‘পাক-ভারত পরমাণু যুদ্ধ ২০২৫ সালে সাড়ে ১২ কোটি মানুষের প্রাণহানি’

মিজানুর রহমান খান 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, কাশ্মীর বিরোধের জের ধরে ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক যুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটবে। গবেষকরা বলছেন, এর ফলে জলবায়ুর ওপর যে বিরূপ প্রভাব পড়বে তাতে অনাহারে মারা যাবে আরও বহু কোটি মানুষ। এ রকম এক বিপর্যয়ের ধারণা দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর এ দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। আমেরিকার রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এসব আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই যুদ্ধ কীভাবে শুরু হবে তার কিছু কাল্পনিক দৃশ্যও গবেষকরা তৈরি করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. অ্যালান রোবোক, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘ভারত ও পাকিস্তান তাদের পরমাণু অস্ত্রভা-ার বাড়িয়ে চলেছে। শুধু সংখ্যার বিচারেই নয়, এসব অস্ত্রের বিস্ফোরণের শক্তিও তারা ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে। ফলে তাদের আশঙ্কা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেই এ যুদ্ধের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
এসব কি নিছকই কিছু নাটক?
গবেষক অ্যালান রোবোক বলছেন, কিছু পেশাজীবীকে নিয়ে তারা ওয়ার্কশপ করেছেন যেখানে এসব সম্ভাব্য কারণের কথা উঠে এসেছে। ‘ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া কয়েকজন জেনারেলকে আলাদা আলাদা দুটি কক্ষে বসিয়ে দেওয়া হয়। এক পক্ষকে বলা হয় যেসব কারণে যুদ্ধ হতে পারে তার কিছু ধারণা দিতে। তার পর সেগুলো অন্য আরেকটি কক্ষে অপর গ্রুপের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় সেরকম কিছু হলে তারা কী করবেন? এরকম আলোচনার ভিত্তিতেই এসব সিনারিও তৈরি করা হয়েছে।’
তবে তিনি বলেন, ‘এগুলো কিছু দৃশ্য-কল্প। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়তো কিছু হয় না। নেতারা ঠান্ঠা মাথায় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কিন্তু কখনও কখনও পরিস্থিতি তো নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে যেতে পারে!’
কেন ২০২৫?
গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ২০২৫ সালেই যুদ্ধে জড়াতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার চির-বৈরী দুটিা দেশÑ ভারত ও পাকিস্তান। যুদ্ধের এ সময় কীভাবে নির্ধারণ করা হলো?
অধ্যাপক রোবোক বলছেন, ভবিষ্যৎ থেকে তারা শুধু একটি বছরকে বেছে নিয়েছেন। এ যুদ্ধ যেকোনো সময়ে লাগতে পারে, হতে পারে আগামীকালও। ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোনো তথ্য থাকে না। কখন কী হবে সেটাও কেউ বলতে পারে না। সে কারণে আমরা কিছু দৃশ্য-কল্প ব্যবহার করেছি কী হতে পারে সেটা বোঝার জন্য। সে সম্ভাবনার কথা চিত্রিত করতে আমরা শুধু একটা সময়কে বেছে নিয়েছি।
আসলেই কি ২০২৫ সালে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হতে পারে?
ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জি বলছেন, এ গবেষণা একেবারেই কাল্পনিক, যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ‘লোকেরা ভাবছেন দুটি দেশের আণবিক বোমা আছে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো নয়, তার মানে পাঁচ থেকে ছয় বছর পর তাদের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাবে।’ 
তবে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে না হলেও যেকোনো সময় এ দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ হতে পারে। ১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান আণবিক বোমা পরীক্ষা চালিয়েছে। এর পরে গত ১১ বছর চলে গেছে। এর মধ্যে কারগিল যুদ্ধ হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেসময় এবং তার পর থেকে কখনোই আণবিক বোমা ব্যবহারের কথা উঠেনি।
কোনো দেশ ইচ্ছে করে কিছু করতে চায় না। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত বিভিন্ন কারণেÑ যেমন ভয়ে, রাগে অনেক সময় অনেক কিছুই হয়ে যায়, বলেন মি. ব্যানার্জি।
এই গবেষণার সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানে কায়দে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু বিজ্ঞানী ড. পারভেজ হুডভাই। তিনি বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধের সম্ভাবনা সবসময়ই আছে।  কোনো পরিকল্পনা থেকে নয়, বরং দুর্ঘটনাবশতই এরকম যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। দুটি দেশের মধ্যে যদি অনন্তকাল ধরে উত্তেজনা বিরাজ করে, এবং তাদের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকে, তাহলে তো অনেক কিছুই ঘটতে পারে।
উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কাশ্মীরের পুলওয়ামার পর বালাকোটে যা হয়েছে, পাকিস্তান? এর আরও কঠোর জবাব দিতে পারত। তখন ভারতও কিছু একটা করত। এ রকম একের পর এক ঘটনায় উত্তেজনা এতটাই ছড়িয়ে পড়তে পারত যে পারমাণবিক যুদ্ধও শুরু হয়ে যেতে পারত।
‘শীতল যুদ্ধের সময় যা হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ তার চাইতেও খারাপ। আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কয়েক হাজার মাইলের দূরত্ব কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের সীমান্ত একই, যেখানে প্রায় প্রতিদিনই একে অপরকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়, ফলে উত্তেজনা শীতল যুদ্ধের চেয়েও বেশি।’
কারণ কাশ্মীর?
গবেষক অ্যালান রোবোক বলেন, শুধু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নয়, হতে পারে ভারত ও চীনের মধ্যেও। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়ারও অনেক কারণ আছে। তবে আমরা ভারত ও পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছি, কারণ কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এদুটি দেশের মধ্যে অব্যাহত বিরোধ চলছেই। সামরিক যুদ্ধে জড়ানোর অতীত ইতিহাসও তাদের রয়েছে। 
তবে পাকিস্তানের পরমাণু বিজ্ঞানী মি. হুডভাই মনে করেন, অন্যান্য কারণ থাকলেও কাশ্মীরই হবে প্রধান কারণ। কাশ্মীরের পরিস্থিতি যতই শান্ত করা যাবে, পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিও ততটা কমে আসবে। দুর্ভাগ্যজনক হলো সেরকম কিছুই হচ্ছে না। এছাড়াও পরিবেশগত কিছু পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে দিতে পারে।
‘পাকিস্তানের বেশিরভাগ পানি আসে হিমালয় থেকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের সব হিমবাহ গলে উধাও হয়ে গেলে কাশ্মীর পাকিস্তানের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে পানির উৎসের জন্য। এ নিয়ে যদি সমঝোতা না হয় তাহলে তো যুদ্ধের আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
সাবেক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ব্যানার্জি বলছেন, সন্ত্রাসবাদের মতো আরও কিছু ইস্যুও যুদ্ধের কারণ হতে পারে।
পরমাণু মজুত কেমন
সুইডিশ একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে পাকিস্তানের ১৬০টি আর ভারতের আছে ১৫০টির মতো পারমাণবিক বোমা। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান ৪০০ থেকে ৫০০ পারমাণবিক অস্ত্র মজুত করে ফেলবে। ইসলামাবাদে কায়দে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু বিজ্ঞানী মি. হুডভাই বলছেন, এ দুটি দেশের মধ্যে পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে। ‘যদিও এসব তথ্য অত্যন্ত গোপনীয় তারপরও ধারণা করা হয়, পাকিস্তানের কাছে হয়তো দশ/বিশটি বেশি বোমা আছে। ভারতের এখন পারমাণবিক ডুবোজাহাজও আছে। পাকিস্তানও এরকম ডুবোজাহাজ নির্মাণ করছে। ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এসব অস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা ও সংখ্যা দুটি দেশেরই বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
যুদ্ধ হলে কী হবে?
গবেষকরা বলছেন, পারমাণবিক বোমা যেখানে পড়বে, শুধু সেখানকার মানুষই নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই সেটা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। জলবায়ু বিজ্ঞানী অ্যালান রোবোক বলছেন, পারমাণবিক বোমার ফলে আগুন লেগে যাবে, সে আগুন থেকে যে পরিমাণ ধোঁয়া তৈরি হবে সেটা ছড়িয়ে পড়বে সারা পৃথিবীতে। এই ধোঁয়ার কারণে আমাদের এই গ্রহে সূর্যের আলোও ঠিকমতো এসে পৌঁছাতে পারবে না। ফলে পৃথিবী অনেক ঠান্ঠা আর অন্ধকারময় হয়ে পড়বে।
ধোঁয়া যখন পৃথিবীর আরও উপরের আবহম-লে চলে যাবে তখন সেটা সূর্যের আলোয় উত্তপ্ত হয়ে আরও বেশি ছড়িয়ে পড়বে যা সেখানে স্থায়ী হবে কয়েক বছর। বৃষ্টিপাত কমে যাবে। তেজস্ক্রিয়তার ঘটনা ঘটবে। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনের ওপর। ফলে যুদ্ধের পরেও অনাহারে আরও বহু মানুষের মৃত্যু হবে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ লাগতে পারে?
পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপারে ভারতের নীতি হচ্ছে তারা এই অস্ত্র আগে ব্যবহার করবে না। কিন্তু তারাও এখন এই নীতি পুনর্বিবেচনার কথা বলছে। পাকিস্তান সবসময় বলেছে, এরকম অঙ্গীকার করতে তারা রাজি নয়। ফলে দুটি দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর ফলে পারমাণবিক যুদ্ধ যে কখনোই ঘটবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।

 


সড়কের নিরাপত্তায় ইসলামি বিধান
রাস্তা মানবজাতির সহায়ক পথ। রাস্তার সঙ্গে মানুষের বিশাল এক গভীর
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
(পর্ব-৯) এশার নামাজ : আমি যখন নবীজির পরিবার সম্পর্কে জানতে
বিস্তারিত
পরিবেশ বিপর্যয় রোধে ইসলাম
ভারতবর্ষের প্রাচীনতম নগরী দিল্লির বায়ুদূষণ এই মুহূর্তে রাজ্যটির তো বটেই,
বিস্তারিত
ফরজ ওয়াজিব সুন্নত মুস্তাহাব মাকরুহ
পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরিফ দ্বারা ইসলামের যে বিধান আমাদের
বিস্তারিত
প্রথমে গুণ্ডামি করে মসজিদটা ভাঙা
এ রায়টা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হলো, সবটা ঠিক বুঝতে পারছি
বিস্তারিত
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাবরি মসজিদের রায়
বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় ভারতে হিন্দু-মুসলমান সংঘাত আরও
বিস্তারিত