১৫ নভেম্বর সিডরের ১৩তম বছর

সিডরের দুঃসহ স্মৃতি তাড়া করে উপকূলবাসীকে

তখন রাত ৭ টা ৪০ মিনিট। মহাবিপদ সংকেতের কথা শুনে আতঙ্কিত বরগুনা উপকূলের মানুষ। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির সাথে দমকা হাওয়া বইছে। সচেতন মানুষগুলো যেতে শুরু করলেন আশ্রয় কেন্দ্রে। বেশীর ভাগ মানুষই রয়ে গেলেন বাড়িতে। তাদের ধারনা ছিল, কত ঝড়ই আইলো গেলো-এবারেও তাদের কিছু হবেনা।

সিডর আঘাত হানতে শুরু করেছে উপকূলীয় এলাকায়। মানুষের ঘর যেন এখনই উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তার সাথে যুক্ত হলো পানি প্রবাহ। রাত সাড়ে ১০ টার দিকে বঙ্গোপসাগরের সব জল জম দূতের মতো এসে মানুষগুলোকে নাকানি-চুবানী দিয়ে কেড়ে নিতে শুরু করলো। মাত্র ১০ মিনিটের জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের কয়েক হাজার মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পরলো।

পুরো এলাকা হয়ে গেলো লন্ডভন্ড। সকালে মনে হলো কেয়ামত হয়ে গেছে। চারিদিকে ধ্বংসলীলা। লাশের পর লাশ পাওয়া যাচ্ছে। কবর দেবার জায়গা পাওয়া যাচ্ছেনা। একএকটি কবরে ২/৩ জনের লাশ ফেলে মাটি চাপা দেয়া হলো।  সরকারী তথ্য অনুযায়ী সিডরের আঘাতে বরগুনা জেলায় ১ হাজার ৩৪৫ জন মানুষ মারা গেছে।  ৩০ হাজার ৪৯৯ টি গবাদী পশু ও ৬ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯ টি হাস-মুরগী মারা যায়।
জেলার ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৬১ টি পরিবারের সবাই কমবেশী ক্ষতির শিকার হন। সম্পূর্নভাবে গৃহহীন হয়ে পরে জেলার ৭৭ হাজার ৭৫৪ টি পরিবার। বেসরকারী হিসেবে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৬ শত জনের ওপরে।

  • মৃত্যুর কারণ:

সিডরের সময় আবহাওয়া বিভাগের সতর্কবানী যথাযথ ছিলনা। আবহাওয়া অফিস ৪ নম্বর সতর্ক সংকেত থেকে হঠাৎ করে ১০ নম্বর বিপদ সংকেতের কথা ঘোষনা করেন। মংলা সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করে যে সতর্ক সংকেত প্রচার করা হয়েছিল, তা বোঝার উপায় বরগুনার মানুষের ছিলনা। রেডক্রিসেন্টের সেচ্ছাসেবকরা ছিল প্রায় নিষ্ক্রিয়। দু’এক জায়গায় তারা মাইকিং করলেও বেশীর ভাগ জায়গায়ই কোন রকম সংকেত প্রচার করা হয়নি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তথ্য অফিস মাইকিং করলেও তা ছিল শহর এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

যারাও ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত শুনেছেন, তারাও পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্রের অভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেননি। এন এস এস নির্বাহী পরিচালক শাহাবুদ্দিন পাননা বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সতর্ক সংকেত স্থানীয় ভাষায় বোধগম্য করে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য ঘূর্ণিঝড় কর্মসূচির সেচ্ছাসেবকসহ বিভিন্ন বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে।

  • বেঁচে যাওয়ারা আজও আঁতকে ওঠেন:

২০০৭ সালের ওই রাতে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াল সামুদ্রিক  জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় অঞ্চল লন্ড-ভন্ড করে দিয়েছিল। উপকূলীয়  অঞ্চলের শত-শত মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে যায়। নিখোঁজ রয়েছে বহু মানুষ। প্রাণহানী ঘটেছিল শত শত মানুষের। মারা গিয়ে ছিল শত শত গবাদি পশু।

আগের দিনও যে জণপদ ছিল মানুষের কোলাহলে মুখরিত, মাঠ জুরে ছিল কাচা-পাকা সোনালি ধানের সমারোহ, পর দিনই সেই জনপথের কোন চিহ্ন ছিল না। ধ্বংসের তান্ডবলীলায় ওই অঞ্চল পরিনত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। ৬ বছর পরে সেই স্মৃতি  আজও যারা বেঁচে আছেন এবং তাদের মধ্যে যারা আত্মীয় স্বজন হারিয়েছেন সেই বিভীষিকাময় দিনটি মনে পড়লেই আতকে ওঠেন।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপে সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্ট হচ্ছিল। নিম্ন চাপটি কয়েক বার গতি পরিবর্তন করে মধ্যরাতে অগ্নি মুর্তি রুপ ধারণ করে। রাতে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা উপকূলীয় অঞ্চলে। ঝড়ের তীব্রতা কমে যাওয়ার পর শুরু হয় স্বজনদের খোজাখুজি।

কারও বাবা নেই, কারও মা নেই। আবার কারও নেই স্ত্রী, পত্র কন্যা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী, মামা-মামী, খালা-খালু, চাচা-চাচি, গাছের ডালে কিংবা বাড়ি ঘরের খুটির সঙ্গে ঝুলে আছে স্বজনদের লাশ। যে দিকে চোখ যায় শুধু লাশ আর লাশ উপকূলের বাতাসের কানপাতলেই মৃত্যু পথযাত্রি শত মানুষের চিৎকার আর স্বজনদের আহাজারি এতবছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের দুঃসহ সৃতি আজও জেগে আছে স্বজনহারাদের মাঝে দুঃখ স্বপ্নের মত আজও তাড়া করে তাদের। আজও ভুলতে পারেনি সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি। স্বজন হারান বেদনায় আজও তারা কাঁদে।

একদিকে সরকারিভাবে দিনটিকে স্মরণ  করা না হলেও স্বজন হারা মানুষেরা মিলাদ মাহফিল, দোয়া মনাজাত কোরআনখানি ও নানাবিধ পারিবারিক আয়োজনে দিনটিকে স্মরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছ ।

  • বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ:

১২/১৪ ফুট উচ্চতায় ভেঙে পড়ছিল। তার সঙ্গে বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ আর প্রচন্ড বেগে বইছে তুফান। এ অবস্থায় একটি পাতিলে ভাসিয়ে দেওয়া হল মাত্র এক মাস আট দিন বয়সের শান্তকে। প্রায় ৫ ঘণ্টা মাতাল সেই ঢেউয়ের মধ্যেও অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় শান্ত।

১৫ নভেম্বর ২০০৭ ভয়াল এই দিনে আমতলী উপজেলাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চল লন্ড ভন্ড করে দিয়েছিল ঘূর্ণিঝড় সিডর। বিপন্ন হয়ে পড়ে মানুষের জীবনযাত্রা। সেই ভয়াল দিনের ধ্বংসযজ্ঞের কথা আজো ভুলতে পারেনি উপকূলবর্তী আমতলী-তালতলীসহ দক্ষিণাঞ্চলবাসী। ৪ বছর আগে বয়ে যাওয়া সিডরের তাণ্ডবে আমতলী উপজেলার ২৯৭ জন মানুষ প্রাণ হারায়। গবাদী পশু, হাঁস-মুরগি মারা যায় কোটি টাকার। আমতলী উপজেলাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকার বিরান ভূমিতে পরিণত হয়। সিডরের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে আজ ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি এ অঞ্চলের মানুষ।

আমতলী উপজেলাসহ উপকূলের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় ২৩০ কিলোমিটার ঝড়ে রেখে গিয়েছিল শুধু ধ্বংসযজ্ঞ আর লাশের স্তুপ। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বিধ্বস্ত হয়ে যায় উপকূলীয় জনপদ। এই জলোচ্ছ্বাসে উপজেলার ৭০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৫৫ কিলোমিটার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ। ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয় উপজেলার ১৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
স্বজন হারানোদের আহাজারিতে আজো আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে স্বজন হারানোদের পরিবারসহ দুই শতাধিক পরিবার দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। আমতলী উপজেলাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে এ দিনে বইছে শোকের মাতম। এ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবারও বেড়ে গেছে ঝড় জলোচ্ছ্বাস। আতঙ্কিত উপকূলীয় আমতলী-তালতলীবাসী। নিরাপদে থাকতে পারে এই দাবি বর্তমান সরকারের কাছে।


কাপাসিয়াতে বাস ও সিএনজি মুখোমুখি
গাজীপুরের কাপাসিয়াতে বাস ও সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩ জন
বিস্তারিত
বানেশ্বরদীতে বাল্যবিবাহ মুক্ত করতে গণস্বাক্ষর
শেরপুরের নকলা উপজেলার বানেশ্বরদী ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ মুক্ত করতে গণস্বাক্ষর ও
বিস্তারিত
উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় জোছনা উৎসব
বরগুনার তালতলীতে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় জোছনা উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৃহস্পতিবার
বিস্তারিত
পদ্মা সেতু নিয়ে বিএনপি অনেক
মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলতুন নেসা ইন্দিরা বলেছেন, পদ্মা সেতু
বিস্তারিত
ব্রুনাইতে দালাল নিধনে সক্রিয় ভূমিকায়
ব্রুনাইতে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পরে
বিস্তারিত
বাউফলে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি
পটুয়াখালীর বাউফলে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে টিনশেড ঘর
বিস্তারিত