প্রকৃত নবীপ্রেমিকের আদর্শ উপমা

মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ (রা.)

ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে অবস্থিত মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ (রা.) মাধ্যমিক বিদ্যালয়

আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ। রাসুলের বিশিষ্ট সাহাবি। দীর্ঘদেহী। তামাটে বর্ণের। ভারসাম্যপূর্ণ মেজাজের। শান্ত প্রকৃতির। প্রখ্যাত সাহাবি মুসআব বিন ওমায়ের (রা.) এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। সাদ বিন মুআজ (রা.) এর আগে। রাসুল (সা.) এর সঙ্গে বদর, ওহুদসহ প্রতিটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। তাবুক যুদ্ধে রাসুল (সা.) তাকে মদিনার ভারপ্রাপ্ত হিসেবে রেখে যান। ফলে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি। হিজরতের পর মদিনায় রাসুল (সা.) তার ও আবু ওবায়দা ইবনুল জাররাহ এর মাঝে ভ্রাতৃত্ববন্ধন করে দেন। বনু কাইনুকা যুদ্ধে তার দায়িত্ব ছিল ইহুদিদের মদিনা থেকে বের করে দেওয়া এবং তাদের ফেলে যাওয়া ধনসম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র গনিমত হিসেবে একত্রিত করা। 
তিনি ওহুদ যুদ্ধে নবী (সা.) এর পাহারাদার ছিলেন। মুসলিম সেনা ছাউনির পাহারার দায়িত্বও পালন করেন তিনি। হঠাৎ যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। মুসলমানরা পরাজিত হওয়ার উপক্রম হয়। অন্যদিকে রাসুল (সা.) পিপাসার্ত। তখন মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ (রা.) মহিলা শিবিরে যান। পানি তালাশ করেন। তাদের কাছে পানি পাননি। এদিকে রাসুলের পানির পিপাসা ছিল প্রচ-। তাই মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ (রা.) একটি পানির খালের সন্নিকটে যান। সেখান থেকে মিষ্টি পানি নিয়ে আসেন। রাসুল (সা.) তা পান করেন। তার জন্য কল্যাণের দোয়া করেন। 

জীবনের অন্যতম অর্জন
কাব বিন আশরাফ। ইহুদি নেতা। বিশিষ্ট কবি। সে রাসুলকে গালাগাল করত। সাহাবিদের কষ্ট দিত। তাদের বিরুদ্ধে কাফেরদের উসকানি দিত। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুল (সা.) বললেনÑ ‘আমার পক্ষ থেকে কে কাব বিন আশরাফ থেকে প্রতিশোধ নেবে? সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে।’ তখন মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ দাঁড়ালেন। বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি চান যে আমি তাকে হত্যা করি? তিনি জবাবে বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে (নিজ থেকে বানিয়ে কৌশল হিসেবে) কিছু বলার অনুমতি দেন আমাকে! (অর্থাৎ রাসুলের ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে চান) রাসুল বলেন, ‘হ্যাঁ, বলতে পার’। তখন মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ কাব বিন আশরাফের কাছে যান। 
তিনি বললেন : এ লোকটি (নবীজি) আমাদের কাছে চাঁদা চায়। তিনি আমাদের বহু কষ্টে ফেলে দিয়েছেন। আমি তোমার কাছে কিছু ঋণ চাইতে এসেছি। 
সে বলল : আল্লাহর শপথ! তোমরা তার দ্বারা আরও বেশি বিরক্ত হবে। 
তিনি বললেন : আমরা তো এখন তার অনুসরণ শুরু করে দিয়েছি। শেষ পর্যন্ত কী হয় তা না দেখে তাকে এমনিতে ছেড়ে দিতে চাচ্ছি না। আমরা তোমার কাছে এক ওয়াসাক (ষাট সা) বা দুই ওয়াসাক ঋণ চাচ্ছি। 
সে বলল : ঠিক আছে, তাহলে কোনো কিছু বন্ধক রাখ। তিনি বললেন, আপনি কী চান? 
সে বলল : তোমার স্ত্রীকে বন্ধক রাখ। 
তিনি বললেন : কীভাবে আমরা তাকে আপনার কাছে বন্ধক রাখি, অথচ আপনি আরবের সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ। 
সে বলল : তাহলে তোমার সন্তানদের বন্ধক রাখ। 
তিনি বললেন : কীভাবে আমরা তাদের বন্ধক রাখতে পারি, পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ কেউ খোঁটা দেবে। বলবে, এক-দুই ওয়াসাকের জন্য তোমাদের বন্ধক রাখা হয়েছে। এটা আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। বরং আমরা আপনার কাছে অস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি। তিনি তাকে ওয়াদা দিলেন তার কাছে আবার আসবেন। রাতের বেলা তিনি আবার তার কাছে এলেন। তার সঙ্গে ছিলেন আবু নায়েলা। তিনি হলেন কাব বিন আশরাফের দুধভাই।
সে তাদের দুর্গে যেতে বলল। নিজে তাদের কাছে উঠে এলো।  
তার স্ত্রী বলল : এ সময়ে আপনি কোথায় যান? 
সে বলল : সে তো আমার পরিচিত মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ ও দুধভাই আবু নায়েলা। 
স্ত্রী বলল : আমি কেমন যেন রক্ত প্রবাহিত হওয়ার আওয়াজ পাচ্ছি। 
তিনি বললেন : সে আমার ভাই মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ। সঙ্গে দুধভাই আবু নায়েলা। আর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে যদি রাতের বেলা হত্যা করতেও ডাকা হয়, তাহলেও তারা সাড়া দেয়। 
বর্ণনাকারী বলেন : মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ তার সঙ্গে দুজন ব্যক্তিকে প্রবেশ করান। 
তাদের বলেন : যখন সে আসবে আমি তার চুলের প্রশংসা করব। তার ঘ্রাণ শুঁকব। যখন তোমরা দেখবে আমি তার মাথা শক্ত করে ধরে ফেলেছি, তখন তাকে তোমরা আঘাত করবে। সে তাদের কাছে সজ্জিত হয়ে এলো। তার শরীর থেকে ঘ্রাণ বের হচ্ছিল। 
মুহাম্মদ তাকে লক্ষ করে বললেন : ইতঃপূর্বে তো এমন সুঘ্রাণ কখন পাইনি। 
সে বলল : আমার কাছে আরবের সবচেয়ে সুঘ্রাণের অধিকারী মহিলা রয়েছে। রয়েছে আরবের শ্রেষ্ঠ মহিলা। তিনি বললেন : তুমি কি অনুমতি দাও আমি তোমার মাথার ঘ্রাণ শুঁকব। 
সে বলল : হ্যাঁ। তিনি ঘ্রাণ নিলেন। তার সাথিদের ঘ্রাণ শুঁকালেন। 
তিনি আবার বললেন : আরেকবার আমাকে সুযোগ দেবেন? 
সে বলল : হ্যাঁ, নাও ঘ্রাণ। 
তখন তিনি শক্ত করে ধরলেন ও সাথিদের বললেন : এবার ধরো! ফলে তারা তাকে হত্যা করে ফেলেন। অতঃপর তারা নবী (সা.) এর দরবারে এসে ঘটনার বিবরণ শোনালেন। (বোখারি : ৪০৩৭)।

ফেতনা থেকে পলায়ন
মুহাম্মদ বিন মাসলামাহ (রা.) সব সংকটময় জায়গা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। তিনি জঙ্গে জামাল, জঙ্গে সিফফিনে অংশ নেননি। বরং তিনি একটি কাঠের তরবারি বানান। স্থানান্তরিত হয়ে ‘রাবজা’য় চলে যান। সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। ৪৩ হিজরির সফর মাসে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে দশ ছেলে ও ছয় মেয়ে রেখে যান। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন ও আমাদের প্রতিও রহমত বর্ষণ করুন।


তওবার স্তর সর্বোচ্চ মর্যাদা
তওবা ছিল নবী-রাসুলদের রীতি ও অভ্যাস, যা তাদের কাছে নিজেদের
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
(পর্ব-১১) নবীজির বিনয় নবীজি (সা.) সবচেয়ে চরিত্রবান ব্যক্তি। তিনি কোরআন মতে
বিস্তারিত
মানবতার হারানো শান্তি ইসলামে
গোটা বিশ্বে মানবতা আজ পদদলিত, নিগৃহীত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। মানবতার
বিস্তারিত
শুক্রবার আসরের পর পূর্বসূরিদের আমল
১. তাউস ইবনে কায়সান (রহ.) জুমার দিন আসর নামাজের পর
বিস্তারিত
অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ভয়াবহতা
রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ অপরাধী হওয়ার জন্য কোনো মুসলমান ভাইকে
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
ফজরের পর  আগের পর্বে আমরা নবীজি (সা.) এর রাতের ইবাদত
বিস্তারিত