(পর্ব-১২)

একদিন নবীজির বাড়িতে

মানুষ সামাজিক জীব। দেশ-রাষ্ট্র, পরিবার-সমাজ এ নিয়েই তো চলে মানুষের জীবন। এক পরিবারের সঙ্গে আরেক পরিবারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একজন আরেকজনের কাছে যায়। এভাবেই তো চলছে জীবনের পথ। এ জীবন পথে কখনও কখনও অন্যের বাড়িতে মেহমান হতে হয়। অতিথির মেহমানদারি করার মাধ্যমে ফুটে ওঠে মানবতা। আশ্রয় পায়, সমাদৃত হয় একজন পথিক কিংবা আত্মীয়

ভালো খাদেমকে প্রহার করা নিষিদ্ধ হতেই পারে। কিন্তু যেসব খাদেম দুষ্ট প্রকৃতির। উল্টাপাল্টা কাজ করে। বাড়াবাড়ি করে বসে। এদের তো প্রহার করা অন্যায় হওয়ার কথা নয়। আমার ভাবনা আর যুক্তির বিপরীত জানালেন আবদুল্লাহ ইবনু ওমার (রা.)। তিনি বললেন, ‘ওমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেনÑ এক লোক রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, আমার এক সেবক আছে। সে খারাপ আচরণ করে। বাড়াবাড়ি করে। উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। আমি কি তাকে প্রহার করব? নবী (সা.) বললেন, তাকে প্রতিদিন সত্তরবার ক্ষমা কর।’ (আহমাদ : ২/২১৭)।
আয়েশা (রা.) এর এ বক্তব্যের সাপোর্টে অনেকেরই বক্তব্য পাওয়া গেল। এমনকি কাফেররাও সমর্থন করেছেÑ নবীজি (সা.) কাউকে প্রহার করেননি।
মহানবী (সা.) এর মেহমানদারি : মানুষ সামাজিক জীব। দেশ-রাষ্ট্র, পরিবার-সমাজ এ নিয়েই তো চলে মানুষের জীবন। এক পরিবারের সঙ্গে আরেক পরিবারের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একজন আরেকজনের কাছে যায়। এভাবেই তো চলছে জীবনের পথ।
এ জীবন পথে কখনও কখনও অন্যের বাড়িতে মেহমান হতে হয়। অতিথির মেহমানদারি করার মাধ্যমে ফুটে ওঠে মানবতা। আশ্রয় পায়, সমাদৃত হয় একজন পথিক কিংবা আত্মীয়। 
এ মেহমানদারি সম্পর্কে নবীজি (সা.) এর কথা শোনার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিলাম। রাসুলের একটি কথা আমার কর্ণকুহরে পড়ে, নবীজি (সা.) বলেনÑ কারও কাছে যখন কোনো মেহমান আসে, তখন মেহমানের প্রতি সম্মান দেখাও (হাসি মুখে তাকে গ্রহণ করে এবং আপ্যায়ন করে)। একদিন পর্যন্ত মেহমানদারি তো তার প্রাপ্য। তিন দিন পর্যন্ত আপ্যায়নই হলো প্রকৃত মেহমানদারি। আর এর পরবর্তী সময় মেহমানদারি চালিয়ে যাওয়া হলো সাধারণ দান। (মেহমানদের পেছনে তখন যা খরচ হবে, তা দান করার পরিমাণ সওয়াবই পাওয়া যাবে)।
নবীজির এ কথা আমার হৃদয়ে ঝড় তুলল। সত্যিই আমরা সবাই যদি নবীজির এ কথাটুকু উপলব্ধি করি, তাহলে আর মেহমান দেখে মুখ কালো হয়ে যাবে না। মেহমান দুই-একদিন থাকলেও বিরক্তি আসবে না। অথচ অনেককেই বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখি।
নবীজির মেহমানদারির কথা শুনতে চলে এলাম নবীজির পরিবারে। এখানেও দেখি মেহমানদারির ব্যাপারে কত সচেতনতা। আম্মাজানরা (রা.) মেহমানদারি করছেন হাত খুলে। এমনকি কেউ কেউ তো নিজের খাবার পর্যন্ত মেহমানের প্লেটে তুলে দিয়ে মেহমানকে পরিতৃপ্ত করছেন, আর নিজে থেকেছেন অভুক্ত।
মেহমানদারি শুধু খাওয়ানোর নাম নয়, বরং হাসিমুখে বরণ করে নেওয়া, কথাবার্তা বলা, খোঁজখবর নেওয়াও মেহমানদারির অন্তর্ভুক্ত। এসব ব্যাপারেও নবীজিকে পেয়েছি এক আদর্শ মানবরূপে।
মেহমান সাধারণত চেষ্টা করেন যার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন তার জন্য কিছু হাদিয়া নিয়ে যেতে। এ হাদিয়া হয়ে থাকে আন্তরিকতা প্রকাশের নিদর্শনস্বরূপ। অথচ কেউ কেউ এমনও আছেন যে, হাদিয়া গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করেন। এ ব্যাপারে নবীজিকে খুবই অমায়িক উৎফুল্ল পেলাম। নবীজি (সা.) এর কাছে কেউ হাদিয়া নিয়ে এলে তা তিনি সাদরে গ্রহণ করেন এবং তার হাদিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তিনিও হাদিয়া দেন। 
এই মুহূর্তে একদিনের কথা মনে পড়ল। নবীজির কাছে এক মহিলা এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন একটি বুননকৃত চাদর। চাদরটি নবীজির সামনে হাদিয়া হিসেবে পেশ করে বললেন, এ চাদরটি আমি আপনার জন্য নিজ হাতে বুনন করেছি। আমার ইচ্ছা, আপনি এটি পরিধান করবেন। নবীজি (সা.) চাদরটি এমনভাবে গ্রহণ করলেন, যেন মনে হলো এ চাদরটি তাঁর খুবই প্রয়োজন। মেহমান কর্তৃক হাদিয়া যখন আন্তরিকতার সঙ্গে এবং প্রয়োজন অনুভব করে গ্রহণ করা হয়, তখন মেহমান খুশি হন। নবীজির এ ব্যবহারে মহিলা খুশি হয়ে গেলেন। তার চেয়ে আরও বেশি খুশির ব্যাপার ছিল নবীজির আরেকটি সুন্দর ব্যবহার। নবীজি (সা.) চাদরটি নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তা পরিধান করে চলে এলেন সবার সামনে। হাদিয়াদাতা মহিলা আরও খুশি হলেন। তার চাদর বুননের কষ্টের কথা ভুলে গেলেন। তার মন ভরে উঠল এক পবিত্র প্রশান্তিতে। (আশরাফুল ওয়াসাইল ইলা ফাহমিশ শামায়িল : ১৭১)।
আরেক দিনের ঘটনা। হ্যাঁ, খুব মজার ঘটনা। নবীজি (সা.) বসে আছেন মসজিদে। এর মধ্যে প্রায় দুইশত বছরের এক বুড়ো এলো। নবীজির কাছে আসতে চাচ্ছে। এ বুড়োকে দেখে সাহাবিরা একে অপরের দিকে তাকাতাকি করছেন। আর বুড়োর গতিবিধি লক্ষ করছেন। বুড়ো নাকি নবীজির সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎ করবে!
বুড়োর উদ্দেশ্য জানার জন্য এগিয়ে গেলেন এক সাহাবি। বুড়ো সেই সাহাবিকে শোনালেন তার জীবন কথা। সে অনেক কথা। কিন্তু বললেন সংক্ষেপে। 
আগন্তুক এ বুড়োর নাম ‘মাবাহ’। পারস্যের এক জমিদারপুত্র। নামিদামি পরিবারের লোক। সত্যের সন্ধানে বের হয়েছেন তিনি। জীবনের এক কঠিন মুহূর্ত চলছে তার। ভাগ্যচক্রে এখন তিনি কৃতদাস। নবী করিম (সা.) এর কাছে কিছু খেজুর নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। এ খেজুরগুলো নবীজিকে সদকা করবেন। 
সাহাবির অনুমতি পেয়ে মাবাহ চলে গেলেন নবীজির একেবারে কাছে। মাবাহ বললেন, আপনার জন্য কিছু সদকা নিয়ে এসেছি। আপনি তা গ্রহণ করুন। নবীজি (সা.) জানালেন, সদকা বা দান তিনি গ্রহণ করেন না। তাই খেজুরগুলো অন্যান্য সাহাবিকে দিয়ে দিতে বললেন। এ কথা শুনে সেদিনের মতো মাবাহ চলে গেলেন। 
এর কিছুদিন পর আবার ফিরে এলেন মাবাহ। এবার নবীজির কাছে কিছু খেজুর রেখে বললেন, আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি। আপনার প্রতি আমার হৃদয়ের টান থেকেই আমি আপনার জন্য এ উপহার নিয়ে এসেছি। এগুলো হাদিয়া পেশ করছি। নবীজি (সা.) এবার হাদিয়াগুলো গ্রহণ করলেন। বললেন, আমি দানসদকা গ্রহণ করি না, তা আমার জন্য বৈধও নয়। তবে উপহার বা হাদিয়া গ্রহণ করে থাকি। উপহার দিতে পেরে সন্তুষ্ট হৃদয়ে মাবাহ চলে গেলেন। 
এর কিছুদিন পর মাবাহ নবীজি (সা.) কে শেষ নবী হিসেবে চিনতে পেরে সব আলামত পেয়ে মুসলমান হয়ে গেলেন। নতুন নাম হলো সালমান ফারসি (রা.)। (মুসতাদরাক আল-হাকিম : ৪/৫৮৮)।
নবীজির বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে আরও অনেক ঘটনা সম্পর্কেই জানতে পারলাম। এবার একটু বিরতি দেব ভাবছি। হ্যাঁ, সামান্য বিশ্রামের পর নজরে এলো একটি বিষয়। 


উত্তম চরিত্র নিয়ে যাবে জান্নাতে
রাসুল (সা.) এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে দোয়া করতেনÑ তিনি নিজে
বিস্তারিত
আসল ব্যাধির দাওয়াই
ঈমানি ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখা। দ্বীনের ওপর চলার ক্ষেত্রে এটা বড়
বিস্তারিত
আলমেদরে সমালোচনা
আমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শক্ষিক ছলিাম। মাদ্রাসায় পড়ার পর আরও
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : সুবাসিত জীবনের পথ লেখক : মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন ইবরাহীম সম্পাদক
বিস্তারিত
পাথেয়
  ষ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এ হচ্ছে স্মৃতিচারণ, মুত্তাকিদের জন্য অবশ্যই
বিস্তারিত
শীতকালের তাৎপর্য ও বিধিবিধান
শরিয়তে বিধানের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কষ্ট বা প্রয়োজনের সময়
বিস্তারিত