গণক ও জ্যোতিষীদের মিথ্যাচারিতা থেকে সতর্ক থাকুন

মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

আল্লাহ মানুষকে এমন কিছু মাধ্যম প্রদান করেছেন, যেগুলো দিয়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়। তিনি তাকে বুদ্ধি ও বোধ দান করেছেন। তাকে শিক্ষা অর্জনের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন ‘পাঠ কর তোমার মহিমান্বিত পালনকর্তার শপথ করে, যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সূরা আলাক : ৩-৫)।
আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব করতে নির্বাচন করেছেন। তাই তাকে জ্ঞান দান করেছেন, যা কর্ম ও মর্যাদার কারণ। তাকে বুদ্ধি দিয়েছেন, যা নির্দেশনা গ্রহণ ও দায়িত্বপ্রাপ্তির হেতু। তিনি বলেনÑ ‘স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি। তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আমরাই তো আপনার সপ্রশংস স্তুতি ও পবিত্রতা ঘোষণা করি। তিনি বললেনÑ নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তা তোমরা জান না।’ (সূরা বাকারা : ৩০)।
জ্ঞানের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে আল্লাহ বলেছেন ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদাগুলো উন্নীত করেন।’ (সূরা মুজাদালাহ : ১১)। মানুষ অজ্ঞ অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করে, সে তখন কিছুই জানে না। আল্লাহ বলেন ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন, তোমরা কিছুই জানতে না।’ (সূরা নাহল : ৭৮)। আল্লাহ তায়ালা কিছু জ্ঞান-বিদ্যার পর্দা সরিয়ে দিয়ে মানুষকে তা গ্রহণ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। অধিকাংশ জ্ঞান মানুষের বোধশক্তির আওতার বাইরে রয়ে গেছে। তিনি বলেন ‘তোমাদের শুধু অল্প জ্ঞানই প্রদান করা হয়েছে।’ (সূরা ইসরা : ৮৫)।
আল্লাহ অদৃশ্য বা গায়েবের জ্ঞানকে নিজের জন্য রেখে দিয়ে তা গোপন করেছেন। তাই আল্লাহ ছাড়া তার ব্যাখ্যা কেউ জানে না। ‘অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না।’ (সূরা আনআম : ৫৯)।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেনÑ ‘অদৃশ্যের চাবিকাঠি পাঁচটি বিষয়, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। মাতৃগর্ভে কী তৈরি করবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, আগামীকাল কী ঘটবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কখন বৃষ্টি হবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না, কোন ব্যক্তি কোন ভূমিতে মারা যাবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না এবং কখন কেয়ামত ঘটবে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।’ অতঃপর তিনি তেলাওয়াত করেনÑ ‘অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি ছাড়া তা কেউ জানে না। জলে ও স্থলে যা কিছু আছে, তা তিনিই জানেন। তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মৃত্তিকার অন্ধকারে কোনো শস্য বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক কোনো বস্তুই নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।’ (সূরা আনআম : ৫৯)। (বোখারি)। 
আল্লাহর অন্যতম মূল বিধান, নীতি ও পন্থা হলো তিনি তাঁর সৃষ্টির কাছে অদৃশ্যকে আড়াল করে রেখেছেন, এমনকি তাঁর সবচেয়ে প্রিয়তম বান্দাদের কাছেও। তাই নিকটতম কোনো ফেরেশতা ও প্রেরিত কোনো রাসুলও তা জানেন না। ‘বলে দিন, আল্লাহ ছাড়া আসমান ও জমিনে যারা আছে তারা কেউ গায়েব জানে না।’ (সূরা নামল : ৬৫)। আল্লাহ তাঁর রাসুল (সা.) কে সব বিষয় আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি যেন নিজের সম্পর্কে বলে দেন, তিনি গায়েব জানেন না এসব বিষয়ে তাঁর কোনো অবগতি নেই, যতটুকু আল্লাহ তাঁকে জানিয়েছেন ততটুকু ছাড়া।
আল্লাহ বলেন ‘বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভালো-মন্দের ওপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম; তবে তো আমি প্রভূত কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না।’ (সূরা আরাফ : ১৮৮)।
বিভিন্ন লোক গায়েবি ও অদৃশ্য বিদ্যা জানতে তৎপর হয়। অজানা বিষয়ই সবার আগ্রহের বস্তু। তাদের মধ্যে কিছু লোককে শয়তানরা ও তাদের মিথ্যাবাদী সহযোগীরা উসকে দেয়, প্ররোচিত করে। তখন তারা গণকবৃত্তি, জ্যোতিষীগিরি, জাদু ও ভবিষ্যদ্বাণীর দ্বারা মিথ্যাচার করে এবং বানোয়াটিতে লিপ্ত হয়। তারা আল্লাহর বিরুদ্ধে এমন কথা বলে, যা তারা জানে না। ‘বল, নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক হারাম করেছেন প্রকাশ্য-গোপন অশ্লীলতা ও পাপ, অসংগত বিরোধিতা এবং কোনো কিছুকে আল্লাহর শরিক করা, যার কোনো প্রমাণ তিনি প্রেরণ করেননি এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা তোমরা জান না।’ (সূরা আরাফ : ৩৩)।
শয়তানরা আসমানে উঠে যেত। লুকিয়ে চুরি করে শুনত। সেগুলো তাদের সঙ্গীদের বলত। পরে তারা মানুষের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করত। জেনে রাখুন, শয়তানকে এসব চুরি করে শ্রবণ করা থেকে বাধা দেওয়া হয়। আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনের পর থেকে শয়তানদের চুরি করে শ্রবণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাদের নিয়ে কোরআন বর্ণনা করেছে। ‘এবং আমরা চেয়েছিলাম আকাশের তথ্য সংগ্রহ করতে; কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম কঠোর প্রহরী ও উল্কাপি- দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আর পূর্বে আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনতে বসতাম; কিন্তু এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে তার ওপর নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত জ্বলন্ত উল্কাপি-ের সম্মুখীন হয়।’ (সূরা জিন : ৮-৯)। আল্লাহ তাদের ঊর্ধ্ব জগতের কথা শ্রবণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে দেন। গ্রহগুলোকে উল্কাপি-ে পরিণত করে যারা আসমানের দিকে আসতে চায় সেগুলো চারদিক থেকে তাদের প্রতি নিক্ষেপ করা হয়।
কোনো বান্দার হৃদয়ে পবিত্র কোরআনের প্রতি বিশ্বাস ও এসব মিথ্যাবাদী গণকদের প্রতি বিশ্বাসের একত্র সমাবেশ হতে পারে না। এজন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন ‘যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে এসে তার কথায় বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করল।’ 
তাই আপনারা নিজেদের আকিদাকে সুরক্ষিত রাখুন। আপনাদের কোরআনকে আঁকড়ে ধরুন। জেনে রাখুন, আল্লাহ অদৃশ্যের জ্ঞানী, তিনি কারও কাছে তাঁর অদৃশ্যকে প্রকাশ করেন না।
মানুষকে গণক, যাদকর, জ্যোতিষী ও ভেল্কিবাজ লোকদের মিথ্যাচারিতার দ্বারা পরীক্ষায় আক্রান্ত করা হয়। তারা দুর্বলদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তাদের জন্য ওত পেতে থাকে। তাদের বুদ্ধি নিয়ে মারাত্মক বিদ্রƒপে মেতে ওঠে। এক পর্যায়ে দুর্বল লোকরা সুখে ও দুঃখে তাদের আশ্রয় গ্রহণ করে। অদৃশ্য ও আসমানি সংবাদের বিষয়ে তাদের বিশ্বাস করে ফেলে। 
এদের কাছে যেতে ও তাদের কথায় বিশ্বাস করতে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে এসে তার কথায় বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করল।’ ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি অশুভ মনে করে বা যার জন্য অশুভ মনে করা হয়, যে গণকবৃত্তি করে বা যার জন্য গণকবৃত্তি করা হয়, যে জাদু করে বা যার জন্য জাদু করা হয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’
শয়তানদের পণ্য হলো মিথ্যাচারিতা ও বানোয়াটি করা। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকরা আল্লাহর রাসুলকে গণকদের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন তারা কোনো কিছুই নয়। তখন তারা বলল, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কখনও এমন কিছু আমাদের বলে যা সত্য হয়ে যায়! তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন ‘ফেরেশতারা মেঘমালায় অবতীর্ণ হয়ে আসমানে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিষয়ে আলোচনা করে, তখন শয়তানরা লুকিয়ে কান পেতে তা শোনে। তারপর তারা সেটা গণকদের কাছে নিজেদের পক্ষ থেকে শত মিথ্যা মিশিয়ে পৌঁছে দেয়।’ অন্য এক বর্ণনায় আছে, ‘সেই সত্য বাণীটা জিন চুরি করে শুনে আসে, পরে সেটা তার সঙ্গীর কানে মুরগির মতো শব্দ করে ঢেলে দেয়। তারপর তারা তাতে শত শত মিথ্যা মিশ্রিত করে।’ (বোখারি ও মুসলিম)।
জিন ও মানুষ শয়তানরা পরস্পর মিত্র। তারা মানুষের চিরশত্রু। ‘তারা একে অন্যের কাছে বানোয়াট মিথ্যা ছলনা করে প্রচার করে।’ (সূরা আনআম : ১১২)।
আল্লাহ এদের সবাইকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন ‘আল্লাহই একমাত্র অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারী। তাই যে এ বিষয়ে কোনো কিছুর ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে অংশগ্রহণের দাবি করল, সে আল্লাহর জন্য শরিক সাব্যস্ত করল, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে মিথ্যারোপ করল। 
সাবধান, যে আল্লাহর আনুগত্য ত্যাগ করে অন্যের আনুগত্য করেছে এবং নিজের দ্বীনের ক্ষেত্রে অন্যের অনুসরণ করেছে, সে নিশ্চয়ই আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরিক করেছে।
সুতরাং আপনারা নিজেদের দ্বীন ও আকিদা আঁকড়ে ধরুন। আপনারা সঠিক স্বচ্ছ পথে থাকবেন। এ পথের রাতও দিনের মতো স্পষ্ট হবে। শুধু ধ্বংসপ্রাপ্ত লোকই এ পথ থেকে বিচ্যুত হয়।

১৯ সফর ১৪৪১ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ 
মাহমুদুল হাসান জুনাইদ


আজানের মহিমা
সর্বোপরি আজান হচ্ছে নামাজের আহ্বান। আর নামাজের গুরুত্ব যে সর্বাধিক,
বিস্তারিত
আল-মাদ্রাসাতুস সাওলাতিয়াহ মক্কা মোকাররমা
  আল-মাদ্রাসাতুস সাওলাতিয়াহ। পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থিত আরব উপদ্বীপের প্রাচীনতম দ্বীনি
বিস্তারিত
একদিন নবীজির বাড়িতে
ধৈর্য ও সহনশীলতা : নবীজির (সা.) বাড়িতে শুধু শান্তি আর
বিস্তারিত
ফুটপাতে ক্রয়-বিক্রয় প্রসঙ্গে
  প্রশ্ন : আমি ফুটপাতের দোকান থেকে বিভিন্ন জিনিস ক্রয় করি।
বিস্তারিত
২৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক কেরাত সম্মেলন
আসছে ২৯ নভেম্বর শুক্রবার বাদ আসর বাংলাদেশ কারি সমিতির উদ্যোগে
বিস্তারিত
সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা
ইসলাম অতীত ক্ষমা করে দিয়েছে। কারণ ইসলাম পূর্বকৃত সব গোনাহ
বিস্তারিত