতায় লাল কালি দিয়ে লেখা হয় “ডাক্তারের ভুলে রোগীর মৃত্যু”। ভুল করল একজন আর দোষ হয় বাংলাদেশের সকল ডাক্তারের।

যেখানে দেশের ৯০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে দুর্নীতি আর অনিয়মের সাথে জড়িত, সেখানে সেই সমাজেরই অংশ পুলিশ আর ডাক্তারকে আপনি কিভাবে সৎ আশা করেন? দেশের যত শতাংশ জনগন সৎ তত শতাংশ সরকারি কর্মচারি সৎ থাকবে। মুহাম্মদ সাইদুজ্জামান আহাদ নামের একজন লেখক এগিয়ে-চলো ডটকম নামে একটি অনলাইন পোর্টালে লিখেছেন, “আমরা এমন একটা দেশে বাস করি, যে দেশটা ইতর আর শুয়োরে ভর্তি। হাটতে চলতে এদের দেখা পাবেন, গায়ের সঙ্গে ধাক্কা খাবেন। প্রতিক্রিয়াশীলরা বলে নব্বই পার্সেন্ট মুসলমানের দেশ, আমিও সেরকম বলি, নিরানব্বই পার্সেন্ট অমানুষ আর জানোয়ারে ভর্তি একটা দেশ এটা।"

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে রাস্তার ফকির সবাইকে জীবনে একবার হলেও ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন প্রতিটি ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য কাজ করে পুলিশ। যেকোনো সরকারি ছুটি , ইদ বা যেকোনো উৎসবে যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি সরকারি বেসরকরি প্রতিষ্ঠানের পিয়ন থেকে সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ছুটি ভোগ করেন (সামরিক বাহিনী, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও কিছু নিরাপত্তা কর্মী  ছাড়া) তখন পারিবারিক সামাজিক সম্পর্ক ত্যাগ করে বেশিরভাগ পুলিশ সদস্যকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে দায়িত্ব পালন করতে হয়, মূমূর্ষ রোগীর জরুরী প্রয়োজনে হাসপাতালে দিন রাত কাটাতে হয় ডাক্তারদের। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের আনন্দ বিসর্জন দিয়ে যারা দেশের মানুষের আনন্দ নিশ্চিত করছেন তারা কি দেশের মানুষের একটু ধন্যবাদ আশা করতে পারেন না?

লেখক- ফাহাদ মোহাম্মদ, ট্রাফিক সার্জেন্ট, বাংলাদেশ পুলিশ।


শুভ জন্মদিন মিরন আহাম্মেদ
আনন্দ টিভির ন্যাশনাল ডেক্স ইনচার্জ মিরন আহাম্মেদের আজ শুভ জন্মদিন।
বিস্তারিত
সড়কের আনন্দ, বেদনা ও আতঙ্ক
আমি নিজেকে যে কয়েকটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে দাবি করতে পারি
বিস্তারিত
চাকুরি করার মত মানুষ খুবই
বিশ্বাস করুন আমার কাছে বিভিন্ন কোম্পানির প্রধানরা চাকুরি দেওয়ার জন্য
বিস্তারিত
নতুন সড়ক আইন ও বিআরটিএ
অবশেষে এলো বহুপ্রতীক্ষিত সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮। হাজার হাজার স্কুল,
বিস্তারিত
গাড়ির নাম্বারে গ্রেফতারী পরোয়ানা, জেনে
বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, সিএনজি, পিক-আপ ইত্যাদি গাড়ি চালিয়ে মামলা হলে
বিস্তারিত
সঠিক জায়গায় প্রকৃত নেতাদের মূল্যায়ন
১৯৯২ সালে বরগুনা জেলা স্কুল শাখা ছাত্রলীগে নাম লিখিয়ে তার
বিস্তারিত