ফরজ ওয়াজিব সুন্নত মুস্তাহাব মাকরুহ ও মুবাহ

‘মুবাহ’ শ্রেণির অনেক কাজকেই ইবাদতে রূপান্তরিত করে পুণ্য হাসিল করা সম্ভব যদি নিজের মনের নিয়তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে ডাইভার্ট করা হয়। যেহেতু প্রতিদিনের বেশিরভাগ কাজই ‘মুবাহ’ শ্রেণির হয়ে থাকে, তাই নিজের নিয়তকে বিশুদ্ধ করার মাধ্যমে অতিরিক্ত সওয়াব অর

পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরিফ দ্বারা ইসলামের যে বিধান আমাদের ওপর বিধিবদ্ধ হয়েছে তা এক কথায় ইসলামি শরিয়ত নামে অভিহিত। ইসলামে মানুষের জীবনযাপনের জন্য প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঠিক তেমনি তা মানার ক্ষেত্রে গুরুত্ব বিবেচনা করে হুকুম আহকামগুলোকে এতটাই সুন্দর পন্থায় শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে যে, সেগুলো পালন করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক মুসলিম অনেক ধরনের স্বাধীনতাও ভোগ করে থাকেন। ইসলামি শরিয়তের বিধানগুলোকে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, মুস্তাহাব, মাকরুহ ও মুবাহ ইত্যাদি শব্দে স্তরবিন্যাস করা হয়েছে। এসব পরিভাষা আল্লাহ ও রাসুল (সা.) নির্ধারণ করেননি। বরং মুজতাহিদ ইমামরা কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করেছেন, যা সব উম্মত একবাক্যে মেনে নিয়েছেন। সংক্ষেপে এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো : 
ফরজ : ফরজ অর্থ অবশ্য পালনীয়। শরিয়তের যেসব বিধান কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে অকাট্যভাবে পালনীয় তাকে ফরজ বলে। ফরজ দুই ধরনের। যথা ক. ফরজে আইন : যেসব কাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক বিবেকবান নারী-পুরুষ সবার ওপর সমভাবে ফরজ, তাকে ফরজে আইন বলা হয়। যেমন নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। শরয়ি কোনো কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ ত্যাগ করা কবিরা গোনাহ। কারও যদি কোনো ফরজ আমল ছুটে যায় তাহলে সেটা কাজা করা জরুরি। (রদ্দুল মুহতার : ১/৩৯৭)। খ. ফরজে কিফায়া : শরিয়তের যেসব বিধান পালন করা সবার জন্য আবশ্যক নয়; বরং সমাজের কিছু সংখ্যক লোক আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যায়, তাকে ফরজে কিফায়া বলে। যেমন জানাজার নামাজ, দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন। ফরজে কিফায়া যদি কেউ আদায় না করে তবে সবার ফরজ তরক করার হোনাহ হবে। (জাওহিরাতুন নায়্যিরাহ : ১/৪)। 
ওয়াজিব : ওয়াজিব শব্দের অর্থ হলো অপরিহার্য, বাধ্যতামূলক, করণীয়, আবশ্যক। আর ইসলামি পরিভাষায় যে বিধান সুনিশ্চিত দলিলের আলোকে প্রমাণিত নয়; বরং প্রবল ধারণাপ্রসূত দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত, তাকে ওয়াজিব বলা হয়। কার্যত ওয়াজিব ফরজ বিধানের মতোই অবশ্য কর্তব্য। ওয়াজিব ত্যাগকারী কবিরা গোনাহগার হিসেবে গণ্য হবে। তবে এর অস্বীকারকারী কাফের সাব্যস্ত হবে না। যেমন বিতরের সালাত ও দুই ঈদের সালাত ইত্যাদি। (মুজামুল ফকিহ : ৩১৯)।
সুুন্নত : সুন্নত শব্দের শাব্দিক অর্থ রীতি-নীতি, আদর্শ। যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবারা করেছেন তাকে সুন্নত বলা হয়। যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘তোমাদের ওপর আমার এবং আদর্শবান খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নত অনুসরণ করা জরুরি।’ (তিরমিজি : ২৬৭৬)। এ সুন্নত আবার দুই ধরনের। যথা ক. সুুন্নতে মুয়াক্কাদা : যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবারা সর্বদা পালন করতেন, অন্যদেরও পালনের তাগিদ দিতেন সেগুলোকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা বলা হয়। যেমনÑ জামায়াতের সঙ্গে সালাত আদায়, তারাবির নামাজ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মোট বারো রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা রয়েছে। হাদিস শরিফে আছে, হজরত ইম্মে হাবীবা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দিন ও রাতে (ফরজ ব্যতীত) বারো রাকাত নামাজ পড়বে তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে। আর তা হলো জোহরের আগে চার রাকাত ও পরে দুই রাকাত, মাগরিবের পরে দুই রাকাত, এশার পরে দুই রাকাত এবং ফজরের আগে দুই রাকাত। (তিরমিজি : ৪১৫)। আমলের দিক থেকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ওয়াজিবের কাছাকাছি। বিনাকারণে তা ত্যাগ করলে গোনাহগার হবে। তবে গোনাহ ওয়াজিব অপেক্ষা কম হবে এবং ওজরবশত কখনও ছুটে গেলে তা কাজা করতে হবে না। (রদ্দুল মুহতার : ১/৯৭)। খ. সুুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা : যেসব কাজ রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবারা মাঝেমধ্যে করতেন; কিন্তু অন্যকে তা করতে তাগিদ দেননি, সেগুলোকে সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা বা সুন্নতে জায়েদা বলা হয়। যেমন এশা ও আসরের ফরজ নামাজের আগে চার রাকাত সুন্নত, সালাতুত তাহাজ্জুদ, এশরাক ও আউয়াবিনের নামাজ ইত্যাদি। সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা তরক করার দ্বারা কোনো গোনাহ হবে না, তবে আমল করলে সওয়াব পাওয়া যায়। (রদ্দুল মুহতার : ১/৭৭)।
মুস্তাহাব : মুস্তাহাব অর্থ হলো উত্তম, পছন্দনীয়। ফিকহের পরিভাষায় মুস্তাহাব এমন আমল, যা পালন করলে সওয়াব রয়েছে; কিন্তু ছেড়ে দিলে কোনো গোনাহ নেই। যেমন জুমার দিন বেশি বেশি দরুদ পড়া, প্রতি আরবি মাসের তিন দিন রোজা রাখা, শাওয়াল মাসের ছয় রোজা, নিয়মিত জিকির করা ইত্যাদি। মুস্তাহাব দুইভাবে সাব্যস্ত হয় কখনও নস দ্বারা, আবার কখনও কিয়াস দ্বারা। কোরআন বা হাদিস দিয়ে কোনো মুস্তাহাব সাবেত হলে সেটা মুতলাক মুস্তাহাব। আর কিয়াসের দ্বারা কোনো মুস্তাহাব সাবেত হলে সেটা মুস্তাহাবে মুস্তাহসান। সুন্নত ফরজের সহায়ক। আর মুস্তাহাব সুন্নতের সহায়ক। তাই ফরজের পরিপূর্ণতার জন্য সুন্নত আর সুন্নতের পরিপূর্ণতার জন্য মুস্তাহাবের প্রতি গুরুত্ব প্রদান জরুরি।
মাকরুহ : মাকরুহ শব্দের অর্থ হলো অপছন্দনীয়, নিন্দনীয় কাজ। পরিভাষায়, মাকরুহ এমন কাজকে বলা হয়, যেগুলো ইসলামি শরিয়তে অপছন্দনীয় সাব্যস্ত হয়েছে এবং তা করতে নিষেধ করা হয়েছে। মাকরুহ দুইভাগে বিভক্ত। যথাÑ ক. মাকরুহ তাহরিমি : যেসব কাজ হারামের নিকটবর্তী সেসক কাজকে মাকরুহ তাহরিমি বলে। যেমন সূর্যোদয়, দ্বিপ্রহর ও সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়া, বিজাতীয়দের অনুকরণ, দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা। কার্যত মাকরুহে তাহরিমি হারাম বিধানের মতোই অবশ্য পরিত্যাজ্য। যদি কেউ বিনা কারণে মাকরুহে তাহরিমি কাজে অভ্যস্ত থাকে তবে সে ফাসেক হিসেবে সাব্যস্ত হবে এবং পরকালে শাস্তির উপযুক্ত হবে। (কামুসুল ফিকহ : ৩/২৪৭)। খ. মাকরুহ তানজিহি : এমন অপছন্দনীয় কাজ, যা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম। এ ধরনের কাজের বিষয়ে শরিয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, আবার জায়েজ হওয়ারও কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। যেমন কোনো কিছু বাম হাতে গ্রহণ করা ও বাম হাতে প্রদান করা।
মুবাহ : মুবাহ শব্দের অর্থ বৈধ। এটি এমন এক কর্ম, যা সম্পাদন বা বর্জন কোনোটিই ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয়। আবার এই কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়নি। ইসলামের একটি সাধারণ নীতিমালা হচ্ছে, সব কাজই হালাল বা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। শুধু সেসব কাজ ব্যতীত যা হারাম বা মাকরুহ হওয়ার ব্যাপারে দলিল পাওয়া যায় অথবা যেসব কাজে হালাল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আর একটি ব্যাপার হচ্ছে, এই ‘মুবাহ’ শ্রেণির অনেক কাজকেই ইবাদতে রূপান্তরিত করে পুণ্য হাসিল করা সম্ভব যদি নিজের মনের নিয়তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে ডাইভার্ট করা হয়। যেহেতু প্রতিদিনের বেশিরভাগ কাজই ‘মুবাহ’ শ্রেণির হয়ে থাকে, তাই নিজের নিয়তকে বিশুদ্ধ করার মাধ্যমে অতিরিক্ত সওয়াব অর্জন করা যায়। নিয়ত ঠিক না থাকলে কোনো নেকি পাওয়া যাবে না। যেমন ক্রয়-বিক্রয় করা, সাধ্য মতো দামি পোশাক পরিধান করা।


ঘুষখোরদের ওপর আল্লাহর লানত
অবৈধ আয়ের উদ্দেশ্যে জনগণের ওপর কখনও সরাসরি কখনও পরোক্ষভাবে জুলুম
বিস্তারিত
বাজারে সরবরাহ অব্যাহত রাখার ফজিলত ফিরোজ
  আল্লাহ আমাদের রিজিক দাতা। তিনি আমাদের দুনিয়ায় পাঠানোর আগে রিজিকের
বিস্তারিত
সুপারিশে সওয়াব মেলে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেনÑ আমি শুধুই একজন সুপারিশকারী। (অর্থাৎ এটা তোমার
বিস্তারিত
ব্যবসায়িক চুক্তি প্রসঙ্গে
প্রশ্ন : মোশাররফ ও হাসান একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন। শ্রম
বিস্তারিত
ঊর্ধ্বলোকের সূর্যের সন্ধানী হও
  এক লোকের বউটা ছিল দুষ্টু প্রকৃতির, লোভী ও পেটুক। তবুও
বিস্তারিত
পাথেয়
প্রত্যেকের সঙ্গে ফেরেশতা ও  শয়তান থাকে যুবাইর বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত,
বিস্তারিত