মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ভয়াবহতা

বুদ্ধিমান মানুষের জন্য অপরিহার্য হলো, অন্য মানুষের দোষের পেছনে পড়া বাদ দিয়ে নিজের দোষ সংশোধনে উদ্যোগী হওয়ার নিরাপদ পথ বেছে নেওয়া

রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ অপরাধী হওয়ার জন্য কোনো মুসলমান ভাইকে নগণ্য বা তুচ্ছ মনে করাই যথেষ্ট।’ একজন মুসলমানের সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। সে এমন সৃষ্টি, শরিয়ত যার মর্যাদা সংরক্ষণ করেছে। তার নিজস্বতা ও ব্যক্তিগত বিষয়কে সম্মান করেছে। অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায় এমন অনধিকার প্রবেশকারীর সব ধরনের কষ্ট থেকে তাকে হেফাজত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, এমন কথাবার্তা জিজ্ঞেস করো না, যা তোমাদের কাছে পরিব্যক্ত হলে তোমাদের খারাপ লাগবে।’ (সূরা মায়েদা : ১০১)। 
শরিয়তের বিভিন্ন দলিল ও প্রমাণ সেসব পথকে রুদ্ধ করেছে, যা কোনো মুসলমানের ব্যক্তিগত বিষয় ও গোপনীয়তা প্রচারের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা অন্যের গোপনীয়তা অনুসন্ধান করো না।’ (সূরা হুজরাত : ১২)। অর্থাৎ তোমরা মানুষের দোষ যা আল্লাহ তায়ালা গোপন রেখেছেন, তা চর্চা করে বা খোঁজাখুঁজি করে এবং গোপনীয়তা অনুসন্ধান করে তা প্রকাশ করো না। প্রত্যেক মুসলমানেরই তার নিজের, পরিবারের, তার সুনাম-সুখ্যাতির, তার সম্পদের এবং তার স্বার্থের একটা নিজস্ব অঙ্গন রয়েছে। এই উন্নততর শিষ্টাচার একজন মুসলমানকে অন্যের গোপন বিষয় অনুসন্ধানের মতো নিচু কাজ থেকে ঊর্ধ্বে রাখে। যেন প্রত্যেকেই তার নিজের, পরিবারের, তার গোপন বিষয়ের ক্ষেত্রে নিরাপদ থাকতে পারে। সারকথা, মনুষের বাহ্যিক দিক আমাদের দেখার ও লক্ষ্য রাখার বিষয়। গোপন বিষয়ের খবরদারি করা আমাদের জন্য বৈধ নয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি মানুষের অন্তরের বিষয় অনুসন্ধান করতে এবং তাদের ভেতরটা ফেঁড়ে দেখতে আদিষ্ট নই।’ 
গোপনীয়তা অনুসন্ধান বলতে বোঝানো হচ্ছে, ব্যক্তি তার ভাইয়ের দোষ ও গোপন বিষয় জানতে কোনো মাধ্যম ও পদ্ধতি ব্যবহার করা এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করা। এ বিষয়টি মুসলিম ব্যক্তি ও সমাজের জন্য বেদনা এবং বিরাট ভয় ও শঙ্কার বিষয়। এ বিষয়টি অনেক ধ্বংস ও বিপদ টেনে এনেছে। অনেক সম্পর্ক নষ্ট করেছে। বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করেছে। ক্রোধের বীজ বপন করেছে। অনেক ঘড়বাড়ি ধ্বংস করেছে। অসংখ্য পরিবারকে বিভক্ত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা বিনা অপরাধে মোমিন পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সূরা আহজাব : ৫৮)। 
আমরা যখন আল্লাহ তায়ালার বাণী ‘ওয়া লা তাজাসসাসু’ নিয়ে গভীরভাবে ভাবব তখন বোঝা যাবে, এ আয়াত মানবজীবনের সার্বিক সব দিক অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাবা-মাকে সম্বোধন করে বলছে, যেন তারা গোপনীয়তার অনুসন্ধানে অতি বাড়াবাড়ি না করে। অনুমতি ব্যতীত নিজের অধীনে থাকা সন্তান-সন্ততির ব্যক্তিগত গোপন বিষয়ের পেছনে না পড়ে। শিষ্টাচার এবং আমানত পালনের দাবি হচ্ছে, পরিচালক তার অধীনদের যে বিষয় জানা হালাল নয় এবং একান্তই ব্যক্তিগত সে বিষয়ে অতি বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত থাকবেন। কোনো ব্যক্তি যেন রাতের আঁধারে তার পরিবারের খেয়ানত ও বিশ্বসঘাতকতা জানার উদ্দেশ্যে এবং তাদের বিচ্যুতি ধরার জন্য ঘরের কড়া না নাড়ে। তিনি বলেন, তুমি যদি মানুষের গোপন বিষয়ের পেছনে পড়ে থাকো তাহলে তুমি যেন তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে বা ছিন্ন করার উপক্রম হলে। তেমনিভাবে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর কথা, ফোনালাপ, বার্তা আদান-প্রদানে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া আড়ি পাতা, এর পেছনে লাগা উচিত নয়। এমন আচরণ পরস্পরের বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। সুখের ভিতকে নড়বড়ে করে দেয়। এতে ভেতরে ভেতরে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। ইসলাম পারিবারিক জীবনে ব্যক্তিগত বিষয়ের নিরাপত্তা বিধানে কোন ধরনের গুরুত্বারোপ করে তার প্রমাণ মা-বাবার কাছে যাওয়ার প্রয়োজনেও সন্তান-সন্ততির অনুমতি প্রার্থনার বিধানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছে। 
‘তোমরা গোপনীয়তা অনুসন্ধান করো না’, এই বাণী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পুরোধা ব্যক্তিদের জন্যও প্রযোজ্য। তাদের কোনো মুসলিম ভাইয়ের ব্যক্তিগত বিষয় অনুসন্ধান থেকে এবং যে কোনো ধরনের হ্যাকিং থেকে বিরত থাকার দাবি জানায়। কেননা, এই আচরণ বড় ধরনের ক্ষতির কারণ এবং তা ব্যক্তিকে অনেক কষ্ট দেয়। এর মাধ্যমে অপহরণ, ছিনতাই, সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তেমনিভাবে কোনো মুসলিমের তার অপর ভাইয়ের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ গোপনীয়তা অনুসন্ধানের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। ব্যক্তির ব্যাপারে কুধারণা থাকায় অবস্থা দাঁড়ায়, সে এমন সব কথা বলে, যা সঠিক নয়। এমন কাজ করে যা অনুচিত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা কুধারণা থেকে বেঁচে থাক, কেননা কুধারণা মিথ্যা কথা। আর তোমরা গোপনীয়তা অনুসন্ধান করো না।’ 
অতিরিক্ত পরচর্চা, বিষয়ের খুব গভীরে যাওয়ার প্রবণতা এবং মানুষের জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে জিজ্ঞেস করা গোপনীয়তা অনুসন্ধানের দিকে টেনে নেয়। এতে একজন মুসলমানের মানসম্মান নষ্ট হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সূরা ইসরা : ৩৬)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ইসলামের সৌন্দর্যের একটি দিক হচ্ছে অযথা কাজ পরিত্যাগ করা।’ গোপনীয়তা অনুসন্ধানের এই ব্যাধি গোপন বিষয় প্রকাশের মাধ্যমে প্রপাগান্ডা প্রচারের লক্ষ্যে তাদের মাঝেই ব্যাপক প্রচার হচ্ছে, যাদের বুঝশক্তি লোপ পেয়েছে, যাদের মূল্যোবোধ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
অতএব, বুদ্ধিমান মানুষের জন্য অপরিহার্য হলো, অন্য মানুষের দোষের পেছনে পড়া বাদ দিয়ে নিজের দোষ সংশোধনে উদ্যোগী হওয়ার নিরাপদ পথ বেছে নেওয়া। কেননা যে ব্যক্তি অন্যের দোষ ছেড়ে নিজের দোষ নিয়ে ব্যস্ত হয়, সে তার শরীরকে প্রশান্তি দেয় এবং হৃদয়কে কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়। আর যে নিজের দোষ বাদ দিয়ে মানুষের দোষ নিয়ে ব্যস্ত হয়, তার হৃদয় অন্ধ হয়ে যায়। তার শরীর কøান্ত হয়ে পড়ে এবং নিজের দোষের সংশোধন করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে যায়। 
একজন মুসলিম নবীজির দেখানো পথ ও পদ্ধতিতে চলে এই রোগ থেকে তার ঈমানকে রক্ষা করবে। রাসুল (সা.) তার হাদিসের মাধ্যমে এই রোগের সমাধানের বিষয়টি এঁকে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য তিনটি বিষয়কে অপছন্দ করেছেনÑ অযথা কথাবার্তা বলা, সম্পদ বিনষ্ট করা এবং বেশি প্রশ্ন করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘হে সম্প্রদায় যারা মুখে মুখে ঈমান এনেছ অথচ ঈমান হৃদয়ে প্রবেশ করেনি তারা শোন, তোমরা কোনো মুসলমানের গিবত করো না। তাদের গোপন বিষয় তালাশ করো না। কেননা যে মুসলমানের গোপন বিষয় তালাশ করবে আল্লাহ তায়ালা তার দোষ খুঁজতে থাকবেন। আর আল্লাহ তায়ালা যার দোষ খুঁজবেন তা প্রকাশ করে দেবেন যদিও তা অনেক গভীরে হয়।’ 
তাজাসসুস বা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করা এবং অন্যের পদস্খলনের পেছনে দৌড়ানোর রোগ নির্মূল করার কার্যকরি দাওয়াই হচ্ছে একজন মুসলিম ভাইয়ের দোষ সংশোধনে ব্যক্তি তার নিজ দায়িত্ব পালন করবে। নসিহত ও উপদেশের মাধ্যমে তাদের গোপন বিষয়কে আড়ালে রাখবে। যখন কোনো মুসলিম তার আচরণে উন্নতি করবে, অন্য ভাইয়ের দোষ খোঁজা ও গোপনীয়তা অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকবে এবং তা গোপন করে পাশ কাটিয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তায়ালা আরও বড় দয়া দেখিয়ে তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন করবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো দোষকে ক্ষমা করবে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার দোষ-ত্রুটিকে ক্ষমা করবেন।’
প্রত্যেক মুসলমানের এ বিষয়টি ভালোভাবে জানা উচিত যে, ইসলাম তার ব্যক্তিগত বিষয় ও গোপনীয়তা সংরক্ষণ ও হেফাজত করেছে। অতএব এর দাবি ও চাহিদা হচ্ছে যে, সে নির্জনে, গোপনে এবং একাকি নিভৃতে হারাম কোনো কাজে লিপ্ত হবে না। কোনো অপরাধে জড়িত হবে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা তার নির্জনতা ও গোপনীয়তার খবর রাখেন। তাঁর কাছে কোনো কিছুই গোপন নেই। অতি গোপন বিষয়ও তিনি জানেন। সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘উম্মতের মধ্যে এমন লোকদের কথা জানি যারা কেয়ামতের দিন তেহামা পাহাড়সম সওয়াব নিয়ে আসবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সেগুলোকে নিঃশেষ করে দেবেন। তখন সাওবান (রা.) বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ আমরা যেন অজান্তে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে না যাই তাই তাদের বিস্তারিত বর্ণনা দিন। তাদের বিষয়টি স্পষ্ট করে দিন।’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘তারা তোমাদের নিজেদের ভাই। তোমাদের সঙ্গেই তাদের জীবনযাপন। তবে তারা যখন একাকি, নির্জনে থাকে তখন হারাম কাজে লিপ্ত হয়।’

১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার অনুবাদ মুহিউদ্দীন ফারুকী


চীনে মুসলিম নির্যাতনের গোপন নথি
  সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নথিতে গণচীনে উইঘুর মুসলিম নির্যাতন
বিস্তারিত
হিজাব পরার অনুমতি পেলেন ত্রিনিদাদ-টোবাগোর সেই
দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগরের দেশ ত্রিনিদাদ-টোবাগো প্রজাতন্ত্রের এক মুসলিম নারী পুলিশ
বিস্তারিত
আফগান যুদ্ধ অবসানে তালেবানের সঙ্গে
দীর্ঘদিনের আফগান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে তালেবানের সঙ্গে আবার
বিস্তারিত
ইউনেস্কোর তালিকায় বিশ্বের প্রভাবশালী কবিদের
বাহলানির কবিতা ছিল সূক্ষ্ম প্রেমময়। কিন্তু তার সাহিত্য ও চিন্তাজগতে
বিস্তারিত
যে ১০ দেশে বাংলাদেশের সবচেয়ে
  জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে
বিস্তারিত
জনসমাবেশের ‘শব্দদূষণ’ নিয়ন্ত্রণ
যানবাহনের হর্নের শব্দ, মানুষের হল্লা, চিৎকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রোগ্রামের মাইকের
বিস্তারিত